প্রায় ১৫৭ বছর পুরনো কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ভৌগলিক গুরুত্ব, পর্যটননির্ভর অর্থনীতি এবং দ্রুত নগরায়ণের প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ২৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, দেশের সিটি করপোরেশনের তালিকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যুক্ত হতে যাচ্ছে কক্সবাজার। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পুরনো কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কক্সবাজার পৌরসভা দীর্ঘ সময় ধরে দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে নাগরিক সেবা দিয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটনকেন্দ্রিক নগর হিসেবে এর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে, যা পৌরসভার বিদ্যমান কাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। পর্যটননির্ভর অর্থনীতি, অবকাঠামোগত চাপ এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বের কারণে এটিকে সিটি করেপোরেশনে উন্নীত করার প্রস্তাব নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক উদ্যোগে বিষয়টি নতুন গতি পেয়েছে।
সরকারি পর্যায়ে প্রক্রিয়া শুরু হওয়া এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমর্থন থাকায় কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তরের বিষয়টি এখন বাস্তবায়নের পথে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “দেশের প্রাচীনতম পৌরসভাগুলোর একটি কক্সবাজার হলেও পর্যটননির্ভর এ শহরটি নানা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। বিশ্বের দীর্ঘতম বালুকাময় সমুদ্রসৈকত থাকা সত্ত্বেও এ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের ওপর পড়েছে।”
নজরুল ইসলাম আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় আশার সঞ্চার হয়েছে।”সিটি করপোরেশনে রূপান্তর হলে নগর ব্যবস্থাপনায় আর্থিক বরাদ্দ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়বে বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, এর ফলে সড়ক উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নে বড় পরিসরে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সংসদ সদস্যের উদ্যোগ ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি
কক্সবাজারকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার বিষয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে উদ্যোগ শুরু হয় গত ২ এপ্রিল। কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে একটি আধা-সরকারি চিঠি (ডিও লেটার) পাঠান। সেখানে তিনি কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তরের দাবি জানান।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, কক্সবাজার বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন নগরী এবং বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমনে শহরের জনসংখ্যা, অবকাঠামো চাহিদা এবং নাগরিক সেবার পরিধি দ্রুত বাড়ছে।
বর্তমানে সীমিত জনবল ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে পৌরসভা নগর ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করছে, যা ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। এ অবস্থায় আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কার্যকর নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন কাঠামো প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়।
এর ধারাবাহিকতায় গত ১৩ জুন কক্সবাজার সফরকালে এক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৮ জুন পাঠানো একটি চিঠিতেও এ বিষয়ে সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয় এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দ্রুত অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠানোর কথাও বলা হয়।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ও পৌরসভার প্রশাসক মো. শামীম আল ইমরান জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পরবর্তী কোনো অগ্রগতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আব্দুল আউয়াল মজুমদার এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “আমি মনে করি যে এটা ভালো হবে। আমি সমর্থন করি। কারণ এটা তো বাংলাদেশের এক নম্বর আর্নিং প্রজেক্ট।”
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বছর চার আগে কক্সবাজার গিয়েছিলাম, তো সেখানে একেবারে দুরাবস্থা—রাস্তাঘাট ভাঙা, তারপরে আপনার আবাসিক এলাকা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। দোকানপাট সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তো আমি মনে করি, এটা ভালো সিদ্ধান্ত হবে।”