কুনওয়ার খালদুন শহীদ

চলমান যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মাঝে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। এমনকি ইসলামাবাদে উভয় পক্ষের মধ্যে বৈঠকের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, পাকিস্তানের নেতৃত্ব তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয় পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে। চলতি সপ্তাহে আলোচনা ও সাময়িক যুদ্ধবিরতির খবরের আগে, গত ২২ মার্চ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন বলে জানা গেছে।
ইসলামাবাদের জন্য এই কূটনৈতিক সাফল্য যেমন একদিকে আনন্দের, তেমনি অন্যদিকে এটি বড় চ্যালেঞ্জও নিয়ে এসেছে। কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বজায় রাখার পাশাপাশি নিজেদের অস্থির প্রদেশ বেলুচিস্তান নিয়ে সৃষ্ট কঠিন পরিস্থিতিরও মোকাবিলা করতে হচ্ছে দেশটিকে।
সামরিক ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাটকে জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী বর্তমানে উচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “গত বছর ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকেই সীমান্ত দিয়ে (ইরান থেকে) সন্ত্রাসী তৎপরতা অনেক বেড়ে গেছে। চলমান যুদ্ধের কারণে আমরা এখন বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে আরও বড় ধরণের হামলার আশংকা করছি এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তান ও ইরান একে অপরের বেলুচিস্তান অঞ্চলে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর গোপন আস্তানা লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছিল।
সীমান্তবর্তী বেলুচ জাতীয়তাবাদ এবং সশস্ত্র তৎপরতা
প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর বেলুচিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ, যা দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ। ইরানের সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের সঙ্গে এর ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ঐতিহাসিক বেলুচিস্তান অঞ্চলটি বর্তমানে পাকিস্তান, ইরান ও আফগানিস্তান এই তিন দেশের মধ্যে বিস্তৃত। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এই অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন প্রবল হয়েছে, যার পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র তৎপরতাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বেলুচিস্তান অঞ্চলের অনেকেরই ধারণা, তাদের ভূমি এই রাষ্ট্রগুলো দ্বারা দখল করে রাখা হয়েছে। এমনকি সেখানে চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগকেও তারা নব্য-উপনিবেশবাদ মনে করে। এর ফলে বেলুচ লিবারেশন আর্মিসহ (বিএলএ) বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী এসব প্রকল্পকে লক্ষ্য করে নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে চলমান অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন জিহাদি গোষ্ঠী এই অঞ্চলে নিজেদের আস্তানা গেড়েছে এবং আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত এলাকা থেকে দক্ষিণ দিকে তাদের প্রভাব বিস্তার করছে।
পাকিস্তানের একজন ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “আফগানিস্তান-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে এই গোষ্ঠীগুলোর অনেকেই এখন ইরানের সীমান্ত এলাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ভারত ও ইসরায়েল উভয় দেশই এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পেছনে প্রচুর বিনিয়োগ করছে।”
ইরান যুদ্ধের সমান্তরালে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান একে অপরের বিরুদ্ধে সীমান্ত দিয়ে সশস্ত্র উগ্রবাদ উসকে দেওয়ার অভিযোগে লড়ছে। ভারত ও পাকিস্তানও নিয়মিত একে অপরের বিরুদ্ধে একই ধরনের দাবি করে আসছে। এমনকি গত বছর কাশ্মীরে এক জিহাদি হামলার পর এই দেশ দুটির মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তবে বর্তমানে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অনেকেই ইরান-পাকিস্তান সীমান্তকে তাদের প্রধান কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র বা মিলিট্যান্ট হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য স্থির করেছে।

আন্ত:সম্প্রদায় বিভেদ
বিএলএর মতো বেলুচ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি বেলুচিস্তানে সুন্নি জিহাদি মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ইসলামিক স্টেট খোরাসান থেকে শুরু করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান এবং তাদের বিভিন্ন সহযোগী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। বিশেষ করে খ্রিস্টান এবং শিয়া হাজারা সম্প্রদায়ের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা তাদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে।
বেলুচিস্তানে সুন্নি জিহাদিরা স্থানীয় শিয়া জনগোষ্ঠীর ওপর বারবার হামলা চালালেও, বর্তমানে ওই অঞ্চলে শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হচ্ছে। একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, “পাকিস্তানে শিয়া সশস্ত্র তৎপরতা আগের চেয়ে বেড়েছে। এদের অনেকেই ইরান থেকে সরাসরি সরঞ্জাম এবং আদর্শিক সমর্থন পেয়ে থাকে।”
পাকিস্তানের মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ সুন্নি এবং ২০ শতাংশ শিয়া। ১৯৭০ ও ৮০-র দশকে দেশটিতে যে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ঘটেছিল, তাদের প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট সাম্প্রদায়িক বা মাযহাবী ঝোঁক ছিল। গত কয়েক দশকে পাকিস্তানে সালাফি ও দেওবন্দি জিহাদী তৎপরতার ব্যাপক বিস্তার এবং উগ্র সুন্নি ও শিয়া-বিরোধী রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় সমর্থনের ফলে শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এক প্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘লিওয়া জয়নাবিয়ুন’-এর মতো গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে, যারা পাকিস্তান থেকে শিয়া যোদ্ধাদের সংগ্রহ করে এবং তারা মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত প্রক্সি যুদ্ধে অংশ নেয়।
বর্তমানে সেই যুদ্ধগুলো দক্ষিণ এশিয়ার দিকে বিস্তৃত হচ্ছে। একইসাথে তালেবানের পুনরুত্থানের ফলে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে আন্ত:সম্প্রদায় বিভেদগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এর ফলে লস্কর-ই-সারুল্লাহর মতো নতুন নতুন শিয়া সংগঠনের জন্ম হচ্ছে। গত বছর লিওয়া জয়নাবিয়ুন-পন্থী একটি সংগঠন ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের পক্ষে কথা বলার অপরাধে একজন পাকিস্তানি সাংবাদিককে হত্যা করে। ঘটনাটি এটাই প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলো এখন দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরানের সিস্তান ও বেলুচিস্তান অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র তৎপরতায় ইতিমধ্যেই একটি সাম্প্রদায়িক রূপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ‘জুনদাল্লাহ’ এবং ‘জইশ আল-আদল’-এর মতো সুন্নি জিহাদি গোষ্ঠীগুলো শিয়া-বিরোধী কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এ ছাড়া গত বছর সুন্নি মিলিশিয়াদের একটি জোট হিসেবে ‘জাবহে-ই মুবারিজিন-ই মারদুমি’ (জেএমএম) আত্মপ্রকাশ করেছে। এই গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বিভিন্ন তালেবান উপদলসহ অন্যান্য সুন্নি সংগঠনগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব লেফটেন্যান্ট জেনারেল তালাত মাসুদ দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “একই আদর্শ এবং এই অঞ্চলে অভিন্ন লক্ষ্য থাকার কারণে এই গোষ্ঠীগুলোর মিত্র হয়ে ওঠাটা স্বাভাবিক। আর এই কারণেই তারা এখন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে জোট বাঁধছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই বিদ্রোহ দমনে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন যেকোনো অভিযান কেবল সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের লক্ষ্যেই পরিচালিত হয় এবং তা যেন কোনো নির্দিষ্ট মাযহাব, নৃগোষ্ঠী বা গ্রুপকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রতীক হিসেবে প্রতীয়মান না হয়।”

বিচ্ছিন্নতাবাদী, জিহাদি এবং যুদ্ধ–এক বিষাক্ত সমীকরণ
বিচ্ছিন্নতাবাদী বিএলএ ও টিটিপির মধ্যে গড়ে ওঠা জোটের ফলে পাকিস্তানে গত এক দশকের মধ্যে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে গেছে। বর্তমানে ২০২৬ সালের গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সে পাকিস্তান তালিকার শীর্ষে রয়েছে।
বরাবরের মতো ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পাশাপাশি পাকিস্তান এই পরিস্থিতির জন্য কাবুলের তালেবান শাসনকেও দায়ী করছে এবং এর ফলে হাজার হাজার আফগান শরণার্থীকে দেশটি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে পর্দার আড়ালে ইসলামাবাদ এখন আরও বড় এক আশঙ্কার প্রহর গুনছে–সশস্ত্র উগ্রবাদের কেন্দ্রবিন্দু আফগানিস্তান থেকে সরে ইরানের দিকে চলে যেতে পারে।
ইরানে যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে লাখ লাখ শরণার্থী নিকটবর্তী সীমান্ত হিসেবে বেলুচিস্তানে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে। এমন পরিস্থিতি সিস্তান ও বেলুচিস্তান ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে তাদের লক্ষ্য আরও বড় করতে উৎসাহিত করবে, বিশেষ করে যদি তারা বাইরের কোনো শক্তির সমর্থন পায়।
দ্য বেলুচ ইনসারজেন্সি ইন পাকিস্তান বইয়ের সহ-লেখক এবং গবেষক ইমতিয়াজ বেলুচ বলেন, “ইরানে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বর্তমানে সরাসরি এই যুদ্ধে জড়াতে কিছুটা ইতস্ততবোধ করছে বলে মনে হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “তবে বিস্তৃত সমর্থন এবং ভৌগোলিক বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে তৈরি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা পেলে এই গোষ্ঠীগুলো তাদের তৎপরতা আরও বাড়াতে উৎসাহিত হতে পারে। বিশেষ করে ইরানের সীমান্ত এবং উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে তারা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।”
বিএলএর মতো কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অন্যদিকে, সিস্তান ও বেলুচিস্তান ভিত্তিক জিহাদি গোষ্ঠীগুলো স্বভাবতই কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করছে। কারণ, তাদের সদস্য সংগ্রহের প্রচারণায় সাধারণত ইসরায়েল-বিরোধী ইসলামপন্থী মনোভাব ব্যবহার করা হয়। তা সত্ত্বেও, এই অঞ্চলের বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী এখন তাদের স্বাভাবিক মিত্র হয়ে উঠছে, যারা ইরান অথবা পাকিস্তানের বিরোধিতা করতে চায়।
বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউনাইটেড বেলুচ আর্মির সাবেক প্রধান মেহরান মারি বলেন, “ইসরায়েল জানে যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী একটি হুমকি। তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে নানাভাবে সাহায্য করে নিজেদের গুরুত্ব বাড়িয়ে নিয়েছে, কিন্তু আফগানিস্তানের মতো ইরানের ক্ষেত্রেও তারা দ্বিমুখী চাল চালার ক্ষমতা রাখে। এমনকি এবার তারা শিয়া গোষ্ঠীগুলোকেও সমর্থন দেওয়া শুরু করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এর ফলে আফগানিস্তানের তালেবান এবং বেলুচ স্বাধীনতাকামীদের মধ্যকার জোট আরও শক্তিশালী হবে। কারণ, বেলুচিস্তানের মানুষের মতো আফগানিস্তানের মানুষও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছে।”
মারিরের পরিবার একসময় বিএলএর নেতৃত্বে ছিল। তার মতে একটি স্বায়ত্তশাসিত বেলুচিস্তান পাকিস্তানের স্বার্থে না হলেও বিশ্বশক্তিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করবে। তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার প্রভাব কতটা ভয়াবহ। হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার এলাকা আমাদের (বেলুচিস্তান)। তাই বেলুচদের এই স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশ্বশক্তিগুলোর নজর থাকা উচিত। বেলুচরা স্বভাবগতভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ, আর একটি স্বাধীন বেলুচিস্তান যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্দেশ্য সফল করতে সহায়ক হবে।”

বেলুচ জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের হারানো অধিকারের দাবিগুলো পাকিস্তানের কিছু মানবাধিকার সংগঠনের সমর্থন পেলেও, সাম্প্রতিক সশস্ত্র তৎপরতা জনমতকে তাদের বিপক্ষে ঠেলে দিয়েছে। শ্রমিক ও খনি শ্রমিক হত্যা থেকে শুরু করে বাস ও ট্রেনে হামলার মতো ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এই নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়েছেন বেলুচিস্তানের সেইসব রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মীরাও, যারা বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে কয়েক হাজার মানুষের গুম হওয়ার ঘটনায় তারা সোচ্চার ছিলেন। এখন আশংকা করা হচ্ছে যে, ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় সাধারণ বেলুচ জনগণের দুর্দশা আরও প্রকট হয়ে উঠবে।
বেলুচ ইয়াকজেতি কমিটির নেত্রী সাম্মি দীন বালুচ দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “ইরান, আফগানিস্তান বা অন্য যেখানেই হোক না কেন—আঞ্চলিক প্রতিটি সংঘাতের ফলাফল সবসময় একটাই হয়–সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ওপর চরম দমন-পীড়ন।”
ইরান যুদ্ধের মোড় যেদিকেই যাক না কেন, এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়বে এবং নজরদারি আরও জোরালো হবে। সাম্মি বলেন, “প্রতিটি ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতই ভিন্নমত দমনের একটি অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র প্রায়ই রাজনৈতিক দাবিগুলোকে নিরাপত্তা হুমকি বা ‘বিদেশী মদদপুষ্ট’ বলে তকমা দেয়, যার ফলে অধিকারকর্মী, সাংবাদিক এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ওপর দমন-পীড়ন আরও বেড়ে যায়।”
দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত বেলুচ জনগোষ্ঠী, ইরানের যুদ্ধের সাথে একাত্মতা পোষণকারী শিয়া সম্প্রদায় অথবা আদর্শগতভাবে অনুপ্রাণিত যেকোনো কট্টর ইসলামপন্থী সবাই এখন বেলুচিস্তানে তাদের ক্ষোভের সহিংস বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর সুযোগ পেতে পারে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে পূর্ব সীমান্তে ভারতের সাথে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে লিপ্ত এবং পশ্চিম সীমান্তে আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রলম্বিত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় দেশটি এখন বেলুচিস্তানে একটি বহুমুখী এবং বহুপাক্ষিক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা ধীরে ধীরে বিশ্ববাসীর নজর কাড়ছে।
তাই চলতি সপ্তাহে ইসলামাবাদ যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে, তখন তাদের এমন একটি সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা উচিত, যা একই সঙ্গে পাকিস্তানের নিজের ক্রমাগত বাড়তে থাকা নিরাপত্তা সংকটগুলোকেও মোকাবিলা করতে সহায়ক হবে।
লেখক: কুনওয়ার খুলদুন শহীদ দ্য ডিপ্লোম্যাট এর পাকিস্তান ভিত্তিক সংবাদদাতা।
*লেখাটি দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ থেকে অনূদিত*

চলমান যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মাঝে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। এমনকি ইসলামাবাদে উভয় পক্ষের মধ্যে বৈঠকের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, পাকিস্তানের নেতৃত্ব তেহরান ও ওয়াশিংটন উভয় পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে। চলতি সপ্তাহে আলোচনা ও সাময়িক যুদ্ধবিরতির খবরের আগে, গত ২২ মার্চ ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন বলে জানা গেছে।
ইসলামাবাদের জন্য এই কূটনৈতিক সাফল্য যেমন একদিকে আনন্দের, তেমনি অন্যদিকে এটি বড় চ্যালেঞ্জও নিয়ে এসেছে। কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বজায় রাখার পাশাপাশি নিজেদের অস্থির প্রদেশ বেলুচিস্তান নিয়ে সৃষ্ট কঠিন পরিস্থিতিরও মোকাবিলা করতে হচ্ছে দেশটিকে।
সামরিক ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাটকে জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী বর্তমানে উচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “গত বছর ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকেই সীমান্ত দিয়ে (ইরান থেকে) সন্ত্রাসী তৎপরতা অনেক বেড়ে গেছে। চলমান যুদ্ধের কারণে আমরা এখন বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে আরও বড় ধরণের হামলার আশংকা করছি এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তান ও ইরান একে অপরের বেলুচিস্তান অঞ্চলে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর গোপন আস্তানা লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছিল।
সীমান্তবর্তী বেলুচ জাতীয়তাবাদ এবং সশস্ত্র তৎপরতা
প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর বেলুচিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ, যা দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৪ শতাংশ। ইরানের সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশের সঙ্গে এর ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ঐতিহাসিক বেলুচিস্তান অঞ্চলটি বর্তমানে পাকিস্তান, ইরান ও আফগানিস্তান এই তিন দেশের মধ্যে বিস্তৃত। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এই অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন প্রবল হয়েছে, যার পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র তৎপরতাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বেলুচিস্তান অঞ্চলের অনেকেরই ধারণা, তাদের ভূমি এই রাষ্ট্রগুলো দ্বারা দখল করে রাখা হয়েছে। এমনকি সেখানে চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগকেও তারা নব্য-উপনিবেশবাদ মনে করে। এর ফলে বেলুচ লিবারেশন আর্মিসহ (বিএলএ) বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী এসব প্রকল্পকে লক্ষ্য করে নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে চলমান অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন জিহাদি গোষ্ঠী এই অঞ্চলে নিজেদের আস্তানা গেড়েছে এবং আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত এলাকা থেকে দক্ষিণ দিকে তাদের প্রভাব বিস্তার করছে।
পাকিস্তানের একজন ঊর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “আফগানিস্তান-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে এই গোষ্ঠীগুলোর অনেকেই এখন ইরানের সীমান্ত এলাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ভারত ও ইসরায়েল উভয় দেশই এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পেছনে প্রচুর বিনিয়োগ করছে।”
ইরান যুদ্ধের সমান্তরালে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান একে অপরের বিরুদ্ধে সীমান্ত দিয়ে সশস্ত্র উগ্রবাদ উসকে দেওয়ার অভিযোগে লড়ছে। ভারত ও পাকিস্তানও নিয়মিত একে অপরের বিরুদ্ধে একই ধরনের দাবি করে আসছে। এমনকি গত বছর কাশ্মীরে এক জিহাদি হামলার পর এই দেশ দুটির মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তবে বর্তমানে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অনেকেই ইরান-পাকিস্তান সীমান্তকে তাদের প্রধান কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র বা মিলিট্যান্ট হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য স্থির করেছে।

আন্ত:সম্প্রদায় বিভেদ
বিএলএর মতো বেলুচ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি বেলুচিস্তানে সুন্নি জিহাদি মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ইসলামিক স্টেট খোরাসান থেকে শুরু করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান এবং তাদের বিভিন্ন সহযোগী গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। বিশেষ করে খ্রিস্টান এবং শিয়া হাজারা সম্প্রদায়ের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা তাদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে।
বেলুচিস্তানে সুন্নি জিহাদিরা স্থানীয় শিয়া জনগোষ্ঠীর ওপর বারবার হামলা চালালেও, বর্তমানে ওই অঞ্চলে শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হচ্ছে। একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, “পাকিস্তানে শিয়া সশস্ত্র তৎপরতা আগের চেয়ে বেড়েছে। এদের অনেকেই ইরান থেকে সরাসরি সরঞ্জাম এবং আদর্শিক সমর্থন পেয়ে থাকে।”
পাকিস্তানের মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ সুন্নি এবং ২০ শতাংশ শিয়া। ১৯৭০ ও ৮০-র দশকে দেশটিতে যে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ঘটেছিল, তাদের প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট সাম্প্রদায়িক বা মাযহাবী ঝোঁক ছিল। গত কয়েক দশকে পাকিস্তানে সালাফি ও দেওবন্দি জিহাদী তৎপরতার ব্যাপক বিস্তার এবং উগ্র সুন্নি ও শিয়া-বিরোধী রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় সমর্থনের ফলে শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এক প্রকার কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘লিওয়া জয়নাবিয়ুন’-এর মতো গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছে, যারা পাকিস্তান থেকে শিয়া যোদ্ধাদের সংগ্রহ করে এবং তারা মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-সমর্থিত প্রক্সি যুদ্ধে অংশ নেয়।
বর্তমানে সেই যুদ্ধগুলো দক্ষিণ এশিয়ার দিকে বিস্তৃত হচ্ছে। একইসাথে তালেবানের পুনরুত্থানের ফলে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে আন্ত:সম্প্রদায় বিভেদগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এর ফলে লস্কর-ই-সারুল্লাহর মতো নতুন নতুন শিয়া সংগঠনের জন্ম হচ্ছে। গত বছর লিওয়া জয়নাবিয়ুন-পন্থী একটি সংগঠন ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের পক্ষে কথা বলার অপরাধে একজন পাকিস্তানি সাংবাদিককে হত্যা করে। ঘটনাটি এটাই প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলো এখন দক্ষিণ এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরানের সিস্তান ও বেলুচিস্তান অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র তৎপরতায় ইতিমধ্যেই একটি সাম্প্রদায়িক রূপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ‘জুনদাল্লাহ’ এবং ‘জইশ আল-আদল’-এর মতো সুন্নি জিহাদি গোষ্ঠীগুলো শিয়া-বিরোধী কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এ ছাড়া গত বছর সুন্নি মিলিশিয়াদের একটি জোট হিসেবে ‘জাবহে-ই মুবারিজিন-ই মারদুমি’ (জেএমএম) আত্মপ্রকাশ করেছে। এই গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বিভিন্ন তালেবান উপদলসহ অন্যান্য সুন্নি সংগঠনগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব লেফটেন্যান্ট জেনারেল তালাত মাসুদ দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “একই আদর্শ এবং এই অঞ্চলে অভিন্ন লক্ষ্য থাকার কারণে এই গোষ্ঠীগুলোর মিত্র হয়ে ওঠাটা স্বাভাবিক। আর এই কারণেই তারা এখন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে জোট বাঁধছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই বিদ্রোহ দমনে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন যেকোনো অভিযান কেবল সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের লক্ষ্যেই পরিচালিত হয় এবং তা যেন কোনো নির্দিষ্ট মাযহাব, নৃগোষ্ঠী বা গ্রুপকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রতীক হিসেবে প্রতীয়মান না হয়।”

বিচ্ছিন্নতাবাদী, জিহাদি এবং যুদ্ধ–এক বিষাক্ত সমীকরণ
বিচ্ছিন্নতাবাদী বিএলএ ও টিটিপির মধ্যে গড়ে ওঠা জোটের ফলে পাকিস্তানে গত এক দশকের মধ্যে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে গেছে। বর্তমানে ২০২৬ সালের গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সে পাকিস্তান তালিকার শীর্ষে রয়েছে।
বরাবরের মতো ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পাশাপাশি পাকিস্তান এই পরিস্থিতির জন্য কাবুলের তালেবান শাসনকেও দায়ী করছে এবং এর ফলে হাজার হাজার আফগান শরণার্থীকে দেশটি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে পর্দার আড়ালে ইসলামাবাদ এখন আরও বড় এক আশঙ্কার প্রহর গুনছে–সশস্ত্র উগ্রবাদের কেন্দ্রবিন্দু আফগানিস্তান থেকে সরে ইরানের দিকে চলে যেতে পারে।
ইরানে যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে লাখ লাখ শরণার্থী নিকটবর্তী সীমান্ত হিসেবে বেলুচিস্তানে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে। এমন পরিস্থিতি সিস্তান ও বেলুচিস্তান ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে তাদের লক্ষ্য আরও বড় করতে উৎসাহিত করবে, বিশেষ করে যদি তারা বাইরের কোনো শক্তির সমর্থন পায়।
দ্য বেলুচ ইনসারজেন্সি ইন পাকিস্তান বইয়ের সহ-লেখক এবং গবেষক ইমতিয়াজ বেলুচ বলেন, “ইরানে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বর্তমানে সরাসরি এই যুদ্ধে জড়াতে কিছুটা ইতস্ততবোধ করছে বলে মনে হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “তবে বিস্তৃত সমর্থন এবং ভৌগোলিক বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে তৈরি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা পেলে এই গোষ্ঠীগুলো তাদের তৎপরতা আরও বাড়াতে উৎসাহিত হতে পারে। বিশেষ করে ইরানের সীমান্ত এবং উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে তারা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।”
বিএলএর মতো কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অন্যদিকে, সিস্তান ও বেলুচিস্তান ভিত্তিক জিহাদি গোষ্ঠীগুলো স্বভাবতই কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করছে। কারণ, তাদের সদস্য সংগ্রহের প্রচারণায় সাধারণত ইসরায়েল-বিরোধী ইসলামপন্থী মনোভাব ব্যবহার করা হয়। তা সত্ত্বেও, এই অঞ্চলের বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী এখন তাদের স্বাভাবিক মিত্র হয়ে উঠছে, যারা ইরান অথবা পাকিস্তানের বিরোধিতা করতে চায়।
বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউনাইটেড বেলুচ আর্মির সাবেক প্রধান মেহরান মারি বলেন, “ইসরায়েল জানে যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী একটি হুমকি। তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে নানাভাবে সাহায্য করে নিজেদের গুরুত্ব বাড়িয়ে নিয়েছে, কিন্তু আফগানিস্তানের মতো ইরানের ক্ষেত্রেও তারা দ্বিমুখী চাল চালার ক্ষমতা রাখে। এমনকি এবার তারা শিয়া গোষ্ঠীগুলোকেও সমর্থন দেওয়া শুরু করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “এর ফলে আফগানিস্তানের তালেবান এবং বেলুচ স্বাধীনতাকামীদের মধ্যকার জোট আরও শক্তিশালী হবে। কারণ, বেলুচিস্তানের মানুষের মতো আফগানিস্তানের মানুষও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছে।”
মারিরের পরিবার একসময় বিএলএর নেতৃত্বে ছিল। তার মতে একটি স্বায়ত্তশাসিত বেলুচিস্তান পাকিস্তানের স্বার্থে না হলেও বিশ্বশক্তিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করবে। তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার প্রভাব কতটা ভয়াবহ। হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার এলাকা আমাদের (বেলুচিস্তান)। তাই বেলুচদের এই স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশ্বশক্তিগুলোর নজর থাকা উচিত। বেলুচরা স্বভাবগতভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ, আর একটি স্বাধীন বেলুচিস্তান যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্দেশ্য সফল করতে সহায়ক হবে।”

বেলুচ জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের হারানো অধিকারের দাবিগুলো পাকিস্তানের কিছু মানবাধিকার সংগঠনের সমর্থন পেলেও, সাম্প্রতিক সশস্ত্র তৎপরতা জনমতকে তাদের বিপক্ষে ঠেলে দিয়েছে। শ্রমিক ও খনি শ্রমিক হত্যা থেকে শুরু করে বাস ও ট্রেনে হামলার মতো ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এই নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়েছেন বেলুচিস্তানের সেইসব রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মীরাও, যারা বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে কয়েক হাজার মানুষের গুম হওয়ার ঘটনায় তারা সোচ্চার ছিলেন। এখন আশংকা করা হচ্ছে যে, ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় সাধারণ বেলুচ জনগণের দুর্দশা আরও প্রকট হয়ে উঠবে।
বেলুচ ইয়াকজেতি কমিটির নেত্রী সাম্মি দীন বালুচ দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “ইরান, আফগানিস্তান বা অন্য যেখানেই হোক না কেন—আঞ্চলিক প্রতিটি সংঘাতের ফলাফল সবসময় একটাই হয়–সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ওপর চরম দমন-পীড়ন।”
ইরান যুদ্ধের মোড় যেদিকেই যাক না কেন, এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়বে এবং নজরদারি আরও জোরালো হবে। সাম্মি বলেন, “প্রতিটি ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতই ভিন্নমত দমনের একটি অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র প্রায়ই রাজনৈতিক দাবিগুলোকে নিরাপত্তা হুমকি বা ‘বিদেশী মদদপুষ্ট’ বলে তকমা দেয়, যার ফলে অধিকারকর্মী, সাংবাদিক এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ওপর দমন-পীড়ন আরও বেড়ে যায়।”
দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত বেলুচ জনগোষ্ঠী, ইরানের যুদ্ধের সাথে একাত্মতা পোষণকারী শিয়া সম্প্রদায় অথবা আদর্শগতভাবে অনুপ্রাণিত যেকোনো কট্টর ইসলামপন্থী সবাই এখন বেলুচিস্তানে তাদের ক্ষোভের সহিংস বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর সুযোগ পেতে পারে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে পূর্ব সীমান্তে ভারতের সাথে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে লিপ্ত এবং পশ্চিম সীমান্তে আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রলম্বিত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় দেশটি এখন বেলুচিস্তানে একটি বহুমুখী এবং বহুপাক্ষিক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা ধীরে ধীরে বিশ্ববাসীর নজর কাড়ছে।
তাই চলতি সপ্তাহে ইসলামাবাদ যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে, তখন তাদের এমন একটি সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা উচিত, যা একই সঙ্গে পাকিস্তানের নিজের ক্রমাগত বাড়তে থাকা নিরাপত্তা সংকটগুলোকেও মোকাবিলা করতে সহায়ক হবে।
লেখক: কুনওয়ার খুলদুন শহীদ দ্য ডিপ্লোম্যাট এর পাকিস্তান ভিত্তিক সংবাদদাতা।
*লেখাটি দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ থেকে অনূদিত*

মানবপাচারকারীরা প্রায়ই বিপজ্জনক রুট ব্যবহার করে মানুষ পাচার করে থাকে। সমুদ্রপথে বা দুর্গম স্থলপথে যাত্রাকালে অনেকেই প্রাণ হারান। এর সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে সামনে আছে ইতালি পাড়ি দেওয়ার সময় সমুদ্রে ডুবে এই মানুষদের মৃত্যু। সুনামগঞ্জের বাতাস আজ ভারী। অথচ, সঠিক পথে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গেলে তাদের স্বপ্নের