সামরিক ইতিহাসে এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে যেখানে রণাঙ্গনে অসাধারণ পেশাদারিত্ব ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের পরও কৌশলগত ভুলের কারণে চূড়ান্ত পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। ইতিহাসবিদ ব্রেট ডেভোরো, যিনি রোমান অর্থনীতি ও সামরিক ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ, ফরেইন পলিসি পত্রিকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই সত্যটিই তুলে ধরেছেন। মার্কিন নৌবাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের একটি ছবির উল্লেখ থেকে শুরু করে সংঘাতের বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন যে, সামরিক কৌশলের চরম ব্যর্থতা কীভাবে যেকোনো উন্নত বাহিনীকে পরাস্ত করতে পারে।
সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই নিরাপত্তা ও নীতি বিশ্লেষকরা আমেরিকার সামরিক অভিযানের লজিস্টিকস ও কৌশলগত ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে তেল ও সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পূর্বাভাস না থাকা, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মতো যুদ্ধাস্ত্র ও প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি, সস্তা একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন মোকাবিলার প্রস্তুতির অভাব এবং পর্যাপ্ত মাইন অপসারণকারী জাহাজের অনুপস্থিতি। কিন্তু ডেভোরোর মতে, এগুলো হলো বাহ্যিক ও গৌণ সমস্যা। এগুলো সামাল দেওয়া গেলেও ট্রাম্প প্রশাসনের মূল যুদ্ধ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হতো না।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন যেসব প্রাথমিক লক্ষ্য নিয়ে এই অভিযান শুরু করেছিল—যেমন ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, দেশটির দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা—তার একটিও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। সংঘাতের কয়েক মাস পার হওয়ার পরও দেখা যাচ্ছে, আমেরিকা দীর্ঘমেয়াদে বোমাবর্ষণ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলেও এসব লক্ষ্য অর্জন অবাস্তব।
এর ফলে ইরান আগের চেয়েও বেশি স্বাধীনতা নিয়ে পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর প্রভাব বৃদ্ধির সুযোগ পাচ্ছে, যা মূলত মার্কিন কৌশলের চরম ব্যর্থতারই প্রমাণ। অথচ প্রযুক্তিগত ও সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখনো বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে। নিজ ভূখণ্ড থেকে সাত হাজার মাইল দূরে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা কিংবা ইরানের আকাশসীমা সহজে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া—মার্কিন বাহিনী তাদের চিরাচরিত শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ ঘটিয়েছে। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির পরিসংখ্যানও সেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ ক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মাত্র ১৮ জন নিহত ও ছয়শর বেশি আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়, সেখানে ইরানের প্রাণহানি হাজার ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে এই বিশাল ব্যবধান ও ধ্বংসযজ্ঞের পরও দিনশেষে কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে মার্কিন শূন্যতা পূরণ হয়নি। সামরিক বাহিনীকে অসম্ভব লক্ষ্য পূরণের নির্দেশ দিলে কোনো প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বই বিপর্যয় এড়াতে পারে না।
ডেভোরোর মতে, ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন বাহিনীকে তিনটি অবাস্তব ও অসম্ভব লক্ষ্য পূরণের দায়িত্ব দিয়েছিল। প্রথমত, কোনো ধরনের স্থল সেনা না পাঠিয়ে শুধুমাত্র বিমান হামলার মাধ্যমে একটি দেশের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো। ১৯২১ সালে ইতালীয় তাত্ত্বিক জিউলিও দো হেত প্রস্তাব করেছিলেন যে শুধুমাত্র বোমারু বিমান দিয়েই যুদ্ধ জেতা সম্ভব। ইতিহাস প্রমাণ করে, এই তত্ত্ব বারবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি যখন লন্ডনে হাজার হাজার টন বোমা ফেলেছিল, তখন ব্রিটিশদের প্রতিরোধের সংকল্প আরো দৃঢ় হয়েছিল।
পরবর্তীতে মিত্রবাহিনী জার্মানিতে লাখ লাখ টন বোমা বর্ষণ করেও হিটলারের শাসন ভেঙে ফেলতে পারেনি, বরং যুদ্ধের প্রতি জনগণের সমর্থন বেড়েছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার ফেলা লক্ষ লক্ষ টন বোমার পরিণতিও ছিল একই রকম। যুদ্ধবিমানের বোমাবর্ষণ করে কোনো দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস করার একমাত্র কাছাকাছি উদাহরণ ছিল সার্বিয়া। কিন্তু সেখানেও ১৯৯৯ সালে বোমাবর্ষণ বন্ধ হওয়ার অনেক পরে ২০০০ সালে রাজনৈতিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিলোসেভিচের পতন ঘটে। ফলে ইরানে বিমান হামলার মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের আশা করাটাই ছিল একটি ঐতিহাসিক ভুল।
মার্কিন বাহিনীর দ্বিতীয় অবাস্তব লক্ষ্যটি ছিল বিমান হামলার মাধ্যমেই ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করা। ইতিহাস বলে, শুধুমাত্র আকাশপথ থেকে সচল বা মোবাইল লঞ্চার ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ‘অপারেশন ক্রসবো’ জার্মানির ভি-ওয়ান ও ভি-টু রকেটের নিক্ষেপ বন্ধ করতে পারেনি। আধুনিক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মতো অস্ত্রের যুগেও এটি সম্ভব হয়নি। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী ইরাকের স্কাড রকেট লঞ্চারগুলো ধ্বংস করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। ঠিক একইভাবে গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের বিমান অভিযানও রকেট হামলা বন্ধ করতে পারেনি; শেষপর্যন্ত তাদের স্থলবাহিনী পাঠাতে হয়েছে।
ইয়েমেনের হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক জোটের বিমান হামলাও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। কারণ আধুনিক মোবাইল লঞ্চারগুলো দ্রুত স্থান পরিবর্তন ও আত্মগোপন করতে পারে। ফলে স্থল বাহিনী ছাড়া এগুলো ধ্বংস করার মার্কিন চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য ছিল।তৃতীয় অবাস্তব বিষয়টি হলো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মিত্র দেশগুলোকে রক্ষা করার জন্য নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ধারণা। মার্কিন যুদ্ধ প্রচেষ্টা এই আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বাস্তবে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা যতটা সহজ ও সাশ্রয়ী, সেগুলোকে আকাশে ধ্বংস করার ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধক ব্যবস্থা তৈরি করা তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। ফলে ইরান খুব সহজেই তাদের বিপুল পরিমাণ সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অতিসংপৃক্ত করে ফেলেছিল। মার্কিন বাহিনীর কাছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও এই অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক অসামঞ্জস্যতার কারণে তারা ব্যর্থ হয়।
এই সামরিক মহাবিপর্যয়ের দায় পেন্টাগন বা মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের চেয়ে বেশি ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের নীতি নির্ধারণের ওপর বর্তায়। মার্কিন সেনাপতিদের কাজ ছিল প্রেসিডেন্টকে এই অসম্ভব অভিযানের বাস্তব ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একজন অভিজ্ঞ ও যোগ্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্বাচনের বদলে পিট হেগসেথকে বেছে নিয়েছিলেন, যার আনুগত্য যোগ্যতার চেয়ে বেশি স্পষ্ট ছিল।
হেগসেথ পেন্টাগনের শীর্ষ পদে থাকা এমন কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেন যারা ভিন্নমত পোষণ করতে পারতেন। এর ফলে হোয়াইট হাউসের ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো জোরালো আপত্তি ওঠেনি। ট্রাম্পের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত দায়ভার গিয়ে পড়ে মার্কিন ভোটারদের ওপর, যারা একজন অযোগ্য ও স্তাবক পরিবেষ্টিত নেতাকে পুনর্নির্বাচিত করেছিলেন। পরিশেষে, ডেন ডেভোরো স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, ভোটারদের ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, সামরিক ও কৌশলগত ব্যর্থতার মাধ্যমেও রাষ্ট্রকে দিতে হয় এবং সামরিক শক্তির চরম সাফল্যও রাজনৈতিক ও কৌশলগত মূর্খতাকে ঢেকে রাখতে পারে না।