একসময় চীনে ভারতকে খুব সম্মানের চোখে দেখা হতো, কারণ ভারতকে বৌদ্ধধর্মের সূতিকাগার মনে করা হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের প্রতি চীনের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে চীন ও ভারত কেবল দুই শক্তিশালী প্রতিবেশীই নয়, ভূরাজনীতির নানা সমীকরণের কারণে তারা একে অপরের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীও। যেকারণে প্রতিবেশী ভারতকে বোঝার প্রয়োজন বাড়ছে বেইজিংয়ের। কিন্তু ভারত নিয়ে চীনা গবেষণার পরিধি বাড়লেও দেশটির রাজনীতি, সমাজ ও কৌশলগত অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতিবেশী ও সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে নিয়ে এত গবেষণার পরও কেন দেশটিকে বুঝতে পারছে না চীন।
ভারত নিয়ে চীনের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। ভারত নিয়ে চীনের প্রথম দিককার গবেষকদের একজন ছিলেন চীনা পর্যটক ও বৌদ্ধ ভিক্ষু শুয়ানজাং। সপ্তম শতকে তিনি পশ্চিমের দিকে যাত্রা করেছিলেন। তার গন্তব্য ছিল ভারত। তখন চীনে ভারতকে খুব সম্মানের চোখে দেখা হতো, কারণ ভারতকে বৌদ্ধধর্মের সূতিকাগার মনে করা হতো।
১৬ বছর পর ওই পর্যটক চীনে ফিরে যান। তার সঙ্গে ছিল বৌদ্ধদের বহু ধর্মগ্রন্থ। এসব গ্রন্থের চীনা অনুবাদ দেশটির বৌদ্ধধর্মের বিকাশে বড় প্রভাব ফেলে।
তবে তিনি শুধু ধর্মীয় জ্ঞান নিয়েই ফেরেননি। ভারতীয় রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভূগোল সম্পর্কেও তিনি অনেক তথ্য নিয়ে আসেন। এসব তথ্য তিনি তার ‘রেকর্ডস অব দ্য ওয়েস্টার্ন রিজিয়নস’ বইয়ে লিখে রাখেন। এভাবে অজান্তেই ভারত বিষয়ে চীনের প্রথম দিককার গবেষকদের একজন হয়ে উঠেছিলেন শুয়ানজাং।
এরপর কেটে গেছে ১৪ শতক। এ সময়ে বদলেছে অনেক কিছু। এর মধ্যে ভারতের প্রতি চীনের দৃষ্টিভঙ্গিও রয়েছে। বর্তমানে ভারতকে আগের মতো ভালো চোখে দেখে না বেইজিং। দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, বিশ্বের অন্যান্য দেশ সম্পর্কে চীনের জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২২ সাল পর্যন্ত চীনে কোনো দেশ বা অঞ্চল নিয়ে গবেষণা বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে বিভক্ত ছিল। যেমন, একজন গবেষক ইতিহাস বিভাগে ভারত নিয়ে পড়াশোনা করতে পারতেন, পরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি করতে পারতেন।
২০২২ সালে চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘এরিয়া স্টাডিজ’ বা বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চল নিয়ে সমন্বিত গবেষণাকে বিশেষ মর্যাদা দেয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বয়ে নতুন বিভাগ খুলতে এবং নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চল নিয়ে ডিগ্রি চালু করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের মূল কারণ হলো–চীন যেসব দেশ ও অঞ্চলে প্রভাব বাড়াতে চায়, সেগুলোকে আরও ভালোভাবে বোঝার প্রয়োজন এখন তাদের কাছে অনেক বেশি।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, চীন অনেক দিন ধরেই ভারতকে নিয়ে বেশ গুরুত্ব দিয়ে গবেষণা করে আসছে। এর কয়েকটি কারণ আছে। ভারত চীনের প্রতিবেশী, সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী এবং চীন বাদে বিশ্বের একমাত্র দেশ, যার জনসংখ্যা ১০০ কোটির বেশি। দুই দেশই ব্রিকসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জোট ও সংগঠনের সদস্য।
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই সম্মেলনের আয়োজন করবেন। এতে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়েরও যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। ২০১৯ সালের পর এটাই হবে তার প্রথম ভারত সফর।
ভারতের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়ার পাশাপাশি চীনের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ভারত নিয়ে গবেষণা করা চীনা গবেষকের সংখ্যাও বেড়েছে।
সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের লিন মিনওয়াং এবং বেইজিংয়ের সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাও কেজি গত বছর প্রকাশিত এক গবেষণায়, ভারতকে নিয়ে করা চীনের এসব গবেষণার বড় অংশের মান খুব একটা ভালো নয়। তাদের মতে, ভারত নিয়ে গবেষণার আগ্রহ বাড়লেও অনেক গবেষণায় গভীরতা, ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রয়োজনীয় জ্ঞানভিত্তির অভাব রয়েছে।
ভারতীয় গবেষকরাও চীনের গবেষণার ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরনের সমস্যা দেখেছেন। চীনে ১১ বছর থাকা রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাজ ভার্মা বলেন, পুরোনো প্রজন্মের চীনা গবেষকেরা সাধারণত বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ। কিন্তু তরুণ গবেষকদের কেউ কেউ ভারতের বিষয়ে আক্রমণাত্মক ও উদ্ধত।
এর মানে হলো–চীন ভারত নিয়ে বেশি গবেষণা করলেও ভারতকে বোঝার ক্ষেত্রে যেন আরও পিছিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ কী?
অনেক চীনা গবেষকের মতে, ভারতে গিয়ে গবেষণা করার সুযোগ কম। ভারত বরাবরই বিদেশি গবেষক ও সাংবাদিকদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক। ২০২০ সালে লাদাখে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর চীনা গবেষকদের ভারতে প্রবেশও বন্ধ হয়ে যায়।
সম্প্রতি দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আবার পর্যটন ভিসা দেওয়া শুরু হয়েছে। এমনকি দুই দেশ একে অপরের সাংবাদিকদের আবার প্রবেশের অনুমতি দিতে পারে–এমন আলোচনাও চলছে। এরপর হয়তো গবেষকদের জন্যও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে সীমান্ত খুলে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না বলে মত বিশেষজ্ঞদের। কারণ ভারত সম্পর্কে চীনা গবেষকদের মধ্যে আগে থেকেই কিছু পুরনো ধারণা রয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চীনের শাসক ও শিক্ষিত শ্রেণির একটি অংশ মনে করে আসছে, ভারত দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশিদের শাসন মেনে নিয়েছিল। চীনের বিপ্লবী নেতারাও ভারতের অহিংস স্বাধীনতা আন্দোলনকে খুব একটা গুরুত্ব দেননি। ভারতের গণতন্ত্রকেও চীনে অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়।
চীনা তরুণ গবেষকদের কাছে ভারতকে চীনের তুলনায় দরিদ্র এবং সামরিক দিক থেকেও দুর্বল। কিন্তু একই সঙ্গে ভারত বড় বড় কথা বলে এবং নিজের সক্ষমতার কথা জোর দিয়ে তুলে ধরে। তাই ভারতের বড় ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে তারা সহজেই অবজ্ঞা করেন।
আরেকটি সমস্যা হলো, নিজেদের ভুল নিয়ে চীনা গবেষকদের মধ্যে আত্মসমালোচনার অভাব। ভারতীয় গবেষকরা চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের ভুল ও ব্যর্থতা নিয়ে নিয়মিত লেখেন।
‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকার সাংবাদিক অনন্ত কৃষ্ণন এ বছরের শুরুতে তার নিউজলেটারে লিখেছেন, ভারত নিয়ে চীনা গবেষণায় এমন আত্মসমালোচনা খুব কম দেখা যায়। তার মতে, চীন যদি মনে করে দুই দেশের সম্পর্কের সব সমস্যার জন্য শুধু ভারতই দায়ী, তাহলে এ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করা সম্ভব নয়।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ভারত সত্যিই অনেক দিক থেকে জটিল ও কঠিন একটি দেশ। এমনকি যারা সারা জীবন ভারতে থেকেছেন, তারাও বলতে পারবেন না যে তারা দেশটিকে পুরোপুরি বুঝতে পেরেছেন। তবে ভারতকে বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো বিনয়ী মনোভাব নিয়ে এগোনো। শুয়ানজাং ভারতের জ্ঞান ও সংস্কৃতি জানতে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। নিজেদের মনটা একটু খোলা রাখলে বিদেশি গবেষকরাও ভারতকে বোঝার যাত্রা শুরু করতে পারেন।