মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান বিকাশ–এর বিরুদ্ধে এজেন্টদের ওপর ডিপিএস ও লেনদেনের টার্গেট পূরণে চাপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। অবশ্য বিকাশ এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলেই উড়িয়ে দিয়েছে। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে বিকাশ এজেন্টরা সম্প্রতি নিজেদের অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের কেউ ডিপিএসের টার্গেট পূরণে চাপ দেওয়ার অভিযোগ করছেন। আবার কেউ টার্গেট অনুযায়ী লেনদেন না করতে পারায় এজেন্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার দাবি করছেন।
কিছু এজেন্টের অভিযোগ, প্রতি মাসে ডিপিএস করা কিংবা নির্দিষ্ট পরিমাণ লেনদেনের টার্গেট পূরণ করতে না পারায় তাদের এজেন্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে কেউ নিজের পরিবারের সদস্যদের নামে, পরে আত্মীয়স্বজনের নামে ডিপিএস করেছেন বলেও জানিয়েছেন। আবার কোনো কোনো এজেন্টের অভিযোগ, নির্ধারিত লেনদেনের লক্ষ্য পূরণে নিজের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পাঠিয়ে আবার অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠানোর মাধ্যমে লেনদেন বাড়ানোর চাপও দেওয়া হয়েছে।
তবে এজেন্টদের এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ হিসেবে দাবি করেছে বিকাশ। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডিপিএস না করা কিংবা লেনদেন কম হওয়ার কারণে কোনো এজেন্টের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয় না। বরং কোনো অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রথমে এজেন্টকে সতর্ক করা হয়। এরপরও সন্দেহজনক লেনদেন বন্ধ না হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এদিকে এমএফএস সেবা ব্যবহার করতে গিয়ে কোনো ধরনের জটিলতা, লেনদেনসংক্রান্ত সমস্যা বা অভিযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রের (সিআইপিসি) হটলাইন ১৬২৩৬ নম্বরে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমএফএস নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গ্রাহকদের এ বিষয়ে সচেতন করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও এ হটলাইন ব্যবহারের কথা জানানো হয়েছে।
পরিবারের পর আত্মীয়স্বজনের নামেও ডিপিএস!
কক্সবাজার সদর উপজেলার উত্তর ডিককুলের এজেন্ট জিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক জিয়াউল হক অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে বিকাশ–এর পক্ষ থেকে তাকে প্রতি মাসে ডিপিএস করার জন্য চাপ দেওয়া হতো। শুরুতে নিজের পরিবারের সদস্যদের নামে ডিপিএস করলেও পরে নতুন গ্রাহক খুঁজে না পাওয়ায় আত্মীয়স্বজনের নামেও ডিপিএস করতে হয়েছে বলে অভিযোগ তার।
জিয়াউল হক চরচাকে বলেন, “প্রথম দিকে আমার পরিবারের সবার নামে ডিপিএস করেছি। তারপর বিকাশের চাপে আমার আত্মীয়স্বজনদের নামে ডিপিএস করেছি। এখন প্রতিনিয়ত আমি নতুন নতুন কাস্টমার কোথায় পাব? আর মানুষকে বললেই কি তারা সব সময় ডিপিএস করবে?” তার অভিযোগ, ডিপিএসের নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে না পারায় তার এজেন্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন শাহীন টেলিকম বিডির এজেন্ট সাইফুল্লাহ শাহীন। তিনি জানান, কিছুদিন আগে তাকে জানানো হয়, সেভিংস বা ডিপিএস না করলে এজেন্ট ব্যবসা চালানো সম্ভব হবে না। এরপর তিনি প্রায় ২০ হাজার টাকার সেভিংস করেন। কিন্তু পরে আরও সেভিংস করার জন্য চাপ দেওয়া হলে, তা আর করতে পারেননি।
সাইফুল্লাহ শাহীন চরচাকে বলেন, “কিছুদিন আগে আমাকে বলা হয় সেভিংস (ডিপিএস) করতে হবে, নয়ত এজেন্ট চালানো যাবে না। তারপর আমি প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো সেভিংস করেছি। এরপর গত ১৫ দিন আগে আমাকে বলা হয় আরও সেভিংস করতে হবে। কিন্তু আমি তা করতে পারিনি। তখন আমার এজেন্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে।” শুধু নিজের নয়, তার এলাকার আরও অনেক এজেন্টের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
গাজীপুরের রাকিব এন্টারপ্রাইজের মালিক রাকিব খানও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, প্রতি মাসে সেভিংস বা ডিপিএস করার জন্য তাকে চাপ দেওয়া হতো। তিনি নিয়মিত কিছু না কিছু সেভিংস করতেনও। এরপর কোনো কারণ না জানিয়েই একদিন তার এজেন্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
রাকিব খান চরচাকে বলেন, “আমার অ্যাকাউন্ট ঠিক কী কারণে বন্ধ করেছে, আমি নিজেও জানি না। তারা প্রতি মাসে সেভিংসের (ডিপিএস) জন্য চাপ দেয়।
আমিও প্রতি মাসে কিছু না কিছু সেভিংস করি। তারপর একদিন হঠাৎ অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিল। আমি তখন অফিসে যোগাযোগ করলাম। তারাও আমাকে বলল না যে, কোন কারণে বন্ধ করা হয়েছে। তারা বলল, এটা বিকাশ করেনি, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বন্ধ করেছে, দ্রুত চালু হয়ে যাবে। তারপর এক দিন, দুই দিন করে দিন পার হচ্ছে, কিন্তু অ্যাকাউন্ট চালু হচ্ছে না।”
‘পুশ ব্যাক’ নিয়ে অভিযোগ
ফরিদপুর জেলার বড় মাধবপুর চার রাস্তার মোড়ের এজেন্ট আবু বক্কর সিদ্দিকের অভিযোগ, তাকে প্রতি মাসে ৯ লাখ টাকা লেনদেনের টার্গেট দেওয়া হয়েছিল। গ্রামীণ এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা করায় এই পরিমাণ লেনদেন করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না বলে জানান তিনি। পরে টার্গেট পূরণ করতে তাকে ‘পুশ ব্যাক’ করার পরামর্শ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ তার।
আবু বক্কর সিদ্দিকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘পুশ ব্যাক’ বলতে নিজের অন্য কোনো অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা পাঠিয়ে আবার সেই টাকা অন্য কোনো অ্যাকাউন্টে পাঠানোর মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ বাড়ানোকে বোঝানো হয়েছে। এভাবে টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে প্রতি মাসে নিজের অতিরিক্ত খরচ হতো বলেও দাবি তার।
আবু বক্কর বলেন, “এভাবে করতে গিয়ে প্রতি মাসে আমার অনেক টাকা খরচ হয়ে যেত। এখন ব্যবসা করছি লাভের জন্য। কিন্তু টার্গেট ফুলফিল করার জন্য যদি লস দিতে হয়, তাহলে ব্যবসা করা সম্ভব না।”
প্রায় ১২ বছর ধরে বিকাশের সঙ্গে এজেন্ট হিসেবে ব্যবসা করছেন জানিয়ে এই ব্যবসায়ী বলেন, “শুরুর দিকে এ ধরনের চাপ ছিল না। গত তিন-চার বছর ধরে টার্গেটের চাপ বেড়েছে। ডিপিএস করার জন্যও টার্গেট দিত। সেটা ফুলফিল করতে পারতাম না। একটা মানুষকে যদি তার ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি চাপ দেওয়া হয়, তাহলে তা পূরণ করা কখনোই সম্ভব না।”
লেনদেন কমায় অ্যাকাউন্ট বন্ধ!
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আওয়াল স্টোরের মালিক আব্দুল আওয়ালও বিকাশের এজেন্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন। তিনি জানান, প্রায় ১০-১২ বছর ধরে বিকাশের এজেন্ট হিসেবে ব্যবসা করছেন। দীর্ঘ সময়ে তার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলা ও ডিপিএস করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আব্দুল আওয়াল জানান, সম্প্রতি তিনি বাংলা কিউআর সেবা চালু করার পর বিকাশে লেনদেন কিছুটা কমে যায়। এরপর তাকে নিয়মিত লেনদেন বাড়ানোর জন্য বলা হতো। এক পর্যায়ে হঠাৎ তার এজেন্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যায়। চরচাকে তিনি বলেন, “সম্প্রতি আমি বাংলা কিউআর চালু করেছি। এটা চালু করার পর বিকাশে লেনদেন কিছুটা কমেছে। তারপর আমাকে মাঝে মাঝেই বলা হতো যেন আমি লেনদেন বাড়াই। এভাবে চলতে চলতে হঠাৎ একদিন অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে।”
অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার পর বিকাশের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি আব্দুল আওয়াল। এমনকি ফের সুযোগ পেলেও আর বিকাশের এজেন্ট হতে চান না বলে জানান এই ব্যবসায়ী।
আব্দুল আওয়াল বলেন, “তাদের যে গ্রাহকটা ১০/১২ বছর ধরে ব্যবসা করেছে, তার লেনদেন কিছুটা কমলেই যদি তারা অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়, তাহলে তাদের সঙ্গে ব্যবসা না করাই ভালো। তাদের এজেন্ট হলে বহুত ঝামেলা। প্রতি মাসেই এই কর, সেই কর ইত্যাদি ইত্যাদি।”
যা বলছে বিকাশ
এজেন্টদের তোলা এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছে বিকাশ। প্রতিষ্ঠানটির করপোরেট কমিউনিকেশনস ও পাবলিক রিলেশনস বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম চরচাকে বলেন, “এজেন্টদের পক্ষ থেকে ওঠা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। আমরা কেন আমাদের এজেন্টদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেব? তাদের নিয়েই তো আমরা ব্যবসা করছি। বিষয়টা সাংঘর্ষিক হয়ে গেল না?”
অ্যাকাউন্ট বন্ধের বিষয়ে বিকাশের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে জানিয়ে শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, “কোনো এজেন্টের অ্যাকাউন্টে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট এজেন্টকে বিষয়টি জানানো হয়। এরপরও সন্দেহজনক লেনদেন বন্ধ না হলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়।”
ডিপিএস না করা কিংবা বিকাশের পাশাপাশি বাংলা কিউআরে অন্য কোনো ব্যাংকের এজেন্ট অ্যাকাউন্ট নেওয়ার কারণে বিকাশের এজেন্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয় কি না জানতে চাইলে, তা পুরোপুরি নাকচ করেন করপোরেট কমিউনিকেশনস ও পাবলিক রিলেশনস বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম। তিনি বলেন, “এমনটা হয় না। সেই ব্যক্তি বিকাশের অ্যাকাউন্ট অনেক আগে থেকে ব্যবহার করেন। এখন সে যদি অন্য কোনো এজেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেন, তাতে আমরা কিছু মনে করি না। আমাদের তো শুধু এজেন্ট অ্যাকাউন্টই নয়, আমাদের আরও ২০০-এর ওপর সার্ভিস রয়েছে। যিনি আমাদের এজেন্ট নন, তিনিও আমাদের অন্য সার্ভিসগুলো ব্যবহার করেন। তাই অযৌক্তিক কারো অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার প্রশ্নই ওঠে না।”
এমএফএস অ্যাকাউন্টে সমস্যা হলে যা করণীয়
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এমএফএস অ্যাকাউন্টে প্রতারণাসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের হেল্পলাইনে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গ্রাহকদের সচেতন করতে এ বিষয়ে একটি নোটিশও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ওই নোটিশে বলা হয়েছে, এমএফএস সেবা ব্যবহার করতে গিয়ে কোনো জটিলতা, লেনদেনসংক্রান্ত সমস্যা বা অভিযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রের (সিআইপিসি) ১৬২৩৬ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে। এই হটলাইনের মাধ্যমে গ্রাহকরা তাদের সমস্যার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নির্দেশনা পাবেন।
বর্তমানে এমএফএস–এর মাধ্যমে টাকা পাঠানো ও গ্রহণ, বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেন করেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। এক্ষেত্রে লেনদেন আটকে যাওয়া, টাকা কেটে নেওয়ার পর প্রাপকের হিসাবে জমা না হওয়া, অননুমোদিত লেনদেন, অ্যাকাউন্টসংক্রান্ত জটিলতা কিংবা সেবা প্রদানকারীর কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সমাধান না পাওয়ার মতো ঘটনা ঘটলে গ্রাহকদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে।এমএফএস খাতে অনিয়ম ও প্রতারণা প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। চরচাকে তিনি বলেন, “এমএফএস খাতে সব অনিয়ম ও প্রতারণা প্রতিরোধে তদারকি আরও জোরদার করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন বিভাগ নিয়মিত পরিদর্শন করছে। তাছাড়া হটলাইনে যোগাযোগ করে একজন গ্রাহক তার সমস্যার কথা জানালে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নেবে।”