চট্টগ্রামের পতেঙ্গার লালদিয়ার চরে সর্ম্পূণ বিদেশি বিনিয়োগে নতুন কনটেইনার টার্মিনাল নির্মিত হতে যাচ্ছে। প্রায় ৫০ একর জায়গা জুড়ে এ টার্মিনাল নির্মাণ করবে ডেনর্মাক-ভিত্তিক মার্স্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে এ টার্মিনালের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হবে।
বন্দর ব্যবহারকারীরা লালদিয়ার কনটেইনার টার্মিনাল (এলসিটি) নির্মাণকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।
নতুন টার্মিনালটি নির্মাণের ফলে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে আরও বড় আকারের জাহাজ বেশি সংখ্যক কনটেইনার নিয়ে ভিড়তে পারবে। এতে পণ্য খালাস ও পরিবহনে সময় কম লাগবে। অর্থ সাশ্রয়ও হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম চরচাকে বলেন, “বন্দরের ক্রমবর্ধমান কনটেইনার হ্যান্ডলিং চাহিদা পূরণ এবং ৬ হাজার টিইইউস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের হিসাবে) ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা অর্জন হবে। এ টার্মিনাল নির্মাণের ফলে জাহাজের ‘টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম’ ও আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট ব্যয় কমবে এবং বন্দরে সক্ষমতা বাড়বে।”
বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে লালদিয়ার চরে টার্মিনাল নির্মাণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে চুক্তি করে ডেনমার্কের মার্স্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। চুক্তির শর্তানুযায়ী গত ২২ এপ্রিল এপিএম টার্মিনালসকে প্রকল্পের জন্য জমি হস্তান্তর করা হয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, কনসেশন চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটি তিন বছরে নির্মাণ কাজ শেষ করার পর পরবর্তী ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে। চুক্তির শর্ত পূরণ ও পালন করলে এই মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। এলসিটি নির্মিত হলে সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের (জাহাজের পানির নিচের অংশের গভীরতা) এবং ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার জাহাজ তাতে ভিড়তে পারবে।
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের মূল টার্মিনাল অংশ হবে ৩২ একরজুড়ে। এরপর ৭ দশমিক ১৫ একরের কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একরের ট্রাক পার্কিং ও প্রি গেট সুবিধা মিলিয়ে পুরো টার্মিনালটি হবে ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমিতে।
লালদিয়া টার্মিনালটি খালি জমি থেকে টার্মিনাল পর্যন্ত রূপান্তরে সব অবকাঠামো নির্মাণ কাজ করবে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। কনসেশন মডেলে এই টার্মিনালের নকশা প্রণয়ন, নির্মাণ, অর্থায়ন, পরিচালনা ও হস্তান্তর (ডিবিএফওটি) এই কয় ধাপে বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করা হবে।
বন্দর সচিব রেফায়েত হামিম বলেন, “এই টার্মিনালের ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটিতে বছরে ৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) বিনিয়োগ, যাতে মোট ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ হবে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করা বিশেষায়িত কনটেইনার টার্মিনাল রয়েছে মোট তিনটি। এগুলো হলো-নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) ও চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি)। এছাড়া, জেনারেল কার্গো বাথের (জিসিবি) কয়েকটি জেটিতে কনটেইনারবাহী জাহাজ ভেড়ে।
এর মধ্যে এনসিটি নৌবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড, পিসিটি সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরএসজিটি এবং সিসিটি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে। লালদিয়ার চর টার্মিনাল হবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে নির্মিত প্রথম কনটেইনার টার্মিনাল।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমান টার্মিনালগুলো থেকে ৯ কিলোমিটার ভাটিতে গুপ্ত বাঁকের পরেই লালদিয়ার চরের অবস্থান। এর উজানে গুপ্ত বাঁক পেরিয়ে পিসিটি এবং আরও উজানে এনসিটি, সিসিটি ও জিসিবির অবস্থান।
বন্দরের এক কর্মকর্তা বলেন, বঙ্গোপসাগরের মোহনা থেকে বন্দর চ্যানেলে প্রবেশের শুরুতেই এ টার্মিনালের অবস্থান। অন্য টার্মিনালগুলোতে চ্যানেলের বাঁক পেরিয়ে যেতে হয়। মোহনার খুব কাছে হওয়ায় কনটেইনারবাহী বড় জাহাজগুলো কম সময়ে এলসিটিতে ভিড়তে পারবে।
শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন চরচাকে বলেন, “বিদেশি বিনিয়োগে লালদিয়ায় বিশ্বমানের গ্রিন টার্মিনাল গড়ে উঠলে আধুনিক প্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়বে। এর ফলে জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম কমানো, দ্রুত পণ্য খালাস এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। এটি বাংলাদেশের বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে।”
খায়রুল আলম বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি লালদিয়ায় আধুনিক বন্দর (টার্মিনাল) অবকাঠামো গড়ে ওঠা দেশের জন্য কোনো প্রতিযোগিতামূলক ঝুঁকি নয়, বরং এটি একটি স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করবে। বন্দর ব্যবহারকারী, আমদানি-রপ্তানিকারক এবং শিপিং কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে উভয়পক্ষকেই আরও উন্নত, দ্রুত, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক সেবা দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত এই প্রতিযোগিতার সুফল ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীরা পাবে এবং এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।”
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমীরুল হক চরচাকে বলেন, “লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের বিনিয়োগ নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরও উজ্জ্বল করবে। এই প্রকল্পের সুদূরপ্রসারী প্রভাব কেবল একটি টার্মিনাল নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশে আরও বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (হারবার ও মেরিন) আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ চরচাকে বলেন, “লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। প্রকল্পটি বন্দর খাতে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) বিনিয়োগ।”
আমিন আহমেদ বলেন, “সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও আধুনিক শোর টু শিপ (এসটিএস) ক্রেনসহ উন্নত কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা এখানে স্থাপন করা হবে। এর ফলে জাহাজের ওয়েটিং টাইম ও কনটেইনার জট হ্রাস পেয়ে আমদানি-রপ্তানি পণ্য দ্রুত খালাস ও পরিবহন করা সম্ভব হবে।”
বন্দরের এ কর্মকর্তা বলেন, “জাহাজ দ্রুত খালাস ও ছাড়ার ফলে অপেক্ষা, জ্বালানি, ডেমারেজ, সংরক্ষণ এবং পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে। এসব ব্যয় কমে যাওয়ায় দেশের সামগ্রিক লজিস্টিকস ব্যয় কমবে এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও সাশ্রয়ী ও পূর্বানুমানযোগ্য হবে।”
বড় জাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে সরাসরি সেবা বাড়াতে উৎসাহিত হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সরাসরি সেবা বাড়ার ফলে ট্রান্সশিপমেন্টের ওপর নির্ভরতা কমবে, পণ্য পরিবহনের সময় ও অতিরিক্ত হ্যান্ডলিং ব্যয় হ্রাস পাবে। এর ধারাবাহিক প্রভাবে রপ্তানি পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং আমদানি পণ্যের সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হবে।”
রোববার সকালে লালদিয়ার চরে এ কনটেইনার টার্মিনালটির নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।