তাসীন মল্লিক

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাসকে ঘিরে যে চিত্র দেখা গেছে, তা কেবল সরকার ও বিরোধী দলের প্রচলিত বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর ভেতরে সম্ভাব্য এক ‘অঘোষিত ঐকমত্যের’ ইঙ্গিত রয়েছে।
বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলীয় সদস্যরা ধারাবাহিকভাবে তীব্র সমালোচনা করলেও চূড়ান্ত আইন প্রণয়নের পর্যায়ে তাদের কোনো সংশোধনী প্রস্তাব না থাকা সেই সম্ভাবনাকেই জোরালো করে তুলেছে।
গত মঙ্গলবার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট সংসদে পাস হয়। এতে সরকারি দলের আনা সংশোধনী যুক্ত হলেও বিরোধীদের কোনো প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বাজেট পাসের পরদিন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, চূড়ান্ত বাজেট তাদের ছায়া বাজেটের ‘কাছাকাছি’।
অন্যদিকে একই দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান এটিকে ‘অপরিকল্পিত, অস্বচ্ছ ও অবাস্তবায়নযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন। তবে তিনি আবার দাবি করেন, বিরোধীদের ‘গঠনমূলক অবস্থান’-এর কারণেই বাজেটের কিছু প্রস্তাবে পরিবর্তন এসেছে। এই দ্বৈত বক্তব্য একদিকে সমালোচনা, অন্যদিকে আংশিক সন্তুষ্টির ইঙ্গিত দেয়–যা বিরোধী রাজনীতির কৌশলগত অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
বিরোধীদের এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয়, তারা হয়তো সরাসরি আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের বদলে রাজনৈতিক চাপ ও জনমত তৈরির পথকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে সরকারও সীমিত কিছু সংশোধনের মাধ্যমে সেই চাপকে আংশিকভাবে গ্রহণ করে নিয়েছে।
সংঘাতের ভেতর সমন্বয়?
বাজেট আলোচনায় বিরোধী সদস্যরা করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনে বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার এবং নতুন ভ্যাট আরোপের বিরোধিতা করেছিলেন। চূড়ান্ত বাজেটে সেগুলোরই প্রতিফলন দেখা গেছে। সরকার শেষ পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করে। বিতর্কিত নিবন্ধন বিধান বাতিল এবং তিনটি খাতে নতুন ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। পাশাপাশি মুদি দোকানের ওপর কর প্রত্যাহার, আবাসন খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল এবং ব্যাংক রেজ্যুলুশন আইনের একটি বিধান বাদ দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়। ফলে বিরোধীদল এই পরিবর্তনগুলোকে নিজেদের ‘গঠনমূলক চাপ’-এর ফল হিসেবে তুলে ধরছে।
তবে এই দাবির ভেতরেই একটি প্রশ্ন উঠে আসে। যে বিষয়গুলোতে বিরোধীরা আপত্তি জানিয়েছিল এবং যেগুলো শেষ পর্যন্ত সংশোধিত হয়েছে, সেগুলোতে তারা কেন আনুষ্ঠানিক সংশোধনী প্রস্তাব দেয়নি?
বাজেটের ওপর আলোচনা নিয়ে সংসদে সংসদ সদস্যরা বক্তব্য দেন। তারা এর ওপর তাদের দাবি তুলে ধরেন। কিন্তু অর্থবিল পাসের সময় যেসব সংশোধনী দেন, সেগুলো মূলত আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব। সরকার এর কিছু গ্রহণ করে, কিছু করে না। অনেক সময় সরকারি দলের সদস্যরাও সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মূলত সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু পরিবর্তন আনতে চাইলে সেগুলো এসব সংশোধনীর মাধ্যমে করা হয়।
সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বিলের ওপর সংশোধনী আনা বিরোধীদের একটি মৌলিক হাতিয়ার হলেও এই ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত ছিল। এতে এ ধারণা জোরদার হয় যে, বিরোধীরা সরাসরি আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার বদলে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির পথকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
অন্যদিকে সংশোধনীগুলোর উৎস ও প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো এসেছে মূলত সরকারের ভেতর থেকেই। করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যবাধকতা শিথিল করার মতো প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাজেটের ওপর বক্তৃতার সময় তিনি বলেন, “নরমালি দাবিটা বিরোধী দল থেকে হয়ে থাকে। আমি আপাতত ফিজিক্যালি না হলেও মানসিকভাবে তাদের পাশে গিয়ে কথা বলতে চাই।”
বাজেটের ওপর সমাপনী আলোচনায় তার পুনর্বিবেচনার আহ্বানের পরই অর্থমন্ত্রী সংশোধিত বিলটি সংসদে তোলেন। অর্থাৎ, সংশোধনীগুলো একদিকে বিরোধীদের উত্থাপিত ইস্যুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ন্ত্রণ ছিল সরকারের হাতেই।
প্রশ্ন উঠেছে–এটি কি বিরোধীদের কার্যকর চাপের ফল, নাকি সরকারের কৌশলগত সমন্বয়? একদিকে বিরোধীরা সমালোচনার মাধ্যমে জনমত তৈরি করেছে, অন্যদিকে সরকার সীমিত কিছু সংশোধন এনে সেই চাপ আংশিক প্রশমিত করেছে। ফলে উভয় পক্ষই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ‘সফলতা’ দাবি করতে পারছে।
সব মিলিয়ে, সংশোধনীকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের এই সাফল্য দাবির ভেতরে যেমন রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে, তেমনি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাদের সীমিত অংশগ্রহণের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই দ্বৈততা থেকেই বাজেট বিতর্কে ‘সংঘাতের ভেতরে সমন্বয়’-এর একটি প্রবণতা সামনে আসে, যা ভবিষ্যতের সংসদীয় রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
বাজেট নিয়ে যা বলেছে বিরোধীরা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘সবার জন্য’ বলে উপস্থাপন করলেও বিরোধী দলগুলো শুরু থেকেই এটিকে বাস্তবতা-বিবর্জিত ও জনস্বার্থবিরোধী বলে সমালোচনা করে আসছে। সরকারের দাবি, সীমিত সম্পদের মধ্যেও সব শ্রেণির মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে বিরোধীদের প্রশ্ন–এই অন্তর্ভুক্তি কতটা কার্যকর এবং বাস্তবে কারা এর প্রকৃত সুবিধাভোগী হবে।
বাজেট ঘোষণার আগেই জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছায়া বাজেট দিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে। ১১ জুন জামায়াত প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘গণবিরোধী ও গণনিপীড়ক’ আখ্যা দিয়ে নেমেছিল রাজপথেও। এনসিপি একে ‘প্রতারণামূলক ও দিকনির্দেশনাহীন’ বলে উল্লেখ করে। ফলে রাজনৈতিকভাবে বাজেটকে ঘিরে বিরোধিতার সুর আগেভাগেই তৈরি হয়, যা পরে সংসদীয় আলোচনায় আরও তীব্র রূপ নেয়।
বাজেট অধিবেশনের ১৭তম দিনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অবাস্তব ও প্রতারণার দলিল’ বলে মন্তব্য করেন। দলের অন্য সদস্যরাও এটিকে ‘গণবিরোধী ও বাস্তবায়ন-অযোগ্য’ বলে তীব্র সমালোচনা করেন।
বিরোধীদের মূল আপত্তি ছিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ঘিরে। জামায়াত থেকে নির্বাচিত রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা নুরুল আমিনের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুস্পষ্ট কৌশল নেই, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও সংকুচিত করতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা ও খেলাপি ঋণের লাগামহীনতা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের অভাবকে তিনি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বাজেটকে ‘গরীব মারার বাজেট’ বলার মধ্য দিয়ে আয়-বৈষম্য বৃদ্ধির আশঙ্কা তুলে ধরেন।
নীলফামারী-৪ আসনের আব্দুল মুন্তাকিম অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দের স্বচ্ছতা না থাকায় উন্নয়ন বৈষম্য আড়াল হওয়ার আশঙ্কা দেখান। অন্যদিকে ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন সুদভিত্তিক অর্থনীতির বিকল্প হিসেবে ইসলামী অর্থব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়ে নীতিগত পরিবর্তনের দাবি জানান, যা মূলধারার অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে ভিন্নধর্মী বিতর্ক উসকে দেয়।
এনসিপির আখতার হোসেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলে অতীতের ঋণ কেলেঙ্কারির পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি উল্লেখ করেন। একই সুরে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সংসদে ঋণখেলাপিদের উপস্থিতি নিয়ে সরব হয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার সংকট সামনে আনেন।
এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ‘অঘোষিত ঐকমত্য’-এর প্রশ্নটি আরও গুরুত্ব পায়। কারণ, একদিকে বিরোধীরা বাজেটের মৌলিক কাঠামো নিয়ে কঠোর সমালোচনা অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে সংশোধনী প্রক্রিয়ায় তাদের অনুপস্থিতি বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি নীরব সম্মতির ইঙ্গিত দেয়।
সংসদীয় রাজনীতিতে অনেক সময় প্রকাশ্য বিরোধিতার আড়ালে নীতিগত কিছু বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি হয়, যা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করা হলেও ফলাফলে চোখে পড়ে। বর্তমান বাজেট প্রক্রিয়ায় সেই ধরনের একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যেখানে সরকার সীমিত সমন্বয়ের মাধ্যমে চাপ প্রশমিত করেছে এবং বিরোধীরা সমালোচনার রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেই সেই পরিবর্তনকে নিজেদের সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করছে।

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাসকে ঘিরে যে চিত্র দেখা গেছে, তা কেবল সরকার ও বিরোধী দলের প্রচলিত বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর ভেতরে সম্ভাব্য এক ‘অঘোষিত ঐকমত্যের’ ইঙ্গিত রয়েছে।
বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলীয় সদস্যরা ধারাবাহিকভাবে তীব্র সমালোচনা করলেও চূড়ান্ত আইন প্রণয়নের পর্যায়ে তাদের কোনো সংশোধনী প্রস্তাব না থাকা সেই সম্ভাবনাকেই জোরালো করে তুলেছে।
গত মঙ্গলবার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট সংসদে পাস হয়। এতে সরকারি দলের আনা সংশোধনী যুক্ত হলেও বিরোধীদের কোনো প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বাজেট পাসের পরদিন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, চূড়ান্ত বাজেট তাদের ছায়া বাজেটের ‘কাছাকাছি’।
অন্যদিকে একই দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান এটিকে ‘অপরিকল্পিত, অস্বচ্ছ ও অবাস্তবায়নযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন। তবে তিনি আবার দাবি করেন, বিরোধীদের ‘গঠনমূলক অবস্থান’-এর কারণেই বাজেটের কিছু প্রস্তাবে পরিবর্তন এসেছে। এই দ্বৈত বক্তব্য একদিকে সমালোচনা, অন্যদিকে আংশিক সন্তুষ্টির ইঙ্গিত দেয়–যা বিরোধী রাজনীতির কৌশলগত অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
বিরোধীদের এই অবস্থান ইঙ্গিত দেয়, তারা হয়তো সরাসরি আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের বদলে রাজনৈতিক চাপ ও জনমত তৈরির পথকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে সরকারও সীমিত কিছু সংশোধনের মাধ্যমে সেই চাপকে আংশিকভাবে গ্রহণ করে নিয়েছে।
সংঘাতের ভেতর সমন্বয়?
বাজেট আলোচনায় বিরোধী সদস্যরা করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনে বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার এবং নতুন ভ্যাট আরোপের বিরোধিতা করেছিলেন। চূড়ান্ত বাজেটে সেগুলোরই প্রতিফলন দেখা গেছে। সরকার শেষ পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করে। বিতর্কিত নিবন্ধন বিধান বাতিল এবং তিনটি খাতে নতুন ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। পাশাপাশি মুদি দোকানের ওপর কর প্রত্যাহার, আবাসন খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল এবং ব্যাংক রেজ্যুলুশন আইনের একটি বিধান বাদ দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়। ফলে বিরোধীদল এই পরিবর্তনগুলোকে নিজেদের ‘গঠনমূলক চাপ’-এর ফল হিসেবে তুলে ধরছে।
তবে এই দাবির ভেতরেই একটি প্রশ্ন উঠে আসে। যে বিষয়গুলোতে বিরোধীরা আপত্তি জানিয়েছিল এবং যেগুলো শেষ পর্যন্ত সংশোধিত হয়েছে, সেগুলোতে তারা কেন আনুষ্ঠানিক সংশোধনী প্রস্তাব দেয়নি?
বাজেটের ওপর আলোচনা নিয়ে সংসদে সংসদ সদস্যরা বক্তব্য দেন। তারা এর ওপর তাদের দাবি তুলে ধরেন। কিন্তু অর্থবিল পাসের সময় যেসব সংশোধনী দেন, সেগুলো মূলত আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব। সরকার এর কিছু গ্রহণ করে, কিছু করে না। অনেক সময় সরকারি দলের সদস্যরাও সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মূলত সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু পরিবর্তন আনতে চাইলে সেগুলো এসব সংশোধনীর মাধ্যমে করা হয়।
সংসদীয় প্রক্রিয়ায় বিলের ওপর সংশোধনী আনা বিরোধীদের একটি মৌলিক হাতিয়ার হলেও এই ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত ছিল। এতে এ ধারণা জোরদার হয় যে, বিরোধীরা সরাসরি আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার বদলে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির পথকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
অন্যদিকে সংশোধনীগুলোর উৎস ও প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো এসেছে মূলত সরকারের ভেতর থেকেই। করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যবাধকতা শিথিল করার মতো প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাজেটের ওপর বক্তৃতার সময় তিনি বলেন, “নরমালি দাবিটা বিরোধী দল থেকে হয়ে থাকে। আমি আপাতত ফিজিক্যালি না হলেও মানসিকভাবে তাদের পাশে গিয়ে কথা বলতে চাই।”
বাজেটের ওপর সমাপনী আলোচনায় তার পুনর্বিবেচনার আহ্বানের পরই অর্থমন্ত্রী সংশোধিত বিলটি সংসদে তোলেন। অর্থাৎ, সংশোধনীগুলো একদিকে বিরোধীদের উত্থাপিত ইস্যুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ন্ত্রণ ছিল সরকারের হাতেই।
প্রশ্ন উঠেছে–এটি কি বিরোধীদের কার্যকর চাপের ফল, নাকি সরকারের কৌশলগত সমন্বয়? একদিকে বিরোধীরা সমালোচনার মাধ্যমে জনমত তৈরি করেছে, অন্যদিকে সরকার সীমিত কিছু সংশোধন এনে সেই চাপ আংশিক প্রশমিত করেছে। ফলে উভয় পক্ষই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ‘সফলতা’ দাবি করতে পারছে।
সব মিলিয়ে, সংশোধনীকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের এই সাফল্য দাবির ভেতরে যেমন রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে, তেমনি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাদের সীমিত অংশগ্রহণের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই দ্বৈততা থেকেই বাজেট বিতর্কে ‘সংঘাতের ভেতরে সমন্বয়’-এর একটি প্রবণতা সামনে আসে, যা ভবিষ্যতের সংসদীয় রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
বাজেট নিয়ে যা বলেছে বিরোধীরা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘সবার জন্য’ বলে উপস্থাপন করলেও বিরোধী দলগুলো শুরু থেকেই এটিকে বাস্তবতা-বিবর্জিত ও জনস্বার্থবিরোধী বলে সমালোচনা করে আসছে। সরকারের দাবি, সীমিত সম্পদের মধ্যেও সব শ্রেণির মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে বিরোধীদের প্রশ্ন–এই অন্তর্ভুক্তি কতটা কার্যকর এবং বাস্তবে কারা এর প্রকৃত সুবিধাভোগী হবে।
বাজেট ঘোষণার আগেই জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছায়া বাজেট দিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে। ১১ জুন জামায়াত প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘গণবিরোধী ও গণনিপীড়ক’ আখ্যা দিয়ে নেমেছিল রাজপথেও। এনসিপি একে ‘প্রতারণামূলক ও দিকনির্দেশনাহীন’ বলে উল্লেখ করে। ফলে রাজনৈতিকভাবে বাজেটকে ঘিরে বিরোধিতার সুর আগেভাগেই তৈরি হয়, যা পরে সংসদীয় আলোচনায় আরও তীব্র রূপ নেয়।
বাজেট অধিবেশনের ১৭তম দিনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অবাস্তব ও প্রতারণার দলিল’ বলে মন্তব্য করেন। দলের অন্য সদস্যরাও এটিকে ‘গণবিরোধী ও বাস্তবায়ন-অযোগ্য’ বলে তীব্র সমালোচনা করেন।
বিরোধীদের মূল আপত্তি ছিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ঘিরে। জামায়াত থেকে নির্বাচিত রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা নুরুল আমিনের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুস্পষ্ট কৌশল নেই, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও সংকুচিত করতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা ও খেলাপি ঋণের লাগামহীনতা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের অভাবকে তিনি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বাজেটকে ‘গরীব মারার বাজেট’ বলার মধ্য দিয়ে আয়-বৈষম্য বৃদ্ধির আশঙ্কা তুলে ধরেন।
নীলফামারী-৪ আসনের আব্দুল মুন্তাকিম অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দের স্বচ্ছতা না থাকায় উন্নয়ন বৈষম্য আড়াল হওয়ার আশঙ্কা দেখান। অন্যদিকে ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন সুদভিত্তিক অর্থনীতির বিকল্প হিসেবে ইসলামী অর্থব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়ে নীতিগত পরিবর্তনের দাবি জানান, যা মূলধারার অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে ভিন্নধর্মী বিতর্ক উসকে দেয়।
এনসিপির আখতার হোসেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলে অতীতের ঋণ কেলেঙ্কারির পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি উল্লেখ করেন। একই সুরে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সংসদে ঋণখেলাপিদের উপস্থিতি নিয়ে সরব হয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার সংকট সামনে আনেন।
এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ‘অঘোষিত ঐকমত্য’-এর প্রশ্নটি আরও গুরুত্ব পায়। কারণ, একদিকে বিরোধীরা বাজেটের মৌলিক কাঠামো নিয়ে কঠোর সমালোচনা অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে সংশোধনী প্রক্রিয়ায় তাদের অনুপস্থিতি বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি নীরব সম্মতির ইঙ্গিত দেয়।
সংসদীয় রাজনীতিতে অনেক সময় প্রকাশ্য বিরোধিতার আড়ালে নীতিগত কিছু বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি হয়, যা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করা হলেও ফলাফলে চোখে পড়ে। বর্তমান বাজেট প্রক্রিয়ায় সেই ধরনের একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যেখানে সরকার সীমিত সমন্বয়ের মাধ্যমে চাপ প্রশমিত করেছে এবং বিরোধীরা সমালোচনার রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেই সেই পরিবর্তনকে নিজেদের সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করছে।

বাজেটের ওপর আলোচনা নিয়ে সংসদে সংসদ সদস্যরা বক্তব্য দেন। তারা এর ওপর তাদের দাবি তুলে ধরেন। কিন্তু অর্থবিল পাসের সময় যেসব সংশোধনী দেন, সেগুলো মূলত আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব। সরকার এর কিছু গ্রহণ করে, কিছু করে না। অনেক সময় সরকারি দলের সদস্যরাও সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। মূলত সরকার প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু পরিবর্তন

চার বছর পর পর বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই বদলে যায় বাংলাদেশের চিত্র। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম — সবখানেই দুটি দলের জয়জয়কার, লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের। পতাকা ও জার্সিতে দেশ দুটির প্রতি নিজেদের ভালোবাসা তুলে ধরেন কোটি সমর্থক।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা মানেই যেন একটু বাড়িয়ে বলা। ২০১৭ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প দুঃখ করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন এক বিধ্বস্ত দেশ। আবার ২০২৫ সালে দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নিয়ে তিনিই ঘোষণা করলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে মহান, শক্তিশালী আর সম্মানিত দেশ হবে যুক্তরাষ্ট্র।