ইরান যুদ্ধের ছয় মাস পেরিয়েছে। এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিভিন্ন খাতে বিশেষ করে তেলের বাজার তীব্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আমেরিকানদের ওপর। গ্যাসের দাম কয়েক সপ্তাহ ধরে ৪ ডলারের বেশি। বন্ধকী ঋণের সুদের হারও বেড়ে প্রায় ৭ শতাংশের দিকে যাচ্ছে। আবার ডিজেলের রেকর্ড দামের কারণে খরচ পোষাতে বিভিন্ন কোম্পানি পণ্য পরিবহনের ওপর অতিরিক্ত টোল বসাচ্ছে।
জীবনযাত্রার এই বাড়তি খরচগুলো ট্রাম্প প্রশাসন যত দ্রুত কমানোর আশ্বাস দিয়েছিল, তার চেয়ে বেশি সময় ধরে চলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলে এসব খরচ শেষ পর্যন্ত আবার কমে আসতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।
মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে মার্কিন অর্থনীতিতে এমন কিছু পরিবর্তন হয়েছে, যেগুলো সহজে আগের অবস্থায় ফিরবে না। শুধু তাই নয়, এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এনেছে। ফলে বিশ্বজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ধরনও বদলে গেছে।
ইরানের নিয়ন্ত্রণে হরমুজ প্রণালি
যুদ্ধ শুরুর আগে যেকোনো দেশের জাহাজ অবাধে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারত। এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে পরিস্থিতি বদলে যায়। ইরান প্রণালিটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। পারস্য উপসাগরে ঢোকা বা বের হওয়ার চেষ্টা করা জাহাজেও তারা হামলা চালায়। এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির সুযোগ পায় ইরান।
মে মাসে প্রণালি বন্ধ রাখার কৌশল বদলায় তেহরান। পুরোপুরি বন্ধ না করে তারা জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। এ জন্য ‘পারস্য উপসাগর হরমুজ প্রণালি কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয়। এরপর প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে ওই সংস্থার কাছে নিবন্ধন করতে, নির্ধারিত পথে চলতে এবং প্রণালি পার হওয়ার জন্য টোল দিতে বলা হয়।
জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করার পর ইরান ৬০ দিনের জন্য এই টোল নেওয়া বন্ধ করতে সম্মত হয়। তবে যেসব জাহাজ ওই কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন না করে প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে, সেগুলোর ওপর ইরান হামলা চালানো অব্যাহত রাখে।
সিএনএন বলছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ওই সমঝোতার পর থেকে রাতে গোপনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সমন্বয় ও পাহারা দিতে শুরু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানি বাড়ানো এবং ইরানের ড্রোন হামলা এড়ানো। এই উদ্যোগ কাজে এসেছে। তবে এত বড়, কঠিন ও ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালানোর প্রয়োজন হওয়ায় দেখিয়ে দেয় যে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব কতটা বেড়েছে।
বিনিয়োগ কৌশলবিদ রস মেফিল্ড সিএনএনকে বলেন, “যুদ্ধ শেষ হলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে ইরান আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোকে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। আগে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি শুধু সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু এখন ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, তারা চাইলে সত্যিই এটি করতে পারে এবং এতে কার্যকরভাবে চাপ তৈরি করা সম্ভব।”
তেলবাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সমাধানের অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানকে টোল নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তবে কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এটি যদি একবার শুরু হয় তাহলে অন্য দেশও আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য টোল দাবি করতে পারে।
তবে আমেরিকান বহুজাতিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের পণ্যবাজার বিশ্লেষণের প্রধান নাতাশা কানেভা বলেন, ‘‘এমন ব্যবস্থা একেবারে নতুন নয়। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য সরাসরি টোল না নিলেও নিরাপত্তা, জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা পাহারা, জরুরি সহায়তা ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য ফি নিতে পারে।’’
কানেভা বলেন, “তুরস্ক, ডেনমার্ক, সুইডেন, রাশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বিভিন্ন প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে এ ধরনের ফি নেয়।” তার মতে, তুরস্কের প্রণালির মতো টোল ব্যবস্থা চালু করলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১ ডলার বাড়তে পারে। একটি বড় তেলবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া-আসার জন্য প্রায় দুই লাখ ৬০ হাজার ডলার দিতে হতে পারে।
তেলের বাজারে চীনের প্রভাব আরও শক্ত হলো
চীন নিজে খুব বেশি তেল উৎপাদন করে না। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় চীন প্রমাণ করেছে যে বিশ্ব তেলের বাজারে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
আরএসএম ইউএসের প্রধান অর্থনীতিবিদ জো ব্রুসুয়েলাস সিএনএনকে বলেন, “এর কারণ হলো চীন প্রয়োজন অনুযায়ী তেলের চাহিদা বাড়াতে বা কমাতে পারে। যুদ্ধের আগে চীন বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করে রেখেছিল। সেই মজুত ব্যবহার করায় দেশটির অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কমে যায়। তবে একসময় চীনকে আবার এসব তেলের মজুত পূরণ করতে হবে। তখন দেশটির তেলের চাহিদা আবার বাড়বে।”
অন্যদিকে, চীনের ভোক্তাদের আচরণে যুদ্ধের কারণে যেসব পরিবর্তন এসেছে, সেগুলোর কিছু স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
চীনের পরিবহন মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে, চীনে পাঁচ দিনের মে দিবসের ছুটিতে মহাসড়কগুলোতে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) চার্জ দেওয়ার পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছিল। ছুটির সময় দেশটির মহাসড়কে চলাচল করা গাড়ির প্রায় এক-চতুর্থাংশ ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ি। এক বছর আগের তুলনায় এ সংখ্যা ৩৩ শতাংশ বেশি।
চীন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও দ্রুত তেল ও গ্যাসের বদলে কয়লা ব্যবহার করতে পেরেছে। এর মাধ্যমে তেলের বড় সংকটের মধ্যেও দেশটি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অসাধারণ সক্ষমতা দেখিয়েছে।
যুদ্ধের সময় বিশ্বে তেলের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যায়। তেল শিল্পের বিশ্লেষকেরা যতটা আশা করেছিলেন, চাহিদা তার চেয়েও বেশি কমেছিল। এতে প্রমাণ হয়েছে, বিশ্বের মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন হলে তেলের ব্যবহার ধারণার চেয়ে অনেক বেশি কমাতে পারে।
জেপি মরগানের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাজারে সরবরাহ না হওয়া ১৯০ কোটি ব্যারেল তেলের মধ্যে ৮০ কোটি ব্যারেল অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক তেলের ব্যবহার কমিয়ে মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সামাল দিয়েছে।
সিএনএন বলছে, এই পরিবর্তনের কতটা স্থায়ী আর কতটা সাময়িক, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে চীনসহ বিভিন্ন দেশে তেলের ব্যবহার যদি স্থায়ীভাবে কমে যায়, তাহলে তেলের চাহিদা এতটাই কমতে পারে যে তা আর আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরবে না। অর্থাৎ বিশ্ব হয়তো তেলের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বা ‘পিক অয়েল’-এ পৌঁছে গেছে।
কানেভা বলেন, “ইতিহাসে দেখা গেছে- অতীতে তেলের সংকটের পর পেট্রোলের চাহিদা অনেক সময় স্থায়ীভাবে কমে গেছে। এবারও তেমনটা হতে পারে।”
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে তেল উৎপাদন বেড়েছে
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তেলের বাজারে আরেকটি বড় পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল। প্রত্যাশার বাইরে থাকা বিভিন্ন দেশ তেল উৎপাদন বাড়িয়েছে।
লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপো বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে তেল অনুসন্ধান ও বিকল্প জ্বালানির খোঁজ বেড়েছে। পাশাপাশি আগে থেকে চালু থাকা তেলক্ষেত্রগুলোতেও উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে।”
জেপি মরগানের হিসাব অনুযায়ী, ব্রাজিল প্রতিদিন আট লাখ ব্যারেল, গায়ানা তিন লাখ ব্যারেল, কানাডা দুই লাখ ব্যারেল এবং নরওয়ে এক লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল করে তেল উৎপাদন বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এখন প্রতিদিন প্রায় নয় লাখ ব্যারেল বেশি তেল উৎপাদন করছে।
সিএনএন বলছে, শুরুতে তেলের দাম সাময়িকভাবে বেড়ে যাওয়ার পর আবার কমে যেতে পারে- এই আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র তেল উৎপাদন বাড়াতে চায়নি। পরে তারা উৎপাদন বাড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি তেলের বড় অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালিত তেলক্ষেত্র থেকে আসছে। এসব তেল শোধনাগারে পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে জেট ফুয়েল ও প্রাকৃতিক গ্যাস তৈরি করে ইউরোপে পাঠানো হচ্ছে, কারণ ইউরোপে এসব জ্বালানির সরবরাহ কমে গেছে। তবে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের তেল উৎপাদন কিছুটা কমতে পারে।
অবশ্য জেপি মরগান মনে করছেন, দেশটির উৎপাদন বর্তমানের কাছাকাছি পর্যায়েই থাকবে। ব্রাজিল তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্লেষকদের অবাক করেছে। তারা যতটা আশা করেছিলেন, ব্রাজিল এখন তার চেয়ে অনেক বেশি তেল উৎপাদন করছে। দেশটির তেল প্রকল্পগুলো ভালোভাবে পরিচালিত হওয়ায় ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও বাড়তে পারে।
এদিকে, গায়ানার উপকূলে চলতি মাসে নতুন একটি বড় তেল উৎপাদনকারী জাহাজ পৌঁছানোর কথা। এর ফলে বিশাল তেলক্ষেত্র থেকে গায়ানা আরও দ্রুত তেল উৎপাদন করতে পারবে।
তেলের সরবরাহ ঠিক রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও তেল পরিবহনের পদ্ধতি বদলাচ্ছে এবং বিকল্প পথ তৈরি করছে।
সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল ও অন্যান্য পণ্য লোহিত সাগরে নিতে বড় বড় ট্রাকের বহর ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে দেশটি তার পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনও সর্বোচ্চ সক্ষমতায় ব্যবহার করছে। ইরাক হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত তেল নেওয়ার জন্য শেভরনের সঙ্গে পাইপলাইন তৈরির বিষয়ে আলোচনা করছে।
এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাত এপ্রিল মাসে ওপেক ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর সংস্থাটির ভবিষ্যৎ নিয়েই বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ইরাক ওপেকের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। দেশটিও ওপেক ছাড়তে পারে বলে আলোচনা চলছে।
ইরাকের তেলমন্ত্রী ব্লুমবার্গকে বলেছেন, “উৎপাদনের অনুমোদিত সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে ইরাককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা ওপেকে থাকবে কি না।”
ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শেষে ইরাক প্রতিদিন রেকর্ড ৫০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনের অনুমতি চায়। দীর্ঘমেয়াদে তারা প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত উৎপাদন করতে চায়। এতে সৌদি আরবকে অন্য দেশগুলোকে আরও বেশি তেল উৎপাদনের সুযোগ দিতে হতে পারে, এমনকি বিশ্ববাজারে যতটা তেল প্রয়োজন, তার চেয়েও বেশি।
এর একটি ভালো দিক হলো, তেলের সরবরাহ বাড়লে সাধারণ মানুষের জন্য তেলের দাম কমতে পারে। তবে অন্যদিকে, বাজারে তেলের অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হলে তেলের দাম ও তেল কোম্পানিগুলোর লাভ স্থায়ীভাবে অনেক কমে যেতে পারে।