মেরিনা মিতু

রাজনীতিতে গান কখনো কখনো শুধু গান হিসেবে থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে ইঙ্গিত, প্রতীক, কিংবা সময়ের ভাষা।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভ্যারিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটির ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছিল বাংলাদেশের জনপ্রিয় গান, “আমার বন্ধু মহাজাদু জানে…।” গানটির ব্যবহার ছিল দুই নেতার উষ্ণ সম্পর্ক এবং সফরের ইতিবাচক আবহ তুলে ধরার জন্য।
ভিডিওটি প্রকাশের পর সেটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা তৈরি হয়। কূটনৈতিক অঙ্গনও এটিকে কেবল একটি গান হিসেবে দেখেননি; বরং প্রশ্ন তুলেছে–বাংলাদেশ কি নতুন এক পররাষ্ট্রনীতির বার্তা দিচ্ছে?
সেই প্রশ্নের উত্তর মেলার আগেই ঘটল আরেকটি ঘটনা।
প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর ভারত ঘোষণা দেয়, বাংলাদেশিদের জন্য আবারও ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হচ্ছে। নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার দিনই ঢাকায় এই ঘোষণা আসে। ২৮ জুন থেকে আবেদনও শুরু হয়।
সময়টা এমন, যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরে চীনে। আর ঠিক সেই সফরের মাঝপথেই আসে ভারতীয় ভিসা চালুর ঘোষণা।
সময়ের এই মিলই এখন কূটনৈতিক মহলের আলোচনার কেন্দ্র। এটি কি নিছক কাকতাল? নাকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরে ভারতের পরিবর্তে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া দিল্লিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে?
সম্পর্ক ঠিক হতে হতে কেন বারবার আটকে যায়?
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক গত দুই বছরে এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে প্রতিবার সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিললেও নতুন কোনো ঘটনা আবার সেই প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিয়েছে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্ক ছিল অন্যতম শীতল পর্যায়ে।
তারপর ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অস্বস্তি তৈরি করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খোদ সরকারপ্রধান এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নানা উক্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্কে উত্তাপ ছড়ায়। সেই উত্তাপ বাড়তে থাকে।
ওই সময় ভিসা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, সীমান্ত উত্তেজনা, হাইকমিশনার তলব–সব মিলিয়ে সম্পর্ক নেমে যায় দীর্ঘদিনের সবচেয়ে কঠিন অবস্থানে।

চলতি বছর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অবশ্য দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগও বাড়তে শুরু করে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার দুই মাসের মধ্যে গত এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর দুই সরকারের মধ্যে জমে থাকা বরফ গলানোর কাজ করেছে। ঢাকার বড় ধনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেটাই ছিল প্রথম উচ্চপর্যায়ের কোনো বৈঠক।
কিন্তু সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আগেই নতুন বিতর্ক তৈরি হয়, যখন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান দিল্লি বিমানবন্দরে ‘হেনস্তার’ অভিযোগে দেশে ফিরে আসেন।
এর আগেই সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করে। বাংলাদেশ অভিযোগ করে, একাধিকবার ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মানুষকে জোর করে সীমান্ত পার করানোর চেষ্টা করেছে।
দিল্লি যখন অপেক্ষায়, ঢাকা তখন বেইজিংয়ের দিকে
সরকার গঠনের পর কূটনৈতিক মহলে একটি ধারণা ছিল–প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বড় দ্বিপক্ষীয় সফর হবে ভারত। সেই প্রত্যাশার পেছনে কারণও ছিল।
ভারত প্রকাশ্যে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের যোগাযোগ, ফোনালাপ এবং কূটনৈতিক আলোচনা তখন নিয়মিত চলছিল।
সেই জল্পনা আরও বাড়ে, যখন চলতি বছরের এপ্রিলে দেশের কয়েকটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত সংবাদও প্রকাশিত হয় যে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হবে ভারতে। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই খবর সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য, সময় বা সূচি–কোনোটিই তখন চূড়ান্ত হয়নি।
সে সময় প্রেস উইং-এর একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় চরচা প্রতিবেদকের। তারা জানান, মূলত ‘দিল্লি না ঢাকা’ দেশের এমন এক রাজনৈতিক চাপে ভারতের প্রতি আগ্রহ দেখাতে পারছে না সরকার। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রথম সফর ভারতেই হতে পারে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই জল্পনার অবসান ঘটে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম বিদেশ সফরের জন্য বেছে নেন মালয়েশিয়া ও চীনকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি সফর ছিল না; বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার সম্পর্কে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।

বেইজিং সফরে বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, নতুন বিনিয়োগ, অবকাঠামো সহযোগিতা এবং তিস্তা-সংক্রান্ত সহযোগিতাসহ একাধিক বিষয়ে আলোচনা করে। একই সঙ্গে দুই দেশ বেশ কয়েকটি সমঝোতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়।
আর ঠিক যখন বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সি চিনপিং-এর বৈঠক চলছে, তখনই ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দেন–২৮ জুন থেকে বাংলাদেশিদের জন্য আবার ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হচ্ছে।
এই সময় নির্বাচনই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয়। এখানেই প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কূটনীতিক চরচাকে বলেন, “ডিপ্লোমেসিতে সরাসরি কারণ বা ফলাফল বলা কঠিন। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে টাইমিং নিজেই অনেক সময় একটি বার্তা বহন করে। বাংলাদেশ যখন প্রকাশ্যে দেখাচ্ছে যে, তারা কেবল একটি শক্তির ওপর নির্ভর করছে না, বরং চীন, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ একাধিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে–তখন ভারতের পক্ষ থেকেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়েছে।”
দিল্লির এই সিদ্ধান্ত কাকতাল নাকি চাপ?
প্রধানমন্ত্রীর সফরের ভিডিওতে ব্যবহৃত ‘মহাজাদু’ গান নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেক ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছিল।
দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা ভিসা হঠাৎ খুলে যাওয়া সেই আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে। তবে কূটনীতিতে জাদু বলে কিছু নেই। আছে জাতীয় স্বার্থ, ভূরাজনীতি, অর্থনীতি এবং সময় বুঝে নেওয়া সিদ্ধান্ত।
হতে পারে, চীন সফর দিল্লিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। কিংবা এটি বহুদিন ধরেই প্রস্তুত থাকা একটি সিদ্ধান্ত, যার ঘোষণা এসেছে কেবল সুবিধাজনক সময়ে।
কূটনীতিতে কারণ সাধারণত একটি হয় না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কূটনীতিক এবং বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের ছয়জন নেতার সঙ্গে কথা বলে এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্তত তিনটি বড় ব্যাখ্যা সামনে আসছে।
প্রথমত, ভূরাজনীতি। তাদের মতে, বাংলাদেশ ক্রমশ একটি ‘ব্যালান্সিং’ বা ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। চীন, মালয়েশিয়া, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য–সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা করছে। এই বাস্তবতায় ভারতও হয়তো বুঝতে পারছে, কেবল অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে প্রভাব ধরে রাখা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, জনগণের যোগাযোগ। ভারতের নতুন হাইকমিশনার ভিসা চালুর ঘোষণা দিতে গিয়ে স্পষ্টভাবে বলেন, এর মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা। দীর্ঘদিন বাংলাদেশি পর্যটক না থাকায় ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের চিকিৎসা, হোটেল, খুচরা ব্যবসা ও পর্যটন খাত উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন ব্যবসায়ী মহল দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিল। ফলে ভিসা পুনরায় চালুর পেছনে অর্থনৈতিক প্রয়োজনও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তাহলে কি চীন সফরের চাপেই দিল্লির এই সিদ্ধান্ত? এমন প্রশ্নের জবাবে সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী চরচাকে বলেন, “এটা সরাসরি বলা যায় না। তবে চীন সফর, মালয়েশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং একই সময়ে ভারতের ভিসা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত এই তিনটি ঘটনা মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন বার্তা তৈরি করেছে।”
ওই প্রতিমন্ত্রীর মতে, বাংলাদেশ এখন আর একমুখী কূটনীতি নয়; বরং বহুমাত্রিক অংশীদারত্বের পথে হাঁটতে চাইছে। আর সেই বাস্তবতায় ভারতও জনগণের যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সম্পর্কের নতুন ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী চরচাকে বলেন, “বাংলাদেশ এখন এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চাইছে, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলাই অগ্রাধিকার।”
সম্পর্ক সত্যিই স্বাভাবিক হচ্ছে?
সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ, ভিসা চালু হলেও অমীমাংসিত থেকে গেছে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো।
সীমান্তে পুশ-ইনের অভিযোগ এখনো রয়েছে। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হয়নি। চলতি বছরের শেষ হচ্ছে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ।
ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার বিষয়টিও দুই দেশের সম্পর্কে সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবেই রয়ে গেছে।
অর্থাৎ, ভিসা চালু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সম্পর্কের বড় পরীক্ষাগুলো এখনো সামনে।

রাজনীতিতে গান কখনো কখনো শুধু গান হিসেবে থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে ইঙ্গিত, প্রতীক, কিংবা সময়ের ভাষা।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভ্যারিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটির ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছিল বাংলাদেশের জনপ্রিয় গান, “আমার বন্ধু মহাজাদু জানে…।” গানটির ব্যবহার ছিল দুই নেতার উষ্ণ সম্পর্ক এবং সফরের ইতিবাচক আবহ তুলে ধরার জন্য।
ভিডিওটি প্রকাশের পর সেটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা আলোচনা তৈরি হয়। কূটনৈতিক অঙ্গনও এটিকে কেবল একটি গান হিসেবে দেখেননি; বরং প্রশ্ন তুলেছে–বাংলাদেশ কি নতুন এক পররাষ্ট্রনীতির বার্তা দিচ্ছে?
সেই প্রশ্নের উত্তর মেলার আগেই ঘটল আরেকটি ঘটনা।
প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর ভারত ঘোষণা দেয়, বাংলাদেশিদের জন্য আবারও ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হচ্ছে। নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার দিনই ঢাকায় এই ঘোষণা আসে। ২৮ জুন থেকে আবেদনও শুরু হয়।
সময়টা এমন, যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফরে চীনে। আর ঠিক সেই সফরের মাঝপথেই আসে ভারতীয় ভিসা চালুর ঘোষণা।
সময়ের এই মিলই এখন কূটনৈতিক মহলের আলোচনার কেন্দ্র। এটি কি নিছক কাকতাল? নাকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরে ভারতের পরিবর্তে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া দিল্লিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে?
সম্পর্ক ঠিক হতে হতে কেন বারবার আটকে যায়?
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক গত দুই বছরে এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে প্রতিবার সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিললেও নতুন কোনো ঘটনা আবার সেই প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিয়েছে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্ক ছিল অন্যতম শীতল পর্যায়ে।
তারপর ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অস্বস্তি তৈরি করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খোদ সরকারপ্রধান এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নানা উক্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্কে উত্তাপ ছড়ায়। সেই উত্তাপ বাড়তে থাকে।
ওই সময় ভিসা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, সীমান্ত উত্তেজনা, হাইকমিশনার তলব–সব মিলিয়ে সম্পর্ক নেমে যায় দীর্ঘদিনের সবচেয়ে কঠিন অবস্থানে।

চলতি বছর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অবশ্য দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগও বাড়তে শুরু করে। বিএনপি ক্ষমতায় আসার দুই মাসের মধ্যে গত এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর দুই সরকারের মধ্যে জমে থাকা বরফ গলানোর কাজ করেছে। ঢাকার বড় ধনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেটাই ছিল প্রথম উচ্চপর্যায়ের কোনো বৈঠক।
কিন্তু সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আগেই নতুন বিতর্ক তৈরি হয়, যখন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান দিল্লি বিমানবন্দরে ‘হেনস্তার’ অভিযোগে দেশে ফিরে আসেন।
এর আগেই সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করে। বাংলাদেশ অভিযোগ করে, একাধিকবার ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মানুষকে জোর করে সীমান্ত পার করানোর চেষ্টা করেছে।
দিল্লি যখন অপেক্ষায়, ঢাকা তখন বেইজিংয়ের দিকে
সরকার গঠনের পর কূটনৈতিক মহলে একটি ধারণা ছিল–প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বড় দ্বিপক্ষীয় সফর হবে ভারত। সেই প্রত্যাশার পেছনে কারণও ছিল।
ভারত প্রকাশ্যে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের যোগাযোগ, ফোনালাপ এবং কূটনৈতিক আলোচনা তখন নিয়মিত চলছিল।
সেই জল্পনা আরও বাড়ে, যখন চলতি বছরের এপ্রিলে দেশের কয়েকটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত সংবাদও প্রকাশিত হয় যে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হবে ভারতে। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই খবর সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য, সময় বা সূচি–কোনোটিই তখন চূড়ান্ত হয়নি।
সে সময় প্রেস উইং-এর একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় চরচা প্রতিবেদকের। তারা জানান, মূলত ‘দিল্লি না ঢাকা’ দেশের এমন এক রাজনৈতিক চাপে ভারতের প্রতি আগ্রহ দেখাতে পারছে না সরকার। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রথম সফর ভারতেই হতে পারে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই জল্পনার অবসান ঘটে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম বিদেশ সফরের জন্য বেছে নেন মালয়েশিয়া ও চীনকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি সফর ছিল না; বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার সম্পর্কে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।

বেইজিং সফরে বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, নতুন বিনিয়োগ, অবকাঠামো সহযোগিতা এবং তিস্তা-সংক্রান্ত সহযোগিতাসহ একাধিক বিষয়ে আলোচনা করে। একই সঙ্গে দুই দেশ বেশ কয়েকটি সমঝোতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়।
আর ঠিক যখন বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সি চিনপিং-এর বৈঠক চলছে, তখনই ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দেন–২৮ জুন থেকে বাংলাদেশিদের জন্য আবার ট্যুরিস্ট ভিসা চালু হচ্ছে।
এই সময় নির্বাচনই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয়। এখানেই প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কূটনীতিক চরচাকে বলেন, “ডিপ্লোমেসিতে সরাসরি কারণ বা ফলাফল বলা কঠিন। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে টাইমিং নিজেই অনেক সময় একটি বার্তা বহন করে। বাংলাদেশ যখন প্রকাশ্যে দেখাচ্ছে যে, তারা কেবল একটি শক্তির ওপর নির্ভর করছে না, বরং চীন, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ একাধিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে–তখন ভারতের পক্ষ থেকেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়েছে।”
দিল্লির এই সিদ্ধান্ত কাকতাল নাকি চাপ?
প্রধানমন্ত্রীর সফরের ভিডিওতে ব্যবহৃত ‘মহাজাদু’ গান নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেক ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছিল।
দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা ভিসা হঠাৎ খুলে যাওয়া সেই আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে। তবে কূটনীতিতে জাদু বলে কিছু নেই। আছে জাতীয় স্বার্থ, ভূরাজনীতি, অর্থনীতি এবং সময় বুঝে নেওয়া সিদ্ধান্ত।
হতে পারে, চীন সফর দিল্লিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। কিংবা এটি বহুদিন ধরেই প্রস্তুত থাকা একটি সিদ্ধান্ত, যার ঘোষণা এসেছে কেবল সুবিধাজনক সময়ে।
কূটনীতিতে কারণ সাধারণত একটি হয় না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কূটনীতিক এবং বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের ছয়জন নেতার সঙ্গে কথা বলে এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্তত তিনটি বড় ব্যাখ্যা সামনে আসছে।
প্রথমত, ভূরাজনীতি। তাদের মতে, বাংলাদেশ ক্রমশ একটি ‘ব্যালান্সিং’ বা ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। চীন, মালয়েশিয়া, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য–সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা করছে। এই বাস্তবতায় ভারতও হয়তো বুঝতে পারছে, কেবল অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে প্রভাব ধরে রাখা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, জনগণের যোগাযোগ। ভারতের নতুন হাইকমিশনার ভিসা চালুর ঘোষণা দিতে গিয়ে স্পষ্টভাবে বলেন, এর মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা। দীর্ঘদিন বাংলাদেশি পর্যটক না থাকায় ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের চিকিৎসা, হোটেল, খুচরা ব্যবসা ও পর্যটন খাত উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন ব্যবসায়ী মহল দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিল। ফলে ভিসা পুনরায় চালুর পেছনে অর্থনৈতিক প্রয়োজনও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তাহলে কি চীন সফরের চাপেই দিল্লির এই সিদ্ধান্ত? এমন প্রশ্নের জবাবে সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী চরচাকে বলেন, “এটা সরাসরি বলা যায় না। তবে চীন সফর, মালয়েশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং একই সময়ে ভারতের ভিসা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত এই তিনটি ঘটনা মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন বার্তা তৈরি করেছে।”
ওই প্রতিমন্ত্রীর মতে, বাংলাদেশ এখন আর একমুখী কূটনীতি নয়; বরং বহুমাত্রিক অংশীদারত্বের পথে হাঁটতে চাইছে। আর সেই বাস্তবতায় ভারতও জনগণের যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সম্পর্কের নতুন ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী চরচাকে বলেন, “বাংলাদেশ এখন এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চাইছে, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভর না করে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলাই অগ্রাধিকার।”
সম্পর্ক সত্যিই স্বাভাবিক হচ্ছে?
সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ, ভিসা চালু হলেও অমীমাংসিত থেকে গেছে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো।
সীমান্তে পুশ-ইনের অভিযোগ এখনো রয়েছে। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হয়নি। চলতি বছরের শেষ হচ্ছে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ।
ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার বিষয়টিও দুই দেশের সম্পর্কে সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবেই রয়ে গেছে।
অর্থাৎ, ভিসা চালু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সম্পর্কের বড় পরীক্ষাগুলো এখনো সামনে।