গত কয়েক দিন ধরে ইরানের রাজধানী তেহরানে নতুন কিছু বিলবোর্ড দেখা গেছে। এসব বিলবোর্ডে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের দায়িত্ব নেওয়া সাত নেতার ছবি রয়েছে। তবে বিলবোর্ডে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয় হলো–নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির কোনো ছবি নেই।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাকে জনসম্মুখেও দেখা যায়নি। বিলবোর্ডে ইরানের প্রচলিত ধর্মীয় প্রতীক, যেমন ইমাম আলী ও ইমাম হোসেনের কালো ও লাল পতাকাও নেই। সাত নেতার মধ্যে মাত্র একজন পাগড়ি পরেছেন।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক বিশ্লেষণ বলছে, এই বিলবোর্ডগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নতুন একদল নেতা ধীরে ধীরে ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিচ্ছেন। তারা যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। তাদের মূল লক্ষ্য নিরাপত্তা ও দমন-পীড়ন। এর মাধ্যমে তারা ইরানের ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে সামরিক একনায়কতন্ত্রে পরিণত করছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের করা সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সম্মতি দিয়েছিলেন। ছবি: রয়টার্স
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে তারা পুরোপুরি বাস্তববাদী অবস্থান থেকে সরে গেছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে সামরিক সরকারগুলো অনেক সময় যুদ্ধের ভয়কে নিজেদের ক্ষমতার বৈধতার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের চিন্তা করতে হবে, ইরানের নতুন নেতৃত্ব আগের চেয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
বিলবোর্ডে ‘দেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার শীর্ষ ব্যক্তি’ হিসেবে সামনে রয়েছেন মোহসেন রেজাই। স্যুট পরা রেজাই ইরানের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এবং আইআরজিসির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধান। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং পরবর্তী পুনর্গঠনের সময় তিনি আইআরজিসির নেতৃত্ব দেন।
বিলবোর্ডে থাকা সাত নেতার মধ্যে পাঁচজন সামরিক পোশাক পরেছেন। তাদের একজন ইরানের নৌবাহিনীর প্রধান, যিনি উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজে ইরানের হামলা পরিচালনা করেন। তার পাশে রয়েছেন আইআরজিসির প্রধান আহমাদ ওয়াহিদি। চার বছর আগে নারীদের হিজাববিরোধী আন্দোলন দমনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি আইআরজিসির বিদেশি শাখা কুদস ফোর্সও প্রতিষ্ঠা করেন। এই বাহিনী ইরানের আঞ্চলিক মিত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে।
একমাত্র পাগড়ি পরা ব্যক্তি হুসেইন তাইয়েব। তিনি আগে আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ছিলেন। এখন তিনি আইআরজিসির আধাসামরিক বাহিনী বাসিজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই বাহিনীর কাজ হলো বিক্ষোভকারীদের রাস্তায় নামতে বাধা দেওয়া।
ইরান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করছেন, দেশটির ক্ষমতা এখন কট্টরপন্থীদের হাতে চলে গেছে। তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে দিতে চায়। অন্যদিকে, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের নেতৃত্বে থাকা বাস্তববাদী নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে ছিলেন।
মোহসেন রেজাই। ছবি: রয়টার্স
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করতে গালিবাফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই চুক্তিতে ইরানের ওপর প্রায় ৫০ বছরের মার্কিন বিরোধিতা শেষ করা, ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের সুরক্ষা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং আটকে থাকা তেল বিক্রির অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা ছিল।
এ ছাড়া যুদ্ধের পর ইরানের পুনর্গঠন শুরু করতে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ছিল। এর বিনিময়ে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা বন্ধ করবে এবং হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নেবে–এমন শর্ত ছিল। কিন্তু চুক্তি সই হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই আবার লড়াই শুরু হয়। হরমুজ প্রণালি এখনও প্রায় বন্ধ রয়েছে। এমওইউতে স্থায়ী শান্তিচুক্তির জন্য যে সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল, ১৭ আগস্ট তা শেষ হয়ে যায়। এর এক দিন পর ইরান উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়। জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেয়।
কয়েকজন বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ঠেকাতে পেরেছে–এমন ধারণা ইরানের কট্টরপন্থীদের মধ্যে আবার শক্তির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের বিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে।
তেহরানের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে পাওয়া বিজয় তারা নষ্ট করছে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, দেশের ভেতরেও নতুন সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তেহরানে নীতি পুলিশ আবারও সক্রিয় হয়েছে। তারা হিজাবের নিয়ম ঠিকভাবে মানছে না বলে মনে করা ক্যাফেগুলোতে অভিযান চালিয়ে সেগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়াও আবার শুরু হয়েছে। চলতি মাসে ইরানের সামাজিক সংকটের ছবি তুলেছিলেন এমন এক আলোকচিত্রীকে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি শহরের কাছে তার মা ও বোনসহ গুলি করে হত্যা করা হয়।
তবে অন্য কিছু ইরানি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের করা সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সম্মতি দিয়েছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, চাপ না থাকলে এই চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো সুযোগ নেই।
সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব অবরোধ তৈরি করে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সহযোগী হিজবুল্লাহকে অস্ত্র ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা করে। এমনকি চুক্তিতে থাকা ইরানের আটকে থাকা অর্থও ফেরত আনতে পারেনি দেশটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন ইরানি সরকার এমন একটি চুক্তি চাইতে পারে, যার মাধ্যমে দেশটি অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে। ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর দেশটির পুনর্গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মোহসেন রেজাই। প্রেসিডেন্ট প্রার্থী থাকাকালে তিনি বিদেশি বিনিয়োগ এবং পারমাণবিক চুক্তির পক্ষে কথা বলেছিলেন।
নতুন নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এমন এক ইরানি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বলেন, ‘‘তারা (নেতারা) মনে করছে, বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব।’’
কেউ কেউ বলছেন, দেশে ইসলামী মূল্যবোধ কমে গেলেও নতুন নেতারা খুব একটা উদ্বিগ্ন নন। ক্যাফেগুলোতে অভিযান চালানো হয়তো তাদের সমর্থকদের খুশি রাখার একটি উপায় মাত্র। অনেকে তাদের সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তুলনা করছেন। তিনি রাজনৈতিক সংস্কারের বদলে সামাজিক ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনছেন।
তবে সব বিশ্লেষকই একমত যে ইরানে নেতৃত্বের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। প্রায় চার দশক ধরে ইরানের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেছিলেন আলী খামেনি। কখনো সংস্কারপন্থীদের, আবার কখনো কট্টরপন্থীদের সুযোগ দিয়েছেন তিনি। কিন্তু নতুন সামরিক নেতারা এর বিপরীতে দ্রুত ও সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষপাতী। ফলে খামেনি ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার দিনটি ইরানের জনগণ এবং বিশ্বের জন্য ভবিষ্যতে আফসোসের কারণ হতে পারে বলে মত অনেক বিশেষজ্ঞদের।