মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও উন্নয়নের জন্য সাক্ষরতার গুরুত্ব তুলে ধরতে ইউনেসকো ১৯৬৬ সালে ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ঘোষণা করে। বিশ্বজুড়ে এর উদযাপন শুরু হয় ১৯৬৭ সালে; আর স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে। সেই থেকে প্রতি বছর দিনটি আমাদের অর্জনের কথা মনে করিয়ে দেয়, সঙ্গে সামনে আনে অপূর্ণ অঙ্গীকারও। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬ এর এবারের প্রতিপাদ্য ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’ সেই অঙ্গীকারকে মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার আহ্বান জানায়।
সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশে সাক্ষরতার প্রসার ঘটেছে। বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত সরকারি হিসাবে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব মানুষের সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৮ শতাংশ। এটি বিবিএসের ২০২৩ সালের তথ্য, ২০২৬ সালের নতুন জরিপ নয়। অন্যদিকে, ২০২২ সালের জনশুমারিতে হার ছিল ৭৪.৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ জনশুমারির হিসাবে প্রতি চারজনে একজন তখনো নিরক্ষর। আরও উদ্বেগের বিষয়, বিবিএসের ২০২৩ সালের প্রায়োগিক সাক্ষরতা জরিপে একই বয়সসীমার প্রায় ৬২.৯২ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় দক্ষতার মান অর্জন করেছেন। কিন্তু বাস্তবে সাক্ষর হিসেবে গণনা হওয়া এবং পড়া–লেখা ও হিসাবের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারার মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। ইউনেসকোর তথ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সিরিজে বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার ৭৯ শতাংশ হলেও সেটি ২০২২ সালের, ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব মানুষের তথ্য। বয়স ও পরিমাপপদ্ধতি আলাদা হওয়ায় এসব সংখ্যাকে একই মাপকাঠিতে দেখা যাবে না।
তবে সাধারণ পাঠকের কাছে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি সংখ্যার নয়। পাঁচ বছর বিদ্যালয়ে পড়ার পরও কোনো শিশু যদি সহজ বাংলা অনুচ্ছেদ বুঝে পড়তে, নিজের কথা লিখতে কিংবা সাধারণ যোগ–বিয়োগ করতে না পারে, তাহলে তার শিক্ষা কতটা সম্পূর্ণ হলো? পঞ্চম শ্রেণি পাসের সনদ কি তার মৌলিক দক্ষতার নিশ্চয়তা দিচ্ছে?
ইউনেসকোর মৌলিক ধারণায় সাক্ষরতার জন্য বুঝে পড়তে ও লিখতে পারা প্রয়োজন; বিস্তৃত ধারণায় সংখ্যার ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এসব দক্ষতা অর্জন না করা শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি যথার্থ: বিদ্যালয়ের একটি ধাপ শেষ করেও সে কি সাক্ষরতার প্রয়োজনীয় ভিত্তি অর্জন করতে পেরেছে? কতজন পারেনি, তা সরাসরি মূল্যায়ন করে জানতে হবে।
সাক্ষরতার এই অর্জনের পেছনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠনগুলোর দীর্ঘ অবদান রয়েছে। গণসাক্ষরতা অভিযান ১৯৯০ সাল থেকে সহযোগী সংগঠনগুলোর সঙ্গে মাঠপর্যায়ের উদ্যোগ এবং জাতীয় পর্যায়ে নীতি-সংলাপ ও জনমত গঠনের মাধ্যমে সবার সাক্ষরতা ও শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ তৈরি, পরিবারকে উদ্বুদ্ধ করা এবং পিছিয়ে থাকা মানুষের প্রয়োজন সামনে আনার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই আজকের অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
সরকারের মৌলিক সাক্ষরতা ও বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের শিক্ষায় ফেরানোর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। এসব কর্মসূচি দ্বিতীয় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে স্বল্পমেয়াদি কোর্সের পর অনুশীলন চলবে কোথায়, প্রবীণেরা কীভাবে শিখবেন এবং অর্জিত দক্ষতা টিকবে কীভাবে-এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। ভর্তি বা কোর্স সমাপ্তির সংখ্যার পাশাপাশি শেখার ফল যাচাই করতে হবে।
বিদেশি অনুদানের সংকট এই কাজের জন্য বাড়তি উদ্বেগ। অর্থের অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম থমকে যাওয়ার সাম্প্রতিক উদাহরণ রোহিঙ্গা শিবিরের শিক্ষাকেন্দ্রগুলো। দেশের সাক্ষরতা উদ্যোগেও কোথায় অর্থসংকটে কাজ স্থিমিত হয়েছে, তা চিহ্নিত করে পুনরুজ্জীবিত করা দরকার। বিদেশি সহায়তার অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষের শেখার সুযোগ ধরে রাখতে নিয়মিত দেশীয় অর্থায়ন অপরিহার্য।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২৬-এর ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধরি জন্য সাক্ষরতা’ (Literacy for people, the planet and prosperity) এবারের প্রতিপাদ্য আমাদের কাজের দিকও দেখায়। মানুষের জন্য সাক্ষরতা মানে স্বাস্থ্যতথ্য বোঝা, অধিকার জানা ও নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া। পৃথিবীর জন্য সাক্ষরতা মানে পরিবেশের যত্ন এবং দুর্যোগের সতর্কবার্তা বুঝে প্রস্তুতি নেওয়া। সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা মানে মজুরির হিসাব রাখা, নতুন দক্ষতা শেখা ও জীবিকার সুযোগ বাড়ানো। পাঠের বিষয়বস্তু তাই মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।
শতভাগ সাক্ষরতার জন্য প্রয়োজন একটি সামাজিক আন্দোলন। সরকারের নেতৃত্বে গণসাক্ষরতা অভিযানসহ এনজিও, স্থানীয় সরকার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গণমাধ্যম, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা চাই। শ্রমজীবীদের সুবিধাজনক সময়, নারীদের নিরাপদ পরিবেশ, আদিবাসীদের মাতৃভাষা ও প্রতিবন্ধীবান্ধব উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে।
ভারতের স্বেচ্ছাশিক্ষকভিত্তিক উদ্যোগ এবং নেপালের কমিউনিটি শিক্ষাকেন্দ্র দেখায়, স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করলে শেখার সুযোগ বাড়ে। আমাদেরও ‘একজন শিখি, আরেকজনকে শেখাই’ উদ্যোগকে স্থায়ী অর্থায়ন ও পেশাগত সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে প্রত্যেক শিশুর বুঝে পড়া, লেখা ও মৌলিক গণিত নিশ্চিত করতে হবে।
সাক্ষরতার প্রকৃত সাফল্য ফুটে উঠবে মানুষের স্বাধীনভাবে চলার সামর্থ্যে। যে শিশু নিজের কথা লিখতে পারে, যে নারী প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যে শ্রমিক নিজের পাওনা হিসাব করতে পারেন-তাদের জীবনেই সেটাই সাফল্যের প্রমাণ। সংখ্যার অগ্রগতি জীবনের পরীক্ষায় কতটা কাজে এল, এবারের সাক্ষরতা দিবসে সেই হিসাবই চাই।
লেখক: শিক্ষা গবেষক ও নীতি বিশ্লেষক