বাংলাদেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠী কর্মক্ষম। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এই বিপুল মানবসম্পদের উপস্থিতি মূলত নিম্নমজুরি ও অদক্ষ ক্যাটাগরিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর পেছনে কারণ কী কী? খুঁজতে গেলে মূলত তিনটি কারণই চোখে পড়ে। এর মধ্যে দুটি কারণ ‘অভাবে’র কথা বলবে–পরিকল্পনার অভাব এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সদিচ্ছার অভাব। তবে অভাব নয়, প্রাচুর্য আছে তৃতীয় কারণটিতে–দুর্নীতি; দেশের পায়ে কুড়াল মেরে হলেও গুটিকয়েকের পয়সা বানানোর খুব চেনা গল্পটিই পাওয়া যাবে এখানে।
কারিগরি শিক্ষা দেওয়ার মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কম নেই। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাপদ্ধতি যেমন মান্ধাতার আমলের, তেমনি শেখানোর মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক ও যন্ত্রপাতির অভাব আছে অনেক। ফলে দক্ষ কর্মী গড়ে ওঠে না। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যে সনদ দেয়, সেটিও খুব বেশি দেশে স্বীকৃতি পায় না। ফলে বাংলাদেশের স্বীকৃতি দেওয়া ‘দক্ষ’ কর্মী অনেক দেশে গিয়ে আর দক্ষ কর্মীর মর্যাদা পান না। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে দুষ্কৃতিকারী অনেক এজেন্সি এবং দুর্নীতিবাজ চক্রের উপস্থিতি তো আছেই, বিদেশে ‘অদক্ষ কর্মী’ পাঠানোই যাদের মূল উদ্দেশ্য।
অদক্ষ শ্রমিক কারা
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, কারিগরি জ্ঞান এবং কাজের পূর্ব-অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে মূলত চারটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। পেশাদার, দক্ষ, অর্ধ দক্ষ এবং অদক্ষ। ‘পেশাদার’ কর্মীরা হলেন তারা, যাদের উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, বিশেষায়িত ডিগ্রি এবং তাত্ত্বিক জ্ঞানের গভীরতা রয়েছে, যেমন–চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইটি বিশেষজ্ঞ বা নার্স। এরা শ্রমবাজারের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করেন এবং মেধাভিত্তিক সেবা প্রদান করেন।
এর ঠিক পরেই রয়েছে ‘দক্ষ’ শ্রমিক শ্রেণি, যারা নির্দিষ্ট কোনো কারিগরি কাজ বা ‘ট্রেড’ (যেমন: ওয়েল্ডিং, প্লাম্বিং, ইলেকট্রিক্যাল কাজ বা হেভি মেশিনারি চালানো) দীর্ঘমেয়াদী তাত্ত্বিক ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ অর্জন করে কারো নিবিড় তদারকি ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম হন।
অন্যদিকে, ‘অর্ধ দক্ষ’ বা সেমি-স্কিলড কর্মীদের কাজের কিছুটা প্রাথমিক ধারণা বা বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকে, কিন্তু কোনো প্রথাগত বা উচ্চতর কারিগরি সনদ থাকে না। সাধারণত এরা দক্ষ শ্রমিকদের সহকারী হিসেবে, সাধারণ দর্জি হিসেবে বা নির্দিষ্ট কোনো রুটিনমাফিক যন্ত্রচালনার কাজে যুক্ত থাকেন।
আর সবার নিচের স্তরটি হলো ‘অদক্ষ’ শ্রমিক–যাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, কারিগরি জ্ঞান বা পূর্ব-প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। মূলত কায়িক শ্রমনির্ভর কাজ যেমন–পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কৃষি শ্রমিক, সাধারণ নির্মাণ শ্রমিক, লোডার বা সাধারণ গৃহকর্মের মতো কাজগুলো এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।
বৈশ্বিক শ্রমবাজারে এই শ্রেণিবিন্যাসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন কর্মীর বেতন কাঠামো, সামাজিক মর্যাদা, চাকরির নিরাপত্তা, ঝুঁকি এবং অভিবাসন ব্যয় সরাসরি তার এই দক্ষতার স্তরের ওপরই নির্ভর করে।
বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীরা কতটা দক্ষ
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং অভিবাসন বিষয়ক গবেষণা সংস্থা রামরুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রবাসী কর্মীদের প্রায় ৭২ থেকে ৭৪ শতাংশই অদক্ষ ও অর্ধ-দক্ষ শ্রেণিতে পড়ে। ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, বিদেশে পাড়ি জমানো ১১ লাখ ৩০ হাজার প্রবাসীর মধ্যে পেশাদার ছিলেন মাত্র ৪ শতাংশ এবং দক্ষ কর্মী ২২ শতাংশ। দক্ষ কর্মীর এই অনুপাত ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্তই ২১ থেকে ২৪ শতাংশের বৃত্তে আটকে আছে।
এর মধ্যেও কাগজে-কলমের হিসাব আর বাস্তবতায় তফাৎ আছে। নারীদের গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানোর আগে ২১ থেকে ২৮ দিনের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে নথিপত্রে ‘দক্ষ’ হিসেবে দেখানো হলেও, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তা কোনো স্বীকৃত পেশাগত দক্ষতা হিসেবে গণ্য হয় না। ফলে বিশ্ববাজার যখন উচ্চ প্রযুক্তি ও সনদনির্ভর আধুনিক কাজের দিকে ঝুঁকছে, বাংলাদেশ তখন সস্তা শ্রম রপ্তানির পুরনো ছকেই আবদ্ধ হয়ে আছে।
প্রতিষ্ঠানের কমতি নেই
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে বর্তমানে ৫৫টি আলাদা ট্রেডে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ১১০টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) এবং ছয়টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি)। ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ-কোরিয়া টিটিসির হাত ধরে এ দেশে কারিগরি প্রশিক্ষণের গোড়াপত্তন ঘটে। পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান আমলে এই তালিকায় যুক্ত হয় আরও চারটি প্রতিষ্ঠান।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধির হার কিছুটা ধীর থাকলেও, ২০০০ সালের পর থেকে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে ব্যাপক গতি আসে। এর প্রমাণ মেলে ২০০১-২০০৬ এবং ২০১১-২০১৭ সালের পরিসংখ্যানে, যখন পর্যায়ক্রমে যথাক্রমে ২৬টি ও ২৭টি নতুন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। সম্প্রসারণের এই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ এক দশকে (২০১৬-২০২৬) ১ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশজুড়ে ৪০টি নতুন টিটিসি স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ পৌঁছে দিতে ৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে উপজেলা পর্যায়ে আরও ৫০টি নতুন টিটিসি নির্মাণের একটি বড় প্রকল্প ইতোমধ্যে সরকারের অনুমোদন পেয়েছে।
তবু কেন এত অদক্ষ কর্মী?
এত প্রতিষ্ঠান থাকার পরও বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না কেন? এর মূলে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার চরম বিশৃঙ্খলা। টিটিসির আওতায় নানা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু থাকলেও সেগুলোর মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে দেশের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুমোদিত শিক্ষক পদের ৫৪ শতাংশই শূন্য, যা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। টিটিসিগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি এবং হালনাগাদ কারিকুলামের অভাবে শিক্ষার্থীরা বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জন করতে পারছে না।
৪০টি উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত নতুন টিটিসিগুলো বানানোই হয়েছে ঠিকঠাকভাবে ফিজিবিলিটি স্টাডি না করে। এই টিটিসিগুলো নিজেদের সক্ষমতার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ সেবা প্রদান করতে পারছে। এর ওপর বিএমইটি প্রদত্ত তিন মাসের প্রশিক্ষণ সনদ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) দ্বারা স্বীকৃত নয়, আবার প্রাক-অভিজ্ঞতার সনদ (আরপিএল) গ্রহণের জন্য ন্যূনতম এসএসসি পাস করতে হয় বলে ৯১ শতাংশ ফেরত আসা প্রবাসী কর্মী এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অ্যাক্রিডিটেশন না থাকায় টিটিসি থেকে উত্তীর্ণ কর্মীদের মাত্র ১০ শতাংশ বিদেশে তাদের নিজস্ব ট্রেডে কাজ পান, আর বাকিদের অদক্ষ ক্লিনার বা সাধারণ শ্রমিক হিসেবে যোগ দিতে হয়।
খুলনা টিটিসির অধ্যক্ষ জিয়াউর রহমান চরচাকে বলেন, “আমাদের দেশ থেকে সিংহভাগ শ্রমিক যায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে। সৌদি আরবে যাওয়ার ক্ষেত্রে আর অদক্ষ শ্রমিক যায় না। সৌদি শ্রমবাজারের এসভিপি স্কিল ভেরিফিকেশন প্রোগ্রামের আন্ডারে ৫০ ডলার ফি দিয়ে দেশের ২৮টি টিটিসি ভেন্যুতে গমনপ্রত্যাশীদের পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই বৈধ ভিসা পাওয়া যায়। তবে সৌদি ছাড়াও তো অন্যান্য দেশে যায় মানুষ। তাদের ক্ষেত্রে এত পূঙ্খানুপুঙ্খ ব্যবস্থা নেই।”
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) পরিচালক শাকিরুল ইসলাম বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও গত চার দশকে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও বৈশ্বিক চাহিদার সমন্বয় ঘটানো হয়নি। টিটিসিগুলোতে এখনো পঞ্চাশের দশকের পুরনো কারিকুলাম এবং প্রাচীন যন্ত্রপাতি দিয়ে ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডিং বা প্লাম্বিংয়ের মতো প্রথাগত ৫০-৫৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন কিংবা বৈশ্বিক সনদের বিষয়টি বিবেচনা না করেই এসব প্রশিক্ষণ পরিচালিত হওয়ায় আমাদের কর্মীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।”
দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সমস্যাগুলোর কিছু সমাধানের রাস্তা দেখিয়ে দেন খুলনা টিটিসির অধ্যক্ষ জিয়াউর রহমান, “টিটিসি সরাসরি কোনো সনদ দিতে পারে না। সনদ দেয় এনএসডিএ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে এই সনদের স্বীকৃতি নেই। সব দেশে আমাদের সনদের স্বীকৃতি হলে ভালো হতো। এছাড়াও টিটিসিগুলোতে প্রশিক্ষকের সংকট আছে। পিএসসির মাধ্যমে আমাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। পিএসসি যদি প্রশিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবে এই জনবল ঘাটতি মেটানো সম্ভব।”
এত এজেন্সি, কার লাভ?
লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও সরকারের বড় ধরনের ব্যর্থতা দেখা গেছে। যেখানে ভারতে ১৯৬টি এবং পাকিস্তানে ৪৬৪টি এজেন্সি রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে এজেন্সির সংখ্যা ২৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। অতি মুনাফা অর্জন ও দায়বদ্ধতা এড়ানোর উদ্দেশ্যে এই এজেন্সিগুলো দক্ষ কর্মী তৈরির চেয়ে অদক্ষ কর্মী পাঠাতেই বেশি উৎসাহী থাকে।
ওকাপ পরিচালক শাকিরুল ইসলাম এই পুরো প্রক্রিয়াতেই একটি অসৎ ও দুর্নীতিবাজ চক্রের উপস্থিতির কথা তুলে আনলেন, “অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর পেছনে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সুপরিকল্পিত অসৎ মানসিকতা কাজ করে। অভিবাসন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত চক্রগুলো ইচ্ছা করেই দক্ষতা উন্নয়নের সঠিক উদ্যোগ নেয় না। কারণ একজন শ্রমিক যত বেশি অদক্ষ হবেন, তাকে ‘ফ্রি ভিসা’ বা ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে তত সহজে প্রতারিত করা ও শোষণের মাধ্যমে বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে রিক্রুটিং এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট মহলগুলো এই শোষণমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে, আর সরকারের পক্ষ থেকেও এতে প্রয়োজনীয় নজরদারি করা হয়নি।”
দক্ষ কর্মী তৈরি করতে না পারার এই সংকট কেবল বৈদেশিক শ্রমবাজারেই প্রভাব ফেলছে না, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পেই বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি মেটাতে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে কর্মকর্তা এনে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার বেতন বাবদ বিদেশে পাঠাতে হচ্ছে। অন্যদিকে, দেশে ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় ৩০.৯ শতাংশই শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে (এনইইটি) অবস্থান করছে। সমাজে কারিগরি শিক্ষাকে অবমূল্যায়ন করার সংস্কৃতির কারণে সাধারণ তরুণদের মধ্যে দক্ষতা অর্জনের আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না।
কর্মী অদক্ষ মানে রেমিট্যান্স কম
বিদেশে অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি বহুমুখী রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ফিলিপাইন মাত্র ৬৫ লাখ প্রবাসী কর্মী পাঠিয়ে বছরে ৩ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করে, অথচ বাংলাদেশ ৯০ লাখের বেশি প্রবাসী কর্মী পাঠিয়ে এর অর্ধেকের কম রেমিট্যান্স পায়। একজন বাংলাদেশি কর্মীকে বিদেশে যেতে গড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা খরচ করতে হয়, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। অথচ অদক্ষ হওয়ার কারণে তারা সর্বনিম্ন পারিশ্রমিক পান এবং সেই অভিবাসন খরচ তুলতেই তাদের বছরের পর বছর কেটে যায়।
বিদেশে প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরে বিএমইটিতে অভিযোগ জানিয়ে সামান্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়, যা গড়ে মাত্র ৩২ হাজার টাকা। এটি প্রবাসীদের মূল বিনিয়োগের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
শ্রমবাজারে বৈচিত্র্য না থাকায় বাড়ছে ঝুঁকি
বাংলাদেশের অভিবাসন খাতের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো, এটি গুটিকয়েক দেশের ওপর নির্ভরশীল। গত পাঁচ বছরের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতি বছর বিদেশে যাওয়া কর্মীদের প্রায় ৯০ শতাংশ ঘুরেফিরে ৫ থেকে ৬টি দেশেই গেছেন। ২০২৫ সালে শুধু সৌদি আরবেই গেছেন বিদেশ যাওয়া মোট প্রবাসী কর্মীর ৬৭ শতাংশ, সংখ্যার হিসাবে ৭ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি! বাকি ৩৩ শতাংশের বড় অংশেরই কর্মসংস্থান হয়েছে মূলত কাতার, সিঙ্গাপুর, কুয়েত ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলোতে। চিত্রটা বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক বেশি মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। এই তীব্র এককেন্দ্রিকতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো রাজনৈতিক বা সামরিক অস্থিরতা সরাসরি বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি ও প্রবাসীদের নিরাপত্তার ওপর মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
এ ছাড়াও, ভুয়া ভিসা বাণিজ্য, অতিরিক্ত অভিবাসন খরচ ও দূতাবাসগুলোর তদারকির অভাবে মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালদ্বীপের শ্রমবাজার বারবার বন্ধ বা সংকুচিত হয়েছে। এই অদক্ষতার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে হাজার হাজার অদক্ষ কর্মীকে কম্বোডিয়ায় নিয়ে সাইবার স্ক্যামে জিম্মি করা কিংবা রাশিয়ায় ক্লিনার ও মেকানিক হিসেবে নিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের সামনের সারিতে পাঠানোর মতো ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ইতোমধ্যে বহু বাংলাদেশি তরুণের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সাথে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিদেশে যাওয়ার সুযোগ না পেয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার নজির ঘটে অহরহ।