দীর্ঘদিন ধরে দেশে চলছে গ্যাস সংকট। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, ‘এফএসআরইউ’ নষ্ট হয়ে গেছে এবং এটি সারাতে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছেন। তিনি আরও জানান, এফএসআরইউ ছাড়া গ্যাস সরবরাহ করা যাবে না।
এর ঠিক একদিন পর কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত সামিট এলএনজি টার্মিনালের এফএসআরইউ থেকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্যাস সঞ্চালন চালু করা হয়। সামিট গ্রুপের মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) হারে এলএনজি পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে। আজ রোববার মধ্যরাতের মধ্যেই এই সরবরাহের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়িয়ে পূর্ণ সক্ষমতা; অর্থাৎ, ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সংকট ও সমাধানের এই দোলাচলের মধ্যে প্রশ্ন উঠতেই পারে–দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই ‘এফএসআরইউ’ আসলে কী এবং কীভাবে এটি কাজ করে?
এফএসআরইউ কী
এফএসআরইউ-এর পূর্ণ রূপ হলো–ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট। এটি বিশেষভাবে তৈরি বা রূপান্তরিত জলযান, যা সরবরাহকারী ট্যাঙ্কার থেকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) গ্রহণ করতে পারে। এটি অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রার; মানে ক্রায়োজেনিক ট্যাঙ্কে এলএনজি সংরক্ষণ করে এবং পরে তা পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরিত করে উপকূলীয় পাইপলাইন নেটওয়ার্কে সরবরাহ করে। সোজা ভাষায়, এফএসআরইউ হলো–ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল।
একটি এফএসআরইউ-এর কার্যাবলি ভূমিতে অবস্থিত এলএনজি রিসিভিং টার্মিনালের মতোই। একমাত্র পার্থক্য হলো এফএসআরইউ-এর ক্ষেত্রে গ্যাস সংরক্ষণ ট্যাঙ্ক, রিগ্যাসিফিকেশন প্ল্যান্ট এবং গ্যাস রপ্তানি ব্যবস্থা ভূমির পরিবর্তে একটি ভাসমান জাহাজের কাঠামোর ওপর অবস্থান করে।
এফএসআরইউকে জেটি কিংবা গভীর সমুদ্রে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে নোঙর করে রাখা হয়। সমুদ্রতলের নিচে বা ওপর দিয়ে বিস্তৃত পাইপলাইনের মাধ্যমে এটি জাতীয় গ্যাস নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত থাকে।
এফএসআরইউ বিশেষভাবে তৈরি বা রূপান্তরিত জলযান, যা সরবরাহকারী ট্যাঙ্কার থেকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) গ্রহণ করতে পারে। ছবি: সংগৃহীত
২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে এফএসআরইউ-এর সংখ্যা ছিল ৩০টি, যা ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ বেড়ে ৫১টিতে দাঁড়ায–মাত্র তিন বছরে, যা প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি।
২০২৪ সালে বৈশ্বিক এফএসআরইউ বাজারের মূল্য ছিল ৯০ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার, যা ৭.৮৫ শতাংশ বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি হারে (সিএজিআর) বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩৩ সালের মধ্যে ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কীভাবে কাজ করে?
একটি এলএনজি ক্যারিয়ার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস লিকুইফিকেশন প্ল্যান্ট থেকে রিসিভিং টার্মিনালে পরিবহন করে। অন্যদিকে, এফএসআরইউ এলএনজি গ্রহণ, সংরক্ষণ এবং পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর (রিগ্যাসিফিকেশন) করে থাকে। তবে কিছু জলযান নোঙর করা অবস্থায় এলএনজি ক্যারিয়ার এবং এফএসআরইউ–উভয় হিসেবেই কাজ করতে পারে।
সরবরাহকারী ট্যাঙ্কার মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (মাইনাস ২৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) এলএনজি বহন করে আনে; এই বায়ুমণ্ডলে চাপ ও তাপমাত্রায় প্রাকৃতিক গ্যাস তরলে পরিণত হয় এবং এর আয়তন মূল বায়বীয় রূপের ৬০০ ভাগের এক ভাগে নেমে আসে। পরে চাপ প্রয়োগ ও তাপ সঞ্চালনের মাধ্যমে রিগ্যাসিফিকেশন প্রক্রিয়ায় একে পুনরায় আগের গ্যাসীয় অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।
প্রথম ধাপটি হলো জাহাজ থেকে জাহাজে জ্বালানি স্থানান্তর। এই ধাপে সরবরাহকারী ট্যাঙ্কারটি এফএসআরইউ-এর পাশে অবস্থান নেয় এবং আনলোডিং আর্মস বা ক্রায়োজেনিক হোসের মাধ্যমে ট্যাঙ্কারের কার্গো ট্যাঙ্ক থেকে এলএনজি এফএসআরইউ-এর স্টোরেজ ট্যাঙ্কে স্থানান্তর করে।
এরপর মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও বায়ুমণ্ডলীয় চাপে এলএনজি এর ইনসুলেটেড কার্গো ট্যাঙ্কে সংরক্ষিত থাকে। ট্যাঙ্কের ইনসুলেশন এবং একটি নিরবচ্ছিন্ন বয়েল-অফ গ্যাস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে গ্যাসটিকে তরল অবস্থায় ধরে রাখা হয়।
সংরক্ষিত এলএনজি সরবরাহের প্রয়োজন হলে একটি পাম্পের সাহায্যে তা ট্যাঙ্ক থেকে তুলে আনা হয়। এরপর বুস্টার পাম্পের মাধ্যমে এর চাপ বাড়িয়ে প্রায় ১০০ বারে (স্বাভাবিক চাপ ১.০১৩২৫ বার) উন্নীত করা হয়, যা মূলত উচ্চচাপের গ্যাস এক্সপোর্ট সিস্টেমের কার্যক্ষম চাপ।
পরবর্তী ধাপটি হলো–বাষ্পীভবন ও উত্তপ্তকরণ। উচ্চচাপের এই এলএনজি ভেপোরাইজারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, যেখানে তাপীয় মাধ্যমের সহায়তায় তরল এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তরিত করা হয়। পূর্ণ সরবরাহ চাপে এর তাপমাত্রা মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে বেড়ে প্রায় প্লাস ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়।
সর্বশেষ ধাপে রিগ্যাসিফায়েড প্রাকৃতিক গ্যাস মিটারিং স্টেশন অতিক্রম করে উচ্চচাপের এক্সপোর্ট আর্ম বা নমনীয় হোসের মাধ্যমে উপকূলীয় পাইপলাইনে সরবরাহ করা হয়।
জলযানে আকার এবং রিগ্যাসিফিকেশন ট্রেইনের বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে এফএসআরইউ-এর গ্যাস প্রবাহের মাত্রা বা প্রবাহের হার দৈনিক ৪০০ থেকে ৭৫০ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক ফুট (এমএমএসসিএফডি) পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এফএসআরইউ-এর সুবিধা কী
এফএসআরইউ-এ এলএনজি প্রক্রিয়াকরণ ও সরবরাহে বেশ কিছু সুবিধা দেয়–
দ্রুত বাস্তবায়ন
যেখানে স্থলভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণে বেশ কয়েক বছর লেগে যায়, সেখানে একটি এফএসআরইউ মাত্র ১ থেকে ৩ বছরের মধ্যেই চালু করা সম্ভব। তবে এর জন্য অনুমোদন, সংগ্রহ ও নির্মাণকাজ একসঙ্গে হতে হবে।
কম মূলধন
একটি এফএসআরইউ প্রকল্পের নোঙর সুবিধা, জেটি সংযোগ এবং উপকূলীয় রিসিভিং অবকাঠামো তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার। সমক্ষমতার একটি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল পরিচালনার জন্য যেখানে ৪০ কোটি ডলার বা তারও বেশি অর্থের প্রয়োজন হয়, তার তুলনায় এই খরচ একেবারেই সামান্য।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য সম্পদ
কোনো নির্দিষ্ট স্থানে গ্যাসের চাহিদা কমে গেলে নিজস্ব চালিকাশক্তিসম্পন্ন এফএসআরইউকে সহজে অন্য বাজারে সরিয়ে নেওয়া যায়–যা কোনো স্থলভিত্তিক এলএনজি সুবিধার ক্ষেত্রে মোটেও সম্ভব নয়।
বহুমাত্রিক ব্যবহারের সক্ষমতা
নিজস্ব চালিকাশক্তিসম্পন্ন এফএসআরইউগুলো দুটি এফএসআরইউ চুক্তির মধ্যবর্তী সময়ে এলএনজি ক্যারিয়ার বা পরিবহনকারী জাহাজ হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে এর মালিক ও চার্টারাররা ভিন্ন ভিন্ন বিন্যাসে ব্যবহারের মাধ্যমে আয় সচল রাখতে পারে।
বাজারের জন্য সহজলভ্য
যেসব দেশের পক্ষে স্থলভিত্তিক টার্মিনালে বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়, কিংবা বিশাল আকৃতির এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ ভেড়ানোর মতো পর্যাপ্ত গভীরতা নেই, তারাও সমুদ্রের মাঝে নোঙর করা এফএসআরইউ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তীরে সরাসরি সংযোগ নিয়ে গ্যাস গ্রহণ করতে পারে।
অসুবিধা কী কী
অনেক ধরনের সুবিধা থাকলেও এই ব্যবস্থার বেশ কিছু অসুবিধাও আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো–
আবহাওয়ার সংবেদনশীলতা
একটি সরবরাহকারী ট্যাঙ্কার এবং এফএসআরইউ-এর মধ্যে জাহাজ থেকে জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের জন্য শান্ত আবহাওয়া ও পানির ঢেউয়ের উচ্চতা ২.৫ থেকে ৩.০ মিটারের নিচে থাকা প্রয়োজন। প্রতিকূল আবহাওয়া বা উন্মুক্ত স্থানে বছরজুড়ে কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী দিনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
সীমিত সংরক্ষণ ক্ষমতা
বর্তমানে সচল থাকা সবচেয়ে বড় এফএসআরইউ-এর ধারণক্ষমতা ২ লাখ ৬৩ হাজার ঘনমিটার। এর বিপরীতে মাঝারি আকারের স্থলভিত্তিক টার্মিনালগুলোর ধারণক্ষমতা সাধারণত ৪ লাখ ঘনমিটার অতিক্রম করে এবং বড় বেসলোড সুবিধাগুলোতে তা ৬ লাখ ৩০ হাজার ঘনমিটার বা তারও বেশি হয়ে থাকে। যেসব বাজারে গ্যাসের চাহিদা অত্যন্ত বেশি, সেখানে এফএসআরইউ-এর সীমিত ধারণক্ষমতা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
স্বল্প আয়ুষ্কাল
বিদ্যমান এলএনজি ক্যারিয়ার থেকে রূপান্তরিত এফএসআরইউ-এর জাহাজের কাঠামোর অবশিষ্ট আয়ুষ্কাল সীমিত থাকে, যা সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর। অন্যদিকে, স্থলভিত্তিক টার্মিনালগুলো ২৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা দিতে পারে। আয়ুষ্কাল কম হওয়ায় নির্দিষ্ট সময় পর এটি পুনঃস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে, যা এর দীর্ঘমেয়াদী ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
চলমান চার্টার ব্যয়
এফএসআরইউ পরিচালনকারীদের দৈনিক ২৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার মার্কিন ডলার ভাড়ায় জাহাজ সংগ্রহ করতে হয়। ফলে মূল নোঙর অবকাঠামোর প্রাথমিক বিনিয়োগের বাইরেও ১৫ বছরের চুক্তি মেয়াদে এটি ১৩ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২২ কোটি মার্কিন ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়, যা মূলত একটি পুনরাবৃত্তিমূলক ব্যয়। নির্মাণ শেষ হওয়ার পর স্থলভিত্তিক টার্মিনাল মালিকদের এ ধরনের ব্যয় বহন করতে হয় না।
সীমিত সম্প্রসারণ সুবিধা
একটি স্থলভিত্তিক টার্মিনালের গ্যাস সরবরাহের ক্ষমতা বাড়াতে বিদ্যমান জমিতে নতুন ট্যাঙ্ক ও রিগ্যাসিফিকেশন ট্রেইন যুক্ত করলেই চলে। কিন্তু এফএসআরইউ-এর ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা বাড়াতে হলে আরেকটি নতুন জাহাজ বহরে যুক্ত করতে হয়। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল।
বাংলাদেশে এফএসআরইউয়ের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশে মোট দুটি এফএসআরইউ আছে। একটি সামিট গ্রুপ এবং অন্যটি যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি দ্বারা পরিচালিত। তবে বাংলাদেশ সরকার ভবিষ্যতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের লক্ষ্যে ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি এফএসআরইউ বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে একটির কার্যাদেশ ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে বাকি দুটিরও অর্ডার দেওয়া সম্ভব হবে। বর্তমানে দেশের সব এফএসআরইউ চট্টগ্রামের দিকে। তাই খুলনার পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টের দিকে নতুন টার্মিনাল বসানোর কথা ভাবছে সরকার এবং সেখানে ইতিমধ্যে সমীক্ষা চালানো হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: মেরিন ইনসাইট