চীনে ম্যানোস্ফিয়ার বা পুরুষতান্ত্রিক অনলাইন সংস্কৃতির সরাসরি কোনো প্রতিশব্দ নেই, তবে এর বিষাক্ত প্রভাব বর্তমানে দেশটির প্রতিটি কোণে বিদ্যমান।
অন্যান্য দেশের মতোই সেখানকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের লক্ষ্য করে প্রতিনিয়ত চরম বিদ্বেষমূলক আক্রমণ চালানো হয়। পার্থক্য শুধু একটাই।
তা হলো যে দেশে সামান্য অপছন্দের পোস্টও সেন্সরশিপ দপ্তর নিমেষে মুছে ফেলে, সেখানে এই ম্যানোস্ফিয়ারের বিষবাষ্প দমনে কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি উদাসীন।
বরং সরকারের সমস্ত কঠোরতা গিয়ে পড়ে নারীদের ওপরই।
ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ক্ষতিকর কনটেন্ট ছাঁটাইয়ের তালিকায় বিশেষভাবে উগ্র নারীবাদ এবং একা বা সিঙ্গেল থাকার অনুপ্রেরণাদায়ী পোস্টগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
চীনের পুরুষ শাসকদের সঙ্গে বিপরীত লিঙ্গের যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, এটি তার কেবল একটি লক্ষণমাত্র।
এশিয়ার অন্য দুই পরাশক্তি জাপান ও ভারতের চেয়ে চীনের মূল তফাৎ হলো আধুনিক যুগে দেশটি কখনোই কোনো নারী নেতৃত্ব পায়নি।
চীনের বর্তমান শীর্ষ নেতা সি চিনপিং যেভাবে নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন, ঠিক সেভাবেই নারীদের ক্রমেই একপাশে সরিয়ে দিয়েছেন।
২৪ সদস্যের শক্তিশালী পলিটব্যুরো ২০২২ সাল থেকে পুরোপুরি পুরুষশাসিত হয়ে পড়েছে।
আর তার চেয়েও প্রভাবশালী পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটিতে কোনো নারী কখনোই জায়গা পাননি। ফলে লিঙ্গ সমতার বৈশ্বিক সূচকে চীনের ধারাবাহিক অবনতি হওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
নারীদের প্রতি কমিউনিস্ট পার্টির মূল নীতির গোড়াতেই রয়েছে এক বিরাট ঐতিহাসিক ভুল। দেশের কমতে থাকা জনসংখ্যা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলটি গভীরভাবে চিন্তিত।
তবে তারা মনে করে, নারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং ঐতিহ্যবাহী প্রথা মেনে তাদেরকে ‘গুণবতী স্ত্রী ও আদর্শ মা’ হতে বাধ্য করাই এর সমাধান।
এমন জোরজবরদস্তিমূলক পদ্ধতির ফলে পার্টির সংকীর্ণ লক্ষ্য তো পূরণ হবেই না, বরং উল্টো লাখ লাখ নারীর জীবনকে বিষাদময় করে তুলবে।
চীনের নারীরা। ছবি: রয়টার্সমাও সেতুং একসময় বলেছিলেন, নারীরা অর্ধেক আকাশ ধরে রাখে।
কিন্তু আজকের চীনে সেই আদর্শের কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় না।
২০১৫ সাল পর্যন্ত বহাল থাকা সরকারের আত্মঘাতী ‘এক সন্তান নীতি’ লাখ লাখ কন্যাভ্রুণ হত্যার পথ প্রশস্ত করেছিল।
যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে চীন আজ ভয়াবহ নারীসংকটে ভুগছে। নারীর এই অনুপস্থিতি ডেকে এনেছে এক চরম সামাজিক সংকট।
২৩ থেকে ৩৭ বছর বয়সী পুরুষ এবং ২২ থেকে ৩৬ বছর বয়সী নারীদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীনে নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ বেশি।
এখানে বিয়ের বাজারে টিকে থাকতে হলে একজন পুরুষের উচ্চশিক্ষা, স্থায়ী চাকরি ও নিজস্ব ফ্ল্যাট থাকা বাধ্যতামূলক।
পাশাপাশি অনেক এলাকায় কনের পরিবারকে দিতে হয় মোটা অঙ্কের যৌতুক।
এর ফলে বিয়ে করতে ইচ্ছুক তরুণদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই মনে করেন, ৩০ বছর বয়সের মধ্যে তাদের বিয়ের সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ বা তারও কম।
ফলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষোভ।
গ্রামীণ এলাকার অনেকের মধ্যেই চরম পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব দানা বাঁধছে এবং এই ক্ষোভের পারদ সামনে আরও চড়বে।
বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ অর্ধেকেরও বেশি।
অন্যদিকে উপযুক্ত শিক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক সামর্থ্য না থাকা পুরুষরা সমাজ থেকে ক্রমশ আরও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এই জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে রাতারাতি লাখ লাখ নিখোঁজ নারীকে ফিরিয়ে আনা চীন সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে তারা এমন নীতি গ্রহণ করতে পারে, যা নারীদের অধিকার সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি বিয়ের হার বাড়াতেও সাহায্য করবে।
প্রথমত, বিবাহিত নারীদের আইনি অধিকার সুনিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। চীনে যৌন হয়রানি, বৈবাহিক ধর্ষণ এবং পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ এখনো অত্যন্ত দুর্বল। বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীরা যদি সন্তানের খোরপোশসহ ন্যায্য অধিকার পাওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত হতে পারেন, তবে অনেকেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পাবেন।
পাশাপাশি, নির্যাতনকারী স্বামীর হাত থেকে সহজে বিচ্ছেদের সুযোগ থাকলে অনেকেই আবার নতুন করে সংসার গড়ার তাগিদ অনুভব করবেন।
সি চিনপিং যেভাবে নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন, ঠিক সেভাবেই নারীদের ক্রমেই একপাশে সরিয়ে দিয়েছেন।ছবি: রয়টার্সবিচ্ছেদের পর সম্পদ ও অধিকারের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা গেলে কনে-পণ বা যৌতুক প্রথার দাপটও কমে আসতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, একজন চীনা তরুণকে ১ লাখ ২৭ হাজার ৩০০ ইউয়ান (প্রায় ১৮ হাজার ৭৮০ ডলার) কনে-পণ জোগাড় করতে টানা ছয় বছরের আয় জমাতে হয়।
অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা আইনে নিষিদ্ধ হলেও তার প্রয়োগ নামমাত্র। বহু বাবা-মা এখনো মেয়ের বিয়ের অর্থের ওপর নির্ভর করেন, আর বিয়ের জন্য মরিয়া পুরুষরা বাধ্য হয়ে তা পরিশোধ করেন।
এই প্রথা একদিকে যেমন নারীকে পণ্যে রূপান্তর করে, অন্যদিকে গ্রামীণ অঞ্চলের দরিদ্র পুরুষদের ঠেলে দেয় চরম বিপাকে।
এছাড়া সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে, নতুন দম্পতিদের কাজের সুযোগ ও বাসস্থানের সংকট দূর করতে সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
চীনে অবিক্রিত পড়ে থাকা বিপুলসংখ্যক ফ্ল্যাট কিনে নিয়ে সরকার সেগুলোকে তরুণ দম্পতিদের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়ার আবাসন হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
সম্প্রতি হুকৌ (দেশের ভেতরের পাসপোর্ট ব্যবস্থা) কিছুটা শিথিল করায় নতুন দম্পতিরা এখন সহজেই শহরে নিবন্ধন করতে পারছেন এবং সন্তানদের স্কুলে ভর্তি ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা পাচ্ছেন যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষপর্যায়ে থাকা পুরুষরা এসব প্রস্তাবকে বিদেশি প্রভাব বা চাপ হিসেবে দেখতেই পারেন।
কিন্তু তারা যদি চীনা নারীদের দমন করার নীতি থেকে সরে এসে তাদের মনের কথা শোনেন, তবে হয়তো একদম অন্য এক বাস্তবতার গল্প শুনতে পাবেন।
*লেখাটি দ্য ইকোনমিস্টে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত*