কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের এই লৌকিক মর্ত্যভূমি এবং বসুন্ধরা থেকে বিদায় নিয়েছেন সে প্রায় শত বৎসর হতে চলেছে। কিন্তু আমাদের অনুভবে আছেন তিনি জীবন্ত ও উজ্জ্বল হয়ে। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে আমরা যেন মূক। বাঙালির নানা পার্বণ, সকল উৎসব ও ঋতুতে তার গান আমাদের গাইতেই হয়, নইলে আমরা পূর্ণতা পাই না। জাতির সংকটে প্রথমে তার কাছেই আমরা গিয়েছি বারবার। বাঙালির সবচেয়ে গৌরবের সংগ্রাম একাত্তরে আমাদের হাতের রাইফেলের সঙ্গে সমান শক্তি নিয়ে মুখে ছিল “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...”। এ এক বিস্ময়কর ব্যাপার! কোনো জাতির জীবনে কি এমন ঘটনা ঘটেছে! কবি যেমন গানে বলেছেন আমাদেরও যেন তেমনি–
“পিতা মাতা ভ্রাতা সব পরিবার,
মিত্র আমার, পুত্র আমার,
সকলের সাথে প্রবেশি হৃদয়ে
তুমি আছো মোর সাথে।”
আমাদের সকল কাজ, সকল ভাবনায় তিনি আছেন আমদেরকে ঘিরে। রবীন্দ্রনাথ আমাদেরকে তার চিন্তা-রুচি-মহত্ব-নম্রতার উত্তরাধিকার করে গিয়েছেন। শরীরী রবীন্দ্রনাথ আকাশে বাতাসে বিলীয়মান হয়েছেন জীবের নিত্য সত্যের বিধান মেনে। মানুষের বিশ্ব তো ব্যক্তিত্বের বিশ্ব। ব্যক্তিত্বের রবীন্দ্রনাথ বহুকাল বেঁচে থাকবেন বাঙালির জীবনে, ভারতবাসীর চেতনায়, বিশ্বমানবের মুক্তি চিন্তায়।
কবির ৮৫তম মৃত্যুদিনের আলোচনায় মৃত্যু নিয়ে কবির ভাবনা-দর্শনের দিকগুলো নিয়ে আলোচনার চেষ্টা থাকল।
এক
কবি রবীন্দ্রনাথকে তার দীর্ঘজীবনে অসংখ্য প্রিয়জনের মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। সেইসব মৃত্যুর বেদনা কবির জীবনে গভীর প্রভাব রেখেছিল। সেই বেদনাগুলো প্রভাবিত করেছিল তার সাহিত্যকর্মকে। প্রভাবিত করেছিল তার জীবনদর্শনকে। মৃত্যুর নানা ব্যাখ্যা আমরা পেয়েছি রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষপ্রান্ত অবধির রচনায়; মৃত্যুর মধ্যে দিয়েই জীবনের জয়, মৃত্যুর মধ্যে দিয়েই অমরত্ব লাভ করা–এ কথা ধ্বনিত হয়েছে কবির কণ্ঠে বারবার। এমনই কথা আমরা দেখতে পাই তার মাত্র ১৬ বৎসর বয়সের রচনা ‘ভানু সিংহ ঠাকুরের পদাবলী’-তে।
“মরণ রে তুহুঁ মম শ্যামসমান।”
আরও বলছেন
“মৃত্যু-অমৃত করে দান।”
কেন কিশোর রবীন্দ্রনাথ মৃত্যু নিয়ে এমন গভীর ভাবনা ভাবতে গেলেন? কেন তিনি এমন করে ভাবতে গেলেন? সে কি মায়ের মৃত্যু? কিন্তু ‘জীবনস্মৃতি’তে তো তিনি বলেছেন মায়ের মৃত্যুর মধ্যে ভয়ঙ্কর কিছু দেখতে পাননি, সেটাকে বরং বলেছেন মনোহর।
দুই
রবীন্দ্রনাথের মায়ের মৃত্যু হয় ১৮৭৫ সালে, তখন কবির বয়স প্রায় ১৪ বৎসর। মায়ের মৃত্যু কিশোর রবীন্দ্রনাথের মনের অন্তর্জগতে একটা কালো ছায়া ফেলে কিন্তু গভীর কালো দাগ কাটে না। সে কালো ছায়া অল্প বয়সের জীবনের লঘু স্বভাবের বেগে লঘু হয়ে মিলিয়ে যায়। মায়ের মৃত্যুর পর বৌঠান কাদম্বরী দেবী মাতৃহীন বালকের ভার নেন। কাদম্বরী দেবী স্থান নেন মায়ের, হলেন কবির পরম বন্ধু, পরিণত হলেন রবীন্দ্রনাথের কাব্যের প্রধান সমঝদার ও সমালোচকে। কিন্তু হঠাৎ বৌঠানের মৃত্যুতে কবির বাস্তব পৃথিবী যেন গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেল, আশপাশের সমস্ত কিছু যেন অর্থহীন হয়ে গেল। কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুশোকই কবির জীবনের প্রথম ও প্রধান শোকের আঘাত, যা কবির জীবনের শেষদিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে ছিল। রবীন্দ্রনাথ ‘জীবনস্মৃতি’তে লিপিবদ্ধ করলেন সেই শোকগাথা–“যে ক্ষতি পূরণ হইবে না, যে বিচ্ছেদের প্রতিকার নাই, তাহাকে ভুলিবার শক্তি প্রাণ শক্তির একটা প্রধান অঙ্গ, শিশুকালে সেই শক্তি নবীন ও প্রবল থাকে, তখন সে কোনো আঘাতকে গভীরভাবে গ্রহণ করে না, স্থায়ী রেখায় আঁকিয়া রাখে না। এই জন্য জীবনে প্রথম যে মৃত্যু কালো ছায়া ফেলিয়া প্রবেশ করিল তাহা আপনার কালিমাকে চিরন্তন না করিয়া ছায়ার মতই একদিন নিঃশব্দপদে চলিয়া গেল।…
“কিন্তু আমার চব্বিশ বছর বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে-পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়। তাহা পরবর্তী প্রত্যেক বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুমালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে। শিশুবয়সের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মৃত্যুকেও অনায়াসে পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়, কিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই। তাই সেদিনকার সমস্ত দুঃসহ আঘাত বুক পাতিয়া লইতে হইয়াছিল।…
“জীবনের মধ্যে কোথাও যে কিছুমাত্র ফাঁক আছে, তাহা তখন জানিতাম না; সমস্তই হাসিকান্নায় একেবারে নিরেট করিয়া বোনা। তাহাকে অতিক্রম করিয়া আর কিছুই দেখা যাইত না, তাই তাহাকে একেবারে চরম করিয়াই গ্রহণ করিয়াছিলাম। এমন সময় কোথা হইতে মৃত্যু আসিয়া এই অত্যন্ত প্রত্যক্ষ জীবনটার একটা প্রান্ত যখন এক মুহূর্তের মধ্যে ফাঁক করিয়া দিল, তখন মনটার মধ্যে সে কী ধাঁধাই লাগিয়া গেল। চারিদিকে গাছপালা মাটিজল চন্দ্রসূর্য গ্রহতারা তেমনি নিশ্চিন্ত সত্যেরই মত বিরাজ করিতেছে অথচ তাহাদেরই মাঝখানে তাহাদেরই মতো যাহা নিশ্চিন্ত সত্য ছিল, এমন-কি, দেহ প্রাণ হৃদয় মনের সহস্রবিধ স্পর্শের যাহাকে তাহাদের সকলের চেয়েই বেশি সত্য বলিয়া অনুভব করিতাম সেই নিকটের মানুষ যখন এত সহজেই এক নিমিষে স্বপ্নের মতো মিলাইয়া গেল তখন জগতের দিকে চাহিয়া মনে হইতে লাগিল, এ-কী অদ্ভুত আত্মখণ্ডন! যাহা আছে এবং যাহা রহিল না, এই উভয়ের মধ্যে কোনোমতে মিল করিব কেমন করিয়া।”
তিন
ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে কবি রবীন্দ্রনাথ অসংখ্য চিঠি লিখেছেন। ঠাকুর পরিবারের যার কাছে কবি তার সাহিত্য ভাবনাসহ নানা ভাবনা সবচেয়ে বেশি বিনিময় করতেন, তিনিই হলেন ইন্দিরা দেবী। ‘ছিন্নপত্রাবলী’র সমস্ত চিঠিসহ আরও অনেক চিঠি কবি লিখেছেন তাকে, যা রবীন্দ্র সাহিত্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে। যৌবন বয়সেই রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলাদেশে জমিদারি দেখভাল করছিলেন, সেই সময়েই বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান সম্পদ তার ছোটোগল্প এবং ‘ছিন্নপত্রাবলী’র অধিকাংশ চিঠিগুলো লিখেছিলেন।
১৮৯৫ সালের ২৪ জুলাই ইন্দিরা দেবীকে লেখা একটি চিঠি, যেখানে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু ভাবনার দর্শনের একটি ছবি আমরা দেখতে পাই। যে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের জীবন এবং মৃত্যু নিয়ে ভাবনার একটি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ উপলব্ধির পরিচয় পাই, তা আমাদেরকে একটি অনির্বচনীয় জীবনবোধের দিকে ধাবিত করে।
সেই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—
“যদি মৃত্যু না থাকত তা হলে আপনার দীনহীন অস্তিত্বের মধ্যেই সুকঠিন ভাবে বদ্ধ থাকতুম;
মানবাত্মার সর্বাপেক্ষা মহৎ যা তা কবিতার দান, পরলোক এবং দেবলোক, যা আমাদের ধর্মবুদ্ধি এবং সৌন্দর্যবোধের প্রধান পরিতৃপ্তির দান, তার আমরা আভাস বা উদ্দেশ্য পেতুম না। তা ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব, মাঝে মাঝে যদি লোপ না পেত তা হলে বিভীষিকাময় কুৎসিত হয়ে উঠত। একদিকে পরিষ্কার definiteness আর এক দিকে অসীম suggestiveness–এই দুইয়ে মিলে যথারীতি সৌন্দর্য গঠিত হয়। মৃত্যুরূপেই যেমন আমাদের জীবনকে এক দিকে সীমাবদ্ধ করে, তেমনি সেই মৃত্যুতেই আমাদের আর-এক দিকে সীমামুক্ত করে দেয়। ব্যক্তিগত হিসাবে দেখতে গেলে মৃত্যুটা উৎকট এবং তার মধ্যে কোনো সান্ত্বনা নেই। কিন্তু বিশ্বজগতের হিসাবে দেখতে গেলে মৃত্যুটা অতি সুন্দর এবং মানবাত্মার যথার্থ সান্ত্বনা।”
চার
যৌবনেই কেন মৃত্যুচিন্তা রবীন্দ্রনাথের দর্শনে কাব্যে চিত্রিত, প্রকাশিত, বর্ণিত, রূপায়িত বা বিধৃত হলো? এর উত্তর পাওয়া যায় কবির জীবনে মৃত্যুর প্রত্যক্ষতাগুলো দেখলেই। যৌবনেই অনেকগুলো মৃত্যু কবিকে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। বৌঠান কাদম্বরী দেবী, স্ত্রী, কন্যা, কনিষ্ঠ পুত্র ও পিতার মৃত্যু। এসব মৃত্যু কবির চিন্তার জগতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। কবির যৌবনে যে মৃত্যু সবচেয়ে গভীর প্রভাব ফেলে সেটা তার বৌঠান কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু। সে মৃত্যুর সাল ১৮৮৪, কবির বয়স ২৩ বছর। রবীন্দ্রনাথ তখন নববিবাহিত। জীবনস্মৃতিতে কবি সে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছেন, মৃত্যু যে এত কঠিন ভয়ংকর এর আগে কখনও বুঝতে পারেননি। কিন্তু সে মৃত্যুর শোক কবি কাটিয়ে উঠেছিলেন। তারপর থেকে নানান লেখা চলছে, বই প্রকাশ হচ্ছে, খ্যাতি বাড়ছে, জমিদারি দেখাশোনা, ব্যবসা ইত্যাদি নিয়ে জীবন অবিরাম ব্যস্ততার মধ্যে চলছিল। ঠিক তখন তার কাব্য গ্রন্থ আসে ‘সোনার তরী’। সোনার তরী প্রকাশিত হয় ১৮৯৪ সালে। সোনার তরী তার একটা সাধারণ কাব্যগ্রন্থ নয়। রবীন্দ্র সাহিত্যের বহুল আলোচিত কাব্যগ্রন্থ, এটা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের একটা বাঁক বলা হয়ে থাকে। সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের একটি দীর্ঘ কবিতা ‘বসুন্ধরা’। বসুন্ধরা কবিতার কিছু অংশে কবির মৃত্যু চিন্তা, স্মৃতিকাতরতা এত প্রকটভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, তা আমাদেরকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর ভাবনার সাথে গভীরভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়। সমস্ত কবিতার নানা জায়গায় চলে যাবার চিন্তার আবেগী প্রকাশ, পৃথিবীর কোলে নিজেকে সমর্পণের করুণাঘন নিবেদন–এসবের মধ্যে মূলত তার মৃত্যুচিন্তা, মৃত্যুভাবনা অভিব্যক্ত হয়েছে। ১৮৯৩ সালে লেখা কবিতার অংশবিশেষ নিচে উল্লিখিত হলো।
“আমারে ফিরায়ে লহো অয়ি বসুন্ধরে,
কোলের সন্তানে তব কোলের ভিতরে
বিপুল অঞ্চলতলে। ওগো মা মৃন্ময়ী,
তোমার মৃত্তিকা মাঝে ব্যাপ্ত হয়ে রই;
দিক্বিদিকে আপনারে দিই বিস্তারিয়া
বসন্তের আনন্দের মত;”
আবার একই কবিতার শেষের দিকের অংশে দেখা যায়, কবি এই অনন্ত চরাচরে থাকবেন না–এটা ভেবে হাহাকার জেগে উঠছে। হাহাকার এই ভেবে–তিনি থাকবেন না অথচ সব থাকবে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন–
“…আজ শতবর্ষ পরে
এ সুন্দর পল্লবের স্তরে
কাঁপিবে না আামার পরাণ? ঘরে ঘরে
কতশত নরনারী চিরকাল ধরে’
পাতিবে সংসার খেলা তাহাদের প্রেমে
কিছুতে কি রব না আমি? আসিব না নেমে
তাদের মুখের পরে হাসির মতন,
তাদের সর্বাঙ্গমাঝে সরস যৌবন,
তাদের বসন্ত দিনে অকস্মাৎ সুখ,
তাদের মনের কোণে নবীন উন্মুখ
প্রেমের অঙ্কুররূপে? ছেড়ে দিবে তুমি
আমারে কি একেবারে ওগো মাতৃভূমি,
যুগযুগান্তরের মহা মৃত্তিকা বন্ধন
সহসা কি ছিঁড়ে যাবে? করিব গমন
ছাড়ি লক্ষ বরষের স্নিগ্ধ ক্রোড় খানি?”
পাঁচ
১৯২৬ সাল। রবীন্দ্রনাথ ইউরোপ ভ্রমণে বের হন। সেবার ইতালি, সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি ভ্রমণ করেন। ইউরোপ ভ্রমণ শেষে ভারতের পথে যখন সুয়েজ খাল অতিক্রম করছিলেন, তখনই বন্ধু শচ মজুমদারের পুত্র, পুত্রসম সন্তোষ মজুমদারের মৃত্যু সংবাদ পান। সন্তোষ মজুমদারের মৃত্যু কবির অন্তরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। রবীন্দ্রনাথের চিত্ত ও জীবনভাবনা গভীরভাবে আলোড়িত হয়। সে আলোড়ন বৌঠান কাদম্বরী দেবী, স্ত্রী, কন্যা, কনিষ্ঠ পূত্র এবং পিতার মৃত্যু যেমন কবিকে বেদনার সাগরে ভাসিয়েছিল, ঠিক তেমনি সন্তোষের মৃত্যু। এই বেদনা কবিকে মৃত্যু সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবায়। গ্রিস হয়ে দেশের উদ্দেশে যাত্রায় তার যে পত্রধারা ‘পথে ও পথের প্রান্তে’ তার তৃতীয় পত্রে লিখেছেন–
“কাল সুয়েজে এসে খবর পেলুম সন্তোষ মারা ‘গেছে। মৃত্যুকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যে এত কঠিন তার কারণ অন্যের জীবনের সঙ্গে আমাদের জীবন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। আমি আছি অথচ আর যে একজন আমার সঙ্গে এমন একান্ত মিলিত ছিল সে একেবারেই নেই, এমন বিরুদ্ধ কথা ঠিকমত মনে করাই শক্ত।”
আবার ‘পথে ও পথের প্রান্তে’র চতুর্থ পত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “মৃত্যুর কথাটা মন থেকে কিছুতে যাচ্ছে না। আমাদের আপন সংসারের প্রত্যেককে নিয়ে বিশেষ কোনো-না-কোনো আমিই বিস্তৃত হয়ে আছি–কোথাও গভীর কোথাও অগভীর ভাবে। সে সবটা নিয়েই আমার জীবন। বিশ্বজগতে আমার প্রায় কিছুতেই উদাসীন্য নেই। তার মানে আমি খুব ব্যাপকভাবে বেঁচে আছি। কিন্তু যত ব্যাপ্তি তত তার আনন্দও যেমন দুঃখও তেমনি। প্রাণের পরিধি যেখানে প্রসারিত মৃত্যুর বাণ সেখানে নানা জায়গায় এসে বিদ্ধ হবার জায়গা পায়। জীবনের সত্য সাধনা হচ্ছে অমরতার সাধনা, অর্থাৎ এমন কিছুতে বাঁচা যা মৃত্যুর অতীত।”
ছয়
রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ, শরীরে বায়ু পরিবর্তনের নির্দেশ হয়। সালটা ১৯৩৮, কবির বয়স তখন ৭৭। কবি বিশ্রামের জন্য ১৯৩৮ সালের ২৫ এপ্রিল শিলিগুড়ি থেকে ৫০ মাইল দূরে কালিম্পং যাত্রা করেন। সেখানে নানা কথাবার্তা, ছোটখাটো লেখার কাজেই কবির সময় কাটে। সেখান থেকে মৈত্রেয়ী দেবীর আমন্ত্রণে মংপুতে যান ২১ মে। মৈত্রেয়ী দেবী ছিলেন অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের কন্যা। ডাক্তার স্বামীর কর্মসূত্রে মংপুতে তাদের থাকতে হয়। মংপুতে বাসকালে কিছু কবিতা লেখেন কবি–সেগুলো আছে ‘সেঁজুতি’, ‘নবজাতক’ ও ‘সানাই’ কাব্যগ্রন্থে। সেখানে অবস্থানকালে কবি অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের একটি পত্রত্তোরে একটি কবিতা লেখেন তার নামও ‘পত্রত্তোর’। সে কবিতায় আমরা বিশ্বের চিররহস্য মৃত্যু নিয়ে জিজ্ঞাসা ভাবনার প্রকাশ পাই।
কবিতার অংশ বিশেষ নিম্নরূপ–
“কী আছে জানিনা দিন-অবসানে
মৃত্যুর অবশেষে;
এ প্রাণের ছায়া
শেষ আলো দিয়ে ফেলিবে কি রঙ অস্তরবির দেশে
রচিবে কি কোনো মায়া।”
রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুকে জয়ের কথা বারবার বলেছেন কবিতায়-গানে-প্রবন্ধে। যৌবনের প্রারম্ভেও কবিকে মৃত্যু নিয়ে ভাবতে দেখা যায়। জীবনের শেষ প্রান্তে যখন কবির ভাবনায় আসে, যাবার বেলা এল নিকটে, সাঙ্গ হবে জীবনের এই হাসি খেলা। দূরের পারের যাত্রীর মতো সূদুরের আহ্বানে সাড়া দেবার প্রস্তুতির সুর কবির নানা কবিতায় আমরা দেখতে পাই। ‘নবজাতক’ কাব্যের ‘জবাবদিহি’ কবিতায় আমরা সেই সুদূরের আহ্বান, পাড়ের যাত্রার ডাকের ছবিই দেখতে পাই–যেখানে দেখতে পাই জীবন-মৃত্যু নিয়ে গভীর জীবন জিজ্ঞাসা। ‘জবাবদিহি’ কবিতায় কবি লিখলেন–
“সকাল বেলা বেড়াই খুঁজি খুঁজি
কোথা সে মোর গেল রঙের ডালা,
কালো এসে আজ লাগালো বুঝি
শেষ প্রহরে রঙহরণের পালা।
ওরে কবি, ভয় কিছু নেই তোর–
কালো রঙ যে সকল রঙের চোর।
জানি যে ওর বক্ষে রাখে তুলি
হারিয়ে যাওয়া পূর্ণিমা-ফাল্গুনী-
অস্তরবির রঙের কালো ঝুলি,
রসের শাস্ত্রে এই কথা কয় শুনি।
অন্ধকারে অজানা-সন্ধানে
অচিন লোকে সীমাবিহীন রাতে
রঙের তৃষ্ণা বহন করি প্রাণে
চলা তখন তারার ইশারাতে,
হয়তো তখন শেষ-বয়সের কালো
করবে বাহির আপন গ্রন্থি খুলি
যৌবন দীপ জাগাবে তার আলো
ঘুমভাঙা সব রাঙা প্রহরগুলি।
কালো তখন রঙের দীপালীতে
সুর লাগাবে বিস্মৃত সঙ্গীতে।”
সাত
বিশ্বের ব্যাকরণিক বিধি–জীবন-মৃত্যু। এর ব্যত্যয় নেই। এই মুহূর্তে যে সবচেয়ে আপন বলে আছে, পরমুহূর্তেই সে কোথাও নেই। কোনোভাবেই কেনোমতেই কোথাও আর তাকে পাওয়া যাবে না। মৃত্যুই এটা ঘটিয়ে দেয় এক মুহূর্তে। জীবনের প্রথম বা দ্বিতীয় অধ্যায়ে মৃত্যু নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে তার সেই সময়ের নানা কাব্যে বা লেখায়। কিন্তু জীবন সায়াহ্নে এসে সে ভাবনাগুলো আরও গভীর হয় বিচিত্র রূপকে। হারানোর বেদনা, চলে যাবার শূণ্যতা শেষকালের লেখার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে গভীর ব্যঞ্জনায়, অনেক সময় ভয়ংকরতা নিয়ে। ১৯৪০ সালের কিছু লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয় কবির ‘শেষ লেখা’ কাব্যগ্রন্থ। সেখানকার কাব্যগুলোতে মৃত্যু নিয়ে কবির গভীর হাহাকার, শূন্যতা এবং ভয়ংকরতার প্রকাশ। সে সকল মৃত্যুভাবনার কাব্যরস আমাদেরকে দেয় এক অনির্বচনীয় হাহাকার, বেদনা, শূণ্যতার স্বাদ। ‘শেষ লেখা’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতায় মৃত্যু যে কী ভয়ংকর রূপ নিয়ে আমাদের কাছে দেখা দেয়, তার ছবি কবি আঁকলেন একই সাথে জীবনের জয়গান।
“রাহুর মতন মৃত্যু
শুধু ফেলে ছায়া,
পারে না করিতে গ্রাস জীবনের স্বর্গীয় অমৃত
জড়ের কবলে
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
প্রেমের অসীম মূল্য
সম্পূর্ণ গ্রাস করি লবে
হেন দস্যু নাই গুপ্ত
নিখিলের গুহাগহ্বরেতে
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
সবচেয়ে সত্য করে পেয়েছিনু যারে
সবচেয়ে মিথ্যা ছিল তারি মাঝে ছদ্মবেশ ধরি,
অস্তিত্বের এ কলঙ্ক কভু
সহিত না বিশ্বের বিধান
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
সবকিছু চলিয়াছে নিরন্তর পরিবর্তবেগে
সেই তো কালের ধর্ম।
মৃত্যু দেখা দেয় একান্তই অপরিবর্তনে
এ বিশ্বে তাই সে সত্য নয়
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
বিশ্বেরে যে জেনেছিল আছে বলে
সেই তার আমি
অস্তিত্বের স্বাক্ষী সেই,
পরম আমির সত্যে সত্য তার
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।”
আট
১৯২৬ সাল। রবীন্দ্রনাথের ৬৫তম জন্মদিন সমাগত। শান্তিনিকেতনে কবির জন্মোৎসব হয় নিয়মিত। সে বছরেও বৈশাখের শুরু থেকেই উৎসব আয়োজনে ব্যস্ত শান্তিনিকেতন। ওই বছরের জন্মদিনে ইতালি, চীন, গ্রিস ইত্যাদি নানা দেশের অতিথি ছিলেন। কিন্তু সেই জন্মদিনে কবির মনে অন্য ভাব। জন্মদিনের উৎসবের মাঝে কবির মনে কি এই ভাবনাই আসছিল যে, আমাকে তো যেতে হবে। সেদিন কবি লিখলেন–
‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থের ‘দিনাবসান’ কবিতা। ‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থের সেই কবিতায় আমরা কোন বেদনার আভাস পেলাম–
“বাঁশি যখন থামবে ঘরে
নিববে দীপের শিখা,
এই জীবনের লীলার ‘পরে
পড়বে যবনিকা,
সেদিন যেন কবির তরে
ভিড় না জমে সভার ঘরে,
হয় না যেন উচ্চস্বরে
শোকের সমারোহ।”
কবির আকাঙ্ক্ষা মানুষের কোলাহলের চেয়ে প্রকৃতির মাঝে বিলীন হয়ে যাওয়া। এই কবিতায় কবি আরও লিখলেন–
“আমার স্মৃতি থাক্ না গাঁথা
আমার গীতি-মাঝে
যেখানে ওই ঝাউয়ের পাতা
মর্মরিয়া বাজে।”
‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থের আরও একটি কবিতায় আমরা প্রায় একই ধরনের বেদনার বাঁশি বেজে উঠতে দেখি। কবিতাটি ‘বর্ষশেষ’। এই কবিতাটি তিনি লেখেন তার জন্মমাস বৈশাখ শুরুর ঠিক আগের দিন, ৩০ চৈত্র। শান্তি নিকেতনে জন্মোৎসবের প্রস্তুতির আভাস পেয়েই কি কবির মনে সেই একই বেদনার বাঁশি বেজে ওঠে? জন্মোৎসবের প্রস্তুতির শুরুতেই কবির মনে এ কী সুর বাজছে?
“যাত্রা হয়ে আসে সারা, আয়ুর পশ্চিমপথশেষে
ঘনায় মৃত্যুর ছায়া এসে।
অস্তসূর্য আপনার দাক্ষিণ্যের শেষ বন্ধ টুটি
ছাড়ায় ঐশ্বর্য তার ভরি দুই মুঠি।
বর্ণসমারোহে দীপ্ত মরণের দিগন্তের সীমা,
জীবনের হেরিনু মহিমা।
এই শেষ কথা নিয়ে বিশ্বাস আমার যাবে থামি,–
কত ভালোবেসেছিনু আমি।
অনন্ত রহস্য তারি উচ্ছলি আপন চারিধার
জীবন মৃত্যুরে করি দিল একাকার;
বেদনার পাত্র মোর বারম্বার দিবসে নিশীথে
ভরি দিল অপূর্ব অমৃতে।
দুঃখের দুর্গম পথে তীর্থযাত্রা করেছি একাকী,
হানিয়াছে দারুণ বৈশাখী।
কতদিন সঙ্গীহীন, কত রাত্রি দীপালোকহারা,
তারি মাঝে অন্তরেতে পেয়েছি ইশারা।
নিন্দার কণ্টকমাল্যে বক্ষে বিঁধিয়াছে বারে বারে,
বরমাল্য জানিয়াছি তারে।
…
আজি এই বৎসরের বিদায়ের শেষ আয়োজন,
মৃত্যু, তুমি ঘুচাও গুণ্ঠন।
কত কী গিয়েছে ঝরে, জানি জানি কত স্নেহ প্রীতি
নিবায়ে গিয়েছে দীপ রাখে নাই স্মৃতি।
মৃত্যু, তব হাত পূর্ণ জীবনের মৃত্যুহীন ক্ষণে,
ওগো শেষ অশেষের ধনে।”
এ কি মৃত্যুকে বন্ধুবেশে আলিঙ্গনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা, নাকি মৃত্যু বিলাস?
নয়
রবীন্দ্রনাথের উচ্চারিত কথা ‘মৃত্যুকে করিবে তুচ্ছ প্রাণের উৎসাহ’। কোনোভাবেই মৃত্যুর কাছে পরাজয় নয়। কবি বারবারই বলছেন জোর দিয়ে যে, মৃত্যু জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। মৃত্যু জীবনেরই অংশ। জীবনকে বড় করে দেখতে গেলে মৃত্যুর বৃহৎ জানালা দিয়েই দেখতে হবে। অথচ কবির মধ্যে এই বিশ্বচরাচর ছেড়ে না যাবার বাসনা যে প্রবল। প্রবল আবেগ বলছে যাব অথচ যাব না। ভুলে যাবে অথচ ভুলে যেও না। মনে রেখো না অথচ মন বলছে মনে রেখো। বিলীন হয়ে যাবে, মুছে যাবে অথচ কবি বলছেন আমি থাকতে চাই। কয়েকটি কবিতা লক্ষ্য করলে আমরা কবির সেই অসীম আকুতি, বেদনা, শূন্যতা এবং হাহাকার বুঝতে পারি। ‘সানাই’ রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের একটি কাব্যগ্রন্থ। সানাই কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা ‘অবসান’। ১৯৪০ সালের ১৯ জুলাই অর্থাৎ মৃত্যুর এক বছর আগে কবিতাটি তিনি লেখেন। কবি কি আসন্ন জীবনাবসান নিয়ে খুবই ভাবিত ছিলেন অথবা জীবনের সূর্যাস্ত যে সন্নিকটে তা কি বুঝতে পারছিলেন? ‘অবসান’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন–
“জানি দিন অবসান হবে,
জানি তবু বাকি রবে।
রজনীতে ঘুমহারা পাখি
একসুরে গাহিবে একাকী–
যে শুনিবে, যে রহিবে জাগি
সে জানিবে, তারি নিড়হারা
স্বপন খুঁজিছে সেই তারা
যেথা প্রাণ হয়েছে বিবাগী।
কিছু পরে করে যাবে চুপ
ছায়ঘন স্বপনের রূপ।
ঝরে যাবে আকাশকুসুম,
তখন কুজনহীন ঘুম
এক হবে রাত্রির সাথে।
যে-গান স্বপনে নিল বাসা
তার ক্ষীণ গুঞ্জন-ভাষা
শেষ হবে সব-শেষ রাতে।”
আবার ১৯৪০ সালের শেষে; অর্থাৎ, মৃত্যুর আট মাস আগে লেখা একটি কবিতার মধ্যে দেখতে পাই একই সঙ্গে মৃত্যুর ভয় এবং মৃত্যুকে আলিঙ্গনের আকাঙ্ক্ষা বা প্রস্তুতি। কবিতাটি ‘রোগ শয্যায়’ কাব্যগ্রন্থের ৩৭ সংখ্যক কবিতা। কবিতাটি লিখেছেন ৪ ডিসেম্বর।
“ধূসর গোধূলিলগ্নে সহসা দেখিনু একদিন
মৃত্যুর দক্ষিণবাহু জীবনের কণ্ঠে বিজরিত,
রক্ত সূত্রগাছি দিয়ে বাঁধা;
চিনিলাম তখনি দোঁহারে।
দেখিলাম নিতেছে যৌতুক
বরের চরম দান মরণের বধূ;
দক্ষিণবাহুতে বহি চলিয়াছে যুগান্তের পানে।”
এই কবিতা আমাদেরকে জীবন-মৃত্যু নিয়ে কী ইঙ্গিত দেয়? বিশ্বচরাচরে আমরা যেন কোনো এক প্রহেলিকার মধ্যে পড়ে যাই।
কিন্তু ১৯৪১ সালে মৃত্যুর মাত্র ছয় মাস আগের কথা। কবির শরীর ভেঙে পড়েছে। অথচ তখনকার একটি কবিতার মধ্যে কবির বিদায়ের আনন্দই যেন দেখা যায়। ধরনীর সঙ্গে বন্ধন অটুট যেন থাকে মৃত্যুর পরও এই আকাঙ্ক্ষা, যেন কোনো কিছুই ক্ষয়ে যাবে না, বিলোপ হবে না। হাহাকারের মধ্যে মূল সুর যেন ধরনীকে ভালোবাসায় অসীম আনন্দ, যার কোনো ক্ষয় নাই। ১৯৪১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি লেখা কবিতাটি ‘আরোগ্য’ কাব্য গ্রন্থের প্রথম কবিতা।
“এ দ্যূলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি,
অন্তরে নিয়েছি আমি তুলি
এই মহামন্ত্রখানি,
চরিতার্থ জীবনের বাণী।
দিনে দিনে পেয়েছিনু সত্যের যা-কিছু উপহার
মধুরসে ক্ষয় নাই তার।
তাই এই মন্ত্রবাণী মৃত্যুর শেষের প্রান্তে বাজে–
সবক্ষতি মিথ্যা করি অনন্তের আনন্দ বিরাজে।
শেষ স্পর্শ নিয়ে যাব যবে ধরণীর
বলে যাব, তোমার ধুলির
তিলক পরেছি ভালে,
দেখেছি নিত্যের জ্যোতি দুর্যোগের মায়ার আড়ালে।
সত্যের আনন্দরূপ এ ধুলিতে নিয়েছে মুরতি,
এই জেনে এ ধুলায় রাখিনু প্রণতি।”
দশ
জীবনের জয়গানই ছিল রবীন্দ্রনাথের সকল কর্ম, সকল চিন্তা, সকল গান, সকল দর্শনের সারকথা। তিনি জীবনের জয়গান গাইতে গিয়ে মৃত্যুকে অস্বীকার করেছেন। তিনি বললেন মৃত্যু সত্য নয়, মৃত্যু জীবনকে গ্রাস করতে পারবে না। মৃত্যু স্থির, মৃত্যু অপরিবর্তনীয় কিন্তু জীবন চলমান, জীবন সদা বিকাশমান, জীবন নব নব রূপে এই চরাচরে প্রকাশমান বারে বারে। এই আমরা জানি রবীন্দ্রনাথের জীবনভাবনা।
কিন্তু এই জীবন ভাবনার বাইরেও বারবার মৃত্যুর কালো ছায়া কবিকে যেন দেখা দিয়েছে ঘোমটার আড়ালে। যৌবনে মৃত্যুর যে রূপ কবির মনে ধরা দিয়েছে বা মৃত্যুর যে ছবি আঁকা হয়েছে তার সাথে জীবনে অস্তলগ্নের ছবির বা রূপের মূলগত প্রভেদ আছে বলে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। জীবনের একদম শেষ প্রান্তে এসে কবির শরীর যখন ক্ষয়িষ্ণু, কর্মও সীমিত হয়ে পড়েছে, রোগশয্যায় অসীম অলস সময়ের ক্লান্তিকর বোঝা—এসব মৃত্যু চিন্তার এক বিশেষ রূপ বা ধরণ দিয়েছে বলে মনে করতে পারি।
অসুস্থ শরীরে যে সকল কাব্যগ্রন্থ লেখা বা প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যেই অনেক সংখ্যক কবিতায় আমরা এ ধরনের মৃত্যুর রূপ আঁকা দেখতে পাই বা নানা রূপের ভাবনা, হাহাকার, শূণ্যতার বেদনার সুর বাজতে দেখি। রোগশয্যায় মূলত যেসব কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সানাই, পরিশেষ, আরোগ্য, রোগশয্যায়, নবজাতক, ছড়ার ছবি, শেষ লেখা ইত্যাদি। ‘নবজাতক’ কাব্য গ্রন্থের একটি কবিতা ‘শেষ কথা’ এখানে এই আলোচনায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমাদের আলোচনার মূলভাবটা অনুধাবনের জন্য কবিতাটি নিচে দেয়া গেল—
“এ ঘরে ফুরোলো খেলা,
এল দ্বার রুধিবার বেলা।
বিলয়বিলীন দিনশেষে
ফিরিয়া দাঁড়াও এসে
যে ছিল গোপনচর
জীবনের অন্তরতর।
ক্ষণিক মূহুর্ত তরে চরম আলোকে
দেখে নিই স্বপ্নভাঙ্গা চোখে;
চিনে নিই, এ লীলার শেষ পরিচয়ে
কী তুমি ফেলিয়া গেলে, কী রাখিলে অন্তীম সঞ্চয়ে।
কাছের দেখায় দেখা পূর্ণ হয় নাই,
মনে–মনে ভাবি তাই–
বিচ্ছেদের দূরদিগন্তের ভূমিকায়
পরিপূর্ণ দেখা দিবে অস্তরবিরস্মির রেখায়।
জানি না, বুঝিব কিনা প্রলয়ের সীমায় সীমায়
শুভ্রে আর কালিমায়
কেন এই আসা আর যাওয়া,
কেন হারবার লাগি এতখানি পাওয়া।
জানি না, এ আজিকার মুছে-ফেলা ছবি
আবার নূতন রঙে আঁকিবে কি তুমি, শিল্পীকবি।”
এগারো
কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ জীবনের পরম হিতৈষী ছিলেন আর্জেন্টিনার নারী কবি, সাহিত্যিক ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। ১৯২৪ সালের নভেম্বরে পেরু যাবার পথে রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ হয়ে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসের ‘প্লাসা’ নামের এক হোটেলে ওঠেন। খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে দেখা করেন তার লেখার অনুরাগী ওকাম্পো। তিনি রবীন্দ্রনাথকে বুয়েনস আইরেস থেকে একটু দূরে সান ইসিদ্রোতে তার নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। রবীন্দ্রনাথ ১৯২৫ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় দুই মাস ওকাম্পোর সান ইসিদ্রোতের ‘মিরালরিও’-তে, অতিথি হয়ে ছিলেন। কবির সাথে ছিলেন বন্ধু-সচিব লেনার্ড এল্মহার্স্ট। কবির জীবনের অত্যন্ত গভীর স্মৃতিময় সে সময়টা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল নানা আলোচনা, নানা রচনার জন্যে। তখন নববর্ষের দিনে কবি সুহৃদ এল্মহার্স্টের এক প্রশ্নের জবাবে মৃত্যু নিয়ে এক গুঢ় দার্শনিক তত্ত্ব আমাদের জন্য রেখে গিয়েছিলেন। এল্মহার্স্টের প্রশ্নের উত্তরে কবি বলেছিলেন—
“মৃত্যু হয়তো আরও কোনো নবায়নের আগের নিদ্রা চেয়ে বেশি কিছু নাও হতে পারে।…কিন্তু অমরত্ব কেবল মৃত্যুকে অস্বীকার করা নয়। এটা বরং এমন এক প্রক্রিয়া যা অগুনতি মৃত্যুর ভিতর দিয়ে পার হয়ে জীবনকে এক ধরনের সঙ্গীতময় ছন্দ ও লয়, এক ধরনের ধারা দেয়। চিরকাল বেঁচে থাকতে হলে আমাদের অবশ্যই মৃত্যুর চক্রের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। আমাদের জন্য সবসময়ই বর্তমান ও আগামী জগতে এক ধরনের ছন্দ, এক ধরনের তাল, এক ধরনের সাময়িক নববর্ষের দিন থাকবে।”
লেখক: রবীন্দ্র গবেষক