পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে স্বাধীনতার দাবি আবারও জোরালো হয়েছে। ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ ১১ আগস্টকে স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করেছে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বেলুচিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
কয়েক সপ্তাহ আগেই পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান। একই সঙ্গে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের কাছে কূটনৈতিক স্বীকৃতিও চেয়েছিল।
নতুন এই ঘোষণার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে, বেলুচিস্তান কি সত্যিই স্বাধীন দেশ হতে পারবে?
আর্থিক সংবাদ ও শেয়ারবাজারভিত্তিক ওয়েবসাইট মানি কন্ট্রোলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই কোনো অঞ্চল নতুন দেশ হয়ে যায় না বলে মত আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে সেই অঞ্চলের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, অন্য দেশের স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হয়।
১১ আগস্ট কেন স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলো?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ১৮-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দিনটিকে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালনের ইতিহাস ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময় থেকে শুরু।
সে সময় কালাত নামে একটি রাজ্য ছিল, যার শাসক ছিলেন মীর আহমদ ইয়ার খান। কালাতের শাসকদের দাবি ছিল, তারা অন্য দেশীয় রাজ্যগুলোর মতো ব্রিটিশ ভারতের অংশ ছিল না। বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের মতে, কালাত একটি আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্র ছিল এবং ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে তাদের নিজস্ব চুক্তিও ছিল।
১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট ব্রিটিশ সরকার, কালাতের খান ও পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি ‘স্ট্যান্ডস্টিল’ চুক্তি হয়। বেলুচ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর দাবি, এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান গঠনের আগে আলাদা মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি পেয়েছিল কালাত।
বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের কাছে ১১ আগস্টের গুরুত্ব এখানেই। তাদের মতে, এই দিনটি প্রমাণ করে যে পাকিস্তানের অংশ হওয়ার আগে বেলুচিস্তান একটি আলাদা রাজনৈতিক সত্তা ছিল।
প্রতি বছর এই দিনে কিছু বেলুচ সংগঠন ও বিদেশে বসবাসকারী বেলুচরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। তারা বেলুচিস্তানের পতাকা উত্তোলন করে এবং বেশি স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার দাবি জানায়।
পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে স্বাধীনতার দাবি আবারও জোরালো হয়েছে। ছবি: রয়টার্স
স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই আলাদা দেশ হওয়া যায় না
মানি কন্ট্রোলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনে কোনো অঞ্চল স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারে। তবে শুধু ঘোষণা দিলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয় না।
সাধারণভাবে একটি অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হতে হলে মন্টেভিডিও কনভেনশনের কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হয়। যেমন: সেখানে স্থায়ী জনসংখ্যা থাকতে হবে, নির্দিষ্ট সীমানা থাকতে হবে, কার্যকর সরকার থাকতে হবে এবং অন্য দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ার সক্ষমতা থাকতে হবে।
এসব শর্তের কিছু পূরণ হলেও, শেষ পর্যন্ত অন্য দেশগুলোর স্বীকৃতিই ঠিক করে দেয় নতুন রাষ্ট্রটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্য হবে কি না।
স্বীকৃতিই সবচেয়ে বড় বাধা
মানি কন্ট্রোল বলছে, রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের স্বীকৃতি দেয়নি।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পেলে বেলুচিস্তান জাতিসংঘের সদস্য হতে পারবে না। অন্য দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়তে বা আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুবিধাও পাবে না।
কোনো নতুন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে কি না, সেটি পুরোপুরি প্রতিটি দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
এখনো বেলুচিস্তানের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানের হাতে
বেলুচিস্তান স্বাধীন হতে না পারার আরেকটি বড় কারণ হলো, অঞ্চলটির প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ এখনো পাকিস্তানের হাতেই রয়েছে। যদিও সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো সক্রিয়, তবু পাকিস্তান সরকার প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
আন্তর্জাতিক আইনে কোনো অঞ্চলকে রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে ওই অঞ্চলের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
যতদিন পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, ততদিন বেলুচিস্তানের স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার দাবি বাস্তবে সফল হওয়া কঠিন।
জাতিসংঘের সনদ কী বলে?
রিপাবলিক অব বেলুচিস্তানের দাবি, তাদের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। জাতিসংঘের সনদ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকৃত। তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন বিদ্যমান স্বাধীন দেশগুলোর ভৌগোলিক অখণ্ডতারও সুরক্ষা দেয়।
বাস্তবে খুব বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনো অঞ্চলের আলাদা হয়ে স্বাধীন হওয়ার দাবিকে সমর্থন করে না। যেমন–ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি বা দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাতের মতো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এমন সমর্থন দেখা গেছে।
ভারত বেলুচিস্তানকে স্বীকৃতি দিতে পারে?
বেলুচিস্তানের নতুন ঘোষণার পর এই প্রশ্নও আবার সামনে এসেছে। তবে ভারত এখনো বেলুচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। বরং দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অবস্থান হলো, বেলুচিস্তান পাকিস্তানের অংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত যদি বেলুচিস্তানকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে সেটি তাদের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন হবে এবং এর বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে।
এ পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন সরকার বেলুচিস্তানে মানবাধিকার ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন করেনি।
আগের উদাহরণ কী বলে?
বিশ্বে শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই কোনো অঞ্চল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে—এমন ঘটনা খুবই কম।
কসোভো ২০০৮ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। পরে ১০০টির বেশি দেশ তাকে স্বীকৃতি দেয়। তবে এখনো কয়েকটি বড় শক্তিধর দেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়নি।
যতদিন পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, ততদিন বেলুচিস্তানের স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার দাবি বাস্তবে সফল হওয়া কঠিন। ছবি: রয়টার্স
অন্যদিকে উত্তর সাইপ্রাস, সোমালিল্যান্ড ও ট্রান্সনিস্ট্রিয়ার মতো অঞ্চল বহু বছর ধরে নিজেদের শাসন চালালেও এখনো অধিকাংশ দেশের স্বীকৃতি পায়নি। এসব উদাহরণ দেখায়, শুধু আইনি যুক্তি নয়, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের জন্য কেন চ্যালেঞ্জ?
বেলুচিস্তানের নতুন স্বাধীনতার ঘোষণা এমন সময়ে এসেছে, যখন পাকিস্তান একাধিক অভ্যন্তরীণ সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে বেলুচিস্তানে বিদ্রোহ, খাইবার পাখতুনখোয়ায় সশস্ত্র হামলা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা রয়েছে।
১১ আগস্টকে স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির নতুন আহ্বানের কারণে বেলুচিস্তান ইস্যুতে বিশ্বের নজর আরও বাড়তে পারে।
তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক বাস্তবতায় বেলুচিস্তানের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পথ এখনো অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকদের মতে, কার্যকরভাবে নিজের ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সদস্যপদ ছাড়া শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বেলুচিস্তানের আইনি অবস্থার পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।