চরচা ডেস্ক

‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ নামে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া একটি ভাইরাল চিঠি পাকিস্তানের অশান্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশটির প্রতি বিশ্ববাসীর মনোযোগ নতুন করে আকর্ষণ করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই নথিতে দাবি করা হয়েছে, বেলুচ স্বাধীনতাকামীরা পাকিস্তানের কাছ থেকে তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং বর্তমানে প্রদেশটির একটি বিশাল অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
হঠাৎ দেখলে বিষয়টি অবাক করার মতো মনে হলেও, গত কয়েক দিনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি আসলে আচমকা তৈরি হয়নি।
চলতি জুলাই মাসের শুরু থেকেই পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত রূপ নিয়েছে। একের পর এক বড় ধরনের হামলায় সেখানে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার তথ্যমতে, গত ৬ থেকে ৮ জুলাইয়ের মধ্যে বেলুচিস্তান প্রদেশে নতুন করে ঘটা হামলাগুলোতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪২ জনে দাঁড়িয়েছে।
পাকিস্তানি সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, জিয়ারাত অঞ্চলের মাঙ্গি বাঁধ এলাকার একটি পুলিশ পোস্টে হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে অপহরণ করে সশস্ত্র বিদ্রোহীরা।
পরবর্তীতে সেখান থেকে অপহৃত ১৮ জন পুলিশ সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া পৃথক আরেকটি হামলায় আরও ১১ জন সেনাসদস্য প্রাণ হারান।
এই রক্তক্ষয়ী হামলার পর পুরো বেলুচিস্তানজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী।
সেনাবাহিনী, ফ্রন্টিয়ার কোর (এফসি) এবং পুলিশ যৌথভাবে এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।
ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষের দাবি, গত কয়েকদিনের চিরুনি অভিযানে বহু সশস্ত্র বিদ্রোহী নিহত হয়েছে।
তবে সংঘাতকবলিত এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে স্বাধীন সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত হওয়ায়, কোনো পক্ষের হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যাই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমদ শরিফ চৌধুরী কড়া ভাষায় বলেছেন, “আমরা তোমাদের পিছু ছাড়ব না, যেখানেই থাকো তোমাদের ওপর আঘাত হানা হবে।”
তার এই কঠোর অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে, ইসলামাবাদ বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল সাধারণ আইনশৃঙ্খলাজনিত সংকট হিসেবে দেখছে না, বরং একে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের এই সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে ‘বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি’ (বিএলএ)-সহ অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো তাদের হামলার পরিধি ও কৌশল অনেকটাই বদলেছে।
এখন তারা সরাসরি সামরিক ঘাঁটি, থানা, জাতীয় মহাসড়ক, রেলপথ, সরকারি দপ্তর এবং বিশেষ করে পাকিস্তানে চলমান চীনা প্রকল্পগুলোকে নিশানা করছে।
এমনকি বড় শহরের বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রাস্তাঘাট অবরোধ করা, সাময়িক তল্লাশিচৌকি বসানো কিংবা ছোট ছোট শহরে আকস্মিক ঢুকে পড়ে হামলা চালানোর মতো ঘটনাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
এই অস্থিতিশীলতা বেলুচিস্তানকে আবারও একটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে, যেখানে পাকিস্তান সরকারের পাশাপাশি সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে পরাশক্তি চীনও।
ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ, যা দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত।
তবে আয়তনে বিশাল হলেও এই অঞ্চলটি পাকিস্তানের সবচেয়ে কম জনবহুল এবং অন্যতম অনুন্নত এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রাকৃতিক সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এই প্রদেশে তামা, সোনা, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও মূল্যবান খনিজের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে।
এছাড়া আরব সাগরের কোল ঘেঁষে এর কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়াকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে একে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বা গেটওয়েতে পরিণত করেছে।
তবে দশকের পর দশক ধরে বেলুচ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ—পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ অবাধে শোষণ করে আসছে।
আর এই বঞ্চনাবোধই প্রদেশটিতে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র বিদ্রোহের মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।
বেলুচিস্তানের ওপর চীনের নজর দেওয়ার প্রধান কারণ হলো সিপিইসি প্রকল্প, যা চীনের বিশাল বেল্ট অ্যান্ড রোড (বিআরই) পরিকল্পনার একটি অন্যতম প্রধান অংশ।
প্রায় ৬৫ বিলিয়ন (৬ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারের এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো রাস্তাঘাট, রেলপথ ও বিদ্যুৎ লাইনের মাধ্যমে চীনের পশ্চিমাঞ্চলকে সরাসরি আরব সাগরের সাথে যুক্ত করা। আর এই পুরো পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বেলুচিস্তান।
এর মাধ্যমে চীন সরাসরি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্য করার সুযোগ পাবে, যা বর্তমানে ব্যবহৃত ব্যস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ‘মালাক্কা প্রণালী’র ওপর বেইজিংয়ের নির্ভরতা অনেক কমিয়ে দেবে।
বেলুচিস্তানে চীনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হলো গোয়াদর বন্দর। আরব সাগরের তীরে অবস্থিত এই গভীর সমুদ্রবন্দরটি এখন চীন নিজেই পরিচালনা করছে এবং এটিকে সিপেক প্রকল্পের প্রাণকেন্দ্র বলা হয়।
গোয়াদরকে একটি বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র বানাতে চীন প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে, যার মধ্যে রয়েছে ইস্টবে এক্সপ্রেসওয়ে, নতুন নতুন সংযোগ সড়ক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা এবং নতুন গোয়াদর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ।
চীন আশা করছে, এই গোয়াদর বন্দরের মাধ্যমেই তাদের উৎপাদিত পণ্য খুব সহজে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বাজারে পৌঁছে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানের ওপর পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ যদি কোনোভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে তা এই অঞ্চলে চীনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।
যদিও বর্তমানে একটি স্বাধীন বেলুচিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, তবুও সেখানকার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন জোরদার হলে বেইজিংয়ের বিপুল বিনিয়োগ বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ভবিষ্যতে সেখানে কোনো স্বায়ত্তশাসিত বা স্বাধীন সরকার গঠিত হলে তারা পাকিস্তানের সাথে করা চীনের আগের সব চুক্তি নতুন করে খতিয়ে দেখতে পারে।
সেই সাথে খনি ও অবকাঠামো উন্নয়নের চুক্তিগুলো পুনরায় মূল্যায়নের দাবি তোলা এবং নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থানীয় জনগণের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাওয়ার পথও তৈরি হবে। এমনকি চীনের বদলে বিশ্বের অন্য কোনো দেশ বা বিনিয়োগকারীদের সাথে নতুন অংশীদারিত্বে জড়ানোর আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই ধরনের যেকোনো পরিস্থিতি সরাসরি গোয়াদর বন্দর ও সিপিইসি প্রকল্পের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলবে।
এর বড় কারণ হলো, বেলুচিস্তানে চীনের এত বড় বিনিয়োগ থাকা সত্ত্বেও বিদেশি প্রকল্পগুলোর জন্য এই অঞ্চলটি এখনও অন্যতম বিপজ্জনক এলাকা হিসেবে রয়ে গেছে।
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-সহ বেশ কয়েকটি সশস্ত্র সংগঠন এই প্রদেশে চীনের উপস্থিতির তীব্র বিরোধিতা করছে। এই গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, স্থানীয় মানুষের কোনো উপকার না করেই বেলুচিস্তানের মূল্যবান সম্পদ লুটে নিতে ইসলামাবাদ সরকারকে সরাসরি সাহায্য করছে বেইজিং।
এর ফলে এই অঞ্চলে কর্মরত চীনা নাগরিক এবং সিপেক প্রকল্পের সাথে যুক্ত বিভিন্ন স্থাপনা বারবার হামলার শিকার হচ্ছে।
বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়ই বোমা হামলা, ওত পেতে আক্রমণ এবং বড় বড় অবকাঠামো ধ্বংস করার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। চীনা কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে এবং এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রক্ষা করতে পাকিস্তান সরকার সেখানে বিশেষ বাহিনীসহ হাজার হাজার অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে।
কিন্তু এত সুরক্ষার পরেও বেলুচিস্তানে চীনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএলএ আসলেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন।
তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, বিএলএ বেলুচিস্তানকে একটি কার্যকর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে বা নতুন সরকার গঠন করেছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
এছাড়া প্রদেশটির প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা বিএলএ-র নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির সত্যতাও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
একই সাথে পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে, প্রাদেশিক সরকার বিলুপ্ত হয়েছে কিংবা বিএলএ স্থায়ীভাবে বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
ফলে ভাইরাল হওয়া চিঠির দাবিটি আপাতত প্রোপাগান্ডা বা গুজব হিসেবেই গণ্য হচ্ছে

‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ নামে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া একটি ভাইরাল চিঠি পাকিস্তানের অশান্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশটির প্রতি বিশ্ববাসীর মনোযোগ নতুন করে আকর্ষণ করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই নথিতে দাবি করা হয়েছে, বেলুচ স্বাধীনতাকামীরা পাকিস্তানের কাছ থেকে তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং বর্তমানে প্রদেশটির একটি বিশাল অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
হঠাৎ দেখলে বিষয়টি অবাক করার মতো মনে হলেও, গত কয়েক দিনের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি আসলে আচমকা তৈরি হয়নি।
চলতি জুলাই মাসের শুরু থেকেই পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত রূপ নিয়েছে। একের পর এক বড় ধরনের হামলায় সেখানে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার তথ্যমতে, গত ৬ থেকে ৮ জুলাইয়ের মধ্যে বেলুচিস্তান প্রদেশে নতুন করে ঘটা হামলাগুলোতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪২ জনে দাঁড়িয়েছে।
পাকিস্তানি সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, জিয়ারাত অঞ্চলের মাঙ্গি বাঁধ এলাকার একটি পুলিশ পোস্টে হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে অপহরণ করে সশস্ত্র বিদ্রোহীরা।
পরবর্তীতে সেখান থেকে অপহৃত ১৮ জন পুলিশ সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া পৃথক আরেকটি হামলায় আরও ১১ জন সেনাসদস্য প্রাণ হারান।
এই রক্তক্ষয়ী হামলার পর পুরো বেলুচিস্তানজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী।
সেনাবাহিনী, ফ্রন্টিয়ার কোর (এফসি) এবং পুলিশ যৌথভাবে এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।
ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষের দাবি, গত কয়েকদিনের চিরুনি অভিযানে বহু সশস্ত্র বিদ্রোহী নিহত হয়েছে।
তবে সংঘাতকবলিত এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে স্বাধীন সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত হওয়ায়, কোনো পক্ষের হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যাই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমদ শরিফ চৌধুরী কড়া ভাষায় বলেছেন, “আমরা তোমাদের পিছু ছাড়ব না, যেখানেই থাকো তোমাদের ওপর আঘাত হানা হবে।”
তার এই কঠোর অবস্থান থেকে স্পষ্ট যে, ইসলামাবাদ বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল সাধারণ আইনশৃঙ্খলাজনিত সংকট হিসেবে দেখছে না, বরং একে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের এই সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে ‘বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি’ (বিএলএ)-সহ অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো তাদের হামলার পরিধি ও কৌশল অনেকটাই বদলেছে।
এখন তারা সরাসরি সামরিক ঘাঁটি, থানা, জাতীয় মহাসড়ক, রেলপথ, সরকারি দপ্তর এবং বিশেষ করে পাকিস্তানে চলমান চীনা প্রকল্পগুলোকে নিশানা করছে।
এমনকি বড় শহরের বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রাস্তাঘাট অবরোধ করা, সাময়িক তল্লাশিচৌকি বসানো কিংবা ছোট ছোট শহরে আকস্মিক ঢুকে পড়ে হামলা চালানোর মতো ঘটনাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
এই অস্থিতিশীলতা বেলুচিস্তানকে আবারও একটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে, যেখানে পাকিস্তান সরকারের পাশাপাশি সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে পরাশক্তি চীনও।
ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ, যা দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত।
তবে আয়তনে বিশাল হলেও এই অঞ্চলটি পাকিস্তানের সবচেয়ে কম জনবহুল এবং অন্যতম অনুন্নত এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রাকৃতিক সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এই প্রদেশে তামা, সোনা, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও মূল্যবান খনিজের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে।
এছাড়া আরব সাগরের কোল ঘেঁষে এর কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়াকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে একে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বা গেটওয়েতে পরিণত করেছে।
তবে দশকের পর দশক ধরে বেলুচ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ—পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ অবাধে শোষণ করে আসছে।
আর এই বঞ্চনাবোধই প্রদেশটিতে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র বিদ্রোহের মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।
বেলুচিস্তানের ওপর চীনের নজর দেওয়ার প্রধান কারণ হলো সিপিইসি প্রকল্প, যা চীনের বিশাল বেল্ট অ্যান্ড রোড (বিআরই) পরিকল্পনার একটি অন্যতম প্রধান অংশ।
প্রায় ৬৫ বিলিয়ন (৬ হাজার ৫০০ কোটি) ডলারের এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো রাস্তাঘাট, রেলপথ ও বিদ্যুৎ লাইনের মাধ্যমে চীনের পশ্চিমাঞ্চলকে সরাসরি আরব সাগরের সাথে যুক্ত করা। আর এই পুরো পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বেলুচিস্তান।
এর মাধ্যমে চীন সরাসরি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে বাণিজ্য করার সুযোগ পাবে, যা বর্তমানে ব্যবহৃত ব্যস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ‘মালাক্কা প্রণালী’র ওপর বেইজিংয়ের নির্ভরতা অনেক কমিয়ে দেবে।
বেলুচিস্তানে চীনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হলো গোয়াদর বন্দর। আরব সাগরের তীরে অবস্থিত এই গভীর সমুদ্রবন্দরটি এখন চীন নিজেই পরিচালনা করছে এবং এটিকে সিপেক প্রকল্পের প্রাণকেন্দ্র বলা হয়।
গোয়াদরকে একটি বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র বানাতে চীন প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে, যার মধ্যে রয়েছে ইস্টবে এক্সপ্রেসওয়ে, নতুন নতুন সংযোগ সড়ক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা এবং নতুন গোয়াদর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ।
চীন আশা করছে, এই গোয়াদর বন্দরের মাধ্যমেই তাদের উৎপাদিত পণ্য খুব সহজে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বাজারে পৌঁছে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানের ওপর পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ যদি কোনোভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে তা এই অঞ্চলে চীনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।
যদিও বর্তমানে একটি স্বাধীন বেলুচিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, তবুও সেখানকার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন জোরদার হলে বেইজিংয়ের বিপুল বিনিয়োগ বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ভবিষ্যতে সেখানে কোনো স্বায়ত্তশাসিত বা স্বাধীন সরকার গঠিত হলে তারা পাকিস্তানের সাথে করা চীনের আগের সব চুক্তি নতুন করে খতিয়ে দেখতে পারে।
সেই সাথে খনি ও অবকাঠামো উন্নয়নের চুক্তিগুলো পুনরায় মূল্যায়নের দাবি তোলা এবং নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থানীয় জনগণের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাওয়ার পথও তৈরি হবে। এমনকি চীনের বদলে বিশ্বের অন্য কোনো দেশ বা বিনিয়োগকারীদের সাথে নতুন অংশীদারিত্বে জড়ানোর আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই ধরনের যেকোনো পরিস্থিতি সরাসরি গোয়াদর বন্দর ও সিপিইসি প্রকল্পের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলবে।
এর বড় কারণ হলো, বেলুচিস্তানে চীনের এত বড় বিনিয়োগ থাকা সত্ত্বেও বিদেশি প্রকল্পগুলোর জন্য এই অঞ্চলটি এখনও অন্যতম বিপজ্জনক এলাকা হিসেবে রয়ে গেছে।
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-সহ বেশ কয়েকটি সশস্ত্র সংগঠন এই প্রদেশে চীনের উপস্থিতির তীব্র বিরোধিতা করছে। এই গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, স্থানীয় মানুষের কোনো উপকার না করেই বেলুচিস্তানের মূল্যবান সম্পদ লুটে নিতে ইসলামাবাদ সরকারকে সরাসরি সাহায্য করছে বেইজিং।
এর ফলে এই অঞ্চলে কর্মরত চীনা নাগরিক এবং সিপেক প্রকল্পের সাথে যুক্ত বিভিন্ন স্থাপনা বারবার হামলার শিকার হচ্ছে।
বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়ই বোমা হামলা, ওত পেতে আক্রমণ এবং বড় বড় অবকাঠামো ধ্বংস করার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। চীনা কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে এবং এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রক্ষা করতে পাকিস্তান সরকার সেখানে বিশেষ বাহিনীসহ হাজার হাজার অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে।
কিন্তু এত সুরক্ষার পরেও বেলুচিস্তানে চীনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএলএ আসলেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন।
তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, বিএলএ বেলুচিস্তানকে একটি কার্যকর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে বা নতুন সরকার গঠন করেছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
এছাড়া প্রদেশটির প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা বিএলএ-র নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির সত্যতাও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
একই সাথে পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে, প্রাদেশিক সরকার বিলুপ্ত হয়েছে কিংবা বিএলএ স্থায়ীভাবে বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
ফলে ভাইরাল হওয়া চিঠির দাবিটি আপাতত প্রোপাগান্ডা বা গুজব হিসেবেই গণ্য হচ্ছে

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে একটি নতুন সামরিক অভিযানে অবতীর্ণ হয়েছে, যা মূলত পূর্ববর্তী অঘোষিত যুদ্ধেরই একটি ধারাবাহিকতা। এই নতুন পর্যায়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। তবে এই অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী ঠিক

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। বিশেষ করে যখন তাদের নিরাপত্তা, পরীক্ষার মান বা মূল্যায়নের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরীক্ষা নেওয়া, প্রশ্নপত্রে ভুল থাকা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অসংবেদনশীল মন্তব্য–এসবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ স্বাভাবিক।