চলতি মাসে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যে লং মার্চ করেছে তাকে সরকারের জন্য ‘ওয়েক আপ কল’ বলে উল্লেখ করছেন জোটটির নেতারা। প্রায় ১ হাজার গাড়ি নিয়ে এই লং মার্চ করে জোটের পক্ষ থেকে সরকারকে ৬ দফা দাবি দেওয়া হয়েছে। জোট নেতারা ওই ৬ দফায় বিদ্যুৎ, গ্যাস সংকট ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে আনলেও তাদের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন।
জোটের ঘোষণা অনুসারে, গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লং মার্চ শেষ হয়েছে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুরে, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে লং মার্চ হবে। আর ঢাকায় মহাসমাবেশ হবে আগামী ১৪ নভেম্বর। ১১ দলীয় ঐক্য যে ৬ দফা দাবিতে লং মার্চ করছে, সেগুলো হলো-গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, দেশব্যাপী গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও সারের চলমান তীব্র সংকটের দ্রুত সমাধান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও দলীয়করণ বন্ধ।
জোটের নেতারা বলছেন, এই লং মার্চের পরও যদি ‘কাজ না হয়’, তাহলে সরকারবিরোধী তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে চান তারা। যদিও এই লং মার্চকে সরকার পতনের আন্দোলন বলতে রাজি নন তারা।
এর আগে চট্টগ্রামে লং মার্চ চলাকালে একে সরকারের জন্য ‘ওয়েক আপ কল’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামের নায়েবে আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। লং মার্চে কুমিল্লায় তাহের বলেন, “এই মুহূর্তে আমরা সংসদে এবং সংসদের বাইরে যে লং মার্চ বা আন্দোলনে আছি, তা সরকারের পদত্যাগ বা সরকার পতনের আন্দোলন নয়, এটা সরকারের জন্য ওয়েক আপ কল।”
অপর দিকে জোটের নেতৃত্বে থাকা জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ঢাকা-চট্টগ্রাম লং মার্চে বলেছেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের কর্মসূচির ওষুধ ইতিমধ্যে কাজ করতে শুরু করেছে। বিভিন্ন জায়গায় তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।...আপনারা বলতেছেন এই করলে সেই করলে ছাড় দিয়ে কথা বলা হবে না। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি করলে জনগণও কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলবে না।”
যদিও সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে বিরোধীদের লং মার্চ কর্মসূচিতে খুব একটা ‘পাত্তা’ দেওয়া হয়নি। বরং লং মার্চকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘লং ড্রাইভ’ বলে কটাক্ষ ও হাসি-তামাশা করছে সরকারি দলের কর্মী ও সমর্থকরা। তবে রাজনৈতিক মহলের বিভিন্ন বিশ্লেষকরা একে ‘অতি সাধারণ’ কর্মসূচি মানতে নারাজ। ওই কর্মসূচি থেকে জামায়াতে ইসলামী ও জোটের রাজনৈতিক ‘গ্রহণযোগ্যতা’ জনসাধারণে বাড়বে বলেই অনেকে মনে করছেন।
অনেকে এই কর্মসূচিকে ভারতের বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধির ‘ভারত জোড়ো যাত্রার’ সঙ্গেও তুলনা করছেন। যদিও জামায়াতের ওই লং মার্চের সঙ্গে ওই কর্মসূচির সাদৃশ্য নেই। ভারতের বিগত নির্বাচনের আগে ২০২২ সালে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী শুরু করেছিলেন ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’। ভারতের তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী থেকে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরে শেষ হয় ওই কর্মসূচি। কংগ্রেস এটাকে নিছক নির্বাচনী প্রচার হিসেবে উপস্থাপন করেনি। তবে ওই কর্মসূচির পর কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধীর ‘গ্রহনযোগ্যতা’ বেড়েছিল সারা ভারতে। পরবর্তী নির্বাচনের ফল তার প্রমাণ। তবে ওই কর্মসূচিতে ভারতের সরকারি দল বিজেপির বিরুদ্ধে যে ধরনের রাজনৈতিক বয়ান কংগ্রেস তৈরি করেছিল, ঠিক সেরকম বয়ান বিএনপির বিরুদ্ধে জামায়াত তৈরি করতে চায় কি না—তা অবশ্য প্রশ্ন হিসেবেই রয়েছে। কারণ বিরোধী দল একই সঙ্গে সংসদে ও রাজপথে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েই এগোচ্ছে।
আবার রাজনৈতিক মহলের অনেকে বলছেন, জামায়াত এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে অনেকগুলো কাজ করতে পারছে। একই সঙ্গে তারা সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে। এবং দীর্ঘ ওই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ যাতে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে না পারে সেটাও ‘খেয়াল’ রাখছে। সরকার যদি আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ দেয়, তার ‘ব্যাকআপ’ হিসেবে সরকার পতনের হুমকি হিসেবে কাজ করবে এই লং মার্চ কর্মসূচি। অপর দিকে এই কর্মসূচির মধ্যে নিয়ে যে জনসম্পৃক্ততা জোটের তৈরি হলো, তাকে আগামীর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের ‘ব্যর্থতার কথা’ বলে আগামীতে জাতীয় নির্বাচনের জন্যও নিজেদের পথ প্রশস্ত করতে পারছে।
অবশ্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আর ফিরবে না বলেই ধারণা করছেন ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও মামুনুল হকের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি চরচাকে বলেন, ‘‘আমরা বিশ্বাস করি, তারা (আওয়ামী লীগ) দেশের রাজনীতিতে আসবে না।
চট্টগ্রাম মিরসরাইয়ে অনুষ্ঠিত পথসভা। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
তারা যা বলে এগুলো শুধু ফাঁকা আওয়াজ। শেখ হাসিনা দেশে মোটেও আসবে না।” তিনি আরও বলেন, ‘‘এখন সরকার যদি তাদের (আওয়ামী লীগ) আসার পরিবেশ করে দেয়, সেটা ভিন্ন বিষয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা দেশে আসবে না। আসতে পারবেও না।”
রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, বিরোধীদের এই লং মার্চ সারা দেশে বিরোধীশক্তির জন্য একটি জোয়ার তৈরি করতে পারে। ১১ দলীয় জোট নেতারা বলছেন, ওই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তারা জনসমর্থন প্রদর্শন করতে সক্ষম হচ্ছেন। জোটের দাবি অনুযায়ী, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে বিপুল মানুষ পথসভা ও কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে। প্রায় ১ হাজারের বেশি গাড়ির বহর নিয়ে লংমার্চ শুরু হয়েছিল।
জোটের নেতা জালাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘‘আমরা লং মার্চে জনগণকে সচেতন করব। সরকারের ব্যর্থতার বিষয়গুলো আমরা জানাব। যেহেতু আমরা জনগণের পক্ষে কথা বলছি, এ জন্য আমরা তৃণমূলে পৌঁছে যাচ্ছি।”
এদিকে জামায়াতের আমির বলেছেন ‘কর্মসূচি ওষুধ’ কাজ করছে। কীভাবে কাজ করছে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলের মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের চরচাকে বলেন, ‘‘এই যে জনগণ সাড়া দিচ্ছে, আমরা জনগণের সমর্থন পাচ্ছি, সরকারের নেতৃবৃন্দের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, সেটাই তো ওষুধ কাজ করার ইঙ্গিত।”
কটাক্ষের যে জবাব জামায়াতের
লং মার্চ নিয়ে সরকারি দলের পক্ষ থেকে যে সমালাচনা তার উল্লেখ করে এহসানুল মাহবুব বলেন, ‘‘উনারা কথাবার্তা বলছেন। উনাদের অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে।”
সরকার পক্ষের অনেকে কটাক্ষ করে লং মার্চকে ‘লং ড্রাইভ’ বলছে; সে বিষয়ে এই জামায়াত নেতা বলেন, ‘‘ হ্যাঁ, লং ড্রাইভ তো বটেই। ২৫০, ২৫০, মোট ৫০০ কিলোমিটার। হাজার গাড়ি নিয়ে গেছি, কয়েক লাখ মানুষ সেটা দেখেছে। পুরো রাস্তার দুই পাশে লাখ লাখ মানুষ দাঁড়িয়ে আমাদের সমর্থন জানিয়েছে, এটা তো অনেকের জন্যই কষ্টের বিষয়।”
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দিন বলেন, ‘‘সরকারি দল তো অনেক কিছুই বলবে। তবে এটা তাদের বলা উচিত নয়। আমরা যে বিষয়ে লং মার্চ করেছি, একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের দাবি আদায়ে তো আমরা নামতেই পারি।”
ফেনীর মহিপালে অনুষ্ঠিত পথসভা চিত্র। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
মূল দাবি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন
লং মার্চে বিরোধী জোট কী কী অর্জন করছে—এমন প্রশ্নে জামায়াত নেতা জুবায়ের বলেন, ‘‘যে গণদাবি, গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, এটাই তো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য এটা একটি অপরিহার্য় বিষয়। আমরা তো সংস্কারে ছিলাম, বিএনপিও ছিল। বিএনপি এটার পক্ষে ছিল। কিন্তু এখন তারা এটার পক্ষে নেই। জনগণের সঙ্গে তারা প্রতারণা করছে।”
সরকার দাবি না মানলে কি সরকার পতনের আন্দোলন হবে—জানতে চাইলে এই জামায়াত নেতা বলেন, ‘‘আমরা দাবি অনুসারে জনগণের সাড়া পাচ্ছি। আমরা সংসদে ও রাজপথে একসঙ্গে কাজ করছি। তৃতীয় বিষয় হচ্ছে, দাবি না মানলে দেশের জনগণই ঠিক করবে যে আগামীতে কী হবে।”
জোটের নেতারা মনে করেন, লং মার্চ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ১১ দলের ঐক্যও ‘নতুন পরীক্ষায়’ টিকে গেছে। জামায়াত, এনসিপি ও তার শরিক দলগুলো একই কর্মসূচিতে মাঠে সক্রিয় হয়ে জোটের সাংগঠনিক সমন্বয়ের সক্ষমতা দেখিয়েছে। এটি একটি অর্জন বলেই তারা মনে করছেন। এ ছাড়া এই কর্মসূচির ফলে পরবর্তী আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি হবে বলেই জোট নেতাদের ধারণা।
চাপ সৃষ্টিই মূল উদ্দেশ্য?
জোটের নেতারা বলছেন, দাবি বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরও কঠোর হতে পারে। চট্টগ্রামের সমাবেশে জোটের এক শীর্ষ নেতার ৬ দফা ১ দফায় পরিণত হওয়ার বক্তব্য নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। জোটের নেতাদের দাবি, এতে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা গেছে।
জোটের শীর্ষ নেতা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘‘আমরা সরকারকে চাপ প্রয়োগ করার জন্যই তো এ কর্মসূচি দিয়েছি। যদি বিদ্যুৎ, গ্যাসের সমস্যা না হতো, তাহলে তো আমরা মাঠে এমন কর্মসূচি দিতাম না।”
এই নেতা মনে করেন, সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। তিনি বলেন, “সরকারের অধিকাংশ যারা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে, তারা অযোগ্য ও অপরিপক্ক। যার কারণে তারা সব জায়গায় ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। আর সরকারের অযোগ্যতাই আমাদের মাঠে নামিয়ে দিচ্ছে।”
লংমার্চে ফেনীর জনসভায় ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাদের দেখা যাচ্ছে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
প্রয়োজনে এক দফা?
সরকার পতনের আন্দোলনের দিকেই কি জোটের কর্মসূচি যাচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দিন বলেন, ‘‘এটা একটি কর্মসূচির ধারাবাহিকতা। আমরা যে ছয় দফা দিয়ে মাঠে নামছি, এখন সরকার যদি আমাদের দাবির প্রতি কোনো তোয়াক্কাই না করে, গ্রাহ্য না করে, তখন আমাদের করণীয় তো জনগণের অধিকার আদায়ে এক দফার দিকে যাওয়া।”
তবে এই নেতা বলছেন, তাদের এখনকার কর্মসূচি সরকার পতনের আন্দোলন নয়। তার কথায়, “আমরা সরকারকে আরও ছয় মাস সময় দেব। এরপরও যদি সরকার কোনো তোয়াক্কা না করে, তখন তো কঠোর আন্দোলনের দিকেই যাওয়া ছাড়া করণীয় নেই।”