সরকার বদলায়, প্রশাসনের কর্তারাও বদলি হন। কিন্তু বদলায় না সিলেট নগরীর চিরচেনা যানজটের চিত্র। যত্রতত্র পার্কিং আর ফুটপাত দখল করে কথিত হকারদের ব্যবসা চলে নিয়মিত। নিয়মমাফিক কিছুদিন পরপর পুলিশ ও প্রশাসনের অভিযানও চলে। অভিযানে ম্যাজিস্ট্রেটসহ পুলিশের জিপ আসে সাইরেন বাজিয়ে। হুইসেলের অ্যালার্ট পেলেই হকাররা ব্যস্ত রাস্তা ছেড়ে পাশের গলিতে ঢুকে পড়েন দোকান-পসরা নিয়ে। লাইন করে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোও যেন নিমেষেই উধাও হয়ে যায়। গত কয়েক বছর ধরে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সব পয়েন্টে এভাবেই চলছে যানজট ও ফুটপাত দখলের চিরচেনা খেলা। নিত্যদিনের এই সমস্যা এখন সিলেটের বাসিন্দাদের জন্য এক নিয়তি। কিন্তু এই ভোগান্তির দায় নেবে কে?
সিলেটের শামীমাবাদের বাসিন্দা রাহুল সরকার (২৯)। নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করতে মোটরসাইকেল নিয়ে এসেছেন বন্দরবাজারে। তিনি জানান, নগরীর মূল প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, কোর্ট পয়েন্ট, রিকাবীবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা, ওসমানী মেডিকেল রোডসহ এর আশপাশের এলাকাগুলোর যাতায়াতের কথা। চোখ বুজে কল্পনা করলেই দেখা যায় রাস্তাগুলো সিএনজি-অটোরিকশা আর রিকশায় ঠাসা।
সদ্য ঢাকা থেকে উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে সিলেটে ফিরে আসা মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন (৩২) ট্রেনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, ট্রেনটিতে বাইরের জেলা থেকে প্রচুর পর্যটক সিলেটে আসছিলেন। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের সিলেট দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন নগরী। আমি চাই নগরীতে চলাফেরা সহজ ও সুন্দর হোক।’’
জিন্দাবাজার থেকে চৌহাট্টা-আম্বরখানার রাস্তা দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘‘সকালে রাস্তা যখন ফাঁকা থাকে, এখান থেকে আম্বরখানা যেতে মাত্র ৫ মিনিট লাগে। কিন্তু বিকেল হলেই একই রাস্তায় সময় লাগে কমপক্ষে আধা ঘণ্টা। তাছাড়া ফুটপাত আর রাস্তা দখল করে হকারদের ব্যবসা করার সমস্যা তো আছেই। প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েও লাভ হয় না। পুলিশকে বললে বলবে এটা সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব, আর সিটি করপোরেশনে বললে বলবে জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব। এভাবেই চলে দেশ। তাই কোথাও কিছু বলতে চাই না। তবুও আমি গণমাধ্যমের মাধ্যমে দাবি জানাচ্ছি, আমাদের এই সুন্দর নগরীতে চলাফেরাটা যেন সুন্দর হয়!’’
সিলেট নগরীর প্রবেশমুখ হুমায়ুন রশীদ চত্বর, চণ্ডীপুল, বাবনা পয়েন্ট ও কদমতলী এলাকাতেও যানবাহনের চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিশেষ করে ওই অংশের সড়কগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপের পাশাপাশি রাস্তাগুলো খানাখন্দে ভরা থাকায় সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। কদমতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দেখা যায়, নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে মূল সড়কে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোর ফলে প্রতিদিন যান চলাচলে তীব্র বিঘ্ন ঘটছে।
সিলেটের জকিগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা এম. এ. জব্বার (৬০) ব্যবসার প্রয়োজনে সপ্তাহের প্রায় ৫-৬ দিন সিলেটে থাকেন। কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘‘সরকার আসে-যায়, প্রশাসনের বিভিন্ন পদের কর্মকর্তারা বদলি হন। কিন্তু দিনের পর দিন একই সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি, মোড়গুলোতে অচলাবস্থা আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তি নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যা দিন দিন আরও বাড়ছে।’’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি জানান, যানজটমুক্ত ও সুন্দর সিলেটের কথা চিন্তা করে এই আধুনিক লাক্সারি বাসস্ট্যান্ড তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু ঘুরেফিরে ওই মূল রাস্তাতেই বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা হয়। এসব দেখার বা বলার কেউ নেই।
এদিকে মদিনা মার্কেট, সুবিদবাজার, শিবগঞ্জ, নাইওরপুল ও ইলেকট্রনিক সাপ্লাই রোডে সন্ধ্যার ২ ঘণ্টা আগে থেকে রাত ৭টা পর্যন্ত থেমে থেমে তীব্র জ্যাম লেগেই থাকে। নগরীর সোবহানীঘাটে দাঁড়িয়ে কথা হয় ধোপাদিঘীরপার এলাকার বাসিন্দা শিপন চন্দ দাস জয়ের সাথে। তিনি বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, ‘‘বিকেল হলেই সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে দেখা যায় ৩-৪ জন ট্রাফিক পুলিশ একযোগে চতুর্মুখী জ্যাম ছাড়াতে কাজ করছেন। কিন্তু তারপরও তারা সামলে উঠতে হিমশিম খান।’’
অবৈধ পার্কিং নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘জিন্দাবাজারের অধিকাংশ বড় বড় শপিং মল ছাড়াও সোবহানীঘাটের ইবনে সিনা হাসপাতাল, মীরবক্সটুলার মাউন্ট এডোরা হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা নেই। এসব পাবলিক সার্ভিসের সাথে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে আসা লোকজন বাধ্য হয়ে তাদের গাড়ি রাস্তায় পার্ক করেন। যে কারণে যানজট লেগেই থাকে।’’ শিপন আরও যোগ করেন, সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমের সময়ে নিয়মিত হকার উচ্ছেদ অভিযান চলায় কিছুদিন যানজট কিছুটা কম ছিল, কিন্তু এখন তা আবার তীব্র রূপ ধারণ করেছে।
সিলেটের অস্থায়ী বাসিন্দা ইউনিলিভারের মার্কেটিংয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা শোভন মোদক বলেন, ‘‘আমরা যারা চাকরি করি, আমাদের জন্য অফিস টাইম ধরে চলাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যানজটের কারণে প্রায়শই বিপাকে পড়তে হয়। আমরা একটি পরিকল্পিত নগরী চাই।’’
ফুটপাত দখল যানজটের অন্যতম কারণ। ছবি: চরচা
সিলেট মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার গৌতম দেব বলেন, ‘‘সিলেটে অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।’’ অবৈধ পার্কিং ও নগরবাসীর অসচেতনতাসহ নানা সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘হকারদের ফুটপাত দখলের কারণে সিলেটের রাস্তাগুলোর অর্ধেকই তাদের দখলে চলে যায়। ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়টি যেহেতু সিলেট সিটি করপোরেশনের এখতিয়ারভুক্ত, তাই আমরা বিষয়টি তাদের বারবার অবহিত করছি।’’
যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের পদক্ষেপ বিষয়ে ট্রাফিক উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক, অতিরিক্ত দায়িত্বে ডিসি-সদর) সুদীপ্ত রায় জানান, বর্তমানে ট্রাফিক অভিযান, ট্রাফিক সপ্তাহ উদযাপন, অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ, ভুল পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা, অন-টেস্ট গাড়ি শহরে প্রবেশ বন্ধ রাখা এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে মামলাসহ নানা উদ্যোগ চালু রয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ সমস্যা সমাধানে সিলেট সিটি করপোরেশনের সাথে বেশ কয়েকবার চিঠি দেয়া হয়েছে। জট সামলাতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিগন্যাল লাইট স্থাপনের বিষয়ে সরকারকে জানানো হয়েছে।’’
সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত ৩২টি স্ট্যান্ডের বাইরে যেসব অবৈধ স্ট্যান্ড রয়েছে, সেগুলোও পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘লোকবল সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জের কারণে একসাথে সব অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করা সম্ভব না হলেও আমরা ধীরে ধীরে এগোচ্ছি।’’
অবৈধ পার্কিংয়ের সত্যতা স্বীকার করে তিনি জানান, ইতিমধ্যে বিভিন্ন মার্কেট ও প্রতিষ্ঠানকে তাদের নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আন্তঃজেলার গাড়ি মেট্রোপলিটন এলাকায় ঢুকলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু মামলা কোনো স্থায়ী সমাধান নয় উল্লেখ করে তিনি জনসচেতনতার ওপর জোর দেন। জনসচেতনতা তৈরির দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে অতীতে বহুবার সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘‘যানজট সরাসরি দেখাশোনার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের নয়। তবে যেহেতু শহরের নাগরিক সেবা দেওয়া আমাদের কাজ, তাই মেট্রোপলিটন পুলিশের সাথে এসব সমস্যা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। শিগগিরই অবৈধ গাড়ি জব্দ শুরু হবে।’’
যানজটের প্রধান কারণ হিসেবে অবৈধ পার্কিংকে দায়ী করে তিনি জানান, খুব শিগগিরই সিলেট সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও মেট্রোপলিটন পুলিশের যৌথ সমন্বয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে যানজট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ফুটপাত দখলকে যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে স্বীকার করে দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে তিনি জানান, খুব দ্রুতই ফুটপাত উচ্ছেদে অভিযান শুরু করা হবে।