মেট্রোরেলের যাত্রীরা স্টেশনে নেমে সহজেই কম খরচে যেন গন্তব্যে যেতে পারে সে জন্য বাইসাইকেল শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের ‘জোবাইক’–এর সাথে চুক্তি করেছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। ছয় মাসের পাইলট প্রকল্পের আওতায় প্রথম ধাপে উত্তরার তিনটি স্টেশনে এ সেবা চালু হতে যাচ্ছে। কিন্তু যাত্রীরা আসলে কতটা সুবিধা পাবেন? ব্যবহারই করবেন কীভাবে?
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পাইলট প্রকল্পের শুরুতে উত্তরার তিনটি স্টেশনে ১৫০ থেকে ৩০০টি স্মার্ট প্যাডেল বাইসাইকেল রাখা হবে। ছয় মাসের এই পরীক্ষা সফল হলে পর্যায়ক্রমে মেট্রোরেলের সবকটি স্টেশনে জোবাইক হাব স্থাপন ও এর সেবা সম্প্রসারণ করা হবে।
২০১৮ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের পর্যটন নগরী কক্সবাজারে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে জোবাইকের যাত্রা শুরু হয়। মাত্র ২০টি সাইকেল দিয়ে যাত্রা শুরু করার পর ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রা শুরু করে জোবাইক। তবে ২০২০ সালে করোনা মহামারীর কারণে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোবাইকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদিন আগে আবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জোবাইকের কার্যক্রম শুরু হয়। এবার প্যাডেল সাইকেলের সাথে ই-বাইকও নিয়ে আসে জোবাইক।
বাইসাইকেল শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মে শুরুতে উত্তরার তিনটি স্টেশনে ১৫০ থেকে ৩০০টি স্মার্ট প্যাডেল বাইসাইকেল রাখা হবে। ছবি: সংগৃহীত
গত ৬ আগস্ট ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) উন্মুক্ত দরপত্রে অংশ নিয়ে মেট্রোরেলের স্টেশনে জোবাইক–এর কার্যক্রম চালুর চুক্তি হয়। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ডিএমটিসিএলের জেনারেল ম্যানেজার নাসির উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ও জোবাইকের সিইও মেহেদী রেজাসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সাইকেল শেয়ার করা যাবে যেভাবে
জোবাইক ব্যবহারের জন্য প্রথমে জোবাইকের মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করে নিবন্ধন করতে হবে। এরপরে অ্যাপে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করলেই আনলক হবে সাইকেল। গন্তব্যে পৌঁছে নির্ধারিত ডকিং স্টেশনে রেখে ট্রিপ শেষ করলেই হিসাব হবে ভাড়া।
জোবাইক ব্যবহারের খরচ প্রতি কিলোমিটারে ধরা হয়েছে এক টাকা। আর বাইক আনলকিং ফি দুই টাকা। অর্থাৎ, কেউ যদি জোবাইক ব্যবহার করে ১০ কিলোমিটার রাস্তা যায়, তবে খরচ হবে মাত্র ১২ টাকা।
মেট্রোরেলের সাথে জোবাইকের এই চুক্তির প্রাথমিক সেবাগ্রহীতারা হবেন উত্তরা রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্ট ও উত্তরা রূপায়ন সিটির বাসিন্দারা। এছাড়াও, শান্তা-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থীরাও জোবাইক ব্যবহারে উপকার পেতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।
মেট্রোরেলের যাত্রীরা কি ভাবছেন?
জোবাইক সেবা নিয়ে মেট্রোরেলের যাত্রীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্টের বাসিন্দা শাহেদ ফেরদৌস। প্রতিদিন মতিঝিলে এসে অফিস করেন তিনি। তিনি চরচাকে বলেন, “প্রতিদিন বাসা থেকে মেট্রো স্টেশন যেতে আমার ৪০ থেকে ৫০ টাকা রিকশা ভাড়া লাগে। বৃষ্টি হলে সেটা আরও বেড়ে যায়। এই সাইকেলের খবর শুনে হিসাব করে দেখলাম প্রতিদিন মেট্রো স্টেশনে যাওয়া-আসা করতে ২০ টাকারও কম লাগবে। এটা বাস্তবায়ন হলে আমাদের খুবই উপকার হবে।”
তবে বাইসাইকেলগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেক যাত্রী। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নম্রতা রহমান চরচাকে বলেন, “ইনিশিয়েটিভ খুব ভালো। আমাদের খরচ অনেক কমবে। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ ভালো জিনিস নষ্ট করে ফেলে। দেখা যাবে চোর এসে এই সাইকেলগুলো ভেঙ্গে নিয়ে যাবে বিক্রি করার জন্য। কেউ দেখা যাবে আনলক করে নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় না রেখে নিজের বাসায় নিয়ে যাবে। এগুলো নজরদারি করে যদি রাখা যায়, তাহলে আমাদের উপকার হবে।”
যা বলছে জোবাইক
জোবাইকের নতুন এই উদ্যোগ ও এর কর্মপরিকল্পনা নিয়ে চরচার সাথে কথা হয় জোবাইকের সিইও মেহেদী রেজার। তিনি বলেন, “আগামী ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যেই উত্তরার তিনটি স্টেশনের (উত্তরা উত্তর, উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ) নিচে জোবাইকের হাব ও সাইকেল ইন্সটলেশনের কাজ সম্পূর্ণ হবে। আশপাশের কিছু এলাকাতেও জোবাইকের হাব বসানো হবে।”
উত্তরার তিনটি স্টেশনের নিচে জোবাইকের হাব ও সাইকেল ইন্সটলেশনের কাজ সম্পূর্ণ হবে। ছবি: সংগৃহীত
জোবাইকের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মেহেদী রেজা দীর্ঘদিন কাজ করেছেন চীনা কোম্পানি আলিবাবায়। সেখানে তিনি দেখেছিলেন যে, মানুষ অ্যাপের মাধ্যমে সাইকেল শেয়ার করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করে। কিন্তু বাংলাদেশে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে তীব্র যানজট ও ছোট দূরত্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রে রিকশার ওপর নির্ভরশীলতা বেশি। এই ‘লাস্ট মাইল’ কানেক্টিভিটি সমস্যার সমাধান খুঁজতেই বাংলাদেশে সাইকেল শেয়ারিং সার্ভিস শুরু করার পরিকল্পনা করেন বলে জানান মেহেদী রেজা।
জোবাইকের নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে মেহেদী রেজা বলেন, “বাইসাইকেল শেয়ারিং সার্ভিসে চুরির চ্যালেঞ্জ শুধু বাংলাদেশে না, সারা পৃথিবীতেই সব বাইসাইকেল বা ই-স্কুটার শেয়ারিং কোম্পানি ফেস করে। সব দেশেই বাইসাইকেল চুরি হয়, ভেঙে নিয়ে যায়। এটা খুব কমন বিষয়। কিন্তু আমরা এবার জিও-ফেন্সিং টেকনোলজি ব্যবহার করছি। আমাদের জিও-লোকেশনের বাইরে যদি কেউ সাইকেল নিয়ে যায় আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবো। এছাড়াও, আমাদের সব সাইকেলে জিপিএস টেকনোলজি থাকবে। শক্তিশালী সেন্সর টেকনোলজিও থাকবে সব সাইকেলে। কেউ যদি কিউআর স্ক্যান না করেই উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, সাথে সাথেই আমাদের টিম সেটার খবর পেয়ে যাবে।”
মেহেদী রেজা বলেন, “আমরা মোবাইল অ্যাপে এখন সব ব্যবহারকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র রেজিস্ট্রেশন করে নেব। আমাদের টিম তিনটা স্টেশনেই থাকবে। কারো সন্দেহজনক বা আন-ইউজ্যুয়াল অ্যাক্টিভিটি দেখলেই ব্যবস্থা নেবে। আমরা সরকার থেকে অনেক সাপোর্ট পাচ্ছি এই উদ্যোগের জন্য। কিছুদিনের মধ্যেই সিটি কর্পোরেশন আর ডিএমপির সাথে আমাদের মিটিং হবে। তারা আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার কথা দিয়েছেন।”
এদিকে গত জুন মাসে নতুন করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জোবাইক চালু হয়েছে। এছাড়াও জোবাইক চালুর জন্য দেশের আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথেও আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে।