ads

জামায়াত এমপির ভিডিও, কিছু প্রশ্ন, উত্তর অজানা

জামায়াত এমপির ভিডিও, কিছু প্রশ্ন, উত্তর অজানা
সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আজ মঙ্গলবার দিনভর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরগরম। মঙ্গলবার এক নারীর সঙ্গে সংসদ সদস্যের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে শুরু হয় তুমুল আলোচনা।

শুরুতে ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ভিডিওটিকে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করা হয়। পরে যখন ভিডিওটি আসল বলে শনাক্ত হয়, তখন নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী ও তিনি নিজে দাবি করেন ওই নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী।

Advertisement

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর কেন ওই নারীকে সংসদ সদস্যের দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করা হলো।

এদিকে, আরেকটি অংশ ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন। এখানেই থামেননি তারা। এই দাবি করা ব্যক্তিরা ওই নারীর সঙ্গে নিজেদের এআই ভিডিও পোস্ট করতে থাকেন।

ভিডিওর ঘটনাস্থল মগবাজারে ওই নারীর বাবার অফিস। কিন্তু অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ওই নারীর বাবার অফিসে খাট থাকবে কেন? আর কক্ষে সিসি ক্যামেরাই বা থাকবে কেন?

ওই ঘটনায় যে নারীকে ঘিরে আলোচনা তিনিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে সংসদ সদস্যের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেছেন। একটি ভিত্তিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, জামায়াত এমপির সঙ্গে তার বিয়ে হয় গত ১৭ জুন। তিনি বলেন, ‘উভয় পরিবারের সম্মতিতে’ তার বাবার বাড়িতে পারিবারিকভাবে ওই বিয়ে হয়। সেখানে এমপির প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। গত ১৩ জুলাই মগবাজারে ওই নারীর বাবার অফিসে ওই ভিডিও ধারণ করা হয় বলে দাবি তার।

ওই নারীর একটি জীবন-বৃত্তান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, ওই নারী তার বৈবাহিক অবস্থা লিখেছেন ‘অবিবাহিত’। সেখানে সংসদ সদস্য নজরুল ইসলামের সুপারিশও রয়েছে। সেখানে একজন সচিবের সইও রয়েছে। তবে ওই জীবন-বৃত্তান্ত দেখে বোঝা যায় না- কীসের সুপারিশ করা হয়েছে। সেখানে তারিখ দেওয়া রয়েছে ২২ জুন, ২০২৬। প্রশ্ন উঠেছে, ওই নারী যদি সংসদ সদস্যের স্ত্রী হন, তাহলে বিয়ের ছয় দিন পর কেন জীবন-বৃত্তান্তে ‘অবিবাহিত’ লিখবেন?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে এ প্রশ্নও তুলছেন যে, চাকরি দেওয়ার নাম করেই কি ওই নারীর সঙ্গে ‘ব্যক্তিগত মূহূর্ত’ কাটাচ্ছিলেন সংসদ সদস্য? ভিডিও প্রকাশের পর এআইয়ের দোহাইও যখন ধোপে টিকল না, তখন বলা হলো- দ্বিতীয় স্ত্রী?

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে মঙ্গলবার দিনভর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরগরম। ছবি: বাসস
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে মঙ্গলবার দিনভর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরগরম। ছবি: বাসস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি প্রশ্নও উঠছে। সেটি হলো, নিজের স্ত্রী হলেও কেন সংসদ সদস্য তার জন্য এভাবে সুপারিশ করবেন? পারিবারিকভাবে বিয়ে হলে বিষয়টি এত দিন গোপন রাখা হলো কেন- এমন প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।

ভিডিওটির তারিখ নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। সেখানে ভিডিওর তারিখে ২০২৩ সাল লেখা রয়েছে। তবে অনেকে ধারণা করছেন, হয়তো ক্যামেরার ত্রুটির কারণেই ওই তারিখ দেখা যাচ্ছে। কারণ, সংসদ সদস্য নিজেই দাবি করেছেন, ‘ভিডিওটি গত ১৩ জুলাইয়ের’।

এমপির দাবি, ‘ভিডিও করেছেন মামা-শ্বশুর’

বিবৃতিতে জামায়াতের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম ওই নারীর নাম বলেছেন, মরিয়ম বেগম।

সংসদ সদস্য বিবৃতিতে লিখেছেন, ‘‘যোহরের নামাজ আদায়ের পূর্বে আমার গাড়িচালক ও আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যায়। পরবর্তীতে সে ৫/৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে আমাদের কক্ষে প্রবেশ করে এবং আমাদের জিম্মি করে ১ লক্ষ টাকা আদায় করে। আমি চলাচলের জন্য যে ভাড়াকৃত গাড়িটি ব্যবহার করি, ওবায়দুল্লাহর যোগসাজশে পরবর্তীতে সেটিও আটকে রেখে দফায় দফায় আমাদের কাছে কয়েক লক্ষ টাকা দাবি করা হয়। আমরা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আমাদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়।”

সংসদ সদস্য আরও দাবি করে বলেছেন, ‘‘আমি এ সময় জানতে পারি, আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মোঃ মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর পূর্ব শত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। পরবর্তীতে হিংসা ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ওবায়দুল্লাহ আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।”

নজরুল ইসলামের দাবি, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিডিওটিকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা হিসেবে প্রচার করছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন।

যা বলছেন ওই নারীর বাবা

অন্য ভিডিও বার্তায় মরিয়ম বেগমের বাবা বলেন, “গত ১৭ জুন রোজ মঙ্গলবার আমার বড় মেয়ে মরিয়ম আক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয়। গত ১৩ জুলাই সেখানে (ভিডিও করার ঘটনাস্থল) এমপি সাহেবকে নিয়ে তার (গাজী নজরুল ইসলাম) প্রথম স্ত্রীসহ আমরা সবাই উপস্থিত ছিলাম। এ ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এটি সামাজিকভাবে হেনস্তা করা ছাড়া আর কিছুই না।”

ভিডিওটি কি ৩ বছর আগের?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে আবার বলছেন, সিসিটিভি ফুটেজের সময়কাল ২০২৩ যদি সত্যি হয়, তবে সেই সময়ে ওই নারীর বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। সেক্ষেত্রে ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ বা পারস্পরিক সম্মতির দাবি তুললেও এটি সরাসরি ‘বাল্যবিবাহ’ এবং আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে যৌন হয়রানির শামিল, যা ধর্ষণের শামিল ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

জীবন-বৃত্তান্তের তথ্য নিয়েও প্রশ্ন

জামায়াতের ওই সংসদ সদস্যের কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীর এসএসসি পরীক্ষার তথ্য, ভাইরাল জীবন-বৃত্তান্ত এবং বিয়ের সময়কাল নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বৈবাহিক অবস্থা-সংক্রান্ত তথ্য এমপির দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠেছে।

মরিয়মের জীবনবৃত্তান্তে দেখা , তিনি ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী এবং এবারই পরীক্ষা দিয়েছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার জীবন-বৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে, তিনি ২০২৬ সালে এসএসসি পাস করেছেন। অথচ চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফল প্রকাশের আগেই ‘এসএসসি পাস-২০২৬’ উল্লেখ থাকায় সেটি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদিও ফলাফলের ঘরে কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

আরেক ভিডিওতে যা দেখা গেল

এদিকে, ফেসবুকে নজরুল ইসলামের আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, সেখানে জামায়াতের ওই সংসদ সদস্যকে কিছু লোক প্রশ্ন করছেন। তবে এটি কবে, কোথায় ধারণ করা, তা জানা যায়নি।

২০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষে গাজী নজরুল ইসলাম ও এক তরুণী দাঁড়িয়ে রয়েছেন। সেখানে টেবিলে রাখা আইডি কার্ডে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে- বাংলাদেশ পার্লামেন্ট। ঠিক এর নিচে লেখা ১৩তম পার্লামেন্ট। এরপর নজরুল ইসলামের ছবি দেওয়া। ছবির নিচে লেখা ‘জি এম নজরুল ইসলাম’। পদবি হিসেবে লেখা ‘সংসদ সদস্য’।

এ সময় হট্টগোলের মধ্যে একজনকে বলতে শোনা যায়, “দেখেন সাতক্ষীরার জামায়াতের লোক মেয়েসহ এখানে ধরা খাইছে। এই যে এই মুরুব্বি।” ওই ভিডিওতে থাকা নারীকে নাম বলতে বলা হলেও তিনি বলেননি। পরে অবশ্য তিনি ‘মারিয়া’ নাম উল্লেখ করেন। ওই ভিডিওতে গাজী নজরুল ইসলামকে একজন জিজ্ঞাস করেন, “আপনি ওরে কয়দিন আনছেন?” তখন গাজী নজরুল উত্তরে বলেন, “বিশ্বাস করেন, একবার। ওরে নিয়ে আমি একবারই এসেছি।”

যা বলছে জামায়াত

এদিকে ওই ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেন, “অতি সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নজর রাখছে।

ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের নিজের বিবৃতি, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ভিডিও বক্তব্য মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে আরও খোঁজখবর নিয়ে এবং প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।”

সবশেষে কাবিনমানা

সন্ধ্যার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই সংসদ সদস্য ও ওই নারীর বিয়ের একটি কাবিনমানা প্রকাশিত হয়। তারপরও পিছু ছাড়ছে না প্রশ্ন- যদি স্ত্রীই হয়, তাহলে আগেই কাবিননামা প্রকাশ করতে সমস্যা কী ছিল?

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে জামায়াতের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলামের ফোনে কল করা হয়। তিনি একবার রিসিভ করেন। কিন্তু পরক্ষণেই কেটে দেন। পরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

সম্পর্কিত