ads

সহসা কাটছে না গ্যাস সংকট, আরও তীব্র হওয়ার শঙ্কা

সহসা কাটছে না গ্যাস সংকট, আরও তীব্র হওয়ার শঙ্কা
কক্সবাজারের মহেশখালীতে সমুদ্রে ভাসমান ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট। ছবি: চরচা

কক্সবাজারের মহেশখালীতে সমুদ্রে ভাসমান ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটের (এফএসআরইউ) মেরামত কাজ এখনো শেষ না হওয়ায় দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। এই সংকট আরও তীব্র হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিদেশ থেকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এফএসআরইউয়ের মাধ্যমে সাধারণ গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়।

Advertisement

মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালনাধীন একটি জাহাজে গত মঙ্গলবার সকালে শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগার পর সেটি বিকল হয়ে যায়। চার দিন পার হলেও ত্রুটি পুরোপুরি ঠিক হয়নি। যার প্রভাবে সারা দেশে গ্যাস সংকট দিন দিন আরও বাড়ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দেশে রয়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কাজ শেষ করলে শিগগির গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে গত মঙ্গলবার ত্রুটি দেখা দেয়। এরপর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। আবাসিক এলাকায় চুলা না জ্বলা, সিএনজি স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি এবং শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় জনজীবনে দুর্ভোগ বেড়েছে।

এমনিতেই দেশের চাহিদার চেয়ে ৩০ শতাংশ গ্যাস কম সরবরাহ করা হয়। ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার স্থানে এলএনজিসহ সরবরাহ হয় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এখন তা নেমে এসেছে ২২০ কোটি ঘনফুটে। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে ৪৫ শতাংশ গ্যাস কম দেওয়া হচ্ছে।

রোববার থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, টার্মিনাল যত দেরিতে চালু হবে, সংকট তত বাড়বে। এমনকি টার্মিনাল চালু হওয়ার পরও ২-৩ দিন সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না, কারণ পাইপলাইন আবার পূর্ণ হতে সময় লাগে। শুক্র-শনিবার সরকারি ছুটি থাকায় গ্যাসের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু রোববার থেকে অফিস-আদালত ও কলকারখানা পুরোদমে চালু হলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জটিলতা কোথায়?

আগুনে পুড়ে যাওয়া তার নতুন করে বসাতে যুক্তরাজ্য থেকে তিনজন প্রকৌশলী এসেছেন। তারা বৃহস্পতিবার রাত থেকে টানা কাজ করছেন। কিন্তু তারা এখনো নিশ্চিত হননি যে টার্মিনাল পুরোপুরি নিরাপদ কি না। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় পেট্রোবাংলার সঙ্গে বৈঠকেও তারা টার্মিনাল কবে চালু হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।

ছবি: ইউএনবি
ছবি: ইউএনবি

এক্সিলারেট কর্তৃপক্ষ পেট্রোবাংলাকে জানিয়েছে, শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে তারা টার্মিনাল চালু করবে না। কারণ, ত্রুটি পুরোপুরি না সারলে জাহাজ থেকে এলএনজি নামানোর কাজ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) রফিকুল ইসলাম চরচাকে জানিয়েছেন, দ্রুত কাজ শেষ করতে এক্সিলারেটকে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের বিকল্প ভাবনা

গত মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া গ্যাস সংকটের জন্য সাবেক সরকারের গ্যাস নীতির সমালোচনা করে এক বিবৃতি দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

সেখানে বলা হয়, ধাপে ধাপে ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। যার অংশ হিসেবে বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে তিনটি কূপ খননে ৭২৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ইতিমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। এছাড়া, গ্যাস সংকট সমাধানে নতুন একটি এফএসআরইউ বসানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে একটি বিকল হলেও বিকল্প থাকে।

এ ছাড়া, মালয়েশিয়া থেকে বিশেষ ট্যাংকে করে বাড়তি এলএনজি আনার সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। ভোলার গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে গ্যাস আনতে পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও বলা হয় বিবৃতিতে।

তবে মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে বলেছে, নতুন কূপ খনন, অবকাঠামো তৈরি করা, বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করা সময়সাপেক্ষ। তাই বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা এই সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়।

ভোগান্তি কোথায় কেমন

সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া, ধনুয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অন্তত ২০০টি কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সদস্যরা। এছাড়া অনেক কারখানা মালিক বুঝতে পারছেন না শ্রমিকদের কাজে রাখবেন নাকি ছুটি দেবেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিতাস গ্যাসের একজন কর্মকতা জানিয়েছেন, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ মালিকদের আপাতত ছুটি দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

দেশজুড়ে বেশিরভাগ সিএনজি স্টেশনে গাড়িতে গ্যাস দেওয়ার মতো চাপ নেই। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ১৫ পিএসআই (চাপ মাপার একক) গ্যাস পাওয়া যেত, এখন তা নেমেছে ৩ থেকে ৫ পিএসআইয়ে, কোথাও প্রায় শূন্য। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও যানবাহনের জন্য গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।

গত বুধবার থেকে রাজধানীসহ সারাদেশের সিএনজি ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। রাতভর অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না অনেক চালক। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক স্টেশন আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর চরচাকে বলেন, “একটি স্টেশন চালাতে অন্তত ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হয়। সরকাররের সাথে সেই চুক্তিই আছে ফিলিং স্টোশনগুলোর। কিন্তু অনেক এলাকায় এখন ৩ থেকে ৪ পিএসআই, কোথাও আবার ২ পিএসআইয়ের কম চাপ পাওয়া যাচ্ছে।”

ফারহান বলেন, “শনিবার পেট্রোবাংলার সাথে বৈঠকে ‍দুঃখ প্রকাশ ছাড়া তেমন কোন আশার কথা শোনাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।”

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় রান্নাঘরের চুলা জ্বলছে না বললেই চলে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, রামপুরা, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাসের চাপ না থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে রান্না করছেন। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা বা ইন্ডাকশন কুকার ব্যবহার করছেন।

গ্যাস সংকটের প্রতিবাদে শুক্রবার মোহাম্মদপুরে স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধন করেছেন। সেখানে নিয়মিত সরবরাহ না দিয়েও বিল আদায় বন্ধের দাবি ওঠে।

অন্যদিকে গ্যাসের ঘাটতিতে অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে আনতে হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ রেখেছে অনেকে।

তল্লাবাগের কর্মজীবি নারী সানজিদা ইসলাম চরচাকে বলেন, “দিনের বেশির ভাগ সময় চুলা জ্বলছে না। কয়েক দিন ধরে একই পরিস্থিতি চলছে। বিকেলে দিকে কিছুক্ষণের জন্য গ্যাস থাকে, তাও চাপ কম। গভীর রাতে আবার গ্যাস আসে। রাত জেগে রান্নাবান্না ও পানি ফোটাতে হচ্ছে। তবে, এলাকারই বেশ কিছু বাসায় গ্যাসের সরবরাহ প্রায় স্বাভাবিক আছে বলেও দাবি করেন এই নারী।”

বৃষ্টির কারণে সংকটের তীব্রতা খুব একট বোঝা যাচ্ছে না। তবে, আবহাওয়া প্রতিকূল হলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় গ্যাস সংকটের প্রভাব গুরুতর হয়ে দেখা দিতে পারে। গ্যাসের অভাবে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদনও। স্বাভাবিক সময়ে গ্যাস দিয়ে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। শুক্রবার তা নেমে আসে ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে। ওই দিন দুপুরে দেশের চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৪৫৮ মেগাওয়াট, সরবরাহ করা গেছে ১২ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। রাত ১টায় লোডশেডিং পৌঁছায় ৯২৪ মেগাওয়াটে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের ভাষ্য ওই সময় দেশজুড়ে বৃষ্টি থাকায় চাহিদা কিছুটা কম ছিল। না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত।

পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, সীমিত গ্যাসের মধ্যেই শুক্রবার শিল্প খাতে সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে, আর বিদ্যুৎ খাতে কমানো হয়েছে। দুর্ঘটনার পর বিদ্যুৎ খাতে থাকা ৭৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে এখন দেওয়া হচ্ছে ৬৮ কোটি ঘনফুট।

যা বলছে তিতাস

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান চরচাকে বলেন, “তিতাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। টার্মিনালে ত্রুটির আগে প্রতিদিন ১৫০ কোটি ঘনফুট পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১২০ কোটি ঘনফুটে।”

এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে মঙ্গলবার যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে দেশের দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৯৫-১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামতে যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরা দেশে এসেছেন। তাদের পরিদর্শন শেষে মেরামত কাজের সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে। তবে কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

সম্পর্কিত