ইরানে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তি এরই মধ্যে ভেস্তে গেছে। দুই দেশ একে অপরকে দোষারোপ করে চলেছে। ফলাফল দাঁড়িয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবারও কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। এই সংকটের আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। খাদ্য সংকটে পড়তে পারে দেশের অন্তত দুই কোটি মানুষ।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের দাম বেড়ে গেছে। এতে দেশে বড় ধরনের সার সংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।
ডব্লিউএফপির নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যে ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়, তার প্রায় ৮০ শতাংশই সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা হয়। বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ ইউরিয়া মজুত আছে, তা অক্টোবর পর্যন্ত চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট।
আরব নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়টি বাংলাদেশের তিনটি প্রধান কৃষি মৌসুমের একটি। এ সময় ধান ও পাটসহ বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের চাষ হয়। সেজন্য এই মৌসুম বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে ওই অঞ্চল থেকে সার আমদানিও বন্ধ হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফজলুর রহমান আরব নিউজকে বলেন, একদিকে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সার আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে কাঁচামালের সংকটের কারণে দেশের সার কারখানাগুলোকেও উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
ডব্লিউএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরিয়া সারের দাম ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে গ্যাসের সংকটের কারণে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাঁচটি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে তিনটি উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড। ছবি: ওয়েবসাইট থেকে নেওয়াবাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সংকটে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান 'ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড' (ডিএপিএফসিএল)। চলতি বছরের ২৮ জুন থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ এই কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
এছাড়া নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের অভাব ও সময়মতো পূর্ণাঙ্গ ওভারহোলিং না হওয়ায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অন্যতম আধুনিক ইউরিয়া সারকারখানা ফেঞ্চুগঞ্জের শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (এসএফসিএল) দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে জাতীয় ইউরিয়া উৎপাদন, কৃষি খাত, স্থানীয় অর্থনীতি এবং সরকারি রাজস্ব আদায়ে সম্ভাব্য প্রভাব পড়ছে বলে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এমন পরিস্তিতিতে ডব্লিউএফপির আশঙ্কা, এই সংকট চলতে থাকলে দেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে পারে।
এর আগে, গত এপ্রিল মাসে ২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ (জিআরএফসি) প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে একটি অস্বস্তিকর ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরাসরি দুর্ভিক্ষ কিংবা চরম কোনো খাদ্য সংকটের মধ্য দিয়ে না গেলেও, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ‘ক্রাইসিস’ (সংকট) এবং প্রায় ৪ লাখ মানুষ ‘ইমারজেন্সি’ (জরুরি) পর্যায়ে ছিল।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালেও অনেক ক্ষেত্রে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা থাকবে। চলমান সংঘাত, জলবায়ুর অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক দেশে এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এমনকি পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে খাদ্যসংকটে থাকা দেশ ও অঞ্চলগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক কৃষি–খাদ্য বাজারে ঝুঁকির মুখে আছে।