ভিজ্যুয়াল সাংবাদিক হিসেবে চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান সরাসরি প্রত্যক্ষ করাকে পেশাগত জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন মনে করি। প্রায় বিশ বছরের সাংবাদিকতা জীবনকে এক ধরনের পরিপূর্ণতা দিয়েছে এই ঘটনা।
দেশে গণঅভ্যুত্থান আগেও ঘটেছে। চব্বিশের আগে সেই নব্বইয়ের দশকে। তখন আমি শিশু। সেসময়ের কোনো স্মৃতিও আমার নেই। এবারই প্রথম বুঝলাম, জানলাম, দেখলাম গণঅভ্যুত্থান কেমন হয়! রক্তনদী পেরিয়ে মানুষ কীভাবে তার বিজয় ছিনিয়ে আনে, রাজপথে দাঁড়িয়ে তা সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতা অতুলনীয়।
ডায়েরি লেখার অভ্যাস আমার অনেক পুরোনো। অভ্যুত্থানের সময়ে যা দেখেছি, তার অনেককিছুই ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলাম। সেখান থেকে জুলাই অভ্যুত্থানের শেষ সাত দিনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এই লেখায় তুলে ধরলাম।
৩০ জুলাই ২০২৪
ছাত্র আন্দোলন ২০২৪ ঘিরে নিহতদের জন্য আজ রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে শেখ হাসিনা সরকার। কিন্তু সাধারণ মানুষ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ফেসবুকে অসংখ্য মানুষ নিজেদের প্রোফাইল পিকচারে লাল ইমেজ ব্যবহার করেছে—বলা হচ্ছে, শোকের রঙ লাল। গতকাল শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সভা হয়েছে। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে—জামায়াত ও শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হবে। যখন করার কথা, তখন কিন্তু করা হয়নি। ২৭ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বলেছে, এখন পর্যন্ত ২৬৬ জন নিহত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তাদের কাছে ১৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য আছে। এর মধ্যে পুলিশ সদস্য ও আওয়ামী লীগ কর্মীও রয়েছে।
সেতু ভবনের সামনে থাকা একাধিক পোড়া গাড়ি। ৩০ জুলাই ২০২৪। ছবি: সুদীপ্ত সালাম
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিল একটি সংবাদ। সারাদিন শহর ঘুরে যখন বাসায় ফিরলাম, ঠিক তখনই আব্বার ফোন। জানালেন, আমার বড় ভাই আবুল কালাম আজাদকে বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে শাহজাহানপুর থানা পুলিশ। আমি তখন গায়ের কাপড়ও ছাড়িনি। বেরিয়ে যেতে হলো। থানার দিকে যেতে যেতে যা জানলাম তা হলো, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মালিবাগে সংঘটিত সংঘর্ষে জড়িত থাকার অভিযোগে ভাইকে আটক করা হয়েছে। ভাই করে প্লেনের টিকিট বিক্রির ব্যবসা। রাজনীতির সঙ্গে ওর কোনো সম্পর্কই নেই। তাকেই কিনা বিএনপির কর্মী বানিয়ে নাশকতার মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে! মামলা পোক্ত করতে বিএনপির জলছাপ দেওয়া প্যাডে তার নাম ঢুকিয়ে তাকে বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে।
থানায় যেতেই ওসি সাহেব আমাকে সেই প্যাড দেখালেন। আমি তাকে নিশ্চিত করলাম, আমার ভাই বিএনপির রাজনীতির কখনো কখনোই জড়িত ছিল না। তাকে ভাইয়ের ট্র্যাক রেকর্ড দেখতে অনুরোধ করলাম। বললাম, চাইলে তিনি এলাকার মানুষকেও জিজ্ঞাসা করতে পারেন। একটু পর এলাকার মান্যগণ্য ব্যক্তিরাও থানায় হাজির হয়ে ওসি সাহেবকে অনুরোধ করলে আমার ভাইকে ছেড়ে দিতে। তাদের মতেও, ভাই কোনো রাজনীতি করেন না। ওসি সাহেব বলতে চাইলেন, তার হাত বাঁধা।
আমি নানা জায়গায়, নানা জনকে ফোন করতে শুরু করলাম। বেশিরভাগ লোকজন বললেন, এই অস্থির সময়ে সাহায্য করা কঠিন। তারপরও কেউ কেউ সাহায্য করলেন। অবেশষ গভীর রাতে আমাকে ডেকে ওসি সাহেব ভাইকে আমার হাতে তুলে দিলেন। ভাইকে ছাড়াতে প্রধানত কাজ করেছিল আমি যেখানে কাজ করি, সেই মার্কিন প্রতিষ্ঠান।
৩১ জুলাই ২০২৪
হাইকোর্টের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিজিবি সদস্যদের সতর্ক অবস্থান। ৩১ জুলাই ২০২৪। ছবি: সুদীপ্ত সালাম
১৩ দিন পর ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ খুলে দেওয়া হয়েছে। ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। সারা দেশে আদালত এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে সর্বস্তরের মানুষ। হাইকোর্টের সামনে (শিক্ষা ভবনের দিকে) গিয়ে দেখি শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিচ্ছে, গান গাইছে। পুরো এলাকা পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ঘিরে রেখেছে।
০১ আগস্ট ২০২৪
সকালে বাসা থেকে বের হয়ে আবুল হোটেলের উল্টো দিকের সড়ক ধরলাম। এই সড়কেই পড়ে আনসারদের মাঠ ক্যাম্প। আরেকটু এগোতেই তিন রাস্তার মোড়ে দেখি আনসার সদস্যরা বাংকার বানিয়ে, রাইফেল উঁচিয়ে সতর্ক অবস্থানে। ছবি তুলতে গেলে একজন সদস্য বাধা দিলেন। পরে বিদেশে গণমাধ্যমের দোহাই দিয়ে ছবি তুলতে পারলাম। তারপর খিলগাঁও ফ্লাইওভার হয়ে চলে গেলাম পুরানা পল্টন এলাকায়। আগের মতো পুরো শহরে থমথমে অবস্থা।
খিলগাঁও এলাকায় বাংকার বানিয়ে, রাইফেল নিয়ে আনসার সদস্যদের অবস্থান। ১ আগস্ট ২০২৪। ছবি: সুদীপ্ত সালাম
সারা দেশে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। আর পালিত হয়েছে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’ কর্মসূচি। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী এবং শিবিরসহ তাদের সকল অঙ্গসংগঠনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নির্বাহী আদেশে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলো।
০২ আগস্ট ২০২৪
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে আড়াই শতাধিক মানুষের নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে এবং হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে আজ বাংলামোটর এলাকায় ‘বিক্ষুদ্ধ কবি-লেখক সমাজ’-এর ব্যানারে মানবন্ধনের আয়োজন করা হয়। আমি সেখানে ছিলাম। আমি আমার বক্তব্যে প্রশ্ন তুলি, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনাকে কেন দায়ী করা হবে না?
ছাত্র-জনতা হত্যার বিচারের দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে শুরু হয় ‘দ্রোহযাত্রা’। ২ আগস্ট ২০২৪। ছবি: সুদীপ্ত সালাম
বেলা তিনটার পর জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে বিশাল মিছিল বের হয়। কর্মসূচির নামে দেওয়া হয়েছিল ‘দ্রোহযাত্রা’। মিছিল থেকে হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি চাওয়া হয়। ওদিকে প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন নাকি আলোচনার জন্য ‘তার দরজা খোলা’!
৩ আগস্ট ২০২৪
আজ বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে এক দফা দাবি তোলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এখন শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগই তাদের একমাত্র চাওয়া। এই ঘটনার পর আওয়ামী লীগ আগামীকাল তাদের নেতাকর্মীদের রাজপথে নামার নির্দেশ দিয়েছে। ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন করার আহ্বান জানিয়েছে।
এক দফা দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশ। ৩ আগস্ট ২০২৪। ছবি: সুদীপ্ত সালাম
ঘরেই ছিলাম। খুব প্রয়োজন না হলে বাইরে বের হচ্ছি না। কিন্তু মনটা পড়ে ছিল শহীদ মিনারে। আর থাকতে না পেরে শৌখিন আলোকচিত্রী মাজেদ ভাইকে নিয়ে রওনা হলাম। নিজের ক্যামেরা সঙ্গে ছিল না। মাজেদ ভাইয়ের ক্যামেরা দিয়েই শহীদ মিনারের এক দফার সমাবেশের ছবিগুলো তুললাম।
৪ আগস্ট ২০২৪
সারা দেশে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। রাত ১০টা পর্যন্ত আসা খবর অনুযায়ী, ৯৩ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছে।
আমি সকালে প্রথম যাই জাতীয় প্রেসক্লাবের দিকে। তারপর সেখান থেকে যাই শাহবাগ এলাকায়। গিয়ে দেখি, ছাত্র-জনতার ভিড়। কারও হাতে প্লাকার্ড, কারও হাতে লাটিসোটা, কারও হাতে জাতীয় পতাকা। দেখলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (অভ্যুত্থানের পর নাম বদলে হয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলি উঠছে। অনেক কষ্টে ভেতরে গিয়ে দেখি, একাধিক যানবহনে আগুন দেওয়া হয়েছে। বিক্ষুদ্ধ ছাত্র-জনতা একটু পরপর আমাদেরও মারতে আসে। তাদের বুঝিয়ে, আশ্বস্ত করে কাজ করতে হয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ। ৪ আগস্ট ২০২৪। ছবি: সুদীপ্ত সালাম
সেখান থেকে আবার প্রেসক্লাবের দিকে এসে দেখি, কদম ফোয়ারার পাশের পুলিশ বক্সে আগুন জ্বলছে, শিক্ষা ভবনের দিকে অসংখ্য পুলিশ। প্রেসক্লাবের সামনের সড়কেও আগুন জ্বলছিল। শুনেছি, এই আগুন জ্বালিয়েছিল আওয়ামী লীগের কর্মীরা। পরে তাদের ধাওয়া করে ছাত্র-জনতা।
৫ আগস্ট ২০২৪
ক্যালেন্ডার বলছে, ৫ আগস্ট, ২০২৪। কিন্তু আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলছেন, ‘৩৬শে জুলাই’। তারা বলছেন, খুনি হাসিনার পতন ও বিচার না হওয়া পর্যন্ত রক্তাক্ত জুলাইয়ের শেষ নেই। ৩৬ জুলাই তথা ৫ আগস্ট ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। ৪ আগস্ট আন্দোলনের সমন্বয়করা ছাত্র-জনতাকে সারাদেশ থেকে দলে দলে ঢাকায় আসার আহ্বান জানান। ছাত্র–জনতার চূড়ান্ত গন্তব্য গণভবন।
শেখ হাসিনা সরকারও বসে নেই। এই আন্দোলন দমনে একজন স্বৈরাচারের যে নিপীড়নমূলক ও মানবতাবিরোধী পদক্ষেপ নেয়ার কথা, তার সবই নেয়া হয়– দেশজুড়ে সশস্ত্র সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড, র্যাব, পুলিশ, আনসার সদস্য এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী মোতায়েন, অনির্দিষ্টকালের কারফিউ ও সাধারণ ছুটি ঘোষণা এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া। আমার মতো অনেকেরই ভাসা ভাসা সন্দেহ ছিল—এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কি শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি সফল হবে? কারফিউর মধ্যে কি ঢাকার বাইরে থেকে মানুষ রাজধানীতে আসতে পারবে? ভয়ের দেয়াল কি ভাঙা যাবে?
সকালে বাসা থেকে বের হলাম। ফ্লাইওভার দিয়ে কাকরাইলের দিকে নামতে গিয়ে দেখি, শান্তিনগর মোড় থেকে দুজন তরুণীকে পুলিশ টেনে-হেঁচড়ে তাদের গাড়িতে তুলছে। দুই তরুণী চিৎকার করে বলছেন, ‘আমরা কিছু করিনি, আমাদের যেতে দিন।’ কে শোনে কার কথা! পুলিশ সদস্যরা তাদের তুলে নিয়ে ছুটে চলল—সম্ভবত পল্টন থানার দিকে। আমি কয়েকটি ছবি তুলে এগিয়ে গেলাম পুরানা পল্টনের দিকে। পুরো এলাকা খাঁ খাঁ করছে। সড়কে কয়েকজন সাংবাদিক, সেনা ও বিজিবি সদস্য ছাড়া কেউ নেই। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছিল না। মোটরসাইকেল নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢুকলাম। সেখানেও লোকজন নেই। একজনকে ফোন করে জানলাম, বেলা দুইটার দিকে সেনাপ্রধান ভাষণ দেবেন। ভাষণ দেবেন শুনে আতঙ্কিত হইনি, কেন যেন মনে হলো—ভালো কিছু হতে যাচ্ছে। দেরি না করে ছুটলাম শাহবাগের দিকে।
শাহবাগে এসে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। শাহবাগ মোড় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পদচারণা ও স্লোগানে মুখরিত। নানা দিক থেকে মিছিলের পর মিছিল এসে যোগ দিচ্ছে চৌরাস্তার এই মোহনায়। সমাবেশের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন সেনা সদস্যরা। তারা মূলত শাহবাগ থানার দিকের সড়কটি বন্ধ করে রেখেছিলেন। থানার দিকটায় সুসজ্জিতভাবে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ সদস্যরা। ঢাকা ক্লাবের দিকে একটি এবং শাহবাগ থানার সামনে সেনাবাহিনীর কয়েকটি সাঁজোয়া যান রাখা আছে। স্লোগান চলছে, ‘এক দফা এক দাবি, হাসিনা তুই কবে যাবি’, ‘তোর কোটা তুই নে, আমার ভাই ফেরত দে’, ‘এই মুহূর্তে খবর এল, খুনি হাসিনা পালিয়ে গেল’…।
শেখ হাসিনার পতনের পর রাজু ভাস্কর্যকে ঘিরে মানুষের উল্লাস। ৫ আগস্ট ২০২৪। ছবি: সুদীপ্ত সালাম
আমরা যারা ছবি তুলি বা ভিডিও করি, তারা মানুষের মুখের এক্সপ্রেশনের ভাষা বুঝি। দেখতে পাচ্ছিলাম, আন্দোলনকারীদের ভেতরের আগুন তাদের চোখেমুখে দাউদাউ করে জ্বলছে। এ আগুন সহসাই নিভে যাওয়ার নয়।
দেখতে দেখতে ছাত্র-জনতার সমাবেশ জনসমুদ্রে রূপ নেয়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের বলয়ের পরিসর বাড়াতে বাধ্য হন। তারা আগে ছিলেন মোড়ে, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তাদের পিছু হটে চলে আসতে হয় থানার দিকটায়। সরাতে হয় সাজোঁয়া যানও।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাবেশের আকার বাড়ছে, আরও উত্তাল হচ্ছে। কিন্তু সেনাবাহিনী নির্বিকার। গতকাল যখন আওয়ামী লীগ মরণকামড়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের গায়ে ‘সন্ত্রাসী’ লেবেল লাগিয়ে দিলেন, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ. আরাফাত যখন বললেন, ‘কঠোর হস্তে দমন করা হবে’, তখন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বলেছিলেন, তারা দেশের আইন ও সংবিধান অনুযায়ী কাজ করবেন। তারপর শাহবাগের এই চিত্র দেখে স্বস্তি ফিরল, সেনাবাহিনী অন্তত দমন-পীড়ন করবে না।
পদচারী সেতুর ছাদে, মেট্রোরেল স্টেশন এবং বিলবোর্ডের ওপর উঠে বসেছে অনেকে। তাদের হাতে জাতীয় পতাকা এবং হাতে লেখা ফেস্টুন। একটি ফেস্টুনে লেখা, ‘বাপের কথা অনেক হইছে, পাপের কথা ভাব’। আরেকটিতে লেখা, ‘স্টেপ ডাউন হাসিনা’।
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। শাহবাগের বাইরে কী হচ্ছে, জানতে পারছি না। কয়েকজনকে ফোন করে বলে রাখলাম, টিভির মাধ্যমে কোনো খবর পেলে যেন জানায়। খবর এল, বেলা তিনটার দিকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন সেনাপ্রধান। শাহবাগে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল, হাসিনা পদত্যাগ করেছেন।
একটু পর পর সমাবেশের বিভিন্ন জায়গায় হৈ-হুল্লোড় শুরু হয়। ছুটে যাই জানতে, ‘কোনো খবর কি এল?’ জানা যায়, এখনো কিছু জানা যায়নি। মোবাইল ফোনের রেডিওতে শুধু নানা ভাষার গান। আফসোস হয়েছিল, ‘ইশ! আজ যদি বিবিসি রেডিওটা থাকতো!’ ২০২২ সালে বন্ধ হয়ে গেল!
বেলা তিনটাও পার হতেই জানা গেল, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ থেকে পালিয়েছেন। শোনা কথা। কোথায় পালালেন? একজন বললো, বেলারুশ। নিশ্চিত হতে একটি পত্রিকার ওয়েবসাইটে ঢোকার চেষ্টা করলাম। একটু সময় নিয়ে ঢোকা গেল, ভেসে উঠলো একটি শিরোনাম, ‘পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন শেখ হাসিনা’।
ওটুকুই, ইন্টারনেট এর চেয়ে বেশি কাজ করল না। সুতরাং মূল খবরটি জানা গেলেও, বিস্তারিত জানতে পারলাম না। অনেক পরে জেনেছি, হাসিনা তার ছোট বোন রেহানাকে নিয়ে ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন। ওই ‘বেলারুশ’ যে কোথা থেকে এল কে জানে!
শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্ককে ঘিরে জনস্রোত। ৫ আগস্ট ২০২৪। ছবি: সুদীপ্ত সালাম
এই খবরে শাহবাগ-টিএসসি এলাকায় ছাত্র-জনতার সে কী উল্লাস! এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখা সৌভাগ্যের ব্যাপার। অভূতপূর্ব ইতিহাসের সাক্ষী হতে পেরে গর্ববোধ হচ্ছিল। গোটা শহরেই ছিল বাঁধভাঙা আনন্দের বন্যা। রাজধানী হয়ে সেই আনন্দের জোয়ার গিয়ে লেগেছিল দেশের আনাচ-কানাচে। আনন্দে আত্মহারা মানুষ চিৎকার করে বলছিল, ‘আইজকা আমরা স্বাধীন হইছি, আজকে আমি পাখির মতন আকাশে উড়বো…।’ বহু লোককে খুশিতে কাঁদতে দেখেছি। একজন আরেকজনকে মিষ্টি খাইয়ে দেয়া, রঙ মেখে দেয়া তো চলছিলই। একদল লোক রাজু ভাস্কর্যের চূড়ায় উঠে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে লাগল। রক্তগঙ্গা পাড়ি দিয়ে যেন এভারেস্ট জয়!
এসময় সেনাবাহিনীর সদস্যরা জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হতে লাগলেন। তাদেরকে ফুল দেয়া, মিষ্টি খাওয়ানো, কাউকে কাউকে মাথায় তুলে নাচা, তাদের সঙ্গে ছবি তোলা…। তারা যতই ‘না’ করেন, জনগণ ততই যেন উৎসাহিত হয়। সেনাবাহিনীর কারো কারো চোখে আমি পানি দেখেছি। তারাও তো রক্ত মাংসের মানুষ, দেশের প্রতি তারাও দায়বদ্ধতা বোধ করেন।
খবর এল, লোকজন গণভবন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢুকে পড়েছে। আমিও সেদিকে রওনা হলাম। কিন্তু জনস্রোতের কারণে শাহবাগ থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত আসতেই প্রায় দেড় ঘণ্টা লেগে গেল। তেজগাঁও এসে বুঝতে পারলাম, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা মাঠে নেমে গেছে। তাদের অনেকের হাতে দা, কুড়াল ও চাপাতি। তারা এখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের খুঁজছে এবং আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলোতে হামলা চালাচ্ছে। দেখি, দাউ দাউ করে জ্বলছে আওয়ামী লীগের ঢাকা জেলা কার্যালয়। তেজগাঁও রেলওয়ে ওভারপাসের কাছে গিয়ে বুঝলাম, এখন আর বিজয় সরণির দিকে যাওয়া যাবে না। সড়ক বন্ধ।
বাসায় ফিরে ছবি ও ভিডিও অফিসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। ফিরতে গিয়ে দেখি, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন ভবন ঘিরে রেখেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। ভবনের নিচের সবগুলো যানবাহন ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমাকে দেখেই একজন জানতে চাইল, আমি এই টেলিভিশনের সাংবাদিক কি না। আমি তাড়াতাড়ি আইডি কার্ড দেখিয়ে প্রমাণ দিলাম, আমি ইনডিপেনডেন্ট-এর কেউ না।