১৭ বছরের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-গ্রেপ্তার আর রাজনৈতিক চাপ সামলে এখন সরকারে বিএনপি। গত ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর দলের শীর্ষ নেতাদের বড় একটি অংশ এখন সরকারের দায়িত্বে ব্যস্ত। মন্ত্রিসভা, সংসদ, প্রশাসন, অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা-সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নানা ক্ষেত্রে তাদের সময় দিতে হচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার সাত মাসের মাথায় বিএনপির ভেতরেই একটি প্রশ্ন সামনে আসছে, সরকার পরিচালনার ব্যস্ততায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম কি পিছিয়ে পড়ছে?
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এবং সাম্প্রতিক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, বিরোধী দলে থাকার সময়ের তুলনায় দলীয় কর্মসূচি ও সাংগঠনিক তৎপরতা অনেকটাই কমেছে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত সভা, কর্মী সমাবেশ, কমিটি পুনর্গঠন ও তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগাযোগে ধীরগতি তৈরি হয়েছে বলে দলটির নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন।
তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিষয়টিকে সাংগঠনিক স্থবিরতা হিসেবে দেখতে নারাজ। বরং তাদের বক্তব্য হলো, দীর্ঘদিন আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতির পর এখন দলকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
কেন্দ্র ব্যস্ত সরকারে, তৃণমূলে পুরনো কমিটি
বিএনপির সাংগঠনিক সমস্যার আরেকটি দিক হলো, দীর্ঘদিন ধরে অনেক কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে থাকা। জাতীয় কাউন্সিলও দীর্ঘ সময় ধরে হয়নি। সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন, তৃণমূল শক্তিশালী করা এবং কাউন্সিল আয়োজনের উদ্যোগের কথা দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। কিন্তু সরকার পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যে এই পুনর্গঠন কতটা দ্রুত করা সম্ভব হবে, সেটিই এখন প্রশ্ন।
কারণ ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে কমিটি ও পদ নিয়ে যে রাজনৈতিক হিসাব ছিল, ক্ষমতায় এসে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন বাস্তবতা। মন্ত্রী-এমপি হওয়া নেতাদের প্রভাব, স্থানীয় পর্যায়ে তাদের নিজস্ব বলয় এবং দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে সাংগঠনিক ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হচ্ছে।
সংসদের অধিবেশনে বিএনপি। ফাইল ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
এর একটি উদাহরণ হলো রাজশাহী জেলা বিএনপির বর্তমান চিত্র। তিন মাসের জন্য গঠিত আহ্বায়ক কমিটি প্রায় আট বছর ধরে বহাল রয়েছে। জেলার ২৩টি সাংগঠনিক ইউনিটের অধিকাংশের সম্মেলন হয়নি। স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যেও বিরোধ রয়েছে।
দলীয় নেতাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন কমিটি পুনর্গঠন না হওয়ায় তৃণমূলে সাংগঠনিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সব জায়গায় তা সমান গতিতে এগোচ্ছে না।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির একজন যুগ্ম আহবায়ক চরচাকে বলেন, “দ্রুত সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া প্রয়োজন। মাই ম্যান স্টাইলে রাজনীতি করলে বিপদই আছে। সরকারে আছে বলে একদম নিশ্চিন্ত হওয়ার কিছু নেই। বরং এই মুহূর্তে সাংগঠনিক তৎপরতা আরও বেশি প্রয়োজন।”
বিএনপি অবশ্য বলছে, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় কাউন্সিলের আগে জেলা, মহানগর, উপজেলা ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে গুছিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলের।
এমপিদের ‘মাই ম্যান’
তৃণমূলে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের ধরনও বদলেছে বলে নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন। দলের এমপিদের নিজস্ব বলয় ও ‘মাই ম্যান’ তৈরির প্রবণতাকে দলের জন্য সমস্যা হিসেবে মনে করছেন শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার স্থানীয় নেতাদের ভাষ্য, সরকার গঠনের পর দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের তুলনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই রাজনৈতিক তৎপরতা বেশি হচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততার কারণে দলীয় কর্মকাণ্ড কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে বলেও তারা মনে করছেন। তারা জানান, স্থানীয় এমপি কামরুজ্জামান কামরুল যেসব কর্মসূচি করেন, মূলত সেগুলো বাস্তবায়ন করেই নেতাকর্মীরা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকছেন।
এ ধরনের পরিস্থিতি বিএনপির ভেতরে নতুন একটি প্রশ্ন তৈরি করেছে—স্থানীয় সংসদ সদস্যদের রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে জেলা ও উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক কর্তৃত্বের ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে?
বিরোধী দলে থাকার সময় স্থানীয় সংগঠনই ছিল বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান ভিত্তি। এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা সংসদ সদস্য হওয়ায় তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক বলয় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে। এ নিয়ে দলের ভেতরে সতর্কতাও রয়েছে।
দলটির একাধিক নেতার ভাষ্য, এতদিন যারা জেলা, মহানগর কিংবা উপজেলা পর্যায়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত সময় দিতেন, তাদের অনেকেই এখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে। ফলে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, সাংগঠনিক সভা কিংবা কমিটি পুনর্গঠনের মতো কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে।
জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়ন চরচাকে বলেন, “নির্বাচনের সময় সবাই নির্বাচন ও সরকার গঠন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। সে কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রম তেমন দৃশ্যমান হয়নি। তবে দলের কার্যক্রম যথারীতি চলমান রয়েছে।”
ইউপি নির্বাচনেই প্রথম বড় পরীক্ষা
বিএনপির সাংগঠনিক সক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অবশ্য খুব দূরে নয়। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন বছরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেপ্টেম্বরেই ইউপি নির্বাচনের তফসিল দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন। এই নির্বাচন বিএনপির জন্য শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের লড়াই নয়; এটি দলের তৃণমূল নিয়ন্ত্রণেরও পরীক্ষা।
এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান জানান দিতে মাঠে নেমেছেন। একই ইউনিয়নে একাধিক নেতার প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। ফলে দলীয় সমর্থন কাকে দেওয়া হবে, বিদ্রোহী প্রার্থী কীভাবে সামলানো হবে এবং প্রার্থী বাছাইয়ে স্থানীয় এমপি বা প্রভাবশালী নেতাদের ভূমিকা কতটা থাকবে—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বিএনপির জন্য সমস্যাটি আরও বড় হতে পারে জামায়াতের সক্রিয় সাংগঠনিক প্রস্তুতির কারণে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত এরই মধ্যে প্রার্থী বাছাই ও মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতির কথা জানাচ্ছে।
আন্দোলনের দল থেকে সরকার পরিচালনার দল
বিএনপির বর্তমান সংকট শুধু ‘সাংগঠনিক দুর্বলতা’ নয়, এটি মূলত একটি রূপান্তরের সংকট। দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের বড় অংশ তৈরি হয়েছে সরকারবিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে। এখন সেই দলকেই সরকার পরিচালনা করতে হচ্ছে। ফলে একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে হচ্ছে—সরকারের নীতির দায় নেওয়া এবং দলীয় সংগঠনকে সক্রিয় রাখা।
ক্ষমতার প্রথম কয়েক মাসে সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায় যেমন বিএনপির ওপর পড়ছে, তেমনি সংগঠনের ভেতরে পদ-পদবি, স্থানীয় আধিপত্য ও নির্বাচনী মনোনয়ন ঘিরে নতুন প্রতিযোগিতাও তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় বিএনপির সামনে মূল প্রশ্ন শুধু সরকার কতটা ভালো চলছে—তা নয়। বরং সরকার চালাতে গিয়ে দলটি যেন সংগঠন হিসেবে দুর্বল হয়ে না পড়ে, সেটিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় বিএনপি রাজপথে যে সাংগঠনিক শক্তি তৈরি করেছিল, ক্ষমতায় থাকার সময় সেই শক্তি ধরে রাখাই হতে পারে দলটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সরকারের মেয়াদ যত এগোবে, এই পরীক্ষার ফলও তত স্পষ্ট হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী চরচাকে বলেন, “দীর্ঘদিন পর বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই দলের অনেক নেতাকর্মী এখন সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছুটা গতি কমে আসার বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। তবে এটাকে সাংগঠনিক স্থবিরতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।”
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ছবি: চরচা
রিজভী আরও বলেন, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দলটি যে সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করেছে, তা এক দিনের নয়। এখন সরকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলকে সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো, সাংগঠনিক কাঠামোকে সক্রিয় রাখা এবং দলের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর বিষয়টি অগ্রাধিকারে রয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, “ক্ষমতায় থাকলে রাজনৈতিক দলের সামনে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। সরকার পরিচালনার ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় দলীয় কর্মকাণ্ডে প্রত্যাশিত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। বিএনপি সেই জায়গাটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। কারণ সরকার ও দল—দুটিকে একই সঙ্গে সক্রিয় রাখতে না পারলে রাজনৈতিকভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।”
রুহুল কবির রিজভী মনে করেন, বিএনপির শক্তি হচ্ছে এর তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তার কথায়, “দীর্ঘ সময় তারা রাজপথে ছিলেন, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, মামলা মোকাবিলা করেছেন। এখন তাদের সঙ্গে আরও নিবিড় যোগাযোগ তৈরি করে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য।