ads

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থক কেন এত বেশি?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থক কেন এত বেশি?
টিএসসিতে বড় পর্দায় দেখানো হচ্ছে আর্জেন্টিনার ফুটবল খেলা। ছবি: চরচা

চার বছর পর পর বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই বদলে যায় বাংলাদেশের চিত্র। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম — সবখানেই দুটি দলের জয়জয়কার, লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের। পতাকা ও জার্সিতে দেশ দুটির প্রতি নিজেদের ভালোবাসা তুলে ধরেন কোটি সমর্থক। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লিওনেল মেসিকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যে মাতামাতি চলছে, তা নজরে আসছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও।

অথচ ১৭ কোটি মানুষের এই দেশ কখনোই ফুটবল বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি। দুনিয়ার বুকে বাংলাদেশই সম্ভবত একমাত্র দেশ, যেখানে নিজ দেশ বিশ্বকাপ না খেলতে পারলেও সেই দেশের মানুষ মেতে থাকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের এক দেশকে নিয়ে। আরও বিশেষ করে বললে বিশেষ কয়েকজন তারকাকে নিয়ে। ব্রাজিলের ক্ষেত্রে পেলে অনেক পুরনো প্রজন্মের হওয়ায় আধুনিক সময়ে তাকে নিয়ে হৈচৈ কমই হয়।

ম্যারাডোনা থেকেই শুরু

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে ঢাকার বসবাস করা ৫০ বছর বয়সী আবদুল হাই তুলে ধরেছেন তার আর্জেন্টিনা প্রেমের কথা। তার সমবয়সী আরও অনেকের মত অবধারিতভাবে সেখানে উঠে আসে ডিয়েগো ম্যারাডোনার কথা।

তিনি বলেন, “১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনাকে দেখেই আর্জেন্টিনার প্রেমে পড়েছিলাম। তার খেলা, আবেগ, দক্ষতা — সবকিছুই আমাদের মুগ্ধ করেছিল।”

তরুণ বয়সে ম্যারাডোনার প্রেমে পড়া আবদুল হাই এখন মেতেছেন তার যোগ্য উত্তরসূরি মেসিকে নিয়ে, “২০২২ সালে মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি দেখে আমার দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হয়েছে। এবার অনেক বেশি স্বস্তি ও আনন্দ নিয়ে তাই বিশ্বকাপটা দেখতে পারছি।”

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তার গল্প

সাবেক জাতীয় ফুটবলার ও কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক আল জাজিরাকে বলেছেন, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-সমর্থনের মূল ভিত্তি তৈরি হয় ১৯৮৬ বিশ্বকাপ থেকেই।

তার মতে, “ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার সেই ম্যাচ আর বিশ্বকাপ জয় বাংলাদেশের মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। এরপর ১৯৯০ সালের ফাইনালে ম্যারাডোনার কান্না সাধারণ মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। মূলত তখন থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থন স্থায়ী রূপ পায়।”

খুব কাছ থেকে সেই সময়টা দেখার কারণে শফিকুল ইসলাম জানেন, কীভাবে এক ম্যারাডোনার হাত ধরেই বাংলাদেশে ব্রাজিল ভক্তদের একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান হয়।

তিনি বলেন, “ব্রাজিলের জনপ্রিয়তা আগে থেকেই ছিল। তবে ১৯৮৬ সালের পর আর্জেন্টিনা ব্রাজিলের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতিতে জায়গা করে নেয়। পরে সেটা সমানে-সমান হয়ে যায়।”

শফিকুল ইসলাম যেমনটা বলেছেন, সেই ১৯৮৬ বিশ্বকাপ দিয়েই বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেন ম্যারাডোনা। তার জাদুকরী পারফরম্যান্স সদ্য রঙিন টেলিভিশন জগতে প্রবেশ করা বাংলাদেশের মানুষকে বিমোহিত করে তোলে। ৮২ বিশ্বকাপে কিছু সংখ্যক ম্যাচ বাংলাদেশ টেলিভিশনে দেখানো হলেও ৮৬ সালে সেটা বেড়ে যায় অনেক। ফলে বিশ্বকাপ জুড়ে ম্যারাডোনা জাদুকরী পারফরম্যান্স একটা প্রজন্মকে আর্জেন্টিনার ভক্ত বানিয়ে ফেলে।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার সেই ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল বা একই ম্যাচে গোল অব দ্য সেঞ্চুরি খ্যাত গোল দুটি তাকে বাংলাদেশে তারকা খ্যাতি এনে দেয়। সেবার ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ে তাই এশিয়ার এই ছোট দেশের মানুষকেও যেন দিয়েছিল বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ। হাল সময়ের মত পতাকা ও জার্সির নিয়ে মাতামাতি না হলেও আনন্দের রেশ ঠিকই ছিল।

এরপর ১৯৯০ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার কান্নাভেজা বিদায় বাংলাদেশে তার সমর্থকদেরও কাঁদায়। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার আগেভাগে বিদায়ে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে এই দেশেও। সেই শুরু। ম্যারাডোনা অবসর নিলেও একটুও কমেনি আর্জেন্টিনার প্রতি তাদের ভালোবাসার। সময়ের পরিক্রমায় সেটা বরং আরও বেড়েছে। গাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, আরিয়েল ওর্তেগারা মাঝে কিছুটা সময় পেয়েছেন জনপ্রিয়তা।

মেসির প্রজন্ম

ম্যারাডোনার পর বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মাঝে সত্যিকারের মাতামাতি শুরু হয় মেসিকে নিয়েই। ২০০৬ বিশ্বকাপে অবশ্য তিনি অনেকটাই অচেনা ছিলেন। ২০১০ সালে মেসি নিজেকে বিশ্ব ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেন। আর্জেন্টিনা ভক্তদের আনন্দ বাড়িয়ে সেই আসরে কোচ ছিলেন আবার ম্যারাডোনা। যদিও শেষ পর্যন্ত তাদের হতাশ করে শেষ আটেই বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। তবে তাতে একটুও কমেনি মেসিকে নিয়ে উন্মাদনা।

টিএসসিতে আর্জেন্টাইন ভক্তদের উল্লাস। ছবি: চরচা
টিএসসিতে আর্জেন্টাইন ভক্তদের উল্লাস। ছবি: চরচা

নতুন প্রজন্মের কাছে ম্যারাডোনার চেয়ে মেসিই বড় ফুটবলার। ঢাকার বেসরকারি চাকরিজীবী দ্বিন ইসলাম যেমন বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকেই মেসির জন্য আর্জেন্টিনাকে পছন্দ করি।”

আবার মোহাম্মদ জাহির জানান, উত্তরাধিকারসূত্রে আর্জেন্টিনা-সমর্থক, “আমার বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিলেন। পরে আমি নিজেও তাদের খেলার প্রেমে পড়ে যাই।”

বিশ্বকাপের ম্যাচ ভোররাতে হলেও আর্জেন্টিনার খেলা দেখতে ঘুম ভাঙাতে অ্যালার্মের প্রয়োজন হয় না বলে হাসতে হাসতেই জানান তিনি।

মেসির প্রজন্ম

নতুন প্রজন্মের সমর্থকদের কাছে ম্যারাডোনার চেয়ে মেসিই বড় নায়ক।

বেসরকারি চাকরিজীবী দ্বিন ইসলাম বলেন, "ছোটবেলা থেকেই মেসির জন্য আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসি।"

তবে বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবার রয়েছে, যেখানে বাবা-মা আর্জেন্টিনা সমর্থক ছিলেন এবং পরের প্রজন্ম সেখান থেকেই দলটির ভক্ত হয়ে গেছেন।

ছবি: চরচা
ছবি: চরচা

ঢাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ জাহিরও উত্তরাধিকারসূত্রে আর্জেন্টিনা সমর্থক হয়ে গেছেন, “বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিলেন। পরে নিজেও তাদের খেলার প্রেমে পড়ে যাই।”

তিনি আরও বলেন, “বিশ্বকাপের ম্যাচ ভোর রাতে হলেও শুধু আর্জেন্টিনার খেলা দেখতে ঘুম ভাঙার জন্য অ্যালার্মের দরকার হয় না।”

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার লড়াই

বাংলাদেশে এখনো বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিলের লড়াই। পেলে, ম্যারাডোনা, রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিয়ো থেকে শুরু করে হাল সময়ের মেসি কিংবা নেইমাররা প্রতিটি প্রজন্মেই এই দুই দলে এমন তারকা ছিলেন, যারা মানুষের আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।

সেটা এতোটাই যে, প্রায়ই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তর্ক লেগে যায়। কোথাও বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক, আবার মা ব্রাজিলের। দুই ভাই বা ভাই বোন দুই দলের সমর্থক হয়েও তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এলাকাভিত্তিক মারামারিতে হাতাহাতি, মারামারির ঘটনাও নিয়মিত।

ফুটবল থেকে কূটনীতি

বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-প্রেম শুধু ফুটবলে সীমাবদ্ধ থাকেনি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে ছড়িয়ে পড়েছে কূটনীতিতেও।

২০২২ বিশ্বকাপে মেসির আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ে বাংলাদেশের সমর্থকদের উন্মাদনা বিশ্ব জুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর ২০২৩ সালে ৪৫ বছর পর ঢাকায় দূতাবাস চালু করে আর্জেন্টিনা। যদিও এই সিদ্ধান্তটির পেছনে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ও ছিল। তবে ফুটবল দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সেই ধারায় বর্তমানে ঢাকায় নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা নিয়মিত বাংলাদেশের সমর্থকদের সঙ্গে বড় পর্দায় খেলা উপভোগ করেন। গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো দেখতে তো আর্জেন্টিনা থেকে কয়েকজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরও এসেছেন বাংলাদেশের।

এবারের বিশ্বকাপেও মেসি ও আর্জেন্টিনাকে নিয়ে ভক্তদের পাগলামির ভিডিও ক্লিপস নিয়মিত প্রকাশ পাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। ফিফাও আছে সেই তালিকায়। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে মেসির হ্যাটট্রিকের পর ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় হাজারো সমর্থক রাস্তায় নেমে আসেন উদযাপন করতে। আর্জেন্টিনার পতাকা গায়ে জড়িয়ে, ঢাক-ঢোল বাজিয়ে, ‘মেসি, মেসি’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ওলি-গলি। দৃশ্যটি দেখে মনে হবে যেন বুয়েনস আইরেসে আছেন, ঢাকায় নয়।

আর এভাবেই ফুটবলের দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা প্রকাশ পাচ্ছে যুগ যুগ ধরে। ম্যারাডোনা থেকে শুরু মেসির প্রজন্মের এই সমর্থন বিশ্ব ফুটবলের সুন্দরতম এক দৃষ্টান্ত।

সম্পর্কিত