মেরিনা মিতু

সরকার গঠনের পর প্রায় পাঁচ মাসে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিএনপির সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছিল নানা প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় একসঙ্গে রাজপথে ছিল তারা। তবে সরকার গঠনের পর শরিকদের অভিযোগ ছিল, নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে নিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তাদের মতামত নেওয়া হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে গত সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বৈঠককে অনেকেই ‘সম্পর্ক মেরামতের উদ্যোগ’ হিসেবে দেখছেন।
তবে প্রশ্ন উঠছে, এক বৈঠকেই কি শরিকদের মনের ক্ষোভ দূর হয়েছে? নাকি আপাতত বরফ গলেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর এটাই ‘যুগপৎ আন্দোলনে’ শরিকদের সঙ্গে প্রথম বৈঠক বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
‘যুগপৎ আন্দোলনে’ বিএনপির শরিক দলগুলোর মধ্যে আছে, গণতন্ত্র মঞ্চের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, ১২ দলীয় জোটের জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), লেবার পার্টি, কল্যাণ পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, এলডিপি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট-এনডিএম, জাগপা, ডেমোক্রেটিক লীগ, বাংলাদেশ মাইনোরেটি জনতা পার্টি, ইসলামিক পার্টি, গণফোরাম, বাংলাদেশ পিপলস পার্টি, এবি পার্টি এবং গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের সাম্যবাদী দল, সমাজতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল, বাম গণতান্ত্রিক জোটের সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, সমাজতান্ত্রিক পার্টি এবং জাতীয় গণফ্রন্ট, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিশ, ইসলামী ঐক্যজোট। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামও আন্দোলনে শরিক ছিল।
প্রকাশ্যে যেসব ক্ষোভ
সরকার গঠনের পর থেকেই শরিক দলগুলোর বড় অংশের অভিযোগ ছিল, আন্দোলনের সময় যে রাজনৈতিক অংশীদারত্বের কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন হয়নি।
নির্বাচনের আগে বিএনপি জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও শরিকদের মধ্যে মাত্র তিনটি দলের তিনজন নেতাকে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শরিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই বিএনপি নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
দুই দিন আগে যমুনার রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সেই অভিযোগও সরাসরি তুলে ধরেন কয়েকজন নেতা।
বৈঠকে উপস্থিত প্রায় ১২ জন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে চরচা। তারা জানিয়েছে, সরকার গঠনের পর বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন শরিক নেতা।
তাদের ভাষ্য, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতা আগের মতো দৃশ্যমান নয়। একই সঙ্গে গত পাঁচ মাসে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের অগ্রগতি নিয়েও সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে বলে মত দেন তারা।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, “প্রথমত, আপনারা আমাদের যেভাবে দাওয়াত দিয়েছেন, তা মর্যাদার হয়নি। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের উচিত ছিল সরাসরি যোগাযোগ করে দাওয়াত দেওয়া। সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর বসলেন, কিন্তু এর মধ্যে শরিকদের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।”
বিএনপি ‘একলা চলো নীতি’ অনুসরণ করছে কি না-জানতে চান ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ছেড়ে দেওয়া আসনে ভোট করে হেরে যাওয়া এই নেতা।
একই সঙ্গে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ এবং সংরক্ষিত নারী আসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শরিকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি উল্লেখ করে বৈঠকে সাইফুল হক বলেন, “অথচ জামায়াতে ইসলামী অল্প কিছু আসনেও তাদের শরিকদের সঙ্গে সমন্বয় করেছে। এতে বন্ধুত্বের কোনো নমুনা দেখা যাচ্ছে না। সবাইকে নিয়ে চলতে গেলে সেটার ধরন কী হবে, তা স্পষ্ট করা উচিত।”
যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম শরিক জোট গণতন্ত্র মঞ্চের আরেক শীর্ষ নেতা নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাও বৈঠকে সরকার পরিচালনা নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। নির্বাচনের আগে তাকে প্রার্থী না করাকে কেন্দ্র করে বিএনপির সঙ্গে কিছুটা তিক্ততা তৈরি হলেও পরে তা আর প্রকাশ্যে গড়ায়নি।
কবি শামসুর রাহমানের একটি কবিতার পঙতি উল্লেখ করে মান্না প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, “আমি এমন সরকার চাই, যাকে সবাই সমালোচনা করতে পারবে। এত রক্ত দিয়েছে মানুষ ভালো একটি দেশ পাওয়ার জন্য। ভালো যা করছেন, সেটার জন্য বাহবা পাবেন। খারাপ যা করছেন, তার দায় আপনাদের। আমি আপনাদের অংশীদার কিংবা ক্ষমতার ভাগাভাগি চাই না।”
বৈঠকের শেষ দিকে পরিবেশ কিছুটা হালকা করতে একজন নেতা রসিকতার সুরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, “এটি কি ফেয়ারওয়েল ডিনার?” জবাবে প্রধানমন্ত্রী হাসতে হাসতে বলেন, “না, এটি ওয়েলকাম ডিনার।”
এরপর প্রধানমন্ত্রী বুফে থেকে নিজেই খাবার নিয়ে শরিক নেতাদের সঙ্গে একই টেবিলে নৈশভোজে অংশ নেন। ওই টেবিলে ছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু।

কেন অনুপস্থিত ছিল দুই শরিক?
যমুনার নৈশভোজে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রায় দেড় শতাধিক নেতাকে আমন্ত্রণ জানায় বিএনপি। আমন্ত্রণ পেয়েও বৈঠকে অংশ নেয়নি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম।
জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রব চরচাকে বলেন, “নৈশভোজে অংশ না নেওয়া আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। কেন যাইনি, সে বিষয়ে আমরা বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে একটি চিঠি দিয়েছি।”
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপিকে পাঠানো চিঠিতে জেএসডি বলেছে, জুলাই সনদ, গণভোট ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আগে বিএনপির সঙ্গে পৃথক রাজনৈতিক বৈঠকে অংশ নেওয়া দলের নীতিগত অবস্থান ও জনগণের প্রতি দেওয়া অঙ্গীকার নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তবে রাষ্ট্র বা সরকারের উদ্যোগে সব রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে জাতীয় সংলাপ হলে সেখানে তারা অংশ নেবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক না হলেও নির্বাচনী জোটের অংশ হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকেও নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে দলটিও বৈঠকে যায়নি।
গত জাতীয় নির্বাচনে জমিয়তকে চারটি আসন ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু কোনো প্রার্থীই জয়ের মুখ দেখেনি। নির্বাচনের পর থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক আলেমদের একটি অংশ এবং জামায়াতের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্যও সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে অবহিত করেই কৌশলগত কারণে বৈঠকে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জমিয়ত।
এ বিষয়ে দলটির মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী চরচাকে বলেন, “না যাওয়ার কারণটি আমরা আপাতত বলছি না।”
শরিকদের আশ্বস্তের চেষ্টা
প্রায় দুই ঘণ্টার বৈঠকে শরিক দলগুলোর নেতারা একে একে সরকার গঠন-পরবর্তী নানা ক্ষোভ, অসন্তোষ ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং শেষে তার জবাবে শরিকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা এতদিন একসঙ্গে ছিলাম। এখন কেন আমরা সরে যাব? আমরা একসঙ্গেই থাকব। আমাদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু ভুল–বোঝাবুঝির কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।”
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ৩১ দফা ও জুলাই সনদের ভিত্তিতেই যুগপৎ আন্দোলনের রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল। সেই লক্ষ্য থেকে সরকার সরে যায়নি বলেও তিনি শরিকদের আশ্বস্ত করেন। তার ভাষায়, “আমাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এক। চলার পথে মতের পার্থক্য হতেই পারে, কিন্তু সেটি বিভেদের কারণ নয়।”
শরিকদের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেন, সরকার গঠনের পর দীর্ঘ সময় একসঙ্গে বসার সুযোগ হয়নি। তিনি বলেন, “আমি জানি, আপনাদের মনে কষ্ট আছে। এটা স্বাভাবিক। বয়সে আপনারা আমার বড়। আমি ছোট ভাই হিসেবে দুঃখ প্রকাশ করছি। শুধু অনুরোধ করব, সবাই একটু ধৈর্য ধরুন। জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আসুন, আমরা সবাই মিলে সেই প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করি।”
শরিকদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, “জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আসুন, আমরা সবাই মিলে সেই প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করি।”
আশ্বাস মিলেছে, ক্ষোভ কি কমেছে?
প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পাশাপাশি সেদিন রাতেই নৈশভোজের ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পাশাপাশি তিনি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফা এবং জুলাই সনদ “অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে।”
তবে এসব আশ্বাসে শরিকদের ক্ষোভ পুরোপুরি কেটেছে কি না, সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতা জানিয়েছেন, শরিকদের বড় একটি অংশ এটিকে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের সূচনা হিসেবে দেখলেও এখনই ক্ষোভ দূর হয়ে গেছে-এমনটা মনে করছেন না। তাদের ভাষ্য, এটি ছিল মূলত একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ, যার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে পরবর্তী পদক্ষেপে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না চরচাকে বলেন, “আমার উপলব্ধি হলো, এই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা যেন দূরে সরে না যায়। তবে এটি মূলত একটি সৌজন্যধর্মী বৈঠক ছিল। নির্দিষ্ট কোনো এজেন্ডা ছিল না। কেউ সরকারে আরও সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহের কথা বলেছেন, আবার কেউ বলেছেন, সরকার কীভাবে চলছে, সে বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। প্রধানমন্ত্রী শুনেছেন ধৈর্য নিয়ে, চমৎকার জবাবও দিয়েছেন। কয়েক মাস পরপর আবারও বসার কথা বলেছেন। দেখা যাক।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শরিক নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে নিয়মিত সমন্বয় বৈঠক হতো, কিন্তু সরকার গঠনের পর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এমন একটি বৈঠক করতে হয়েছে।
একজন নেতা বলেন, “নির্বাচনের আগে আমাদের প্রয়োজন ছিল, এখন যেন আর প্রয়োজন নেই। দেশে থেকে আন্দোলনে অংশীদার ছিলাম আমরা, কিন্তু ক্ষমতায় বসে সরকারের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হলো অন্য একটা মহল, যাদের কেউ কেউ দেশেও ছিলেন না।”
আরেকজন নেতা বলেন, “আমরা সরকারের অতিথি নই, যুগপৎ আন্দোলনের অংশীদার। তাই আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সরকার পরিচালনার প্রক্রিয়াতেও সেই অংশীদারত্বের প্রতিফলন থাকবে। শুধু নৈশভোজ বা আশ্বাস নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই বোঝা যাবে শরিকদের কতটা মূল্যায়ন করা হচ্ছে।”
গণঅধিকার পরিষদের জ্যেষ্ঠ নেতা আবু হানিফ চরচাকে বলেন, “সরকার গঠনের পাঁচ মাসেও বিএনপি বা সরকারের পক্ষ থেকে শরিকদের সঙ্গে কোনো বৈঠক হয়নি। বিভিন্ন পর্যায়ে জোটের নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। অথচ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সবার অবদান ছিল প্রায় সমান। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে সেই বাস্তবতার কথাগুলো তুলে ধরেছি। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং ভবিষ্যতে শরিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন।”

সরকার গঠনের পর প্রায় পাঁচ মাসে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিএনপির সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছিল নানা প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় একসঙ্গে রাজপথে ছিল তারা। তবে সরকার গঠনের পর শরিকদের অভিযোগ ছিল, নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে নিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তাদের মতামত নেওয়া হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে গত সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বৈঠককে অনেকেই ‘সম্পর্ক মেরামতের উদ্যোগ’ হিসেবে দেখছেন।
তবে প্রশ্ন উঠছে, এক বৈঠকেই কি শরিকদের মনের ক্ষোভ দূর হয়েছে? নাকি আপাতত বরফ গলেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর এটাই ‘যুগপৎ আন্দোলনে’ শরিকদের সঙ্গে প্রথম বৈঠক বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।
‘যুগপৎ আন্দোলনে’ বিএনপির শরিক দলগুলোর মধ্যে আছে, গণতন্ত্র মঞ্চের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, ১২ দলীয় জোটের জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), লেবার পার্টি, কল্যাণ পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, এলডিপি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট-এনডিএম, জাগপা, ডেমোক্রেটিক লীগ, বাংলাদেশ মাইনোরেটি জনতা পার্টি, ইসলামিক পার্টি, গণফোরাম, বাংলাদেশ পিপলস পার্টি, এবি পার্টি এবং গণতান্ত্রিক বাম ঐক্যের সাম্যবাদী দল, সমাজতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল, বাম গণতান্ত্রিক জোটের সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, সমাজতান্ত্রিক পার্টি এবং জাতীয় গণফ্রন্ট, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিশ, ইসলামী ঐক্যজোট। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামও আন্দোলনে শরিক ছিল।
প্রকাশ্যে যেসব ক্ষোভ
সরকার গঠনের পর থেকেই শরিক দলগুলোর বড় অংশের অভিযোগ ছিল, আন্দোলনের সময় যে রাজনৈতিক অংশীদারত্বের কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন হয়নি।
নির্বাচনের আগে বিএনপি জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও শরিকদের মধ্যে মাত্র তিনটি দলের তিনজন নেতাকে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শরিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই বিএনপি নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
দুই দিন আগে যমুনার রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সেই অভিযোগও সরাসরি তুলে ধরেন কয়েকজন নেতা।
বৈঠকে উপস্থিত প্রায় ১২ জন নেতার সঙ্গে কথা বলেছে চরচা। তারা জানিয়েছে, সরকার গঠনের পর বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন শরিক নেতা।
তাদের ভাষ্য, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক তৎপরতা আগের মতো দৃশ্যমান নয়। একই সঙ্গে গত পাঁচ মাসে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের অগ্রগতি নিয়েও সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে বলে মত দেন তারা।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, “প্রথমত, আপনারা আমাদের যেভাবে দাওয়াত দিয়েছেন, তা মর্যাদার হয়নি। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের উচিত ছিল সরাসরি যোগাযোগ করে দাওয়াত দেওয়া। সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর বসলেন, কিন্তু এর মধ্যে শরিকদের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।”
বিএনপি ‘একলা চলো নীতি’ অনুসরণ করছে কি না-জানতে চান ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ছেড়ে দেওয়া আসনে ভোট করে হেরে যাওয়া এই নেতা।
একই সঙ্গে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ এবং সংরক্ষিত নারী আসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শরিকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি উল্লেখ করে বৈঠকে সাইফুল হক বলেন, “অথচ জামায়াতে ইসলামী অল্প কিছু আসনেও তাদের শরিকদের সঙ্গে সমন্বয় করেছে। এতে বন্ধুত্বের কোনো নমুনা দেখা যাচ্ছে না। সবাইকে নিয়ে চলতে গেলে সেটার ধরন কী হবে, তা স্পষ্ট করা উচিত।”
যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম শরিক জোট গণতন্ত্র মঞ্চের আরেক শীর্ষ নেতা নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাও বৈঠকে সরকার পরিচালনা নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। নির্বাচনের আগে তাকে প্রার্থী না করাকে কেন্দ্র করে বিএনপির সঙ্গে কিছুটা তিক্ততা তৈরি হলেও পরে তা আর প্রকাশ্যে গড়ায়নি।
কবি শামসুর রাহমানের একটি কবিতার পঙতি উল্লেখ করে মান্না প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, “আমি এমন সরকার চাই, যাকে সবাই সমালোচনা করতে পারবে। এত রক্ত দিয়েছে মানুষ ভালো একটি দেশ পাওয়ার জন্য। ভালো যা করছেন, সেটার জন্য বাহবা পাবেন। খারাপ যা করছেন, তার দায় আপনাদের। আমি আপনাদের অংশীদার কিংবা ক্ষমতার ভাগাভাগি চাই না।”
বৈঠকের শেষ দিকে পরিবেশ কিছুটা হালকা করতে একজন নেতা রসিকতার সুরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, “এটি কি ফেয়ারওয়েল ডিনার?” জবাবে প্রধানমন্ত্রী হাসতে হাসতে বলেন, “না, এটি ওয়েলকাম ডিনার।”
এরপর প্রধানমন্ত্রী বুফে থেকে নিজেই খাবার নিয়ে শরিক নেতাদের সঙ্গে একই টেবিলে নৈশভোজে অংশ নেন। ওই টেবিলে ছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু।

কেন অনুপস্থিত ছিল দুই শরিক?
যমুনার নৈশভোজে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রায় দেড় শতাধিক নেতাকে আমন্ত্রণ জানায় বিএনপি। আমন্ত্রণ পেয়েও বৈঠকে অংশ নেয়নি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম।
জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রব চরচাকে বলেন, “নৈশভোজে অংশ না নেওয়া আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত। কেন যাইনি, সে বিষয়ে আমরা বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে একটি চিঠি দিয়েছি।”
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপিকে পাঠানো চিঠিতে জেএসডি বলেছে, জুলাই সনদ, গণভোট ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আগে বিএনপির সঙ্গে পৃথক রাজনৈতিক বৈঠকে অংশ নেওয়া দলের নীতিগত অবস্থান ও জনগণের প্রতি দেওয়া অঙ্গীকার নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তবে রাষ্ট্র বা সরকারের উদ্যোগে সব রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে জাতীয় সংলাপ হলে সেখানে তারা অংশ নেবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক না হলেও নির্বাচনী জোটের অংশ হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকেও নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে দলটিও বৈঠকে যায়নি।
গত জাতীয় নির্বাচনে জমিয়তকে চারটি আসন ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু কোনো প্রার্থীই জয়ের মুখ দেখেনি। নির্বাচনের পর থেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক আলেমদের একটি অংশ এবং জামায়াতের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে মতপার্থক্যও সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে অবহিত করেই কৌশলগত কারণে বৈঠকে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জমিয়ত।
এ বিষয়ে দলটির মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী চরচাকে বলেন, “না যাওয়ার কারণটি আমরা আপাতত বলছি না।”
শরিকদের আশ্বস্তের চেষ্টা
প্রায় দুই ঘণ্টার বৈঠকে শরিক দলগুলোর নেতারা একে একে সরকার গঠন-পরবর্তী নানা ক্ষোভ, অসন্তোষ ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং শেষে তার জবাবে শরিকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা এতদিন একসঙ্গে ছিলাম। এখন কেন আমরা সরে যাব? আমরা একসঙ্গেই থাকব। আমাদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু ভুল–বোঝাবুঝির কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।”
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ৩১ দফা ও জুলাই সনদের ভিত্তিতেই যুগপৎ আন্দোলনের রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল। সেই লক্ষ্য থেকে সরকার সরে যায়নি বলেও তিনি শরিকদের আশ্বস্ত করেন। তার ভাষায়, “আমাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এক। চলার পথে মতের পার্থক্য হতেই পারে, কিন্তু সেটি বিভেদের কারণ নয়।”
শরিকদের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেন, সরকার গঠনের পর দীর্ঘ সময় একসঙ্গে বসার সুযোগ হয়নি। তিনি বলেন, “আমি জানি, আপনাদের মনে কষ্ট আছে। এটা স্বাভাবিক। বয়সে আপনারা আমার বড়। আমি ছোট ভাই হিসেবে দুঃখ প্রকাশ করছি। শুধু অনুরোধ করব, সবাই একটু ধৈর্য ধরুন। জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আসুন, আমরা সবাই মিলে সেই প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করি।”
শরিকদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, “জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আসুন, আমরা সবাই মিলে সেই প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করি।”
আশ্বাস মিলেছে, ক্ষোভ কি কমেছে?
প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পাশাপাশি সেদিন রাতেই নৈশভোজের ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পাশাপাশি তিনি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফা এবং জুলাই সনদ “অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে।”
তবে এসব আশ্বাসে শরিকদের ক্ষোভ পুরোপুরি কেটেছে কি না, সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতা জানিয়েছেন, শরিকদের বড় একটি অংশ এটিকে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের সূচনা হিসেবে দেখলেও এখনই ক্ষোভ দূর হয়ে গেছে-এমনটা মনে করছেন না। তাদের ভাষ্য, এটি ছিল মূলত একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ, যার প্রকৃত মূল্যায়ন হবে পরবর্তী পদক্ষেপে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না চরচাকে বলেন, “আমার উপলব্ধি হলো, এই বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা যেন দূরে সরে না যায়। তবে এটি মূলত একটি সৌজন্যধর্মী বৈঠক ছিল। নির্দিষ্ট কোনো এজেন্ডা ছিল না। কেউ সরকারে আরও সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহের কথা বলেছেন, আবার কেউ বলেছেন, সরকার কীভাবে চলছে, সে বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। প্রধানমন্ত্রী শুনেছেন ধৈর্য নিয়ে, চমৎকার জবাবও দিয়েছেন। কয়েক মাস পরপর আবারও বসার কথা বলেছেন। দেখা যাক।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শরিক নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে নিয়মিত সমন্বয় বৈঠক হতো, কিন্তু সরকার গঠনের পর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও এমন একটি বৈঠক করতে হয়েছে।
একজন নেতা বলেন, “নির্বাচনের আগে আমাদের প্রয়োজন ছিল, এখন যেন আর প্রয়োজন নেই। দেশে থেকে আন্দোলনে অংশীদার ছিলাম আমরা, কিন্তু ক্ষমতায় বসে সরকারের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হলো অন্য একটা মহল, যাদের কেউ কেউ দেশেও ছিলেন না।”
আরেকজন নেতা বলেন, “আমরা সরকারের অতিথি নই, যুগপৎ আন্দোলনের অংশীদার। তাই আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সরকার পরিচালনার প্রক্রিয়াতেও সেই অংশীদারত্বের প্রতিফলন থাকবে। শুধু নৈশভোজ বা আশ্বাস নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই বোঝা যাবে শরিকদের কতটা মূল্যায়ন করা হচ্ছে।”
গণঅধিকার পরিষদের জ্যেষ্ঠ নেতা আবু হানিফ চরচাকে বলেন, “সরকার গঠনের পাঁচ মাসেও বিএনপি বা সরকারের পক্ষ থেকে শরিকদের সঙ্গে কোনো বৈঠক হয়নি। বিভিন্ন পর্যায়ে জোটের নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। অথচ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সবার অবদান ছিল প্রায় সমান। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে সেই বাস্তবতার কথাগুলো তুলে ধরেছি। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং ভবিষ্যতে শরিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন।”

চট্টগ্রামে সম্প্রতি প্রকাশ্যে গুলি করে মানুষ হত্যা, টেলিফোনে হুমকি দিয়ে বিভিন্নজনের কাছ থেকে চাঁদা দাবি, চাঁদা চেয়ে বাসভবনের বাইরে ফাঁকা গুলি ছোড়া, না পেয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাংচুরসহ নানা ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হিসেবে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত কয়েকজন সন্ত্রাসীর নাম