রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় হওয়া চার খুন এবং এর তদন্ত নিয়ে পুলিশ দেশের মানুষকে একটা তদন্ত বিষয়ক থ্রিলারে ঢুকিয়ে দিয়েছে। তেমন কোনো গুরুতর তথ্যপ্রমাণের নতুন করে হাজির হওয়া নয়, বরং পুলিশি বক্তব্যের নতুনত্বই এর মূল আকর্ষণ। হাজারটা সমালোচনা থাকলেও এই দেশের ঘরে ঘরে যেমন জি বাংলার সিরিয়াল আজও বহাল তবিয়তে, ঠিক তেমনি বহাল পুলিশের এই বয়ানের খেলাও।
রংপুরের মাছুয়াপড়ায় সপরিবারে থাকতেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। ২০ আগস্ট মধ্য রাতে, মতান্তরে ২১ আগস্ট ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ও প্রীতিলতা চক্রবর্তী দম্পতি এবং তাদের দুই সন্তান আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী ও আয়ুষ চক্রবর্তী প্রীয়ম খুন হন। এ ঘটনার তদন্ত অতি দ্রুততার সঙ্গে একটা উপসংহারে আসে। সংবাদ সম্মেলনে অশ্রুসজল এক ‘মানবিক’ পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখে আমাদের কারও কারও অন্তর একেবারে ভেতর থেকে ভিজে যায়। অবশ্য কিছু পাষাণের মন এতটাই মোহর মারা যে, তারা এই অশ্রু নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলে- ‘ইহা কুম্ভীরাশ্রু নয় তো?’ শত শত এমন মরদেহ দেখা এবং ক্রাইম সিন দেখে আসা একজন দুঁদে পুলিশ কর্মকর্তার কাছে এই চার মরদেহ কেন এতটা আবেগতাড়িত হওয়ার কারণ হলো? খুবই বিরক্তিকর এইসব প্রশ্ন, তাই নয় কি?
সে যাক। তদন্তকে নিজের গতিতে চলতে দিতে হবে- এটা আমরা ছোটবেলা থেকেই বাংলা সিনেমাসহ আমাদের দেশের নানা ‘সিনেম্যাটিক’ বক্তৃতা-বিবৃতিতে শুনে আসছি। সুতরাং মুখস্ত। তারপরও যেহেতু স্বল্প স্মৃতির দেশ, সেহেতু এটা প্রায়ই আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া হয়। তো তদন্তের গতি কেউ রোধ করেনি। সে হিম্মতই-বা কার?
তদন্ত চলছিল। জি বাংলা সিরিয়ালে যতটা থ্রিলার মানায়, যেন ঠিক ততটা থ্রিলারের আমেজ নিয়ে। মানে ঠিক হলিউডি না আরকি। ওই যে বললাম তথ্যপ্রমাণ নয়, বয়ানে বদল। এটাকে সর্বোচ্চ ‘থ্রিলার লাইট ভার্সন’ বলা যেতে পারে। সেটা কী রকম?
একটু উদাহরণ দেওয়া যাক। প্রথমে বলা হলো- ডাকাতির উদ্দেশে হতে পারে। পরে বলা হলো- ডাকাতির বিষয়টি সাজানো নাটক। শুনে মনে হলো- আইসক্রিমের দোকানে আছি আমরা, আর আলাপ হচ্ছে ফ্লেভার নিয়ে। ভ্যানিলা, না ভ্যানিলা না, স্ট্রবেরি! সে যাক, যখন সবাই মেনে নিল ডাকাতি সাজানো নাটক, তখন প্রশ্ন এল- ‘তাহলে?’ নো চিন্তা, উত্তর আছে। ইয়াবা সেবনে বাধা। অভিযুক্তরা ইয়াবা কখন খেয়েছে? কোথায় খেয়েছে? কত পরিমাণে খেয়েছে? একে একে উত্তর- পাশের বাড়িতে খেয়ে গণপতির বাড়িতে এসেছে, মানে ইয়াবা সেবনের পর একটু ভ্রমণে বের হয়েছিল অভিযুক্ত দুজন। এটা কখন? রাতেও হতে পারে, আবার সকালেও হতে পারে। আবার আইসক্রিমের দোকানের মধুর কনফিউশন।
আচ্ছা যাক, ইয়াবা আগেই সেবন করে থাকলে গণপতি তাদের ইয়াবা সেবনে বাধা দিলেন কীভাবে? ওহ, কারেকশন-গণপতির বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করেছেন অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। এবার তো বাধা দিতে পারেন নাকি? কিন্তু ইয়াবা সেবনের উপকরণ ফয়েল মিলল গণপতির বাসায়, যা কিনা দোতলায়? কেন? হয়তো পুলিশি বয়ানের কোনো না কোনো এপিসোডে আছে।
যাক যা গেছে, তা যাক। ইয়াবা সেবনের ভাষ্যটি অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তি ছাড়া আর কোথায় আছে? অভিযুক্তদের ডোপ টেস্ট হয়েছে? অভিযুক্তরা কবে থেকে ইয়াবা খান? তাদের সঙ্গী-সাথী কারা? কার কাছ থেকে কিনলেন?
অভিযুক্তরা বললেন, তারা আটটি ইয়াবা সেবন করেছেন। তো সেটাই সই। তারপর তারা বললেন, তারাও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। পুলিশ বলছে, আচ্ছা।
সে যাক, এর উত্তর এখনো মেলেনি। কিন্তু খুনের মোটিভ ঘুরে গেছে এখন আবার চুরির দিকে। তো এই চুরি কোথা থেকে এল? রংপুরের উপপুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বলছেন, “আমি তো আগেই বলেছিলাম।” কিন্তু তার এই সন্দেহও সত্য হিসেবে সামনে এসেছে অভিযুক্তদের দেওয়া জবানবন্দির সূত্র ধরেই। খুনের জন্য দায়ী সন্দেহে শুধু নয়, একেবারে নিশ্চিত হয়ে যে দুজনকে ধরা হয়েছে, তাদেরকে আমাদের পুলিশ যেন বিবেচনা করছে একেবারে ‘সত্যবাদী যুধিষ্ঠির’ হিসেবে। ভাবটা এমন- সম্ভাব্য অপরাধী যখন বলছে, নিশ্চয়ই সত্য হবে; সে তো আর মিথ্যে বলতে পারে না। সারল্যের বলিহারি একেবারে!
ঠিক জনসন-রনসনের মতো লাগছে না বিষয়গুলো? ওহ, জনসন-রনসনকে চেনেন না আবার? টিনটিন পড়েছেন তো? পৃথিবীর সেরা দুই গোয়েন্দা এরা। খুনের তদন্তে তাদের সেরা মীমাংসা হলো-খুন যখন হয়েছে, খুনী তো একজন থাকবেই, আর তার আশপাশেই থাকবার কথা। কী সরল! একই কেতায় আমাদের পুলিশও এতই সরল যে, লাইট ভেবে মোটরের সুইচ টিপে দেয়, সেটা আবার নজরে আসে না ট্যাঙ্কি ভরে পানি উপচে পড়ার আগ পর্যন্ত। এতই সরল যে, সুরতহালের সময় নিকটাত্মীয় বা স্বজনদের উপস্থিতি নিশ্চিতের বিষয়টিও ভুলে যায়।
রংপুরের খুনের তদন্তও কি তবে টিনটিনের গল্পের সেই দুই গোয়েন্দার মতো এগোচ্ছে? নাকি জনসন-রনসনের চেয়েও সরল হিসাব চলছে সেখানে? এই যে ‘ডাকাতি হতে পারে’-এই একটি বিষয় পুলিশের সন্দেহ। আর বাকিটা? অভিযুক্ত দুজনের বয়ান বা জবানবন্দিকে কোট করে বলা পুলিশের বয়ান। একইভাবে একে একে আসে লাইট ভেবে পানির মোটর চালিয়ে দেওয়া, অভিযুক্তদের একজনের গায়ে আঁচড়ের দাগ সত্ত্বেও দুই নারী ভিকটিমের হাতের নখ থেকে নমুনা সংগ্রহ না করা, অথচ খেজুরের বিচি, আধখাওয়া শসা আলামত হিসেবে সংগ্রহ করা, অভিযুক্তদের যথাযথ ডোপ টেস্ট করার বিষয়টিতে দেরি করা, গণপতির মরদেহ কীভাবে পড়েছিল ছাদে–খোলা নাকি টিন ও কাঠের স্তূপের নিচে ঢাকা ইত্যাদি নানা বিষয়ে পুলিশের তরফ থেকে এত অভাবনীয় সারল্য আমরা দেখছি যে, সাধারণ জনতার মনে জটিল সব প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। তারপর যদি প্রশ্ন করি- আচ্ছা প্রতিবেশীর সূত্রে গায়ে আঁচড়ের দাগসমেত সিদ্ধার্থের দেখা পাওয়া বা তাদের জবানবন্দি ছাড়া পুলিশের হাতে আর কী কী আছে?
উত্তর পাওয়া মুশকিল। তবে সুকুমার রায় বেঁচে থাকলে কি বলতেন যে, হাতে থাকে পেনসিল? অভিযুক্ত দুজন কতটি ইয়াবা নিয়েছে? উত্তর-আটটি। কে বলেছে? কে বলেছে? পুলিশের ভাষ্য- সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস বলেছে। তারা না বললে, ইয়াবা সেবনের বিষয়ে পুলিশের হাতে কী আছে? উত্তর অজানা।
কিন্তু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি তো দিয়েছে অভিযুক্তরা। তাহলে? মামলার বিচারে জবানবন্দি একটি বিষয়। কিন্তু বাকিগুলো তো লাগবে। সেসব জোগাড়ের আগেই মিডিয়ার সামনে কথা বলা, বারবার বয়ান বদলে একটা থ্রিলার ভাব নিয়ে আসা-এই সবই অপেশাদারত্বের লক্ষণ শুধু নয়, প্রমাণও বটে। আর এসব নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর প্রশ্নকর্তাকেই আক্রমণের তীর ছোঁড়াটা সন্দেহকে গাঢ় করা ছাড়া আর কিছু করে না। এতটাই সংশয় ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, এরই মধ্যে রংপুরের সাবেক পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদের অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু হয়েছে। ২০০১ সালে তার নিয়োগ থেকে শুরু করে, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ওঠা নানা অভিযোগও সামনে আসছে।
ফলে বিষয়টি আর সাধারণ কিছু থাকছে না। একটি খুনের নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়টা আবারও এই পোড়ার দেশে দাবিতে পরিণত হয়েছে। মানববন্ধন করার মতো ঘটনা সামনে আসছে। আর এই সবই ঘটেছে শুধু একটি আলোচিত ও হতবিহ্বল করা খুনের ঘটনা নিয়ে যেনতেন প্রকারে জনপরিসরে কথা বলার কারণে। নিন্দুকেরা বলবে, খুব শর্টকাটে ঘটনার মীমাংসা টানার চেষ্টা থেকে। আচ্ছা এত দ্রুত সমাধানের এবং তা সম্পর্কে মিডিয়ায় জানানোর প্রয়োজনটা কেন পড়ল? শুধু শার্টের কলার নাচানো স্বভাব, নাকি অন্য কিছু?
বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি সব প্রশ্ন সামনে আসছে। অথচ তার উত্তরে চোখের সামনে চলছে জি বাংলার সিরিয়ালের ‘থ্রিলার লাইট পার্ট’, যেখানে অপরাধী ও ভুক্তভোগী পক্ষকে ঘিরে যাবতীয় ক্রিয়া চলতে থাকে, সারবস্তু বা উপসংহার এক রেখেই। আর আমরা মুড়ির বাটি, হালে অবশ্য পপকর্ন হাতে নিয়ে বসে অনেকটাই অভ্যাসবশত এবং কিছুটা ঔৎসুক্য থেকে পরের পর্ব থেকে তারপরের পর্বে যেতে থাকি। কিছুটা কি নিরুপায় হয়েও নয়?
অবশ্য সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: জনগণ বেশি দিন নিরুপায় থাকতে ঠিক পছন্দ করে না। এই ডিজিটাল যুগে এই সময়ের পরিসরও দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। কারণ প্রযুক্তির কল্যাণে, আর যাই হোক, গতি তো বেড়েছে!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা