সিলেট নগরের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক নিদর্শন কিন ব্রিজের দৃশ্যপট আড়াল করে ‘আই লাভ সিলেট’ নামক একটি সাইনেজ নির্মাণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অধিবাসী, নাট্যকর্মী ও ভ্রমণকারীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রয়া দেখা গেছে। সুরমা নদীর তীরে প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী ব্রিজ এবং সার্কিট হাউস সংলগ্ন এলাকায় সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) ও বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের যৌথ উদ্যোগে পাকা ভিত্তির ওপর আলোকসজ্জিত সাইনেজটি স্থাপন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের অভিযোগ, তথাকথিত সৌন্দর্যায়ন ও পর্যটন আকর্ষণের নামে নির্মিত এই স্থাপনাটির কারণে ঐতিহ্যবাহী ক্বিন ব্রিজের নান্দনিকতা ও মূল সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
নগরের সার্কিট হাউস, আলী আমজাদের ঘড়ি, কিন ব্রিজ ও চাঁদনী ঘাট সংলগ্ন এলাকাটি সর্বসাধারণের কাছে সিলেটের প্রধান ‘ঐতিহ্য চত্বর’ হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি কিন ব্রিজের উত্তর অংশের বাঁ পাশে নদীতীরের জায়গা উঁচু করে একটি পাকা কাঠামোর ওপর সাইনেজটি বসানো হয়, যার নির্মাণকাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। নতুন এই স্থাপনার ফলে ব্রিজের একটি বড় অংশ সাধারণ মানুষের দৃষ্টিসীমা থেকে আড়াল হয়ে যাওয়ায় গত এক সপ্তাহ ধরে সুশীল সমাজ ও নগরবাসীর মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
একই ইস্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে নাট্যকর্মী ডিএক্সএন মাসুম খান প্রশ্ন তোলেন, ‘‘ঐতিহ্যবাহী ব্রিজ ঢেকে এই বিশ্রী জিনিস স্থাপনের আগে একবারও কি কারও মতামত নেওয়া দরকার ছিল না?’’
একই সুর মিলিয়ে লেখক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর জালাল জয় উল্লেখ করেন, কিন ব্রিজ সিলেটের ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অন্যতম প্রধান প্রতীক। তবে নতুন সাইনেজটি স্থাপনের ক্ষেত্রে নগর পরিকল্পনায় সমন্বয়ের স্পষ্ট ঘাটতি দেখা গেছে। তার মতে, সাইনেজটি এমনভাবে স্থাপন করা উচিত ছিল, যাতে ছবি তুললে ক্বিন ব্রিজ ও সাইনেজ—দুটিই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হতো। এতে ঐতিহ্যও বজায় থাকত এবং নতুন স্থাপনার উদ্দেশ্যও সফল হতো।
অন্যদিকে, জয়ন্ত কুমার দাশ নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লেখেন, ‘‘আমিও সিলেটকে ভালোবাসি, কিন্তু আমি এই স্থাপনার বিপক্ষে। কারণ, এর পেছনে আমাদের শতবর্ষী ক্বিন ব্রিজ ঢাকা পড়েছে এবং এর স্থান নির্বাচন অত্যন্ত বাজে হয়েছে।’’
উদ্ভুদ বিতর্কের মুখে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং পর্যটকদের দৃষ্টিনন্দন ছবি তোলার সুযোগ তৈরির জন্যই সাইনেজটি নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়। সিসিক কেবল স্থান ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে; নির্মাণ ও তত্ত্বাবধানের যাবতীয় খরচ বহন করছে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রকল্প থেকে সিসিক কোনো অর্থ গ্রহণ বা ব্যয় করেনি।
বিতর্কিত সাইনেজ প্রসঙ্গে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নগরের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও নান্দনিকতা বজায় রেখে উন্নয়নকাজ চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এবং নগরবাসীর রুচি ও প্রত্যাশাকে সিসিক সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
প্রশাসক আশ্বস্ত করে বলেন, ‘‘ক্বিন ব্রিজের সৌন্দর্য যেন কোনোভাবে আড়াল বা ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। বিষয়টি সরজমিনে পরিদর্শনের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং প্রয়োজন দেখা দিলে সাইনেজের স্থানও পরিবর্তন করা হবে।’’