আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হলেও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ঘিরে আস্থা ও অনাস্থার দোলাচলে রয়েছে গ্রাহকরা। টাকা ফেরত পেয়ে কেউ আবারও ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন চালিয়ে যেতে চান। আবার টাকা হাতে পাওয়ার পর আপাতত আর এই ব্যাংকে আমানত রাখতে চাইছেন না অনেকে। ব্যাংকটি শেষ পর্যন্ত কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং গ্রাহকদের আস্থা কতটা ফিরিয়ে আনতে পারে, সেটিও দেখতে চান তারা।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ঘুরে দেখা গেছে, আবেদন করা গ্রাহকদের পর্যায়ক্রমে টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো শাখায় গ্রাহকদের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার পাশাপাশি ফুল ও মিষ্টি দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তবে টাকা ফেরত পাওয়ার স্বস্তির পাশাপাশি ব্যাংকটির সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
এই ব্যাংকের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। এই ব্যাংকে আমার আরও টাকা আছে। সেগুলো ব্যাংকেই রাখব। আমি এই ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন চালিয়ে যেতে চাই।
টাকা ফেরত পেলেও, আস্থা নিয়ে দ্বিধা
রাজধানীতে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বাসাবো শাখায় মঙ্গলবার গিয়ে দেখা যায়, টাকা ফেরতের জন্য আবেদন করা গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে। এ সময় কয়েকজন গ্রাহককে টাকা নিতে দেখা যায়। টাকা নিতে শাখাটিতে গ্রাহকদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
শাখার ম্যানেজার সিদ্দিক হোসেন চরচাকে বলেন, “আজও প্রায় ৩০ জন গ্রাহক শাখায় এসে টাকা নিয়েছেন। আরও কয়েকজন গ্রাহক টাকা নিতে শাখায় আসবেন। আমরা আশা করি, গ্রাহকের সঙ্গে যে তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে, সেটা ভুলে গিয়ে আবার নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করব।”
ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় গিয়ে দেখা গেছে, টাকা ফেরত দেওয়ার সময় কোনো কোনো গ্রাহককে একটি করে রজনীগন্ধা ফুল উপহার দিচ্ছেন কর্মকর্তারা। কোথাও কোথাও গ্রাহকদের মধ্যে মিষ্টিও বিতরণ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের সংকট ও গ্রাহকদের ভোগান্তির পর আমানত ফেরত দেওয়ার এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ব্যাংকটি গ্রাহকদের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে। তবে গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু টাকা ফেরত পেলেই আগের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসছে না। কেউ ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার কথা বলছেন, আবার কেউ টাকা তুলে নিয়ে আপাতত অন্য ব্যাংকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক মো. লিটন বলেন, “এই ব্যাংকের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। এই ব্যাংকে আমার আরও টাকা আছে। সেগুলো ব্যাংকেই রাখব। আমি এই ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন চালিয়ে যেতে চাই।” লিটনের মতো কোনো কোনো গ্রাহকের বক্তব্যে ব্যাংকটির প্রতি দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও আস্থার বিষয়টি উঠে এলেও অন্যদের মধ্যে রয়েছে অপেক্ষা করে দেখার মনোভাব। টাকা ফেরত নিতে আসা গ্রাহকদের মধ্যে অনেকের মুখে ছিল স্বস্তির ছাপ। দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার পর নিজের আমানতের টাকা হাতে পাওয়াকে স্বস্তির বিষয় হিসেবে দেখছেন তারা। তবে সেই স্বস্তির সঙ্গে ব্যাংকটিতে আবার টাকা রাখার বিষয়ে অনেকে এখনো দ্বিধায় রয়েছেন।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক হুসনে আরা চরচাকে বলেন, “আমি গত ১ সেপ্টেম্বর টাকা ফেরতের জন্য আবেদন করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আজ আমি আমার টাকা তুলতে পেরেছি। টাকা ফেরত পাওয়ায় আমি স্বস্তি পেয়েছি। এ জন্য সরকারকে আমি ধন্যবাদ জানাই। অনেক কষ্টে টাকাটা পেলাম।” তবে ভবিষ্যতে আবারও এই ব্যাংকে টাকা রাখবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপাতত না। আগে দেখি এই ব্যাংক কেমন চলে, তারপর না হয় চিন্তা করব।”
হুসনে আরার মতো অনেক গ্রাহকই আমানতের টাকা ফেরত পাওয়ার পরও ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম, স্থিতিশীলতা ও সেবার বিষয়ে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে আমানত রাখার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে চাইছেন। কেউ কেউ পুরোপুরি ব্যাংক থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি। বরং ব্যাংকটির কার্যক্রম কীভাবে এগোয়, তা পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলছেন তারা।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মতিঝিল শাখার গ্রাহক মোহাম্মদ আলী চরচাকে বলেন, “আমি ধারণাই করতে পারিনি যে এই টাকা ফেরত পাব। তবে ফেরত যখন পেয়েছি, ব্যাংককে ধন্যবাদ।”
এই ৫ ব্যাংক একসাথে মিলে হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক।
এই ব্যাংকের সঙ্গে ভবিষ্যতে সম্পর্ক রাখতে চান কি না জানতে চাইলে আলী বলেন, “এটা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। তবে ব্যাংক যদি ভালো করে তাহলে তো অবশ্যই টাকা রাখব। কারণ, টাকা তো কোনো না কোনো ব্যাংকে রাখতে হবে। তাই যে ব্যাংক ভালো করবে, সেখানেই রাখব।”
অর্থাৎ টাকা ফেরত পাওয়ার পরও গ্রাহকদের একটি অংশ ব্যাংক ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। বরং ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা, সেবা, আমানত ফেরতের ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
গ্রাহক ধরে রাখার চেষ্টা ব্যাংকের
গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে শুধু আমানত ফেরত দেওয়াই নয়, তাদের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকদের ফুল ও মিষ্টি দিয়ে স্বাগত জানানোও সেই প্রচেষ্টার অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের বাসাবো শাখার ম্যানেজার মনজুরুল হক চরচাকে জানান, “আবেদন করা সব গ্রাহককেই টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। টাকা ফেরতের জন্য যারা আবেদন করেছেন, পর্যায়ক্রমে তাদের সবাইকে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। অনেকে টাকা তুলতে এসে কিছু টাকা রেখেও যাচ্ছেন অ্যাকাউন্টে। অর্থাৎ তারা আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে যেতে চান।”
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আবেদুর রহমান সিকদার চরচাকে বলেন, “আমরা নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করছি। যেসব গ্রাহক টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করেছিলেন, তাদের সবার টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রথম দিন যারা টাকা ফেরত নিতে এসেছিলেন, তারা ফেরত পেয়েছেন। অনেকে আসেননি। তারা হয়তো পরে নেবেন বা অনেকে আমাদের ব্যাংকেই রেখে দেবেন। গ্রাহকের আস্থা অর্জন করে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।”
কোনো কোনো শাখায় গ্রাহকদের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার পাশাপাশি ফুল ও মিষ্টি দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। ছবি: চরচা
আস্থা ফেরানোর প্রথম পরীক্ষা
পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য আমানত ফেরতের এই কার্যক্রম শুধু গ্রাহকদের টাকা পরিশোধের একটি প্রক্রিয়া নয়, একই সঙ্গে নতুন ব্যাংকটির প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের বড় পরীক্ষা। দীর্ঘদিনের সংকট, অর্থ ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং সেবায় ভোগান্তির পর গ্রাহকদের একটি অংশ এখন স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের নিশ্চয়তা চাইছেন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সংকট শুরু মূলত পাঁচটি ব্যাংকের দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা, অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট থেকে। এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়ায় আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০২৫ সালের শেষ দিকে রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একীভূতকরণের কাজ শুরু হয়। এরপর নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক করার পাশাপাশি আমানতকারীদের টাকা ফেরত ও গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এখন টাকা ফেরত শুরু হলেও গ্রাহকদের মধ্যে কেউ ব্যাংকটির সঙ্গে থাকতে চাইছেন, আবার কেউ টাকা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।