গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান পুরোপুরি পরাজিত হয়েছে এবং তারা একটি চুক্তি করতে চায়।
এরপর মার্চে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে। তিনি বলেছিলেন, “আমরা খুব শিগগিরই সরে যাব।”
কিন্তু সেই যুদ্ধ ষষ্ঠ মাসে গড়িয়েছে এবং পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে পাল্টাপাল্টি হামলার পর ট্রাম্প বড় ধরনের সংঘাত এড়িয়ে গেছেন। তবে দুই পক্ষের মধ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ বিরোধগুলোর এখনো কোনো সমাধান হয়নি।
পাঁচ মাসে কী কী হয়েছে?
এক প্রতিবেদনে যুদ্ধের গত পাঁচ মাসের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে হামলা শুরু করে। এতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
ফেব্রুয়ারি
২৮ ফেব্রুয়ারি: যুদ্ধের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোড়া টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আঘাত হানে। এতে ১৭৫ জন নিহত হন, যাদের বেশির ভাগই শিশু। একই দিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল দক্ষিণ ইরানের একটি ক্রীড়া হল, একটি স্কুল এবং দুটি আবাসিক এলাকায় আঘাত করে। এতে ২১ জন নিহত হন। তবে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন এই দুটি হামলার দায় প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি।
মার্চ
১ মার্চ: যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে ইরান মধ্যম-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়। কুয়েতে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হন। একই দিন কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভুলবশত যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। তবে সব ক্রুকে উদ্ধার করা হয়।
৪ মার্চ: শ্রীলঙ্কার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমেরিন ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজে টর্পেডো হামলা চালায়। এতে শতাধিক ইরানি নাবিক নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।
৭ মার্চ: সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে হামলায় আহত এক মার্কিন সেনা মারা যান।
১২ মার্চ: পশ্চিম ইরাকে একটি মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হলে ছয় মার্কিন বিমানসেনা নিহত হন।
৩১ মার্চ: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরান থেকে সরে যাবে।
এপ্রিল
এপ্রিলের শুরুতে ইরানের আকাশে আরেকটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। পাইলটকে দ্রুত উদ্ধার করা হলেও অস্ত্রব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে পরে উদ্ধার করা হয়। এই উদ্ধার অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি বিমান ধ্বংস হয়। এছাড়া একটি এ-১০ ওয়ারথগ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলেও পাইলটকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
৬ এপ্রিল: যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তারা ইরানে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
৭ এপ্রিল: ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন।
১১ এপ্রিল: যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, পাকিস্তানে ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরও দুই পক্ষ শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি।
১২ এপ্রিল: যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরোধের ঘোষণা দেয়।
১৯ এপ্রিল: আরব সাগরে ইরানের পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজে গুলি চালিয়ে সেটি জব্দ করে মার্কিন বাহিনী।
২১ এপ্রিল: ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ান।
মে
৩ মে: ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি অভিযান ঘোষণা করেন, যাতে হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিরাপদে বের হতে পারে। তবে ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তা স্থগিত করা হয়।
৫ মে: যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন যুদ্ধ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। এরপর আর এমন ব্রিফিং দেওয়া হয়নি।
৭ মে: ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর।
১০ মে: ইরানের নতুন শান্তি আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ট্রাম্প।
১৩ মে: যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের গবেষণা সংস্থা জানায়, যুদ্ধে ৪২টি মার্কিন যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
২৩ মে: ট্রাম্প দাবি করেন, শান্তিচুক্তি খুব কাছাকাছি।
জুন
মাসের শুরুতে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা খুবই বিরক্তিকর। তিনি আরও বলেন, আলোচনা ভেঙে গেলেও এতে তার কিছু যায়-আসে না।
১১ জুন: এইদিন ট্রাম্প আবারও বলেন, শান্তিচুক্তি খুব কাছাকাছি।
১৪ জুন: হোয়াইট হাউস ও তেহরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে যায়।
১৭ জুন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রকাশ করা হয়। তবে ভাষা অস্পষ্ট হওয়ায় দুই পক্ষ এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়।
২০ জুন: জেডি ভ্যান্স নতুন শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে ওয়াশিংটন ছাড়েন।
২২ জুন: ট্রাম্প ইরানি তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেন।
২৩ জুন: হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায় ইরান। এর জবাবে পরের দুই দিনে যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালায়।
জুলাই
১ জুলাই: আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার জরুরি অবতরণ করে। কয়েক দিন পর ওই হেলিকপ্টারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিখোঁজ ঘোষণা করা হয়।
৪ জুলাই: ওয়াশিংটনে জাতীয় দিবস উপলক্ষে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও প্যারাট্রুপারদের নিয়ে বড় সামরিক প্রদর্শনী করে পেন্টাগন।
৮ জুলাই: ট্রাম্প বলেন, তিন সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন। এর কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানে বিমান হামলা শুরু করে।
৯ জুলাই: ইরান জর্ডানের দিকে মধ্যম-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। সেন্টকম জানায়, নতুন হামলার প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় ১৭০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে।
১১ জুলাই: হরমুজ প্রণালিতে একটি কনটেইনার জাহাজে ইরানের হামলার পর ট্রাম্প আরও বিমান হামলার নির্দেশ দেন।
১৩ জুলাই: ট্রাম্প হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ফি আরোপের হুমকি দেন এবং ইরানের বন্দর অবরোধ আবার চালু করেন।
১৭ জুলাই: জর্ডানে একটি সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হন।
১৮ জুলাই: উত্তর ইরাকে একটি ইরানি ড্রোন নিষ্ক্রিয় করার সময় আরও এক মার্কিন সেনা নিহত হন।
২৬ জুলাই: পেন্টাগন জানায়, যুদ্ধে মোট ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৬২৪ জন আহত হয়েছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের হামলা। ছবি: রয়টার্স
পাঁচ মাসে কৌশলগত অবস্থানের পরিবর্তন
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি এক প্রতিবেদনে বলেছে, এই যুদ্ধে এখন কার অবস্থান শক্তিশালী–এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই। যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক সামরিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু যুদ্ধ কীভাবে শেষ করবে, সে বিষয়ে তাদের পরিষ্কার কোনো পরিকল্পনা নেই। অন্যদিকে ইরান হামলা সহ্য করেও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় পাল্টা আঘাত হেনে যাচ্ছে। গত সপ্তাহের শেষে হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ করার আগে যুক্তরাষ্ট্র টানা ১৩ রাত ইরানে হামলা চালায়।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার জন্য কিছুটা সুযোগ রেখে দিয়েছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঁচ মাসের সামরিক চাপও ইরানের অবস্থান বদলাতে পারেনি। বরং ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের গবেষক ব্র্যান্ডন কার আনাদোলুকে বলেন, পাঁচ মাস আগের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র এখনো মনে করছে, আরও সামরিক চাপ দিলে একসময় ইরান নতি স্বীকার করবে। কিন্তু তিনি মনে করেন, এই কৌশল সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
ব্র্যান্ডন বলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো ইরানের হাতে। তাই এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা ইরানের কাছেই রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কার্যকর সামরিক বিকল্পও খুব বেশি নেই।
আরেক বিশ্লেষক ইব্রাহিম জালাল বলেন, পাঁচ মাস পরও ইরানের কৌশল বদলায়নি। তবে তারা নিজেদের অস্ত্র আরও উন্নত করেছে, হামলার নির্ভুলতা বাড়িয়েছে এবং নতুন নতুন চাপ তৈরির উপায় খুঁজছে। তার মতে, ইয়েমেনের হুতিদের মাধ্যমে সৌদি আরবের সামুদ্রিক বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টি করাও ইরানের বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা জেসন ক্যাম্পবেল বলেন, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট লক্ষ্য বা শেষ পর্যন্ত কী অর্জন করতে চায়, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, আপাতত ট্রাম্প যুদ্ধের পরিসর আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন। কারণ, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য অস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যেতে পারে।
তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাইক ওয়াল্টজ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের কোনো ঘাটতি নেই। সামরিক অভিযান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু তাদের কাছে রয়েছে।
এদিকে চলতি মাসের শুরুতে খবর আসে, যুক্তরাষ্ট্র এফ-১৬ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে।
জেসন ক্যাম্পবেল বলেন, শুধু যুদ্ধবিমান নয়, আকাশে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতাও ইসরায়েলে পাঠানো হচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হয়তো যুদ্ধ আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, উপসাগরীয় অনেক দেশ সম্ভবত তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে এই অভিযান চালাতে দিতে চাইছে না, কারণ এতে তারা ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ইব্রাহিম জালালের মতে, ইরান আরও অনেক মাস এই ধীরগতির যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম। তার মতে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এখনো প্রচুর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুদ ধরে রেখেছে।
এ ছাড়া ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর বেশির ভাগই আবার চালু হয়েছে। আগের যুদ্ধ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতাও তারা কাজে লাগিয়েছে।
ব্র্যান্ডন কার বলেন, ইরান এখন দেখাতে চাইছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ঘাঁটিই পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
কারের মতে, ইরান এসব হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে চাইছে যে, তারা শুধু হরমুজ প্রণালি বন্ধই করতে পারে না, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকেও বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।
জালালও মনে করেন, হুতিদের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির আরেকটি উপায়।
জেসন ক্যাম্পবেল বলেন, জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনা দেখিয়েছে যে, আইআরজিসি এখনো শক্তিশালী হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে। ওই হামলায় এমন একটি বড় ও দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, যা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে খুব নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবারও উত্তেজনা বাড়াতে পারে, যাতে আলোচনায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা যায়। একই সময়ে মধ্যস্থতাকারীরা কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে যাওয়ার চেষ্টা চালাবেন।
জেসন ক্যাম্পবেলের সতর্ক করে বলেন, আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছি, যেখানে কোনো পক্ষেরেই পরিস্থিতির উত্তেজনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে না।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি
ইউএস নিউজ এক প্রতিবেদনে বলেছে, এ পর্যন্ত যুদ্ধে ঠিক কতজন নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিলিটারি স্পেন্ডের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরায়েল, লেবাননসহ বিভিন্ন দেশের তথ্যের ভিত্তিতে যুদ্ধে ৮ হাজার ৯৭৫ থেকে ১৮ হাজার ৩০৯ জন সামরিক ও বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
চলতি মাসে যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যাও বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বারবার বলেছেন, মার্কিন বাহিনী বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ ইরানিদেরই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে।
এদিকে, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ প্রতিদিন প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে বলে জানিয়েছে ইউএস নিউজ।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সর্বশেষ হিসাবে, এখন পর্যন্ত যুদ্ধের মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এই অর্থ ব্যয় হয়েছে সামরিক সরঞ্জাম, ক্ষেপণাস্ত্র এবং যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তায়।
গত সপ্তাহে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় হেগসেথ আরও ৮৮ বিলিয়ন ডলারের জরুরি বরাদ্দ চেয়েছেন। এদিকে যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভুল অস্ত্র ও আধুনিক গোলাবারুদের মজুদ কমে যাওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। যদিও পেন্টাগন এসব প্রতিবেদনের গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছে।
যুদ্ধে এখনো কীভাবে টিকে আছে ইরান?
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাঁচ মাস ধরে যুদ্ধ চললেও ইরানের অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। তবে দেশের কোটি কোটি মানুষ জীবিকা ও টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
তেলনির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে কৃষি, উৎপাদনশিল্প ও সেবাখাতকে গুরুত্ব দেওয়ায় অর্থনীতি কিছুটা টিকে আছে। পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিকভাবে তেল বিক্রি, সীমান্ত বাণিজ্য, সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং বড় অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারও অর্থনীতিকে সচল রাখতে সাহায্য করছে।
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় পেনশন তহবিল-সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাবা পেনশন স্ট্র্যাটেজিস ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ বছর আগে যেখানে দেশের ৩০ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত, চলতি বছরে সেই হার বেড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এই সংখ্যা এখনো বাড়ছে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা কঠোর নিষেধাজ্ঞা, গত বছরের জুন থেকে শুরু হওয়া দুটি যুদ্ধ, দেশজুড়ে বিক্ষোভে হাজারো মানুষের মৃত্যু এবং গত এক বছরে কয়েক দফা ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে মানুষের জন্য আয়-রোজগার করা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জার্মানির ফিলিপস ইউনিভার্সিটি মারবুর্গের মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান বলেন, ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হলো কূটনীতির মাধ্যমে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমানো। তিনি বলেন, স্থিতিশীল পরিবেশ ছাড়া ইরানের অর্থনীতি হয়তো টিকে থাকবে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ খুবই কম।