বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসেবে ভারত অত্যন্ত গর্ববোধ করে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুবিধাগুলো কোটি কোটি তরুণ ভারতীয়দের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। কর্মসংস্থানের অভাব ও কাজের সুযোগ না থাকায় বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটির শত শত হাজার তরুণ সম্প্রতি রাস্তায় নেমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
জুলাই মাসে একটি সর্বভারতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে জেন-জি বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, তা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবহেলার বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক তরুণ অসন্তোষের রূপ নেয়। এই বিক্ষোভের ফলে প্রধানমন্ত্রী মোদি পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন, যা একেবারেই বিরল। তিনি তার শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলো সংস্কারের জন্য একটি বিশেষ কমিশন গঠন করেছেন। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, তরুণদের মধ্যে এই অসন্তোষের যে ঢেউ দেখা যাচ্ছে তা ভারতের প্রবৃদ্ধি মডেলের অনেক গভীর ও কাঠামোগত সমস্যাকে প্রতিফলিত করে, যা সমাধান করা পরীক্ষার সংস্কারের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হবে।
সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি (সিএমআইই)-এর প্রধান নির্বাহী মহেশ ব্যাস এ বিষয়ে বলেন যে, ভারতের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। ভারত তার বিশাল জনসংখ্যার সুবিধা বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগাতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে এবং দেশের তরুণ স্নাতকদের জন্য মানসম্পন্ন চাকরি নিশ্চিত করতে পারেনি। এই সংকটের মাত্রা অত্যন্ত তীব্র ও নজিরবিহীন। ভারতের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা প্রায় ৩৭ কোটি, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। তাদের মধ্যে অনেকেই আগের তুলনায় অনেক বেশি লেখাপড়া করছেন। কিন্তু কষ্টার্জিত ও প্রায়শই অত্যন্ত ব্যয়বহুল ডিগ্রি অর্জন করার পরও তারা কোনো শোভন বা ভালো চাকরির নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।
ভারতের দারিদ্র্যপীড়িত অঙ্গরাজ্য বিহারের এক নির্মাণ শ্রমিকের সন্তান ৩২ বছর বয়সী রঞ্জিত কুমার দাসের গল্পটি এই পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট উদাহরণ। এক দশক আগে রসায়নে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর রঞ্জিত আশা করেছিলেন যে এটি তার জীবনকে আমূল বদলে দেবে। কিন্তু তা না হয়ে তিনি স্বল্প বেতনের কাজে আটকে আছেন। রঞ্জিত আক্ষেপ করে জানান যে, তার বড় দুই ভাই, যাদের কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এবং যারা পেশায় রাজমিস্ত্রি ও গাড়িচালক, তারা তার চেয়ে অনেক বেশি আয় করেন। ডেন্টিস্টের ক্লিনিকে আট বছর ধরে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করার পর রঞ্জিতের সর্বশেষ মাসিক বেতন ছিল মাত্র ১৬ হাজার রুপি। তার মতে, ভারতের এই বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় ভালো চাকরির সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল।
সিএমআইই-এর সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত অর্থবছরে ভারতে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৬.৯ শতাংশ থাকলেও স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১৪.৫ শতাংশ। এমনকি ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে ৩৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। মোদির সমৃদ্ধ ভারতের স্বপ্নের বিপরীতে এমবিএ ডিগ্রিধারীদের ট্যাক্সি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করার গল্প এখন পুরো ভারতে অহরহ দেখা যাচ্ছে।
শুরুতে ‘কাকরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামের একটি অনলাইন সামাজিক ব্যঙ্গাত্মক প্রচারের মাধ্যমে চালিত এই আন্দোলনকে সরকার উপেক্ষা এবং কঠোর হাতে দমন করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আন্দোলনের ব্যাপকতা দেখে পরবর্তীতে সরকার তার অবস্থান পরিবর্তন করে। প্রধানমন্ত্রী মোদি সপ্তাহের পর সপ্তাহ শিক্ষার্থীদের এই উদ্বেগ নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। তিনি হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তা দেওয়া শুরু করেন। এসব বার্তায় তিনি তরুণদের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর কথা বলেন এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করার নির্দেশ দেন। একটি ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, এরা পথভ্রষ্ট শিশু এবং তাদের সঠিক পথ দেখানো সরকারের দায়িত্ব। মোদির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জ্যেষ্ঠ নেতারা আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন যে, নীতিগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে এবং কর্মসংস্থান-সংযুক্ত প্রণোদনার ওপর কাজ করা হচ্ছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
তবে সরকারের সমালোচকেরা জোর দিয়ে বলছেন যে, সারা বিশ্বেই তরুণদের জন্য ভালো বেতনের চাকরি তৈরি করা কঠিন হলেও ভারতের এই বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে সরকারের নিজস্ব নীতিগত ভুল ও সিদ্ধান্তহীনতা অনেক বেশি দায়ী। ‘ইন্ডিয়া আউট অব ওয়ার্ক’ বইয়ের লেখক ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রা উল্লেখ করেন যে, ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে যখন ভারতের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৮ শতাংশ ছিল, মোদি সরকারের আমলে তা কমে ৬ থেকে ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ এই একই সময়ে শিক্ষার্থী বা স্নাতকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
সন্তোষ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, অর্থনীতির এই কাঠামোগত সংকট মূলত এই সরকারের নেওয়া ভুল নীতিগুলোর ফল। উদাহরণ হিসেবে তিনি ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর হুট করে গৃহীত নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন, যা এক রাতে দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। এর পর তড়িঘড়ি করে আনা একটি জটিল ডিজিটাল পণ্য ও সেবা কর (জিএসটি) দেশের ছোট ও মাঝারি ব্যবসাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরবর্তীতে করোনাভাইরাস মহামারীর সময় কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই জারি করা হঠাৎ লকডাউন শহরের কোটি কোটি শ্রমিককে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য করেছিল, যা অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানকে আরও দুর্বল করে দেয়।
ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ সদস্য প্রবীণ চক্রবর্তী সমস্যার মূল কারণটিকে আরও সহজভাবে ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন। ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের এই প্রতিনিধি জানান যে, এই সম্পূর্ণ সংকটটিকে একটি মাত্র তথ্যের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব, আর তা হলো ব্যক্তিমালিকানাধীন বা বেসরকারি বিনিয়োগ। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) শতাংশ হিসেবে বেসরকারি বিনিয়োগের হার ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে এবং মোদি সরকারের আমলেই এটি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
এর কারণ হিসেবে প্রবীণ চক্রবর্তী চরম স্বজনপ্রীতি বা ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’-কে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, কোনো ব্যবসায়ী যদি সরকারের পছন্দের দুটি মূল ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত না হন, তবে তিনি সবসময় আশঙ্কায় থাকেন। বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার পর হুট করে সরকারি অনুমতি না পাওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন করা অথবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি পছন্দের কোনো শিল্পপতির কাছে বিক্রি করে দেওয়ার চাপের মুখে পড়ার ভয় সেখানে কাজ করে। অবশ্য এই বিষয়ে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের পক্ষ থেকে মন্তব্যের জন্য ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
নরেন্দ্র মোদির সরকার অবশ্য দক্ষ ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতকে চাঙা করার চেষ্টা করেছে। তারা তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকে আইফোন তৈরির জন্য অ্যাপলকে আকৃষ্ট করেছে এবং দেশীয়ভাবে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও উৎপাদনের জন্য বেসরকারি খাতের সাথে বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু নিবন্ধিত কারখানাগুলোতে কর্মসংস্থান কিছু বাড়লেও লেবার ফোর্স সার্ভে বা শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বলছে যে ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতে ভারতীয়দের কাজের অনুপাত থমকে আছে। অনেক তরুণ কৃষি খাত ছেড়ে এলেও তারা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের বদলে কম দক্ষতার নির্মাণ কাজ বা সাধারণ সেবা খাতে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ফেলো এবং ভারত সরকারের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যম এ বিষয়ে বলেছেন যে, অ্যাপল ছাড়া অন্য খুব কম ক্ষেত্রই (সরকার) সাফল্য পেয়েছে। কারণ বিশ্বব্যাপী শ্রম-ঘন ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ভারতের অংশীদারত্ব দিন দিন কমছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: রয়টার্স
অন্য দিকে, মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধি চীনের বিকল্প হিসেবে ভারতের ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হয়ে ওঠার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যা মোদির অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল। পাশাপাশি ভারতের শীর্ষস্থানীয় আইটি কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অটোমেশনের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবেলা করতে গিয়ে নতুন কর্মী নিয়োগ থেকে পিছিয়ে আসছে। অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যম জোর দিয়ে বলেন যে, সাত বা আট শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে বিজয়োল্লাস সরকার করে থাকে, বাস্তব চিত্রের সাথে তার কোনো মিল নেই। যদিও মোদি সরকার কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার করেছে, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়েছে এবং বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। কিন্তু এগুলো দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হয়নি। সুব্রহ্মণ্যমের মতে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বেপরোয়া ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রকে অসম করে দেওয়ার কারণেই আইন ও নিয়মের ওপর বিনিয়োগকারীদের সেই আস্থা আর অবশিষ্ট নেই।
মাইকেল স্টট: নয়াদিল্লিতে কর্মরত দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস–এর দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরো প্রধান।
(এই লেখাটি লন্ডনের দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস সৌজন্যে প্রকাশিত হলো।)