বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিবেচনায় এ বছর ভিন্ন দুটি জেলা ‘হটস্পট’ হয়ে দেখা দিয়েছে। এর আগের দুই বছরে বিভাগটিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি ছিল বরগুনা জেলায়। তবে এ বছর পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা এ ক্ষেত্রে দুই জেলার মানুষের সচেতনতার অভাবকেই বড় কারণ হিসেবে দেখছেন। পাশাপাশি, পিরোজপুরে নারকেল ও সুপারির মতো গাছের উপস্থিতিও ডেঙ্গুর বিস্তার বেড়ে যাওয়ার একটা কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে বরগুনায় আগের দুই বছরের তুলনায় মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার কারণেই জেলাটিতে ডেঙ্গুর প্রকোপ আগের দুই বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পুরো বরিশাল বিভাগের ডেঙ্গুর চিত্র বলছে, গত বছরের তুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে এবার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কিছুটা কম।
সর্বশেষ পরিস্থিতি কী বলছে
রোববার এই প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে, তার আগের ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত) বরিশালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ২০০ জন। এই সময়ে ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়নি। আর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৪০ জন।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, এ নিয়ে চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৯ হাজার ৬১৬ জন। মারা গেছেন ১৩ জন। বিভিন্ন হাসপাতালে এখনো চিকিৎসাধীন ৬৫৯ জন।
চলতি বছরের শুরু থেকে মোট আক্রান্তের হিসাবে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে পিরোজপুরে – ২ হাজার ৫২৪ জন। এর পরই ঝালকাঠি, এই জেলায় শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৩৯ জন। এর বাইরে বরিশালে ১ হাজার ৭৮৫ জন, পটুয়াখালী ১ হাজার ৩৯১ জন, বরগুনাতে ১ হাজার ২৯৮, ভোলায় ৫৭৯ জন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পর্যন্ত বছরে ডেঙ্গুতে যে ১৩ মৃত্যু দেখেছে বরিশাল বিভাগ, তার মধ্যে ১১ জনই মারা গেছেন শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে মারা গেছেন একজন করে। তবে বিভাগীয় উপ-স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম বলেন, “শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃতদের বেশিরভাগ ঝালকাঠি এবং পিরোজপুরের বাসিন্দা।”
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর হিসাবে বিভাগের ছয়টি জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী আছেন পিরোজপুরে, ১৬৫ জন। এর বাইরে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৪১ জন, বরগুনায় ৯৬ জন, সদর হাসপাতালে ৮৭ জন, ঝালকাঠিতে ৫৬ জন, পটুয়াখালী সদর হাসপাতালে ৪৭ জন, পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪২ জন এবং ভোলায় ৩৪ জন।
এদিকে, চিকিৎসা নিয়ে সবচেয়ে বেশি রোগী ছাড়পত্রও পেয়েছেন পিরোজপুরে – ২ হাজার ৩৫৮ জন। ঝালকাঠিতে ১ হাজার ৯৮২ জন, বরগুনায় ১ হাজার ২০২ জন, বরিশাল সদর ও শের-ই-বাংলা হাসপাতাল মিলিয়ে ১ হাজার ৫৫৫ জন, পটুয়াখালীতে ১ হাজার ২ জন, ভোলায় ৫৪৫ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন। বিভাগে মোট ছাড়পত্র পেয়েছেন ৯ হাজার ৯৪৪ জন।
বিভাগীয় উপ-স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মোহাম্মদ লোকমান হাকিম বলেন, “এর আগে বরিশাল বিভাগের মধ্যে ডেঙ্গুর হটস্পট ছিল বরগুনা। তবে এ বছর আক্রান্ত রোগী কম। কিন্তু এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্তের দিক থেকে পিরোজপুর সর্বাধিক ও দ্বিতীয় অবস্থানে ঝালকাঠি। বর্তমানে বৃষ্টির মৌসুম চলছে - এ কারণেই ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।”
তিন বছরের তথ্যে ডেঙ্গুর বিস্তারের চিত্র
স্বাস্থ্য বিভাগের তিন বছরের প্রতিবেদন তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে (১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) বরিশাল বিভাগে মোট ৮ হাজার ৭৭৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ওই বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল ৬৪ জনের।
এর পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৮১৯ জনে। ওই বছর মৃত্যু হয় ৫১ জনের। বছরের শেষ দিনে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৭০ জন।
আর ২০২৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৬১৬ জনে। এর মধ্যে ৬৫৯ জন এখনো চিকিৎসাধীন, এবং চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের।
গত তিন বছরে বরগুনার চিত্র
স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব মতে, গত দুই বছরে বরগুনা জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি ছিল। সেখানে ২০২৪ সালে মোট ২ হাজার ৪৫১ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। চারজনের মৃত্যু হয়।
পরবর্তী বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে, বরগুনা জেলাকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। জেলার সর্বাধিক সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী ছিল বরগুনাতে। গত বছর বরগুনাতে মোট ৯ হাজার ৬৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
তবে এ বছর এখন পর্যন্ত বরগুনার সার্বিক ডেঙ্গু পরিস্থিতি সন্তোষজনক। চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২৯৮ জন। এখন পর্যন্ত কারো মৃত্যু হয়নি।
বরগুনায় এ বছর পরিস্থিতি কীভাবে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে, এ ব্যাপারে ধারণা দিলেন বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ, “গত বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা থেকে চলতি বছর আমরা আগাম প্রস্তুতি নিয়েছি। এর মধ্যে মানুষ যাতে আক্রান্ত না হয়, সে কারণে চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা…। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন, পৌরসভার সংশ্লিষ্টদের বলেছি এবং প্রচার-প্রচারণাসহ স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজনও মানুষকে সচেতন করেছি। জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা থেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে। তবে যদি তাদের কাজের মাত্রা আরও একটু বাড়ানো যায়, তাহলে আমরা আরও বেশি স্বস্তিতে থাকতে পারব।”
এ বছর সর্বাধিক আক্রান্ত পিরোজপুরে
গত দুই বছরে পিরোজপুরে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি সন্তোষজনক থাকলেও, চলতি বছর এই জেলা বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় হটস্পট হয়ে দেখা দিয়েছে। আগের দুই বছরের ডেঙ্গুর পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালে পিরোজপুরে মোট ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১ হাজার ১৫৩ জন এবং মৃত্যু হয় ৩ জনের। ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৫৪ জনে। অর্থাৎ এক বছরে রোগী বেড়েছে ৬০১ জন। তবে রোগী বাড়লেও ২০২৫ সালে কোনো মৃত্যু ছিল না।
কিন্তু চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৫২৪ জন। একজনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, প্রতিদিন গড়ে ৪০-৬০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় শিশুদের ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। ছবি: সংগৃহীত
পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, “স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে আইইডিসিআর থেকে ইনভেস্টিগেশন টিম কাজ করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে প্রচুর পরিমাণ সুপারি গাছ রয়েছে। সুপারি গাছ ও নারিকেল গাছের গোড়ায় পানি জমে এবং নারিকেলের খোসায় পানি জমাসহ বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানির মাধ্যমে মশার জন্ম হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতনতার অভাব রয়েছে বলেও জানান তারা। স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত কাজ করছি।”
ঝালকাঠি জেলার চিত্র
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, গত দুই বছরে ঝালকাঠি জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ তেমন বেশি না থাকলেও, চলতি বছর নতুন করে ঝালকাঠিতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভাবাতে শুরু করেছে। চলতি বছরের এখন পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
২০২৪ সালে এই জেলায় মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিল ২৬৯ জন। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮২৬ জনে। তবে গত দুই বছরে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
ঝালকাঠির সিভিল সার্জন ডা. হুমায়ুন কবির বলেন, “ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।”