
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুভাবনা
জাতির সংকটে প্রথমে তার কাছেই আমরা গিয়েছি বারবার। বাঙালির সবচেয়ে গৌরবের সংগ্রাম একাত্তরে আমাদের হাতের রাইফেলের সঙ্গে সমান শক্তি নিয়ে মুখে ছিল “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...”।
বেলুচিস্তানে চলছে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বাধীনতার লড়াই। প্রাকৃতিক সম্পদে পাকিস্তানের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও সেখানকার মানুষ সবচেয়ে গরিব। বেলুচদের ইতিহাস ও সংগ্রাম নিয়ে চরচার এই ধারাবাহিক।

আমরা বেলুচের সন্তান,
মুক্ত ও স্বাধীন,
আমাদের নিজেদের ভাগ্য–নিয়ন্তা
আমাদের ক্রোধে পৃথিবী কম্পিত,
ভয়ে কেঁপে ওঠে প্রাসাদগুলো
আমরা বাঘের মতো নির্ভয় রক্ষক;
আমরা আমাদের পিতৃপুরুষের অনুপ্রেরণা,
আমাদের মা ও বোনদের গর্ব ও সম্মান,
আমাদের ভাইদের শৌর্য
আমাদের রক্ত একদিন,
দেশের প্রয়োজনে বিলিয়ে দেব,
মায়েদের ঘুমপাড়ানি গানের মর্যাদা আমরা রাখব;
আমরা মাতৃদুগ্ধ পান করে বড় হয়েছি,
তলোয়ারের ছায়ায়,
চোখের রক্তিম খুন জানান দেয় আমরা শহীদের বংশধর;
আমরা অসহায় ও গরিবের রক্ষক,
আমরা সন্ত্রাসের দুর্গ ধ্বংস করেছি,
চিরতরে শেষ হয়ে গেছে অত্যাচারের দিন।
(অনুবাদ: ইয়াসিন আরাফাত)
বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামীদের এই গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। এটাকে তারা বলেন, ‘জাতীয় সংগীত’। কিন্তু এই সংগীত ও বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএর তৎপরতা প্রমাণ করে না যে সত্যি সত্যি বেলুচিস্তান স্বাধীন হয়েছে। এখনো এটি পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরের একটি প্রদেশ। বেলুচিস্তানে স্বাধিকারের আন্দোলন চলে আসছে ১৯৪৮ সাল থেকে।
বেলুচিস্তানে রক্ত ঝরেই চলেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যৌথ অভিযান চালিয়ে ২৪ ঘণ্টায় বেলুচিস্তান ও পাকতুন খাওয়ায় ৩২ জন বিদ্রোহীকে হত্যা করেছে। তাদের ভাষায়, দুষ্কৃতকারী। পাকিস্তান সরকারের দাবি, এরা ভারত সমর্থিত ‘ফিতনা আল খাওয়াজ’ আর ‘ফিতনা আল হিন্দুস্তান’-এর সদস্য। জুলাই মাসের শুরুতে বেলুচিস্তানে বিদ্রোহীরা ২৭ জন পুলিশ হত্যা ও অপহরণ করে। এর জবাবে সেনাবাহিনী সাঁড়াশি অভিযান চালায়।
পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্ট্যাডিজ (পিআইসিএসএস) বলেছে, গত মে ও জুন মাস ছিল বেলুচিস্তানের জন্য সবচেয়ে সহিংস মাস। জুন মাসে সেখানে ৭১টি হামলার ঘটনা ঘটে। এপ্রিলে ছিল ৩৪টি। মে মাসে সারা দেশে যে ৫৪টি গুমের ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে বেলুচিস্তানেই ৫২টি।

কেন্দ্রীয় সরকার যখন শক্তিপ্রয়োগে বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ দমন করতে চাইছে তখন সাংবাদিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সেটা সঠিক পথ নয়। গত ২২ জুলাই সাংবাদিক জাহিদ হোসেন পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন-এ লিখেছেন, নিরাপত্তা বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষে হতাহতের যে সংখ্যা দেওয়া হচ্ছে তা প্রকৃত সংখ্যার অর্ধেকেরও কম। কৌশলগতভাবে পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রদেশটি দশকের পর দশক ধরে রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে আছে এবং পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।
আয়তনে বেলুচিস্তান পুরো পাকিস্তানের ৪৪ শতাংশ। লোক সংখ্যা মাত্র দেড় কোটি। বেলুচদের অভিযোগ, বেলুচিস্তান প্রাকৃতিক সম্পদে দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও তারা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে আছে। পাকিস্তানে গড় দারিদ্র্যের হার ২৭ শতাংশ। বেলুচিস্তানে ৪৭ শতাংশ। বেলুচরা মনে করেন, তাদের প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশে শিল্প কারখানা গড়ে উঠলেও তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। সত্তর দশকে ভুট্টো সরকার বেলুচিস্তানের প্রাকৃতিক গ্যাসে তাদের হিস্যা দেওয়ার বিষয়ে যে চুক্তি করেছিল, সেটাও কার্যকর থাকেনি। ভুট্টো কয়েক মাসের মাথায় বেলুচিস্তানের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করেন বিদেশিদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রের ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে। বেলুচদের রাজনৈতিক অসন্তোষ তখন থেকেই ঘনীভুত হয়।
গণতান্ত্রিক ও সশস্ত্র— দুই পথেই বেলুচদের সংগ্রাম চলছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলো সেটা না মেনে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। এরই মধ্যে গড়ে ওঠা বেলুচ লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) তৎপরতা আর উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সীমিত নেই। তারা শহুরে শিক্ষিত তরুণদের আকৃষ্ট করতে পেরেছে। এমনকি বহু নারীও এই সংগঠনে যোগ দিয়েছে। বিএলএ গঠনের পটভূমি হলো ২০০৬ সালে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নওয়াব আকবর বুগতির খুন হওয়া। তখন ছিল পারভেজ মোশাররফের সেনা শাসন। গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ করা যাচ্ছিল না। ফলে বুগতির অনুসারীরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। গঠন করে বেলুচ লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ। ২০১৮ সালে করাচিতে চীনা কনস্যুলেটে হামলা, ২০২০ সালে করাচি স্টক এক্সচেঞ্জ, ২০২৪ সালে করাচি বিমানবন্দরের কাছে চীনা প্রকৌশলীদের গাড়িতে হামলা ও ২০২৫ সালে জাফর এক্সপ্রেস ট্রেন ছিনতাইসহ আরও অনেক সশস্ত্র ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা পাকিস্তানি ক্ষমতা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
বিএলএ বহু বছর ধরেই স্বাধীন বেলুচিস্তান প্রতিষ্ঠার কথা বলে আসছে। সংগঠনটির বিবৃতি, প্রচারণামূলক ভিডিও ও সামরিক অভিযানের ভাষায় প্রায়ই ‘স্বাধীনতা’, ‘মুক্তি’ এবং ‘দখলদার বাহিনী’—এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়। তাদের এই শব্দ চয়নের সঙ্গে সত্তরের দশকে বাঙালি নেতা শেখ মুজিবের ‘শব্দ চয়ন’ মিলে যায়। তিনিও আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা ও মুক্তি প্রভৃতি শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করতেন।

বেলুচ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, গত দুই দশকে বহু ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক ও সন্দেহভাজন বিচ্ছিন্নতাবাদীকে নিরাপত্তা বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে। অনেকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আবার কারও মরদেহ পরে প্রত্যন্ত এলাকায় পাওয়া গেছে। অর্থাৎ বেলুচিস্তানের যে কোনো আন্দোলন সংগ্রাম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করতে চাইছে। সেখানে এখন যা ঘটছে, তা কয়েক দশকের রাজনৈতিক বঞ্চনা, সম্পদের মালিকানা নিয়ে বিরোধ, জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর অবিশ্বাসের ফল।
বেলুচিস্তান ন্যাশনালিস্ট পার্টি বা বিএনপি চিন্তাধারায় বামপন্থী। তবে তারা এখনো সশস্ত্র সংগ্রামের পথে যায়নি। এই দলের নেতা ও বেলুচিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আখতার জান মেঙ্গল ২০১২ সালে মুসলিম লিগের নেতা নওয়াজ শরিফের (তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী নন, বিরোধী দলের নেতা) সঙ্গে দেখা করে বেলুচিস্তানের জন্য ছয় দফা দাবিনামা পেশ করেছিলেন। এই ছয় দফায় বেলুচিস্তানে সামরিক অভিযানের অবসান, রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা ও গুম করার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের কথা বলা হয়েছিল।
বেলুচ মানবাধিকার কর্মী মাহরাং বেলুচের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে; যাতে তিনি তাদের অধিকার আদায়ের ও স্বাধীনতার আন্দোলনে বাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের উদাহরণ টেনে এনেছেন। তিনি সরাসরি শেখ মুজিবের পথ অনুসরণ করার এবং পাকিস্তানের শাসন থেকে মুক্তির ডাক দিয়েছেন।
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে মেঙ্গল বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ক্ষমতা হারানোর পর কারাগারে। কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডনে যান। পাকিস্তানের নেতাদের জন্য গদি ও জেলখানার দূরত্ব খুবই সামান্য। খুব কম নেতাই আছেন, যারা ক্ষমতা হারানোর পর জেলে যাননি। মেঙ্গল লন্ডন থেকে ফিরে এসে আবার বেলুচদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেন।
ইতিমধ্যে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিস্ফোরন্মুখ হয়েছে। কয়েক বছর আগে লন্ডনে নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরে আখতার জান মেঙ্গল সুপ্রিম কোর্টের এক শুনানিতে ছয় দফা দাবি তুলে বলেন, এটাই বেলুচিস্তানে শান্তি আনার একমাত্র পথ। নওয়াজ শরিফের সঙ্গে আলোচনাকালে তিনি আরও বলেছিলেন, এই ছয় দফা কোনোভাবেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফার সঙ্গে ভিন্ন ভাবা ঠিক হবে না। ছয় দফা বাস্তবায়ন না হলে বেলুচিস্তানের জনগণের পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা সম্ভব হবে না। (চলবে)

জাতির সংকটে প্রথমে তার কাছেই আমরা গিয়েছি বারবার। বাঙালির সবচেয়ে গৌরবের সংগ্রাম একাত্তরে আমাদের হাতের রাইফেলের সঙ্গে সমান শক্তি নিয়ে মুখে ছিল “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...”।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই হয়তো নতুন কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেবে না, তবে এটি বিদ্যমান কৌশলগুলোকে আরও সস্তা, দ্রুত এবং সহজ করে তুলছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর ২০২৬ সালের জুলাইয়ের একটি প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য এটাই। এটি

ভিজ্যুয়াল সাংবাদিক হিসেবে চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান সরাসরি প্রত্যক্ষ করাকে পেশাগত জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন মনে করি। প্রায় বিশ বছরের সাংবাদিকতা জীবনকে এক ধরনের পরিপূর্ণতা দিয়েছে এই ঘটনা। কেমন ছিল অভ্যুত্থানের শেষ সাত দিন? নিজের ডায়েরি থেকে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।

কিছু জামা-কাপড় লন্ড্রিতে দিতে হয়েছিল, ইস্ত্রি করতে। গিয়েই দেখা গেল লন্ড্রিতে ঝুলছে বড় আকারের সাইনবোর্ড। তাতে লেখা–‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রতি পিছ ইস্ত্রি এখন থেকে ১২ টাকা, ধন্যবাদ…’। হ্যাঁ, ধন্যবাদ দেওয়া হলো বটে। তবে ভোক্তা হিসেবে ঠিক উষ্ণতার সাথে সেই ধন্যবাদ গ্রহণ করা গেল না। কারণ, ভোক্তা হ