সংকটে পড়া পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে আমানত ফেরত দেওয়া চলছে। টাকা তোলার জন্য আবেদন গ্রহণ শুরুর পর প্রথম তিন দিনে ৫৮ হাজার ৭৪৫ জন গ্রাহক মোট ৩ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন।
এর মধ্যে ৭ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দিনে ২৬ হাজার ৫৬ জন গ্রাহক ব্যাংক থেকে মোট ১ হাজার ৪০ কোটি টাকা তুলেছেন। এছাড়াও এই সময়ে ব্যাংকে নগদ ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অর্থ লেনদেন অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ১ সেপ্টেম্বর থেকে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনের জন্য আবেদন গ্রহণ শুরু হয়। প্রথম দিন ১৮ হাজার ৪৬ জন গ্রাহক মোট ১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেন। এসব আবেদনের বিপরীতে ৭ সেপ্টেম্বর ৮ হাজার ১২৫ জন গ্রাহক মোট ৩১৯ কোটি টাকা তুলেছেন।
পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর আরও ৭ হাজার ২৩৪ জন গ্রাহক ব্যাংক থেকে ৩৪০ কোটি টাকা তুলে নেন। আর ৩ সেপ্টেম্বর জমা দেওয়া আবেদনের বিপরীতে ৯ সেপ্টেম্বর ১০ হাজার ৬৯৭ জন গ্রাহক মোট ৩৮১ কোটি টাকা তুলেছেন।
অর্থাৎ, ৭, ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর তিন দিনে মোট ২৬ হাজার ৫৬ জন গ্রাহক ১ হাজার ৪০ কোটি টাকা তুলেছেন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮ হাজার ৬৮৫ জন গ্রাহক অর্থ তুলেছেন। তিন দিনে গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করা অর্থের গড় পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ লাখ টাকা করে।
অন্যদিকে, ১ থেকে ৩ সেপ্টেম্বর তিন দিনে মোট ৫৮ হাজার ৭৪৫ জন গ্রাহক টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছেন। এসব আবেদনের মোট পরিমাণ ৩ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। ফলে আবেদনকারীদের একটি বড় অংশকে ইতোমধ্যে টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং প্রতিদিনই নতুন করে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম চলছে।
ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেনও চলছে
গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকে নতুন করে অর্থ জমা ও লেনদেনের কার্যক্রমও চলছে বলে জানিয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। ৭ সেপ্টেম্বর ব্যাংক নগদে ৯৩ কোটি টাকা এবং আরটিজিএস, বিএফটিএন ও ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আরও ৫১ কোটি টাকা পেয়েছে। সব মিলিয়ে পেয়েছে মোট ১৪১ কোটি টাকা। এদিন গ্রাহকদের টাকা প্রদান ও অন্যান্য লেনদেন মিলিয়ে ক্যাশ এবং আরটিজিএসসহ মোট ১৬ হাজার ৬০০টি ট্রানজেকশন সম্পন্ন হয়েছে।
পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর ব্যাংক নগদে ৯০ কোটি টাকা এবং আরটিজিএস, বিএফটিএন ও ক্লিয়ারিংয়ের এর মাধ্যমে আরও ১০৫ কোটি টাকা পেয়েছে। অর্থাৎ ওই দিন ব্যাংক পেয়েছে মোট ১৯৫ কোটি টাকা। এদিন মোট ১৬ হাজার ৫০টি ট্রানজেকশন সম্পন্ন হয়।
ব্যাংক সূত্র বলছে, গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেনও চালু রয়েছে। ফলে একদিকে গ্রাহকদের আবেদনের ভিত্তিতে আমানত পরিশোধ করা হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংকের বিভিন্ন হিসাবে টাকা জমা হচ্ছে এবং নিয়মিত ব্যাংকিং লেনদেনও পরিচালিত হচ্ছে।
আমানত পরিশোধের পাশাপাশি ব্যাংকে টাকার প্রবাহও অব্যাহত
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবেদুর রহমান সিকদার চরচাকে বলেন, “গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের পাশাপাশি ব্যাংকে অর্থের প্রবাহও অব্যাহত রয়েছে। যেকোনো ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্বাভাবিকভাবেই লেনদেন কার্যক্রম চলছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে। সার্বিকভাবে, গ্রাহকদের আবেদন অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ কার্যক্রম চলমান এবং প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রাহক তাদের অর্থ উত্তোলন করছেন। একইসঙ্গে ব্যাংকে অর্থের প্রবাহ এবং লেনদেনের কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।”
গ্রাহকদের আবেদনের ক্রমানুসারে টাকা পরিশোধের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ১ সেপ্টেম্বর আবেদন করা গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের পর ২ সেপ্টেম্বরের আবেদনকারীদের অর্থ দেওয়া হয়েছে। এরপর ৩ সেপ্টেম্বর আবেদন করা গ্রাহকদেরও অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
আস্থা ফেরানোর চেষ্টা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ওপর গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠন এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফেরার ক্ষেত্রে আমানত ফেরত দেওয়ার এই কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, একদিকে দীর্ঘদিন আটকে থাকা অর্থ হাতে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন গ্রাহকরা, অন্যদিকে ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেন ও অর্থপ্রবাহ চালু রাখার মাধ্যমে তারল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
সূত্র জানায়, প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক গ্রাহক অর্থ উত্তোলন করলেও ব্যাংকে নতুন অর্থের প্রবাহ অব্যাহত থাকায় আমানত ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ফলে আগামী দিনগুলোতে আবেদন করা গ্রাহকদের কত দ্রুত অর্থ পরিশোধ করা যায় এবং ব্যাংকের অর্থপ্রবাহ কতটা অব্যাহত থাকে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য আমানত ফেরতের এই কার্যক্রম শুধু গ্রাহকদের টাকা পরিশোধের একটি প্রক্রিয়া নয়, একই সঙ্গে নতুন ব্যাংকটির প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের বড় পরীক্ষা। দীর্ঘদিনের সংকট, অর্থ ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং সেবায় ভোগান্তির পর গ্রাহকদের একটি অংশ এখন স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের নিশ্চয়তা চাইছেন।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সংকট শুরু মূলত পাঁচটি ব্যাংকের দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা, অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট থেকে। এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়ায় আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০২৫ সালের শেষ দিকে রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একীভূতকরণের কাজ শুরু হয়। এরপর নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে ব্যাংকটির কার্যক্রম স্বাভাবিক করার পাশাপাশি আমানতকারীদের টাকা ফেরত ও গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এখন টাকা ফেরত শুরু হলেও গ্রাহকদের মধ্যে কেউ ব্যাংকটির সঙ্গে থাকতে চাইছেন, আবার কেউ টাকা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।