হলিউডের ঐতিহ্যবাহী স্টুডিওগুলো যখন দর্শক হারানো, ধর্মঘটের ধাক্কা আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আতঙ্কে টালমাটাল, তখন লস অ্যাঞ্জেলেসে শুরু হয়েছে এক নীরব বিনোদন বিপ্লব। দুবছর আগে ডেথ রো রেকর্ডসের সাবেক সংগীত প্রযোজক ক্রেইগ উইলিয়ামস একটি আসবাবপত্রের গুদামঘর ভাড়া নিয়েছিলেন মিউজিক ভিডিওর শুটিংয়ের জন্য। কিন্তু তার সেই খালি স্থান দ্রুত বদলে যায় ‘মাইক্রোড্রামা’র সুসজ্জিত সেটে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, মোবাইল স্ক্রিনে দেখার উপযোগী ভার্টিক্যালি ধারণ করা ১ থেকে ২ মিনিটের এসব স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটক হলিউডের কলাকুশলীদের জন্য নতুন ভরসা হয়ে উঠেছে। আর এই বিশাল বাজারে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে টিকটক।
গবেষণা সংস্থা ওমডিয়ারের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এ বছর এই নতুন ফরম্যাট থেকে আয় ১৫০ কোটি ডলার স্পর্শ করতে পারে, যা আগামীতে আরও বাড়বে। অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী টেলিভিশনের বাজার প্রতি বছর প্রায় ১৫০ কোটি ডলার করে সংকুচিত হচ্ছে। চীন থেকে শুরু হওয়া এই ফরম্যাটের জনপ্রিয়তায় বিশ্বব্যাপী এর বাজার প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হলিউডের মাইক্রোড্রামা স্টুডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে টিকটকের ওপর এত বেশি জোর দিচ্ছে কেন?
মাইক্রোড্রামার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো সাধারণ পেওয়ালের বাধা ডিঙিয়ে ফ্রিতে ভিডিও দেখা মানুষকে পেইড অ্যাপের সাবস্ক্রিপশনে নিয়ে আসা। আর এখানেই ট্রাম্পকার্ড হিসেবে কাজ করছে টিকটক। ইনস্টাগ্রাম রিলস কিংবা ইউটিউব শর্টসের মতো এটিও এখন মাইক্রোড্রামার জন্য “নতুন ট্রেলার” হিসেবে কাজ করছে।
দর্শকেরা টিকটকে কোনো নাটকের প্রথম কয়েকটি টানটান ও ক্লিফহ্যাঙ্গার পর্ব বিনামূল্যে দেখে ফেলেন। গল্পের মোড়ে আটকে গিয়ে সম্পূর্ণ রহস্য উদঘাটনের ব্যাকুলতা থেকে তারা সরাসরি রিলশর্ট বা ক্যান্ডিজারের মতো মূল অ্যাপগুলোতে গিয়ে সাপ্তাহিক সাবস্ক্রিপশন নিতে বাধ্য হন। অভিনেত্রী ও প্রযোজক ইসা রে তার প্রথম মাইক্রোড্রামা থ্রিলার ‘স্ক্রিন টাইম’ টিকটকে প্রকাশ করে মাত্র এক মাসে ৫০ কোটি ভিউ পেয়েছেন। টিকটকের মাধ্যমে কোনো বাড়তি প্রচার খরচ ছাড়াই কোটি কোটি তরুণের কাছে পৌঁছানো এবং তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে রিলশর্টে দর্শকদের দৈনিক পড়ার সময় নেটফ্লিক্স বা অ্যামাজন প্রাইমকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে।
প্রথাগত হলিউড প্রযোজনা যেখানে আকাশছোঁয়া বাজেটে থমকে গেছে, সেখানে মাইক্রোড্রামা এক নতুন বিকল্প এনেছে।
আধ ঘণ্টার একটি সাধারণ সিটকমের একটি পর্ব বানাতেই ২০ থেকে ৪০ লাখ ডলার লাগে। বিপরীতে পুরো ৫০ থেকে ৭৫ পর্বের একটি আস্ত মাইক্রোড্রামা সিরিজ বানাতে খরচ হয় মাত্র ১ থেকে ৩ লাখ ডলার।
এছাড়া জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই খরচ আরও কমিয়ে ৬০ হাজার ডলারে নামিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে।
হলিউডে একমাত্র মাইক্রোড্রামাই এখন প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে। কম খরচে নির্মাণের সুযোগ দেখে এনবিসি ইউনিভার্সাল ও ফক্সের মতো বড় বিনোদন কোম্পানিগুলো স্বাধীন স্টুডিওগুলোর সঙ্গে চুক্তি করছে। সনি বা প্যারামাউন্ট থেকে কম দামে বিক্রি হওয়া পুরোনো সরঞ্জাম কিনে হাসপাতাল, পুলিশ স্টেশন কিংবা আদালতের স্থায়ী সেট বানিয়ে কাজ চালাচ্ছেন উইলিয়ামসের মতো উদ্যোক্তারা।
মহামারি ও ধর্মঘটের পর কাজের অভাবে থাকা অভিনেতা-কলাকুশলীদের জন্য এটি এক নতুন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। অভিনেতা রবার্ট পামার ওয়াটকিনস যেমন বলেছেন, এই প্ল্যাটফর্ম তাঁর আর্থিক পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। হলিউডে ক্যারিয়ার গড়তে আগে যে বছরের পর বছর বিজ্ঞাপন বা এক্সট্রা হিসেবে কাজের জটিল পথ পার হতে হতো, তা এখন বদলে গেছে। বহু তরুণ লস অ্যাঞ্জেলেসে পা রেখেই মাইক্রোড্রামার মাধ্যমে প্রথম পেশাদার কাজ পাচ্ছেন।
সহজ-সরল গল্প, টানটান উত্তেজনা আর টিকটকের অ্যালগরিদমকে কাজে লাগিয়ে তৈরি এই দ্রুতগতির দুনিয়াই এখন হলিউডের বিনোদন অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করছে।