দুদিন আগে রাজধানীর আদাবরে বিএনপির এক নেতার হত্যার ঘটনাকে ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে দলীয় কোন্দল। এর আগে মোহাম্মদপুরে খেলা দেখা নিয়ে বিরোধ, রমনায় ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ, চট্টগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা, সীতাকুণ্ড, বাগেরহাট কিংবা ময়মনসিংহ—ঘটনাগুলোর স্থান আলাদা হলেও একটি বিষয়ই বারবার সামনে এসেছে। আর তা হলো সংঘাতে নিহতদের বড় অংশই বিএনপির নেতা-কর্মী, আর বহু ঘটনায় প্রতিপক্ষও বিএনপি বা তাদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বলয়ের মানুষ।
সম্প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে, ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থানেও কেন বিএনপির এত নেতা-কর্মী নিহত হচ্ছে? স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব ও সাংগঠনিক শক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দলীয় কোন্দলও কি তীব্র হয়ে উঠছে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা গেছে। বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের পর অনেক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, “আগে দৌড়াইছে শেখ হাসিনা, আর এখন ক্ষমতায় এসে নিজেরাই নিজেদের দৌড়ায়।” এমন মন্তব্যে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া আলোচনা ও প্রশ্নের প্রতিফলন দেখা যায়।
তবে এসব সংঘাতকে আদর্শগত বিরোধ হিসেবে দেখছেন না বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির চার সদস্য, দুই ভাইস চেয়ারম্যান এবং তিন সাংগঠনিক সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলেছে চরচা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, সাম্প্রতিক অধিকাংশ ঘটনায় রাজনৈতিক আদর্শের দ্বন্দ্ব নয়; বরং স্থানীয় আধিপত্য, পদ-পদবি, ভবিষ্যৎ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং ব্যক্তিগত বিরোধই মূল কারণ হিসেবে সামনে এসেছে।
কয়েকজন নেতা বলেন, এসব ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এরইমধ্যে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা করছে।
দলের স্থায়ী কমিটির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, গত কয়েক মাসে স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক প্রভাব দ্রুত বেড়েছে। অনেক এলাকায় দীর্ঘদিন বাইরে থাকা নেতারা ফিরে এসেছেন, আবার নতুন নেতৃত্বও তৈরি হয়েছে। এতে পুরনো ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যে প্রভাব বিস্তার, ভবিষ্যৎ মনোনয়ন, ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং দলীয় কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে।
এই নেতা বলেন, “তবে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলায় দল কোনো পরিস্থিতিতেই ছাড় দেবে না, কারও জন্যই না। এই জায়গায় দলীয় অবস্থান কঠোর।”
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত সারা দেশে ৫৯ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী নিহত হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ৪৫ জন, জামায়াতের সাতজন এবং আওয়ামী লীগের সাতজন।
অর্থাৎ, নিহতের প্রায় ৭৬ শতাংশই বিএনপির নেতা-কর্মী। এই পরিসংখ্যান শুধু সহিংসতার চিত্র নয়; এটি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসা একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতারও প্রতিফলন।
সবচেয়ে বেশি মৃত্যু কেন বিএনপির?
আসক ও গণমাধ্যমে আসা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির নিহত ৪৫ নেতা-কর্মীর মধ্যে অন্তত ২৩ জন মারা গেছেন রাজনৈতিক সংঘাত ও হামলায়। ১৪ জন নিহত হয়েছেন বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে। আবার বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ছয়জন ও বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে আরও তিনজন।
অর্থাৎ, রাজনৈতিক সংঘাতে নিহত বিএনপি নেতা-কর্মীদের বড় অংশের মৃত্যুর পেছনে প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ নয়; বরং সামনে এসেছে নিজেদের দল কিংবা বিগত রাজনৈতিক মিত্র ও বর্তমানে প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিরোধ।
অন্যদিকে বাকি ২২ জন বিএনপি নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন এমন সব ঘটনায়, যেগুলোর সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক সংঘাতের সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তবে তদন্তে উঠে এসেছে আধিপত্য বিস্তার, জমি, ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, ওয়াজ-মাহফিলের অর্থবণ্টন নিয়ে দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিরোধ কিংবা স্থানীয় প্রভাব বিস্তারের মতো কারণ।
ক্ষমতার কাছাকাছি এলেই কেন বাড়ে কোন্দল?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে একটি দল ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে বা প্রশাসনিক প্রভাব বাড়লে স্থানীয় পর্যায়ে সেই দলের ভেতরেই নতুন করে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়। কে এলাকায় প্রভাবশালী হবে; কে কে দলীয় পদ পাবে; ভবিষ্যৎ জনপ্রতিনিধি কে হবে; কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে বাজার, পরিবহন, বালুমহাল, খাসজমি বা টেন্ডার; স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কার যোগাযোগ বেশি—এই বিষয়গুলো তখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
বিএনপি দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্থানীয় পর্যায়ে দলটির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে আগে যেসব স্বার্থের জায়গা অন্যদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, এখন তা নিজেদের মধ্যেই ভাগাভাগির লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের পর বিএনপি যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে, তখন দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে কেন সংঘাত বাড়ছে—এ প্রশ্ন এখন দলটির ভেতরেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে ঢাকার অন্তত পাঁচটি থানার বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে প্রায় একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। তাদেরও দাবি, অধিকাংশ বিরোধের পেছনে আদর্শগত মতপার্থক্য নয়; বরং রয়েছে স্থানীয় প্রভাব বিস্তার, আর্থিক সুবিধা, বিভিন্ন কমিটিতে স্থান পাওয়া এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বণ্টনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব।
এর একটি উদাহরণ পাওয়া যায় ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকায়। সেখানে এখনো ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমেই সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। ওই এলাকার বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একাধিক তৃণমূল নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি একটি আর্থিক সহায়তার অর্থ বণ্টনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় নেতৃত্ব কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেন, জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ১৫ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উপকারভোগীর তালিকা, চেক সংগ্রহ এবং অর্থবণ্টন নিয়ে নেতাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে তথ্য-প্রমাণ পাঠানোর চেষ্টা করছেন বলেও জানান তারা।
নিজেকে বঞ্চিত দাবি করে এক তৃণমূল নেতা বলেন, তার নামেও ১৫ হাজার টাকার একটি চেক বরাদ্দ হওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা পাননি।
চরচাকে তিনি বলেন, “ভুয়া নাম ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দিয়ে একজনই তিনটা চেক নিয়ে নিছে। একাই সব নিয়ে নিছে। নিবে যখন, সবাই মিলেই নিক।”
এই নেতা জানান, যে নেতা এই ভুয়া তথ্য দিয়ে একাই চেক নিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছেন তিনি এবং শিগগিরই হাইকমান্ডে এসব পাঠাবেন।
একই বিষয়ে অপরপক্ষের নেতাদের সঙ্গে কথা হলে তারাও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে দাবি করেন, অভিযোগগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
স্থানীয় নেতারা জানান, যারা একসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেছেন, এখন তারাই একে অপরের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে অভিযোগ পাঠাতে ব্যস্ত। তাদের ভাষ্য, সামান্য অর্থ বা সীমিত সুযোগ-সুবিধা বণ্টন নিয়েই যদি এমন বিভক্তি তৈরি হয়, তাহলে বড় অঙ্কের আর্থিক স্বার্থ, স্থানীয় নির্বাচন বা রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
একই ধরনের অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তির চিত্র ঢাকার আরও কয়েকটি থানার তৃণমূল নেতা-কর্মীদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে।
ঘটনাগুলোর মধ্যে মিল কী?
গত সাড়ে পাঁচ মাসের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি সাধারণ ধারা দেখা যায়। চুয়াডাঙ্গায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন শিমুল কাজী। সীতাকুণ্ডে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষের পর যুবদলকর্মী সজিব চৌধুরী আকাশের মরদেহ উদ্ধার হয়। রমনায় সাবেক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হোসেন হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির বিরোধ। ময়মনসিংহে রানা মিয়া হত্যাকাণ্ডে আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ এসেছে। বাগেরহাটে কৃষক দল নেতা বাদল মোড়ল হত্যার ক্ষেত্রেও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ, ভৌগোলিক অবস্থান আলাদা হলেও সংঘাতের ধরন প্রায় একই। স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করার লড়াই।
নির্বাচনও হয়ে উঠছে সংঘাতের কারণ
৩০টি রাজনৈতিক সংঘাতজনিত হত্যার মধ্যে সাতটিই জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে। নির্বাচনের আগে প্রার্থী মনোনয়ন, বিদ্রোহী প্রার্থী, নির্বাচনী কার্যালয়, নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিশোধ—সব মিলিয়ে একই রাজনৈতিক পরিবারের মধ্যেই সংঘর্ষ হয়েছে একাধিকবার।
আবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরেও কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এতে বোঝা যায়, জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনও এখন অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বড় উৎস হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বেশি সংঘাত খুলনায়
রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের পারস্পরিক বিরোধে সবচেয়ে বেশি ১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে খুলনা বিভাগে। এরপর রাজশাহী বিভাগে হত্যাকাণ্ড হয়েছে ৮টি, ঢাকায় পাঁচটি, ময়মনসিংহে তিনটি এবং চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুরে একটি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেখানে সহিংসতাও বেশি দেখা যাচ্ছে।
শুধু মৃত্যু নয়, বাড়ছে আহতের সংখ্যাও
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে রাজনৈতিক সংঘাতে আহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৩৬ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯৮০ জন আহত হয়েছেন বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে। বিএনপি বনাম বিএনপি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৭৪৫ জন।
এই দুটি তথ্যেই দেখায়, বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার সবচেয়ে বড় অংশ ঘটছে সরকার-বিরোধী দুটি প্রধান শক্তির মধ্যে অথবা একই দলের অভ্যন্তরে।
ইতিহাস কী বলে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা দলগুলোর ভেতরে স্থানীয় প্রভাব বিস্তার, পদ-পদবি, টেন্ডার, ব্যবসা ও নির্বাচনী নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সহিংসতা নতুন নয়।
বিশেষ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের টানা শাসনামলে এ ধরনের একাধিক আলোচিত ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে একাধিক হতাহতের ঘটনা ঘটে।
২০২৩ সালের ২৯ মার্চ চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলাতেও আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার তদন্তে স্থানীয় প্রভাব, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও দলীয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে আসে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় একটি দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্র সেই দলের নেতা-কর্মীদের ঘিরেই তৈরি হয়। ফলে বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘাতের পাশাপাশি একই দলের ভেতরেও প্রতিযোগিতা তীব্র হয়। এখন রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে বিএনপির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতার ইঙ্গিত মিলছে।
দায়িত্বশীলরা কী বলছেন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক চরচাকে বলেন, “একই রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিদের মধ্যেও স্বার্থ, পদ-পদবি, অর্থনৈতিক সুবিধা ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। সেটি অনেক সময় প্রাণঘাতী সহিংসতায় রূপ নেয়। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ না হলে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। দলগুলোকেও সাংগঠনিকভাবে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।”
অন্যদিকে, পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেছেন, “তদন্তে দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের হত্যার বড় অংশের পেছনে জমি, ব্যক্তিগত বিরোধ বা অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকে; সব হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ রাজনৈতিক নয়।”
সরকারের দায়িত্বশীল একজন মন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি চরচাকে বলেন, “বর্তমানে যে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটছে, তার বড় অংশই রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাত নয়; বরং স্থানীয় আধিপত্য, চাঁদাবাজি, ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ, জমিজমা ও ব্যক্তিগত বিরোধের বহিঃপ্রকাশ।”
ওই মন্ত্রীর মতে, বিএনপি বর্তমানে অনেক এলাকায় সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা প্রকাশ্যে চলে এসেছে। আগে যেসব বিরোধ দৃশ্যমান ছিল না, এখন সেগুলো সহিংস রূপ নিচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পরিসংখ্যান বলছে, সাড়ে পাঁচ মাসে নিহত ৫৯ রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মধ্যে ৪৫ জনই বিএনপির। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো–এই মৃত্যুর বড় অংশে প্রতিপক্ষ হিসেবে উঠে এসেছে বিএনপির নিজেদের নেতা-কর্মী, অথবা স্থানীয় স্বার্থভিত্তিক দ্বন্দ্ব।
অর্থাৎ, প্রশ্নটি শুধু “বিএনপির এত নেতা-কর্মী কেন নিহত হচ্ছেন”—এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আরও বড় প্রশ্ন হলো, ক্ষমতার সম্ভাবনা কি দলীয় প্রতিযোগিতাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘাতের চেয়ে নিজেদের মধ্যকার আধিপত্যের লড়াই-ই বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে?