‘সফট ল্যান্ডিং’-এর কথা মনে আছে? আগে বলে নেওয়া দরকার সফট ল্যান্ডিং কী? ‘সফট ল্যান্ডিং’ বলতে বোঝায়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি নিয়ন্ত্রিত ও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা, যাতে মূল্যস্ফীতি কমে আসে, কিন্তু অর্থনীতিতে মন্দা দেখা না দেয় বা বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি না হারান।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ২০২২-২৩ সালে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন একটি লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছিল, যেখানে মন্দা না ডেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। কয়েকটি দেশ সেই লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছিও পৌঁছে গিয়েছিল।
কিন্তু সাফল্য যখন প্রায় হাতের নাগালে, তখনই আরও বেশি সংখ্যক কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করছে। পণ্যের দাম ও অন্যান্য খরচের ওপর চাপ আবারও বাড়ছে।
চার বছর আগের তীব্র সংকট থেকে বিশ্ব এখন অনেকটাই দূরে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়।
গত ২ সেপ্টেম্বর নিউজিল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়েছে। তাসমান সাগরের ওপারে অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছর এরই মধ্যে তিনবার ঋণের খরচ বাড়িয়েছে। জুনে সুদের হার বাড়িয়েছে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জুলাই ও আগস্টে একই পথে হেঁটেছে দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) তাদের আমানতের সুদের হার বাড়িয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী মনে করছেন, খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভও একই পথে হাঁটতে পারে।
মূল্যস্ফীতির চাপ যে আবারও বাড়ছে, এমনটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর সে কারণেই নীতিনির্ধারকেরা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। উন্নত দেশগুলোতে গড়ে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশের দিকে নামার যে প্রবণতা ছিল, তা থেমে গেছে। বরং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি আবার কিছুটা বেড়েছে। ২ শতাংশ মূল্যস্ফীতিই এসব দেশের বেশিরভাগের নির্ধারিত লক্ষ্য।
চলতি বছরের আগস্টে ইউরো অঞ্চলে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সুইজারল্যান্ডে অবশ্য মূল্যস্ফীতি বছরে মাত্র ০ দশমিক ৮ শতাংশ। দেশটির অর্থনৈতিক নীতির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বিস্ময় বলা যায়। তবে সেখানেও মূল্যস্ফীতি দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
আর কিছু কিছু দেশে পণ্যের দাম আবারও মানুষকে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটের সেই দুঃখজনক সময়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। যেমন লিথুয়ানিয়ায় মূল্যস্ফীতি এখন প্রায় ৬ শতাংশ। জানুয়ারিতে যা ছিল ৩ দশমিক ১ শতাংশ।
এর পেছনে মূলত জ্বালানি খাতই দায়ী। তবে একমাত্র কারণ এটি নয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছে। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম এখন ইরান যুদ্ধের আগে যে পর্যায়ে ছিল, তার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। শীতের আগে ইউরোপের গ্যাস মজুতের ট্যাংকগুলো আবার ভরা হচ্ছে। ফলে দাম আরও বাড়তে পারে।
ইতিমধ্যেই ইউরো অঞ্চলে জ্বালানির মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে উঠে গেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে একজন সাধারণ মানুষকে এখন এক গ্যালন পেট্রলের জন্য ৪ ডলারের বেশি দিতে হচ্ছে। বছরের শুরুতে এর দাম ছিল ৩ ডলারেরও কম।
তবে সমস্যা শুধু জ্বালানির মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। দ্য ইকোনমিস্টের হিসাবে, উন্নত দেশগুলোতে গড়ে বার্ষিক ‘কোর’ মূল্যস্ফীতি, যেখানে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম হিসাবের বাইরে রাখা হয়, ২০২৬ সালের শুরুতে ২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন ২ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
দেশগুলোর মূল্যস্ফীতির অন্তর্নিহিত চাপ আরও বিস্তারিতভাবে বোঝার জন্য আমরা ২৩টি উন্নত দেশের সেবার দামের তুলনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছি। সেবার দাম মূলত শ্রমের খরচের ওপর নির্ভর করে, তুলনামূলকভাবে বেশি ওঠানামা করা পণ্যের দামের ওপর নয়।
দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব দেশের দুই-তৃতীয়াংশে সেবা খাতে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। অথচ অনেক দেশেই মজুরি বৃদ্ধির হার কমছে। এই আপাত-বিরোধী পরিস্থিতির একটি ব্যাখ্যা হতে পারে, মজুরির প্রকৃত বৃদ্ধির হার সঠিকভাবে পরিমাপ করা হচ্ছে না। আরেকটি কারণ হতে পারে, সেবা খাতে উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে কর্মীদের বেতন বাড়ানোর অতিরিক্ত খরচ সামলে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
এখন পর্যন্ত এমন খুব বেশি প্রমাণ নেই যে মানুষ ভবিষ্যতে পণ্যের দাম আরও বাড়বে বলে মনে করছে। আর এমনটা হলে তবেই নীতিনির্ধারকেরা সত্যিই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন। মূল্যস্ফীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বাজারভিত্তিক বেশিরভাগ হিসাবেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, কয়েক মাস আগের তুলনায় ভোক্তারা আগামী এক বছরে মূল্যস্ফীতি কম থাকবে বলে আশা করছেন।
তবে কিছু সূচক আবার উল্টো চিত্র দেখাচ্ছে। এগুলো বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এমন একটি সূচক তৈরি করে ‘অলটারনেটিভ ম্যাক্রো সিগন্যালস’ নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। তারা লাখ লাখ সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য গতিপথ বোঝার চেষ্টা করে।
তবে এসব সূচক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সবসময় নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দিতে পারে না। তাই এগুলোকে নিশ্চিত কোনো সংকেত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
ভবিষ্যতে কী হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না। সমালোচকেরা বলছেন, ২০২১-২২ সালে মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়তে শুরু করলেও নীতিনির্ধারকেরা ব্যবস্থা নিতে দেরি করেছিলেন। এবার তারা একই ভুল আর করতে চান না।
স্লোভেনিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বলেছেন, মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিতে স্থায়ীভাবে গেঁথে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। ইসিবির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ইসাবেল শ্নাবেলও সম্প্রতি সতর্ক করেছেন, জ্বালানির বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত মজুরি বাড়ানোর চাপ তৈরি করা পর্যন্ত অপেক্ষা করলে নীতিনির্ধারকেরা আবারও পরিস্থিতির পেছনে পড়ে যেতে পারেন।
তাহলে কি সুদের হার বাড়ানোর নতুন একটি পর্ব মাত্র শুরু হয়েছে?
সুইজারল্যান্ডের ব্যাংক ইউবিএস মনে করছে, যেসব কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো সুদের হার বাড়ানো শুরু করেনি, তাদের অনেকেই শিগগিরই তা করতে পারে। এর মধ্যে সুইডেন ও এমনকি সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও থাকতে পারে।
সবকিছু দেখে মনে হতে পারে অর্থনীতি যেন বড় ধরনের ধাক্কা ছাড়াই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে। কিন্তু বাস্তবে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই কখনোই পুরোপুরি শেষ হয়নি।