রংপুরে আলোচিত ৪ হত্যায় ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা আলামতগুলোর প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ চলছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক বিভাগে। পুলিশ জানিয়েছে, তালিকার প্রথমে থাকা সিগারেটের ফিল্টার, কামড়ে খাওয়া শসার অংশবিশেষ ও খেঁজুরের বিচিতে পাওয়া গেছে পুরুষের ডিএনএ। তবে এই ডিএনএ কার তা এখনো শনাক্ত হয়নি।
সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নামপ্রকাশ না করার শর্তে আজ রোববার চরচাকে বলেন, ‘‘ওই তিনটি আলামতের ল্যাবে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে, তিনটি আলামতেই পুরুষের মুখের লালার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এখন আলামত থেকে পাওয়া ডিএনএ-এর সঙ্গে নিহত গণপতি চক্রবর্তী আর দুই অভিযুক্ত যুবক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হবে। তাদের কারো সঙ্গে ডিএনএ না মিললে বুঝতে হবে সেখানে আরো কেউ উপস্থিত ছিলেন।’’
ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য সকল আলামত পরীক্ষা করা হচ্ছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা। তিনি জানান, আলামতে পাওয়া পুরুষ ডিএনএ-এর সঙ্গে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ডিএনএ ক্রসম্যাচ প্রক্রীয়াধীন। আর দুই অভিযুক্ত যুবকের ডিএনএ প্রোফাইল হাতে পেলে তা মিলিয়ে দেখবে সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে, আলামত থেকে পুরুষের ডিএনএ পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী। তবে ঠিক কোন কোন আলামত পরীক্ষায় এই ফল মিলেছে তা জানাননি তিনি। চরচাকে তিনি বলেন, ‘‘সিআইডির ফরেনসিক টিম আমাদের মৌখিকভাবে জানিয়েছে যে, কয়েকটি আলামত থেকে তারা পুরুষের ডিএনএ পেয়েছে। আপানারা জানেন, অনেক আলামত পাঠানো হয়েছে ফরেনসিকে, সম্ভাব্য যত আলামত আছে কোনটাই বাদ যায়নি। আবার তদন্তের প্রয়োজনে আরো আলামত ফরেনসিকে পাঠানো লাগতে পারে। মাত্র কয়েকটি আলামতের ফরেনসিক হয়েছে, এখনো অনেক বাকি।’’
সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘‘এটা যেহেতু খুব স্পর্শকাতর মামলা তাই এ নিয়ে আগাম কোনো মন্তব্য করতে চাই না। সব আলামতের ফরেনসিক রিপোর্ট আমরা হাতে পেলে তখন সুনির্দিষ্ট করে বলা যাবে।’’
দুই অভিযুক্তের ডিএনএ টেস্টের বিষয়ে জানতে চাইলে তা প্রক্রীয়াধীন বলে জানান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘‘হ্যাঁ, আমরা আজ (রোববার) আদালতে প্রেয়ার (আবেদন) দেব দুজনের ডিএনএ প্রোফাইল কালেক্ট করার অনুমতি চেয়ে। তদন্তের নিয়ম মেনেই আমরা অপেক্ষায় ছিলাম ফরেনসিকের প্রাইমারি ফাইন্ডিংসের জন্য। এখন আমরা দুজন আসামির ডিএনএ কালেক্ট করে তা সিআইডিতে পাঠাব।’’
চলতি বছরের২২ আগস্ট (শনিবার) রংপুরের মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকার বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা, স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রীয়মের মরদেহ উদ্ধার হয়।
এই ঘটনায় আসামি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস গ্রেপ্তারের পর দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের দাবি ইয়াবা সেবন দেখে ফেলায় একে একে চারজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সিদ্ধার্থ এবং মুগ্ধ।
সিদ্ধার্থ স্বর্ণের দোকানের কর্মচারী আর মুগ্ধের পেশা মাছ কাটা। মাদক অধ্যুষিত এই দাসপাড়া এলাকার মাদক কারবারিদের সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হন তারা। ইয়াবা সেবনের পাশাপাশি খুচরা বিক্রির সঙ্গেও যুক্ত হন এই দুজন। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
দুই আসামির জবানবন্দি অনুযায়ী ২১ আগস্ট শুক্রবার ভোর ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটলেও তাৎক্ষণিকভাবে তা জানাজানি হয়নি। পরবর্তী ৪০ ঘণ্টায় আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর বন্ধু ও প্রেমিকের তৎপরতায় ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আসে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে রাত দেড়টার দিকে ওই বন্ধুর সঙ্গে ফোনে ৪০ সেকেন্ড কথা হয় প্রার্থীর। হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার দুপুর থেকে প্রার্থী ও তার মাকে টেলিফোনে না পেয়ে শনিবার বিকেলে ওই বাড়িতে গিয়ে ডাকাতির সন্দেহে পুলিশ ডাকেন তিনি। রাত ৯টার দিকে ঘটনাস্থলে আসে কোতয়ালী মডেল থানা এবং গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা। খবর দেওয়া হয় ফায়ার সার্ভিসকে। এ সময় বাড়িটি ছিল বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন। নিজেদের মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট এবং পোর্টেবল জেনারেটর ব্যবহার করে বাড়ির দোতলার ফ্ল্যাটে যাওয়ার একমাত্র পথ সিঁড়ির মুখের লোহার দরজাটি খোলার কাজ করেন তারা।
দরজার কিছু অংশ কাটার পর বোঝা যায় এটি ভেতর থেকে তালাবদ্ধ। সবশেষে হাইড্রোলিক হ্যামার ব্যবহার করে এটি খোলা হয়। অন্ধকারের মাঝে ফায়ার সার্ভিসের ফ্ল্যাশ লাইটের সহযোগিতায় শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। নিচতলা থেকে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠতেই দেখা যায় ফ্ল্যাটের দরজা খোলা। ভেতরে বাসিন্দাদের কোনো উপস্থিতি নেই, সব এলোমেলো, লুটপাটের চিত্র স্পষ্ট। তল্লাশির সময় বাসার ভেতরে দুর্গন্ধের সূত্র ধরে দোতলার ফ্ল্যাটে কিছু না পেয়ে ছাদে সিঁড়ি ঘরে গিয়ে পাওয়া যায় মা-মেয়ের মরদেহ। সুরতহাল প্রতিবেদন এবং সে সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে মরদেহগুলোর অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ওই সিঁড়ি ঘরের মুখেই ছাদে যাওয়ার লোহার দরজা, যা ভেতর থেকে সবসময় বন্ধ থাকার কথা থাকলেও এর ছিটকিনি ছিল খোলা। এই দরজার সামনে উপুড় হয়ে পড়েছিল প্রীতিলতা চক্রবর্তীর মরদেহ। তিন তলা থেকে আরও অর্ধেক সিঁড়ি নির্মাণ করা ছিল, যেখানে গণপতি কবুতর পালতেন। এই সিঁড়িতেই মাথা নিচে এবং পা উপরের দিক করে চিৎ হয়ে মায়ের মরদেহ ঘেঁষে পড়েছিল প্রার্থীর মরদেহ। দুজনের শরীরেই পচন ধরেছিল। বাইরের কেউ যেন মা-মেয়ের মরদেহ দেখে না ফেলে সেজন্য সিঁড়ির ফাঁকা অংশের গ্রিলে ঝুলিয়ে রাখা ছিল ঘরের বিছানার চাদর।
রাত প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে প্রথমে পাওয়া যায় দুজনের মরদেহ। অন্ধকার ছাদে গিয়ে শুরুতে গণপতির মরদেহ দেখতে পায়নি পুলিশ। প্রাথমিকভাবে এটিকে ডাকাতির পর হত্যাকাণ্ড এমন ঘটনা ধরে নিয়ে কাজ শুরু করে পুলিশ। অপরাধীদের পালানোর একমাত্র পথ ছিল বাড়ির ছাদ। তাই আলামত খুঁজতে ছাদে তল্লাশি চালায় পুলিশ। সে সময় ছাদে কোনো দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল না। কৌতূহলবশত ছাদের দরজার বাম পাশে স্তূপ করে রাখা কয়েকটি পুরাতন টিন এবং কাঠের তক্তা সরাতেই বেরিয়ে আসে গণপতির পচন ধরা মরদেহ। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা মরদেহটি খুঁজে পেয়েছিলেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) আবু সাইদ বাবলা।
সবার শেষে উদ্ধার হয় গণপতির ছেলে প্রীয়মের মরদেহ। তার মরদেহটি পাওয়া যায় রুমের ভেতরে খাট ও দেয়ালের মাঝে ছোট ফাঁকা জায়গায় লুকানো অবস্থায়।
মরদেহগুলো শনাক্ত হওয়ার পর ক্রাইম সিন হিসেবে বাড়িটির নিয়ন্ত্রণ নেয় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহে কাজ শুরু করে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট। অন্যদিকে অপরাধীদের বিষয়ে ধারণা পেতে মাঠে নামেন পুলিশ সদস্যরা। যেহেতু মরদেহগুলো দেখেই বোঝা গেছে ঘটনাটি দু-একদিন আগের তাই স্থানীয় নিজস্ব সোর্সদের ব্যবহার করে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া শুরু করে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। এ বিষয়ে প্রতিবেশীরা সরাসরি কোনো তথ্য না দিলেও একজন নিজের পরিচয় গোপন রেখে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তীকে সিদ্ধার্থের বিষয়ে তথ্য দেন। এদিন ভোর ৫টার দিকে গোয়েন্দারা কৌশল করে সিদ্ধার্থের অবস্থান সম্পর্কে বাবা বিনয় দাসের কাছে জানতে চাইলে তিনি নিজেই একই এলাকার তার ভাইয়ের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখান থেকে সিদ্ধার্থকে আটক করা হয়। আটকের সময় সিদ্ধার্থের গায়ে আঁচড়ের দাগ লক্ষ্য করেন গোয়েন্দারা। সিদ্ধার্থকে আটক করা হলে তিনি মুগ্ধের বিষয়ে তথ্য দেন। তাকে সঙ্গে নিয়ে মুগ্ধের বাড়িতে গেলে পুলিশ দেখে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন মুগ্ধ। পরে প্রায় দুই কিলোমিটার তাড়া করে স্থানীয় দক্ষিণগঞ্জ মহাশ্মশান থেকে মুগ্ধ দাসকে আটক করেন গোয়েন্দারা।