‘সন্ত্রাসের জনপদ’ বলে খ্যাত চট্টগ্রামের রাউজানে খুনোখুনি থামছেই না। রাজনৈতিক নেতাদের ‘প্রশ্রয়’ ও প্রশাসনের ‘নিষ্ক্রিয়তার’ সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসীরা লাগাতার অপরাধ করে যাচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই বছরে এ উপজেলাতেই খুন হয়েছেন ২৭ জন। এদের মধ্যে ২০ জনই রাজনৈতিক বিরোধ ও স্থানীয় আধিপত্যের জন্য খুন হন।
পুলিশ সন্ত্রাসীদের দমনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও থামছে না খুনোখুনি। সবশেষ গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে রাউজানের কেরানীহাটে খুন হন আবদুল করিম নামে এক ব্যক্তি। তাকে বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। পুলিশ দুই বছরে সংগঠিত বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসামিদের গ্রেপ্তারের কথা বললেও রাউজানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক নেতাদের ‘সদিচ্ছা’ এবং পুলিশ প্রশাসনের ‘অদক্ষতা’র জন্য রাউজানের সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারা বলছেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা চাইলে পুলিশের পক্ষে এসব অপরাধ দমন করা সম্ভব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ধারাবাহিক অবনতির কারণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছর যে ২৭ জন খুন হয়েছেন তার কারণ স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, বালুমহাল দখল, মাটি কাটা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও চাঁদাবাজি। পুলিশের দাবি, সর্বশেষ হওয়া সংসদ নির্বাচনের পর থেকে রাউজানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গত তিনমাসে মাত্র দুইটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
অনেক আগে থেকেই রাউজান উপজেলা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। ৫ আগস্টের পর তা আরও ভয়াবহ হয়েছে। এর জন্য দায়ী স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “বেশকিছু অনাকাঙ্ক্ষিত খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বও যেমন রয়েছে তেমনি ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সসহ অন্যান্য ঘটনাও রয়েছে। গত দুইবছরে সংগঠিত বেশিরভাগ খুনের ঘটনায় আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর করিম হত্যার ঘটনায় আসামি আমরা শনাক্ত করলেও কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারিনি।”
ওসি সাইফুলের দাবি, রাউজানে অপরাধের মাত্রা আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর থেকে পরিস্থিতি ধারাবাহিকভাবে উন্নতি হচ্ছে।
রাউজানের স্থানীয়রা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মনোনয়ন নিয়ে বিএনপি নেতা সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম আকবর খোন্দকার এবং বর্তমান সরকারদলীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারীদের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষ বাঁধত। রাজনৈতিক নেতাদের প্রশ্রয়ের সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসীরা রাউজানে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দুই নেতার বিরোধে কিছুটা ভাটা পড়লেও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে তার প্রভাব দেখা যায়নি।
রাউজানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী চরচাকে বলেন, “অনেক আগে থেকেই রাউজান উপজেলা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। ৫ আগস্টের পর তা আরও ভয়াবহ হয়েছে। এর জন্য দায়ী স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। তাদের ইন্ধনে বা উসকানি এসব ঘটনা ঘটছে। এসব অপরাধের সাথে যারাই সম্পৃক্ত তাদের সন্ত্রাসী বানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোই।”
আখতার কবির বলেন, “নেতারা তাদের পুরনো অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেননি। তাই পরিস্থিতি আগের মতোই। বরং আমরা ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পড়ার অবস্থায় আছি। সন্ত্রাসী ধরতে প্রশাসনের সক্ষমতার ঘাটতি বা নিষ্ক্রিয়তা রয়েছে। পেশাদারত্বের অভাব রয়েছে। তারপরও অপরাধ দমনে চেষ্টা থাকতে হবে। রাউজানের সন্ত্রাস দমাতে রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছা খুবই দরকার।”
২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আবদুল মান্নান (৩৫) নামে শ্রমিক লীগের স্থানীয় এক নেতাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর একে একে ২৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তি যেমন রয়েছেন, তেমনি যুবদল বা বিএনপির রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্তরাও রয়েছেন।
স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক নেতাদেরও দায়িত্ব রয়েছে এলাকার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য। স্থানীয় এমপি চাইলে প্রশাসনের মাধ্যমে শান্তির রাউজান প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে দিন-দুপুরে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে। ওষুধ কিনতে বাজারে গেলে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে বাজারে এসে তাকে হত্যা করে পালিয়ে যায়। সবশেষ ৩ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত করিম যুবদলের কর্মী ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে চরচাকে বলেন, “চট্টগ্রামের উত্তরের উপজেলা রাউজান হয়ে পাবর্ত্য জেলা রাঙামাটিতে যেতে হয়। পাহাড়ঘেরা রাউজান বহু বছর ধরে রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। এ কারণে অপরাধীরা বিভিন্ন অপরাধ করে দ্রুত পাহাড়ে পালিয়ে যায়। এতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এরপরেও পুলিশ বিভিন্ন সময়ে হওয়া অপরাধমূলক কাজের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে।”
ওই কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে রাউজানে অপরাধ বেড়ে গেছে। ওই সময়ে পুলিশের মনোবলেও কিছুটা ‘ঘাটতি’ থাকায় বিভিন্ন এলাকার মতো এখানেও অপরাধের হার বেড়ে গিয়েছিল। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দ্বন্দ্বের কারণেও সেটা বেড়ে যায়। নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের সময়ে অপরাধ ধীরে ধীরে কমে আসছে বলে দাবি তার।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম চরচাকে বলেন, “গত দুই বছরে রাউজানে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ১১টি খুন রাজনৈতিক এবং প্রভাব বিস্তারের জেরে ঘটেছে। মাদক সংক্রান্ত সমস্যা, জমি-জমা নিয়ে বিরোধ, পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে ঝগড়াঝাটিসহ অন্যান্য কারণে বাকি ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। সব ঘটনাকে ঢালাওভাবে ‘রাজনৈতিক’ বলা যাবে না।
মাসুদ আলম বলেন, “নির্বাচিত সরকার আসার পর রাউজানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে, অপরাধের মাত্রাও অনেকটা কমে এসেছে। গত জুন মাসে যুবদলনেতা মাসুদুল হত্যার ঘটনার পর ৩ সেপ্টেম্বর আরেকটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে সেটি রাজনৈতিক নয়। সর্বশেষ করিম হত্যাকাণ্ড ছাড়া বাকি সব ঘটনায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসামি গ্রেপ্তার করা গেছে। বাকি সন্ত্রাসীদেরও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।”
রাউজান উপজেলা বিএনপির সভাপতি জসিম উদ্দিন চরচাকে বলেন, “সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই। এসব হত্যাকণ্ডে দলীয় কোনো ভূমিকা বা সম্পৃক্ততাও নেই। আমরা সকল ধরনের সন্ত্রাসী কাজের বিচার চাই। গত দুই বছরে যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে সেগুলো রাজনৈতিক নয় বরং বালুমহালের ইজারা, মাটি কাটার ইজারাসহ আধিপত্য নিয়ে ঘটেছে।
এসব ঘটনায় সম্পৃক্তদের ধরতে পুলিশের আরও কঠোর ভূমিকা দরকার মন্তব্য করে এ বিএনপি নেতা বলেন, “স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক নেতাদেরও দায়িত্ব রয়েছে এলাকার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য। স্থানীয় এমপি চাইলে প্রশাসনের মাধ্যমে শান্তির রাউজান প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।”
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলমও মনে করেন, রাউজানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক নেতাদের শক্ত ভূমিকা নেওয়া দরকার। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের জায়গা থেকে কাজ করে যাচ্ছি। সাথে রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তা পেলেও সন্ত্রাসী র্কাযক্রম কমে আসবে।”