চট্টগ্রামে সম্প্রতি প্রকাশ্যে গুলি করে মানুষ হত্যা, টেলিফোনে হুমকি দিয়ে বিভিন্নজনের কাছ থেকে চাঁদা দাবি, চাঁদা চেয়ে বাসভবনের বাইরে ফাঁকা গুলি ছোড়া, না পেয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাংচুরসহ নানা ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হিসেবে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত কয়েকজন সন্ত্রাসীর নাম উঠে এসেছে।
গত বছর দেড়েক চট্টগ্রাম মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় সংগঠিত এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত মূল আসামিদের বেশিরভাগই চিহ্নিত হলেও পুলিশ তাদের ধরতে পারছে না। পুলিশ প্রশাসনের ‘নিষ্ক্রিয়তার’ সুযোগ নিয়েই চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা বার বার এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময়ে খুন, চাঁদাবাজিসহ বেশিরভাগ অপরাধের সঙ্গে জড়িত হিসেবে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী বলে পুলিশের ভাষ্য। তার হয়ে এখন চট্টগ্রামে এসব অপরাধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান। নগরীতে ঘটা বেশিরভাগ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে ইমনের নামই উঠে এসেছে।
চলতি বছরের ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনি বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে। খুনের ঘটনায় তার বড় ভাইয়ের করা মামলায় আসামি করা হয় রায়হান, মোবারকসহ ১১ জনকে। তাদের বেশিরভাগই বড় সাজ্জাদ গ্রুপের অনুসারী।
গত ৮ মে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন রৌফাবাদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় হাসান রাজু নামে এক যুবককে। রাউজানের একটি ঘটনার বদলা নিতে নগরীতে হওয়া এ ঘটনায়ও সাজ্জাদের সহযোগীদের নাম উঠে আসে। গত বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবর নামের একজনকে।
চট্টগ্রামের অন্যতম র্শীষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গত বছরের ২৯ মার্চ নগরীর চকবাজার থানার বাকলিয়া এক্সেস রোডে একটি প্রাইভেটকারে গুলি করলে দু'জন নিহত হন। গত বছরের ৩ নভেম্বর পাঁচলাইশের চালিতাতলী এলাকায় নির্বাচনী প্রচারের সময় গুলিতে নিহত হন বাবলা।
চলতি বছরের ২ জানুয়ারি ও ২৮ ফেব্রুয়ারি ১০ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে নগরীর চকবাজার থানার চন্দনপুরা খালপাড় এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। এ সকল ঘটনায় বড় সাজ্জাদের সহযোগী বিশেষ করে মোবারক হোসেন ইমন ও রায়হানের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে।
সর্বশেষ গত সোমবার দুপুরে নগরীর চকবাজার থানার বাকলিয়া এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেটের (ডিডিএন) কার্যালয়ে ২০ থেকে ২৫ জন সন্ত্রাসী প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আদিল হোসেন মামুনের অভিযোগ, ‘ডেভিড ইমন’ নামে এক ব্যক্তি টেলিফোনে দুই কোটি টাকা চাঁদা চেয়ে না পেয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গুলি, চাঁদাবাজি, খুনসহ বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে বড় সাজ্জাদের সহযোগীদের নাম বার বার উঠে এলেও তাদের কাউকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারছে না। তারা প্রকাশ্যে বিভিন্নজনকে টেলিফোন করে চাঁদা দাবি করছে, না পেলে হামলা করছে, গুলি করছে। এসব ঘটনার পর পুলিশের জোরালো ভূমিকা না থাকায় সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বিভিন্ন ঘটনায় হাতেগোনা কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তারা মূল অপরাধী নন।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, ‘‘নগরীর বেশ কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে বিদেশে পলাতক বড় সাজ্জাদের নাম উঠে এসেছে। তার হয়ে চট্টগ্রামে মোবারক হোসেন ইমন ও রায়হান এসব কাজে নেতৃত্ব দেয় বলে জানা গেছে।’’
জানা গেছে, বড় সাজ্জাদের এ সন্ত্রাসী গ্রুপটিতে নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিং মল থেকে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারে আছেন। তার বিরুদ্ধে খুন, অস্ত্র-চাঁদাবাজিসহ মোট ১৭টি মামলা রয়েছে।
তার গ্রেপ্তারের পর গ্রুপটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইমন ও রায়হান। তবে ইমন যিনি ‘ডেভিড ইমন’ নামে পরিচিত তার বিরুদ্ধেই চট্টগ্রাম মহানগরীতে সংগঠিত বিভিন্ন ঘটনার বেশিরভাগের নেতৃত্বে থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সম্প্রতি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনের কার্যালয়ে ভাঙচুরের দু'দিন আগে মালিক আদিলকে কল করে ইমন এককালীন দুই কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করেন। আদিল চরচাকে বলেন, 'উনি ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে আমার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর করার হুমকিও দেয়। এ ঘটনার পর সোমবার সেখানে ভাঙচুর করা হয়। আমি র্দীঘদিন চট্টগ্রামে ইন্টারনেটের ব্যবসা করি, কখনো কেউ এভাবে চাঁদা চায়নি বা দিইনি।'
ফোনকলের অডিওতে আদিলকে ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানের বাড়িতে হামলার পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে শোনা যায়। মুজিবের কাছ থেকে ডেভিড ইমন সম্পর্কে জানার পরামর্শও দেওয়া হয়।
আদিল বলেন, ‘‘কক্সবাজার থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত আমাদের ৪৫ হাজারের মতো গ্রাহক রয়েছেন। সব দলের লোকজন আমাদের ইন্টারনেট সেবা নেন। কিন্তু কখনো কেউ আমাদের কাছে চাঁদা দাবি করেনি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করেনি।’’
অতীতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল না দাবি করে আদিল বলেন, ‘‘আমার বাবা একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে যেতে হয়নি। শুধু আমি নই এ ব্যক্তির নামে আমাদের ইন্টারনেট সেবাদানকারী অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করা হয়েছে। আমি চাঁদা না দেওয়ায় আমার প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ঘটনা সামনে আসার পর অনেকে তাদের কাছ থেকে চাঁদা চাওয়ার বিষয়টি সামনে আনছেন।’’
চকবাজারের ভুক্তভোগী একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘‘বিভিন্ন ঘটনার পর যদি পুলিশের অভিযানে অভিযুক্ত সন্ত্রাসীরা ধরা পড়ত তাহলে পরে আর এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতো না। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে সন্ত্রাসীরা এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠছে।’’
ডিডিএন কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় আটজনকে গ্রেপ্তার করার কথা বুধবার দুপুরে জানান নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) ফয়সাল আহম্মেদ। তবে এই আটজন এ ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কি না তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা জানান তিনি। ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, ‘‘তবে ঘটনার সাথে মূল অভিযুক্তদের বিষয়ে তাদের কাছে কেন তথ্য নেই?’’
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন চরচাকে বলেন, ‘‘আমরা হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়েছি। যারা হামলা করেছে তাদের শনাক্ত করে তারা কার লোক সকল তথ্য যাচাই করার চেষ্টা ছলছে, অচিরেই তাদের গ্রেপ্তার করা যাবে।’’
বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার মোহাম্মদ মুছার ছেলে। কৃষক পরিবারের সন্তান হলেও বিভিন্ন সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা ইমন পরবর্তীতে সাজ্জাদ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তীতে চট্টগ্রামে বিভিন্ন খুন ও চাঁদাবাজির ঘটনায় বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে তার নাম আলোচনায় আসে। ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তারের পর মোবারক হেসেন ইমন মূলত ওই সন্ত্রাসী গ্রুপের অন্যতম নেতৃত্বের পর্যায়ে চলে আসেন বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে নগরী ও জেলায় খুন, চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘‘ইমন বাংলাদেশেই পলাতক থেকে তার সহযোগীদের দিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তার গ্রুপের সন্ত্রাসীদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে। তারা কোনো ঘটনা ঘটিয়ে দ্রুতই আত্মগোপনে চলে যায়।’’
পুলিশ কর্মকর্তা নুর হোসেন মামুন বলেন, ‘‘আমরা তাকে ধরার জন্য চেষ্টা করছি। বিভিন্ন ঘটনার সাথে তার সম্পৃক্ততাও আমরা খতিয়ে দেখছি। চকবাজারে ডিডিএনের অফিসে হামলাসহ অন্যান্য ঘটনায় কারা যুক্ত তাও আমরা তদন্ত করছি।’’
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী চরচাকে বলেন, ‘‘আমরা সন্ত্রাসীদের ধরতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছি। যে যত বড় সন্ত্রাসী সন্ত্রাসী হোক কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা খতিয়ে দেখছি। তাদের গ্রেপ্তারে কাজ চলছে। বিদেশে বসে করলেও সেটা ক্রাইম। যেখানে বসে করুক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।’’