ads

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাচ্ছে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাচ্ছে?
ছবি: এআই

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা মানেই যেন একটু বাড়িয়ে বলা। ২০১৭ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প দুঃখ করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন এক বিধ্বস্ত দেশ। আবার ২০২৫ সালে দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নিয়ে তিনিই ঘোষণা করলেন, “পৃথিবীর সবচেয়ে মহান, শক্তিশালী আর সম্মানিত দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তার সঠিক জায়গাটি ফিরে পাবে।”

ব্রিটিশ সাময়িকি দ্য ইকোনোমিস্টের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, খোদ মার্কিনিরাই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান নিয়ে বেশ হতাশ। প্রতি ১০ জনের মধ্যে ছয়জনই মনে করেন, ২০৫০ সালের মধ্যে দুনিয়াজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব আজকের চেয়ে অনেক কমে যাবে।

কিন্তু আসলেই কি বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা কমছে? আর যুক্তরাষ্ট্রের এই শক্তির আসল রহস্যটাই বা কী? এই প্রশ্নগুলো নিয়ে রাজনীতিবিদরা প্রায়ই নানা মন্তব্য করেন। আর তাদের এই মন্তব্যগুলোই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে জিততে, দেশের নীতি ঠিক করতে এবং পুরো বিশ্বকে বদলে দিতে বড় ভূমিকা রাখে।

তাই যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে, ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষমতার একটি চিত্র তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থনৈতিক, সামরিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে দেশটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি ধনী, শক্তিশালী এবং বুদ্ধিমান।

তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সেই আগের অবস্থানটি আর নেই। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য দিন দিন কমছে। আর এখন এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে যা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ক্ষমতার দিককে আরও শক্তিশালী করবে, কিন্তু অন্য দিকগুলোকে একদম দুর্বল করে দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের উন্নতি যে এই রকেটের গতিতে এগোচ্ছে, তা সবচেয়ে সহজে বোঝা যায় দেশটির অর্থনীতির উত্থান দেখলে। ১৮২০ সালের কথা, যখন থেকে অর্থনৈতিক তুলনামূলক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র ছিল মাত্র ১ কোটি মানুষের ছোট্ট একটি দেশ। এই জনসংখ্যার মধ্যে ছিল ইউরোপীয় অভিবাসী, কৃষ্ণাঙ্গ দাস এবং যুক্তরাষ্ট্রের আদি বাসিন্দারা।

তখন দেশটির ভূখণ্ড বা জমির আকারও ছিল বর্তমানের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। আর দেশটির অর্থনীতি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মাত্র ১০ ভাগের এক ভাগ। এমনকি সেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যও তখন ছিটকে গিয়েছিল কিং রাজবংশের চীনের কাছে, কারণ সে সময় দুনিয়ার মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় চার ভাগের এক ভাগই নিয়ন্ত্রণ করত চীন।

যুদ্ধ, উপনিবেশ স্থাপন এবং শিল্প বিপ্লবের ওপর ভর করে ১৮৪০ সালের দিকে চীনকে টপকে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। এইসময় চলছিল এই দুই দেশের মধ্যে প্রথম আফিম যুদ্ধ। তবে যুক্তরাষ্ট্রও খুব দ্রুত তাদের ধরে ফেলছিল।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

১৭৯৩ সালে তুলা থেকে বীজ ছাড়ানোর যন্ত্র কটন জিন আবিষ্কার এবং দাসদের ওপর চালানো অমানুষিক নির্যাতনের ওপর ভিত্তি করে ১৮৫০-এর দশকের মধ্যেই বিশ্বের বেশিরভাগ তুলা উৎপাদন করতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র । প্রায়শই রক্তক্ষয়ী সহিংসতার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম দিকে নিজেদের ভূখণ্ড বাড়াতে থাকে এবং এমন সব প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ পায়, যা পুরো বিশ্বের কাছে ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিস্তীর্ণ বনভূমি থেকে আসা কাঠ দিয়ে দ্রুত নগরায়ন ও ঘরবাড়ি তৈরির কাজ চলতে থাকে। চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থানে থাকা বন্দর আর বিশাল মিসিসিপি নদী পণ্য রপ্তানির পথ সহজ করে দেয়। পেনসিলভেনিয়া, অ্যাপালাচিয়া ও মিডওয়েস্টের কয়লা খনিগুলো রেলগাড়ি আর কলকারখানার জ্বালানি জোগাতে শুরু করে।

আর গ্রেট লেকসের লোহা আকরিকের বড় বড় ভাণ্ডার সচল করে তোলে ইস্পাত কারখানাগুলোকে। গৃহযুদ্ধ দেশটিকে ক্ষতবিক্ষত করলেও ধ্বংস করতে পারেনি, বরং ১৮৬৫ সালে দাসপ্রথার অবসান ঘটায়। শিল্পায়নের এই তীব্র গতিতে ১৮৯১ সালে জ্বালানি ব্যবহারের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র গ্রেট ব্রিটেনকেও ছাড়িয়ে যায়।

আমাদের হিসাব অনুযায়ী, ১৮৯৯ সালে স্পেন-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং প্যারিস চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র পুয়ের্তো রিকো, গুয়াম ও ফিলিপাইন্সের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছিল। এজন্য তখন রাশিয়া সাম্রাজ্য ছাড়া পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে বেশি উর্বর জমি ছিল। এর মাত্র কয়েক বছর পর, ১৯০৩ সালে, যুক্তরাষ্ট্র পরিণত হয় বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে।

ইউরোপ যখন যুদ্ধে করে শেষ হয়ে যাচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য তখন ততই বাড়ছিল। ১৯৪৫ সালের কথা, যখন পৃথিবীর বড় একটি অংশ যুদ্ধের আগুনে পুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল, ঠিক তখন অন্য দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পৌঁছে যায় একদম চূড়ায়।

পরাশক্তিগুলোর মধ্যে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডই যুদ্ধের আঁচ থেকে অনেকটাই বেঁচে গিয়েছিল। ফলে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশের এই দেশটি একাই পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থনৈতিক উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

এরপর শিল্পকারখানা, সাধারণ মানুষের বিপুল কেনাকাটার চাহিদা এবং জাতীয় গবেষণাগার ও মহাসড়ক তৈরির মতো খাতে সরকারি বিনিয়োগের ওপর ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি রকেটের গতিতে ছুটতে থাকে। এর বড় একটা সুবিধা আসে তেল থেকে। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পেনসিলভেনিয়ায় প্রথম তেলের সন্ধান মেলার পর, ২০ শতকে এসে টেক্সাসের তেলকূপগুলো থেকে যেন আক্ষরিক অর্থেই তেল উথলে উঠতে শুরু করে।

বিগত দশকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল বিনিয়োগ এমন সব সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করেছে যা টিকে থাকে যুগের পর যুগ। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বর্তমানে ১১টি যুদ্ধবিমানবাহী রণতরী রয়েছে, যার একেকটি প্রায় অর্ধশতাব্দী বা ৫০ বছর পর্যন্ত সচল থাকতে পারে। অন্যদিকে চীনের কাছে এমন রণতরী আছে মাত্র তিনটি, যার একটিও এখন পর্যন্ত কোনো যুদ্ধে অংশ নেয়নি।

অন্য কোনো দেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো এত উন্নত সামরিক প্রযুক্তি নেই, কিংবা বড় পরিসরে তা ব্যবহারের এত দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও নেই (যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইউক্রেনের জেনারেলরা এখন কিছুটা এগিয়ে আছেন, যা মূলত টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টা থেকে আসা অভিজ্ঞতা)।

তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের এই মাথা ঘোরানো পতন নিয়ে চারদিকে এত হতাশার সুর কেন? আসলে নিজের শক্তি আর অন্যদের ওপর আধিপত্য-এই দুটির মধ্যে একটা বড় তফাত আছে। এই আধিপত্য শব্দটাই কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম পছন্দের। যুক্তরাষ্ট্র আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি শক্তিশালী, কিন্তু কিছু অর্থনৈতিক সূচকে বিশ্বমঞ্চে তার আগের সেই একচ্ছত্র আধিপত্য এখন আর নেই।

যেমন, গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ কমে ৫৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত কয়েক দশক ধরেই ধীরে ধীরে কমছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিশ্বব্যবস্থা আসলে অন্য দেশগুলোকেও ওপরে উঠতে সাহায্য করেছে। এখন আপনার দেখার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করছে যে আপনি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সফলতা হিসেবে দেখবেন, নাকি ব্যর্থতা হিসেবে।

১৯৪৫ সালের পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতি প্রায় ১৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মানুষের গড় আয় বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। চীনের অভূতপূর্ব উত্থান, বিশেষ করে ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় দেশটির যোগদানের পর থেকে বিষয়টি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চরম ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। প্রায় এক দশক আগেই স্থানীয় বাজারের মূল্য অনুযায়ী চীন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ছবি: রয়টার্স
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ছবি: রয়টার্স

ম্যানুফ্যাকচারিং বা পণ্য উৎপাদন এবং পণ্য রপ্তানি-ট্রাম্পের অতি পছন্দের এই দুটি সূচকেই যুক্তরাষ্ট্রের মোট উৎপাদনের পরিমাণ আগের চেয়ে বাড়লেও, অন্যান্য দেশের তুলনায় তথা তুলনামূলক বিচারে তা অনেক পিছিয়ে পড়েছে। যেমন-১৯৪৫ সালে বিশ্বের মোট উৎপাদিত পণ্যের প্রায় অর্ধেকই তৈরি হতো যুক্তরাষ্ট্রে। অথচ ২০২৪ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশে। যেখানে চীনের বৈশ্বিক উৎপাদন অংশীদারত্ব যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।

যুক্তরাষ্ট্র যে চীনের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ সেবা বা সার্ভিস রপ্তানি করে, সেটিকে ট্রাম্প পাত্তাই দিতে চান না। বরং দৃশ্যমান পণ্য রপ্তানির এই তুলনামূলক কম হার নিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত ক্ষোভ প্রকাশ করে যাচ্ছেন। অন্তত কিছু মানুষের মনে এই ধারণাও তৈরি হয়েছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা সাধারণ নাগরিকদের বিনিয়োগের বিপরীতে খুবই সামান্য ফল এনে দিয়েছে। ইরাক, আফগানিস্তান এবং অতি সম্প্রতি ইরানের দিকে তাকালে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে শুধু সামরিক সক্ষমতা থাকলেই যুদ্ধে জয় নিশ্চিত করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের ওই একঝাঁক বিমানবাহী রণতরীও কিন্তু ইরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ করা থেকে আটকাতে পারছে না, কিংবা চীনকে বিরল খনিজ উপাদান (রেয়ার আর্থস) রপ্তানি সীমিত করা থেকে রুখতে পারছে না।

২০২৪ সালে করা এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০জন মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে প্রায় ছয়জনই মনে করেন অন্য দেশের সাথে বাণিজ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি হয়েছে। ২০১৭ সালে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, “আমাদের মধ্যবিত্তদের সম্পদ তাদের ঘরবাড়ি থেকে কেড়ে নিয়ে পুরো বিশ্বে বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

ডেভিড অটর, ডেভিড ডর্ন এবং গর্ডন হ্যানসনের গবেষণা অনুযায়ী, তথাকথিত চায়না শক একটা প্রভাব অবশ্যই ফেলেছিল, যার কারণে ১৯৯৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে প্রায় ২৪ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছিল। ভুক্তভোগী সেই ব্যক্তিদের জন্য বিষয়টি চরম বেদনাদায়ক হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কর্মসংস্থান বাজারে বড় কোনো ধস নামাতে পারেনি। কারণ, ২০১১ সালের শেষের দিকেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি মাসে স্বাভাবিক নিয়মেই প্রায় ৪০ লাখ চাকরির হাতবদল বা পরিবর্তন হতো।

যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা যে যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধিকে দারুণভাবে ত্বরান্বিত করেছিল, তা স্পষ্ট। ১৯৬০ সালের পর থেকে প্রকৃত আয়ের দিক থেকে বিচার করলে অন্যান্য যেকোনো বড় দেশ বা অঞ্চলের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের আয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এই সময়ে ভারতে মানুষের আয় যতটা বেড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে বেড়েছে তার চেয়ে পাঁচ গুণেরও বেশি। এমনকি চীনের আয়ের তুলনায় তা দ্বিগুণেরও বেশি।

২ কোটির বেশি জনসংখ্যা রয়েছে এমন দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ধনী দেশ। এমনকি এই তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়ার চেয়েও যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের আয় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। ১৯৬০ সালের পর থেকে দেশটির একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের গড় প্রকৃত আয় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য যে একটি বাস্তব সমস্যা এবং ধনী দেশগুলোর গড় হারের চেয়ে তা বেশ উঁচুতে, সেটিও সত্যি। এর পেছনে মূলত সম্পদের ক্রমবর্ধমান রিটার্ন (মুনাফা) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্যাক্স কাঠামোর একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।

ধ্বংস বনাম পুনরুত্থান

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার অনুসারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের হারানো শক্তি ফিরিয়ে আনতে, অথবা অন্ততপক্ষে এর একটি নতুন রূপ দিতে মরিয়া। নতুন ভূখণ্ড এবং সেই সাথে পাওয়া প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি তার আগ্রহ যেন একেবারে ঊনবিংশ শতাব্দীর ধ্যান-ধারণার প্রতিফলন। স্থানীয় বাজারদর অনুযায়ী হিসাব করলে দেখা যায়, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর মোট সামরিক ব্যয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে।

হোয়াইট হাউস ২০২৭ অর্থবছরের জন্য ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রস্তাব করেছে, যা ২০২৬ সালের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেশি। সৈন্যদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য খরচ সমন্বয় করে বিভিন্ন দেশের সাথে তুলনা করলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় এখনো দ্বিগুণ। তবে প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি মিত্রদেশগুলোর সুরক্ষার কোনো গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা নয়। আগামী ৭ ও ৮ জুলাই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ন্যাটো সম্মেলনের মূল আলোচনার বিষয় হবে ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। আর এ ক্ষেত্রে এআই প্রভাব বিস্তারের একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

ইলন মাস্ক। ছবি: রয়টার্স
ইলন মাস্ক। ছবি: রয়টার্স

অন্যদিকে, আগে যেসব খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ প্রভাব ও শক্তি ছিল, সেগুলোকে ট্রাম্প যেন বেশ স্বেচ্ছায় ও সানন্দেই দুর্বল হতে দিচ্ছেন। যেমন গত বছর বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের নির্দেশে ও কথায় দেশটির প্রধান উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডিকে একরকম ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়।

সংস্থাটির বার্ষিক বরাদ্দ কমিয়ে ২৯ বিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা আগের পরিমাণের প্রায় অর্ধেক। ফলে বর্তমান বৈশ্বিক সাহায্য-সহযোগিতার বাজারে যুক্তরাষ্ট্র এখন জার্মানির সমান অনুদান দেয়, অথচ জার্মানির অর্থনীতির আকার যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ।

ঠিক একইভাবে গবেষণা ও উদ্ভাবনী খাতেও যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য হারানোর ঝুঁকি নিয়ে ট্রাম্প একেবারেই চিন্তিত নন। বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৫টিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের, যা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি হলেও এই সংখ্যাটি কিন্তু দিন দিন কমছে। ওএইসিডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালেই গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে চীনের খরচ যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জার্নাল বা সাময়িকীগুলোতে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের এক-তৃতীয়াংশের বেশি লিখছেন চীনা গবেষকরা। এমনকি ২০২৫ সালে তারা একাই সমপরিমাণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জার্মানি ও জাপানের গবেষকদের যৌথ অবদানের সমান।

বিজ্ঞানের সেরা মুকুট—অর্থাৎ নোবেল পুরস্কারের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সবার ওপরে। তবে এটা আসলে অতীতের অর্জনের ফল। কারণ, গত দশ বছরে যারা নোবেল পেয়েছেন, তাদের গড় বয়স ৭২ বছর। অর্থাৎ, এই সাফল্য অনেক আগের গবেষণার। বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার এর হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই ৭ হাজার ৮০০-র বেশি গবেষণার সরকারি অনুদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রায় ২৫ হাজার বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তা সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তাছাড়া পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির আবিষ্কারে প্রতিদ্বন্দ্বীরা এগিয়ে গেলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।

সবচেয়ে বড় ও অবাক করার মতো পরিবর্তন এসেছে অভিবাসন বা ইমিগ্রেশন নিয়ে। যে যুক্তরাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল অভিবাসীদের হাত ধরে, সেই দেশের মানুষেরাই এখন মনে করছে বাইরের মানুষ এসে দেশের ক্ষতি করছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ২০২৫ আর ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে মানুষের আসার হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে যেতে পারে।

গ্যালপ এর জরিপ বলছে, অন্য দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য মানুষের প্রথম পছন্দ এখনো যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেই আগ্রহ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের দিকে যেখানে ২৪ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে আসার স্বপ্ন দেখত, এখন তা কমে মাত্র ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। উল্টোদিকে, ৮৫টি দেশের প্রায় ৪৭ হাজার মানুষের ওপর করা আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, অপছন্দের দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র এখন পৃথিবীর মধ্যে ৫ নম্বরে আছে। এমনকি মানুষ এখন রাশিয়া বা চীনের চেয়েও যুক্তরাষ্ট্রকে বেশি অপছন্দ করছে।

বিশ্বের মানুষের এই মনোভাবের পরিবর্তন হয়তো সাময়িক, যা কেবল একজন অপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ও তার সরকারি নীতিগুলোর ওপর ক্ষোভের কারণে তৈরি হয়েছে। আসলে অন্যতম বড় একটা শক্তি হলো এর গতিশীলতা এবং অবস্থা বুঝে দ্রুত নিজেদের পথ বদলে ফেলার ক্ষমতা। আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বিশ্ব একটা বিষয় খুব সতর্কভাবে খেয়াল করছে, আর তা হলো-দেশটি এখনো অনেক বেশি শক্তিশালী, তবে তারা এখন এক বড় ধরনের পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। 

সম্পর্কিত