ads

খামেনির মরদেহ সাময়িকভাবে দাফন করা হয়েছিল?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
খামেনির মরদেহ সাময়িকভাবে দাফন করা হয়েছিল?
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি: রয়টার্স

প্রায় চার মাসেরও বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিনি নিহত হন। চার মাস পর আগামী শনিবার তার এই জানাজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, খামেনির মরদেহ সাময়িকভাবে দাফন করা হয়েছিল বলে গুজব ছড়ালেও বিশেষজ্ঞ এবং ইরানি সূত্রগুলো তা নাকচ করে দিয়েছে।

কেন দেরি হলো জানাজায়?

যুদ্ধের উত্তেজনার কারণে প্রাথমিকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল জানাজা। সংঘাত থামানোর জন্য একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যখন একটি যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তে একমত হয়েছে ঠিক তখনই এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়েছে।

ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, খামেনির মৃত্যুর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের যুদ্ধ বড় আকার ধারণ করেছিল। ধারাবাহিক বোমাবর্ষণ ও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণেই তখন এই জানাজার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। তবে সম্প্রতি দুই পক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে।

ইতোমধ্যে পাকিস্তান জানিয়েছে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন বিহারের রাজ্যপাল সৈয়দ আতা হাসনাইন এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্ঘেরিটা। চীন, আফগানিস্তান এবং ককেশাস অঞ্চলের ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোও তাদের প্রতিনিধি পাঠানোর কথা জানিয়েছে।

কোথায় ছিল খামেনির মরদেহ

ইসলামিক সংস্কৃতি অনুযায়ী মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক একটি বিষয়। এই বিলম্ব মূলত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে দীর্ঘায়িত হয়েছে।

খামেনির মরদেহ সাময়িকভাবে দাফন করা হয়েছিল বলে গুজব ছড়ালেও, ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ধারাবাহিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণেই এই বিলম্ব ঘটেছিল।

ইরানি কর্মকর্তারা আরও জানান, আয়াতুল্লাহর মরদেহ ধর্মীয় বিধি মেনেই সংরক্ষণ করা হয়েছে। ইসলাম সাধারণত রাসায়নিক মমি বা ‘এমবামিং’ নিরুৎসাহিত করে।

ক্রিমিনাল স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ ওমর ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেছেন, “আয়াতুল্লাহর মরদেহ নিশ্চিতভাবেই কোল্ড স্টোরেজে হিমায়িত করে রাখা হয়েছিল, কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়নি, কারণ ইসলামে রাসায়নিক মমি করা নিষিদ্ধ।”

মোহাম্মদ ওমর আরও বলেন, “শিয়া আইন অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে দাফনে বিলম্ব এবং ঠান্ডায় মরদেহ সংরক্ষণ করার অনুমতি রয়েছে, আর একজন সর্বোচ্চ নেতার জন্য ধর্মীয় ছাড় পাওয়া খুবই সহজ। ইরানের ফরেনসিক মর্গে এমনিতেও কয়েক মাস ধরে মরদেহ রাখা হয়, তাই চার মাস হিমায়িত রাখা কোনো অলৌকিক বিষয় নয়। ধর্মীয় ও আইনি মানদণ্ড বলতে মূলত এটিই বোঝানো হয়েছে।”

এক প্রকার 'গণভোট'

তবে খামেনির মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই জানাজার জটিলতার চেয়েও বড় বিষয় হলো এই মুহূর্তের প্রতীকী গুরুত্ব।

কোম শহরের জুমার খতিব আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ সাইদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, “শহীদ নেতা এবং অন্যান্য শহীদদের জানাজার মিছিলে বিপুল জনগণের উপস্থিতি মূলত ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের জন্য আরেকটি গণভোটের মতো হবে।”

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

যদিও তারা এটিকে গণভোট হিসেবেই দেখেন, তবে বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষ ফলাফল ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিচ্ছে না। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী আশা করছে, ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি দেখানোর জন্য তারা দেড় থেকে দুই কোটি সমর্থককে ইরানের শহরগুলোতে জড়ো করতে পারবে। এজন্য পরিবহন, আবাসন ও খাবারের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আস্থার ফাটল

তবে ঐক্য ও ভক্তির মধ্যে বিশ্লেষকরা লক্ষ্য করেছেন, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনগণের সমর্থন অনেকটাই কমে গেছে। দেশজুড়ে অনেক ইরানি কয়েক দশকের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের নামে চালানো দমনে ক্লান্ত ও ক্ষুব্ধ। এই বিপ্লবের কথা দেশটির বর্তমান তরুণ প্রজন্মের বেশির ভাগেরই মনে নেই।

গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে মুদ্রাস্ফীতির কারণে শুরু হওয়া বিক্ষোভে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। তখন অনেকেই খামেনির মৃত্যু চেয়ে স্লোগান দিয়েছিল। এরমধ্যে কর্তৃপক্ষ হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গুলি করে বলে অভিযোগ ওঠে। যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে খামেনির নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তেহরানের কিছু এলাকার বাসিন্দারা ঘরের জানালা ও অ্যাপার্টমেন্টের আড়াল থেকে আনন্দের উল্লাস ধ্বনি শোনার কথা জানিয়েছিলেন।

আয়াতুল্লাহর মর্যাদা

তবে আয়াতুল্লাহ খামেনি কেবল একজন সাধারণ রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন প্রভাবশালী শিয়া মুসলিম ধর্মগুরু। যার অনুসারী রয়েছে ইরাক, পাকিস্তান, লেবাননসহ অন্যান্য এশীয় দেশে। যেখানে শিয়াদের সমাবেশে প্রায়ই তার প্রতিকৃতি দেখা যায়। শিয়া ধর্মীয় পদমর্যাদায় খামেনিকে একজন ‘মারজা’ হিসেবে বিবেচনা করা হত। যার অর্থ হলো, বিশ্বজুড়ে অনেক শিয়া মুসলমান তাদের ধর্মীয় বিধিবিধানের ক্ষেত্রে তাকে অনুসরণ করতেন।

যদিও অনেক শিয়া পণ্ডিত ইরাকের গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলি সিস্তানিকে এই সম্প্রদায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা বলে মনে করেন। তবে আরব বিশ্বজুড়ে শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকারের মিত্রতার কারণে খামেনির রাজনৈতিক প্রভাব ছিল অতুলনীয়। তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের প্রধান ছিলেন। যা লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো শিয়া শক্তিগুলোকে সমর্থন জুগিয়ে আসছিল।

উপস্থিতির আহ্বান

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ‘সমস্ত ইরানি জনগণকে উপস্থিতির মাধ্যমে ইসলামিক ইরানের ইতিহাসে একটি গৌরবময় পাতা লেখার’ আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার গালিবাফ এক বিবৃতিতে আরও বলেন, “এই জাতির প্রতিশোধের ডাক যেন গোটা বিশ্বের কানে প্রতিধ্বনিত হয়।”

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও “প্রতিটি জাতি, ধর্ম, মত ও রাজনৈতিক ধারার” ইরানিদের এই জানাজায় যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

এর আগে বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে পেজেশকিয়ান বলেন, “আপনাদের ব্যাপক উপস্থিতি হবে সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি দাঁতভাঙা জবাব। এটি বিশ্বের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে যে, ইরানি জাতি তার স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ ও সংহতিবদ্ধ।”

প্রতিরোধের শক্তি

ইরানের সরকার এই জানাজাকে জাতীয় ঐক্য এবং সম্মিলিত শোকের একটি মুহূর্ত হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। জানাজার অফিসিয়াল কমিটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত প্রতীকে আয়াতুল্লাহ খামেনির একটি স্লোগান লেখা হয়েছে, “আমাদের অবশ্যই জেগে উঠতে হবে।”

তবে তেহরান এখন থমথমে এবং শান্ত। আনুষ্ঠানিকতা শেষে খামেনির মরদেহ ইরাকের শহর নাজাফ ও কারবালায় নিয়ে যাওয়া হবে। এরপর ৯ জুলাই খামেনির জন্মস্থান ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের ইমাম রেজার মাজারে দাফন করা হবে।

সম্পর্কিত