ads

নীতিমালায় ফাঁক, ক্রেডিট কার্ড নিয়ে আস্থার সংকট

নীতিমালায় ফাঁক, ক্রেডিট কার্ড নিয়ে আস্থার সংকট
ক্রেডিট কার্ডের আগ্রাসী মার্কেটিং ও বিক্রির প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভোক্তারা। ছবি: রয়টার্স

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভোক্তা অধিকার ও ঋণ নীতিমালার ‘ধূসর এলাকা’ ব্যবহার করে ব্যাংকগুলো ক্রেডিট কার্ড বিক্রি ও প্রচারণায় ব্যাংকিং নিয়ম ভাঙছে। ক্রেডিট কার্ডের আগ্রাসী মার্কেটিং ও বিক্রির প্রতিযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভোক্তারা। সার্বিকভাবে আস্থার সংকটে পড়ছে ব্যাংকিং খাত।

ব্যাংক খাত বিশ্লেষকরা বলছেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তো বটেই, এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি-নির্ধারকরাও অনেক ক্ষেত্রে মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কড়াকড়ি আরোপ করলে ক্রেডিট কার্ডের প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে এবং ব্যাংকগুলো লোকসানের মুখে পড়তে পারে।

Advertisement

কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধূসর নীতিমালা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের চাতুর্যের কারণে আস্থার সংকটে পড়ছে গ্রাহক। অনেক ক্ষেত্রেই ক্রেডিট কার্ড সেবা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু ভারত, মালয়শিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের যেসব দেশ ভোক্তাবান্ধব নীতিমালা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে মানতে বাধ্য করেছে, সেসব দেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকও কার্যত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষেই এ বিষয়ে অবস্থান নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলছেন, ব্যাংকগুলো জামানত ছাড়াই কার্ড দেয় বলে তার ঝুঁকি বেশি।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অনেকেই ক্রেডিট কার্ডের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘গাইডলাইন অন ক্রেডিট কার্ড অপারেশন’ এবং ‘কনজ্যুমার প্রোটেকশন গাইডলাইনস’-এর বেশ কয়েকটি ধারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে লঙ্ঘন করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় বড় অনিয়মে (যেমন খেলাপি ঋণ বা করপোরেট জালিয়াতি) কঠোর অবস্থান দেখানোর চেষ্টা করলেও ক্রেডিট কার্ড খাতের কিছু সুনির্দিষ্ট অনৈতিক চর্চাকে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং ‘কনজ্যুমার স্পেন্ডিং’ বাড়ানোর অজুহাতে এক প্রকার ‘না দেখার ভান’ করে এড়িয়ে যায়।

চক্রবৃদ্ধি সুদের চতুর হিসাব

বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো এই সুদের হিসাব যেভাবে করে, তা চাতুর্যপূর্ণ। কোনো গ্রাহক যদি মোট বিলের চেয়ে ১ টাকাও কম দেন, ব্যাংক কিন্তু কেবল বকেয়া টাকার ওপর সুদ ধরে না; তারা পুরো মাসের মোট লেনদেনের ওপর (ট্রানজেকশন ডেট থেকে) সুদ হিসাব করে।

এই ‘পদ্ধতিগত সুদ জালিয়াতি’ বা লুকানো চার্জের ব্যাপারে গ্রাহক সুরক্ষা সেলে (সিআইপিডি) প্রতি মাসে শতাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও বাংলাদেশ ব্যাংক সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে বড় ধরনের জরিমানা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় না। এটিকে ব্যাংকগুলোর ‘অভ্যন্তরীণ হিসাব পদ্ধতি’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়।

সাবেক অন্তর্বতী সরকারের উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার ২৫ শতাংশে ক্যাপ করে দেওয়া হলেও ব্যাংকগুলো ভেতরের হিসাব যেভাবে করে, তা সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ভারত বা অন্যান্য দেশের মতো হিসাবের স্পষ্ট পদ্ধতি সার্কুলার দিয়ে বাধ্যতামূলক না করে, তবে এই নীরব পকেট কাটা বন্ধ হবে না। চুক্তির শর্তাবলীর অজুহাতে ব্যাংকগুলো কোনো অনৈতিক প্র্যাকটিস চালু রাখতে পারে না।”

ডিএসএ নিয়োগ ও গ্রাহক হয়রানি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকের নিজস্ব পে-রোল বা অনুমোদিত প্রতিনিধি ছাড়া কেউ গ্রাহকের সংবেদনশীল আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে না এবং গ্রাহককে অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ করে বিরক্ত করা যাবে না।

কিন্তু সিংহভাগ বেসরকারি ব্যাংক আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে থার্ড-পার্টি এজেন্সি বা কমিশন-ভিত্তিক ডিএসএ নিয়োগ করে। এই এজেন্টরা লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য গভীর রাতে বা কাজের সময়ে প্রতিনিয়ত ফোন দিয়ে গ্রাহকদের অতিষ্ঠ করে তোলে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো, কার্ড বিক্রির জন্য এই এজেন্টরা গ্রাহকদের জাতীয় পরিচয়পত্র, ইউটিলিটি বিল এবং ব্যাংক স্টেটমেন্টের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ডেটা সংগ্রহ করে, যা গ্রাহকের তথ্য গোপনীয়তা আইনের লঙ্ঘন।

প্রাক-অনুমোদিত ও অযাচিত কার্ড

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী গ্রাহকের লিখিত আবেদন ও সই ছাড়া কোনো ব্যাংকিং লোন বা ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করা সম্পূর্ণ নিষেধ। কিন্তু কিছু ব্যাংক তাদের বিদ্যমান ডিপোজিট বা স্যালারি অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের না জানিয়েই ‘প্রি অ্যাপ্রুভড’, ‘আপনাকে অভিনন্দন, আপনার কার্ড রেডি’ বলে মেসেজ পাঠায় এবং অনেক সময় গ্রাহকের ঠিকানায় কার্ড পাঠিয়ে দেয়। গ্রাহক কার্ড অ্যাক্টিভেট না করলেও অনেক ব্যাংক বছর শেষে ‘অ্যানুয়াল ফি’ বা ‘কার্ড মেইনটেইন্যান্স ফি’ চার্জ করে বসে, যা নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। ছবি: বাসস
বাংলাদেশ ব্যাংক সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। ছবি: বাসস

আগ্রাসী ডেট রিকভারি ও মানসিকভাবে হেনস্তা

ক্রেডিট কার্ডের বিল বকেয়া হলে ব্যাংকগুলোর নিয়োগ করা রিকভারি এজেন্টরা গ্রাহকদের কর্মক্ষেত্রে ফোন দেওয়া, আত্মীয়-স্বজনদের কাছে ঋণের কথা ফাঁস করে দেওয়া বা গভীর রাতে ফোন দেওয়ার মতো আচরণ করে।

অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, বকেয়া আদায়ের জন্য কোনো গ্রাহককে সামাজিক বা মানসিকভাবে হেনস্তা করা যাবে না। কিন্তু ব্যাংকগুলো যখন থার্ড-পার্টি ‘কালেকশন এজেন্সি’ ব্যবহার করে এই কাজ করায়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি ব্যাংকের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে এক ধরনের উদাসীনতা দেখায়। ব্যাংকগুলো দায় চাপায় এজেন্সির ওপর, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন চরচাকে বলেন, “ব্যাংকগুলোর কার্ড ডিভিশনের ওপর প্রতি বছর যে বিশাল ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা পূরণ করতে গিয়ে কর্মকর্তারা থার্ড-পার্টি এজেন্সির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। আউটসোর্সিং কর্মীরা ব্যাংকের মূল সংস্কৃতির অংশ না হওয়ায় তারা নীতিমালার তোয়াক্কা করে না। গ্রাহকের ডেটা প্রাইভেসি লঙ্ঘন এবং হিডেন চার্জের বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনা উচিত, যাতে ব্যাংকগুলো এজেন্টের ওপর দায় চাপিয়ে পার না পায়।”

অন্যায্য পার্টনারশিপ ও মনোপলি

বিভিন্ন নামী লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড, চেইন শপ বা রাইড শেয়ারিং কোম্পানির সাথে ব্যাংকগুলো কো-ব্র্যান্ডেড কার্ড চালু করে। এই পার্টনারশিপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু মার্চেন্টকে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয়, যা বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করে।

এই ধরনের আগ্রাসী বাণিজ্যিক পার্টনারশিপের ক্ষেত্রে মনোপলি বা গ্রাহক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃশ্যমান তদারকি না থাকার সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিজ্ঞাপনে বাংলা, শর্তে ইংরেজি: ফাঁদে ভোক্তা

দেশের ব্যাংকগুলো ক্রেডিট কার্ডের বিজ্ঞাপন প্রচার করছে বাংলা ভাষায়। সেখানে ক্যাশব্যাক, রিওয়ার্ড পয়েন্ট আর বিমানবন্দর লাউঞ্জের হাতছানি থাকে। কিন্তু কার্ডের প্রকৃত খরচ, সুদের হিসাব ও বিলম্ব ফি-সংক্রান্ত শর্তাবলি এখনো মূলত ইংরেজি আইনি ভাষায় লেখা থাকে, যা সাধারণ গ্রাহকদের কাছে অনেক সময় দুর্বোধ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে জারি করা এক সার্কুলারে ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ সুদহার ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সিদ্ধান্তের পেছনে নীতি সুদহার ও ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার যুক্তি দিয়েছে। তবে সুদের এই ঊর্ধ্বমুখী হার কার্ডের বিজ্ঞাপনে যতটা প্রকাশ্যে প্রচারিত হয়, শর্তাবলির অন্যান্য জটিল দিক–যেমন চক্রবৃদ্ধি সুদ গণনার পদ্ধতি, লেট পেমেন্ট চার্জ বা ক্যাশ অ্যাডভান্সের প্রকৃত খরচ, ততটা স্পষ্টভাবে বাংলায় জানানো হয় না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের শীর্ষ গবেষক অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব বলেন, “আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সিংহভাগ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী ফিন্যান্সিয়ালি লিটারেট (আর্থিক সচেতন) নন। ব্যাংকগুলোর ‘শিডিউল অব চার্জেস’ এত ছোট অক্ষরে এবং জটিল ভাষায় লেখা থাকে যে, সাধারণ গ্রাহক ট্রেইলিং ব্যালেন্স বা ডাবল পেনাল্টির হিসাব ধরতে পারেন না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত প্রতিটি ব্যাংকের জন্য একটি এক পাতার ‘কি ফ্যাক্ট স্টেটমেন্ট’ (কেএফএস) বাধ্যতামূলক করা, যেখানে সুদের প্রকৃত হিসাব পদ্ধতি বাংলায় স্পষ্ট করে লেখা থাকবে।”

আয়ের কৃত্রিম মূল্যায়ন

নীতিমালা অনুযায়ী, ক্রেডিট কার্ড দেওয়ার আগে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা (ডিবিআর) এবং আয়ের উৎস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা বাধ্যতামূলক।

কিন্তু কার্ডের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ব্যাংকের সেলস টিম অনেক সময় গ্রাহকের প্রকৃত আয়ের চেয়ে বেশি আয় দেখিয়ে (যেমন: অনানুষ্ঠানিক বা ক্যাশ আয় যুক্ত করে) ক্রেডিট লিমিট বাড়িয়ে দেয়। ফলে গ্রাহক তার সামর্থ্যের চেয়ে বেশি ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন।

বিভিন্ন দেশের কঠোর আইন: ঊর্ধ্বমুখী ক্রেডিট কার্ডের প্রবৃদ্ধি

গ্রাহক অসন্তোষ ও সামাজিক চাপের মুখে ক্রেডিট কার্ডের এই চতুর বিলিং পদ্ধতি (যেমন পুরো ব্যালেন্সের ওপর পেছনের তারিখ থেকে সুদ) এবং অন্যায্য ফি বন্ধ করতে কঠোর আইনি সংস্কার করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ভারতসহ অনেক দেশ।

ক্রেডিট কার্ড দেওয়ার আগে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং আয়ের উৎস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা বাধ্যতামূলক। ছবি: ম্যাগনেফিক
ক্রেডিট কার্ড দেওয়ার আগে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং আয়ের উৎস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা বাধ্যতামূলক। ছবি: ম্যাগনেফিক

ভারত: ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) ২০২২ সালে ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের সুরক্ষায় একটি ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত কঠোর মাস্টার ডিরেকশন জারি করে।

আগে ভারতের ব্যাংকগুলোও বাংলাদেশের মতোই পুরো ব্যালেন্সের ওপর পেছনের তারিখ থেকে সুদ হিসাব করত। ২০২২ সালের নির্দেশনায় আরবিআই এটি সম্পূর্ণ নিষেধ করে। স্পষ্ট বলা হয়, সুদ কেবল অপরিশোধিত বকেয়া অংশের ওপর ধার্য করা যাবে, মোট বিলের ওপর নয়।

ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করে দেয়, কোনো গ্রাহক বিল দিতে দেরি করলে কেবল ‘বিলম্ব ফি’ নেওয়া যাবে। এর ওপর আবার নতুন করে কোনো সুদ বা চক্রবৃদ্ধি চক্র চালানো যাবে না। এ ছাড়া গ্রাহকের স্পষ্ট সম্মতি (ওটিপি বা লিখিত) ছাড়া কোনো কার্ড সক্রিয় করা বা চার্জ বুক করা যাবে না। যদি কোনো ব্যাংক গ্রাহকের সম্মতি ছাড়া কার্ড ইস্যু করে, তবে ব্যাংক গ্রাহককে দ্বিগুণ জরিমানা দেবে।

দক্ষিণ আফ্রিকা: দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের দেশের সাধারণ মানুষকে ঋণের ফাঁদ থেকে বাঁচাতে এবং ব্যাংকগুলোর অন্যায্য মুনাফা বন্ধ করতে ন্যাশনাল ক্রেডিট রেগুলেটর (এনসিআর) গঠন করে।

দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় ঋণ আইনের একটি বিখ্যাত ধারা হলো ‘ইন-ডু-প্লোম’। এই নিয়ম অনুযায়ী, ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বিলের ওপর সুদ এবং আনুষঙ্গিক লেট ফি বা পেনাল্টি জমতে জমতে কোনো অবস্থাতেই মূল বকেয়া টাকার চেয়ে বেশি হতে পারবে না। অর্থাৎ, গ্রাহকের মূল বকেয়া যদি ১০ হাজার টাকা হয়, তবে সুদ-জরিমানা মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকাই যোগ হতে পারবে, তার বেশি নয়।

মালয়েশিয়া: মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক নেগারা মালয়েশিয়া (বিএনএম) ক্রেডিট কার্ডের সুদহার এবং লেট ফি আদায়ের ক্ষেত্রে চতুর ব্যাংকিং প্র্যাকটিস বন্ধে কঠোর নিয়ম চালু করে। মালয়েশিয়ায় ব্যাংকগুলো সবার ওপর ঢালাওভাবে সর্বোচ্চ সুদ চাপাতে পারে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, যে গ্রাহক নিয়মিত ১২ মাস ধরে অন্তত ন্যূনতম বিল পরিশোধ করছেন, তার সুদের হার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে সর্বনিম্ন স্তরে চলে আসবে। আর যিনি ডিফল্ট করবেন, কেবল তার ওপর সাময়িক উচ্চ সুদ থাকবে। এ ছাড়া লেট পেমেন্ট ফি বকেয়া পরিমাণের সর্বোচ্চ ১ শতাংশের এর বেশি হতে পারবে না বলে সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যাংকারদের সাধারণ শঙ্কা থাকে যে, এই ধরনের কঠোর নিয়ম স্পষ্ট করে দিলে ক্রেডিট কার্ডের প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে এবং ব্যাংকগুলো লোকসানে পড়বে। কিন্তু মধ্যম আয়ের এই দেশগুলোর বাস্তব অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

২০২২ সালে ভারতের আরবিআই যখন এই কঠোর নিয়মগুলো চালু করে, তখন ধারণা করা হয়েছিল ক্রেডিট কার্ড ইস্যু কমে যাবে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ভারতে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা এবং ট্রানজেকশন জ্যামিতিক হারে বেড়েছে।

মূলত যখন গ্রাহকরা নিশ্চিত হলেন যে, মাত্র ১০০ টাকা বকেয়া থাকার জন্য ব্যাংক তাদের পুরো ১০ হাজার টাকার ওপর পেছনের তারিখ থেকে সুদ কাটবে না, তখন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ভীতি দূর হয়।

ব্যাংকগুলোর অন্যায্য হিডেন চার্জের আয় কমলেও কার্ডের ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় মার্চেন্ট ইন্টারচেঞ্জ ফি থেকে ব্যাংকগুলোর বৈধ আয় অনেক বেড়ে গেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘ইন-ডু-প্লোম’ নিয়মের কারণে ব্যাংকগুলো চাইলেই গ্রাহককে ঋণের জালে আটকে অনির্দিষ্টকাল সুদ তুলতে পারে না। ফলে ব্যাংকগুলো কার্ড দেওয়ার আগেই গ্রাহকের ক্রেডিট স্কোরিং ও আয় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাচাই করে। এতে দক্ষিণ আফ্রিকার কনজ্যুমার ক্রেডিট মার্কেটে খেলাপি ঋণের পরিমাণ লাতিন আমেরিকা বা অন্যান্য উদীয়মান বাজারের চেয়ে অনেক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ভারত বা মালয়েশিয়ার মতো মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেখানে স্পষ্ট ভাষায় ‘বাধ্য থাকবে’ কিংবা ‘করা যাবে না’ লিখে গ্রাহকদের পকেট কাটা বন্ধ করেছে, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক কেবল সুদহারের ওপর ২৫ শতাংশের একটি চটকদার সিলিং বসিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। হিসাবের চতুর পদ্ধতিটি ব্যাংকগুলোর ওপর ছেড়ে দেওয়ায় এ দেশের মধ্যবিত্ত গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত এমন এক অদৃশ্য চক্রবৃদ্ধি সুদের খেসারত দিচ্ছেন, যা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও আইনগতভাবে নিষিদ্ধ।

ক্রেডিট কার্ড মূলত কোনো জামানত বা নিরাপত্তা ছাড়াই দেওয়া হয়। যেহেতু ব্যাংক কোনো সুরক্ষা ছাড়াই গ্রাহককে একটি বড় অঙ্কের লিমিট ব্যবহারের সুযোগ দেয়, তাই এখানে ব্যাংকের জন্য ঝুঁকির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। চরচাকে তিনি বলেন, “ঋণের ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকগুলো এই চার্জের সাথে ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ যোগ করে থাকে। ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে এই বাড়তি চার্জ বা রিস্ক প্রিমিয়াম গ্রহণ করা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত।”

আরিফ হোসেন বলেন, “সাধারণত ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার বা জটিল শর্তগুলো অত্যন্ত ছোট অক্ষরে এবং ইংরেজিতে লেখা থাকে, যা সাধারণ গ্রাহকদের নজর এড়িয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক এই বিষয়গুলো সহজ ভাষায় এবং বাংলায় প্রচারের জন্য ব্যাংকগুলোকে বারবার নির্দেশনা দিচ্ছে।”

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, কোনো গ্রাহক যদি ক্রেডিট কার্ডের সুদের হিসাব বা অন্য কোনো বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হন, তবে তার প্রতিকার পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এফআই-সিএসডি বিভাগে লিখিত অভিযোগ জানানোর সুযোগ আছে।

সম্পর্কিত