জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও ‘স্বাধীনভাবে’ পরিচালনা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও প্রতিকারের সুযোগ রেখে নতুন আইন করা হয়েছে। নতুন আইনে কমিশনের গঠন, নিয়োগ, অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত, ক্ষতিপূরণ, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ ইউনিট গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
তবে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দল। তাদের অভিযোগ, সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারলেও শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে আগে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছেই প্রতিবেদন চাইতে হবে।
বিলটি সংসদে পাসের আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশও (টিআইবি) এই বিল নিয়ে উদ্বোগ জানিয়েছিল।
গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ পাসের মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত হয়। তবে আপত্তি জানিয়ে বিলের আলোচনায় অংশ না নিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।
কেমন হবে কমিশন
নতুন আইনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার নিয়ে পাঁচ সদস্যের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। পাঁচ সদস্যের মধ্যে অন্তত একজন নারী থাকতে হবে।
চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। তবে তার আগে একটি বাছাই কমিটি প্রার্থীদের নাম সুপারিশ করবে।
আইন, বিচার, প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজসেবা, মানবকল্যাণ, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার এবং পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্তত ১৫ বছরের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মধ্য থেকে প্রার্থী বাছাইয়ের কথা বলা হয়েছে। মানবাধিকার রক্ষা, সততা ও শুদ্ধাচারের দৃষ্টান্ত রয়েছে এবং রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত—এমন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধানও রয়েছে।
চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর। একই ব্যক্তি চেয়ারম্যান বা কমিশনার হিসেবে এক বা উভয় পদ মিলিয়ে দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালনের পর আর নিয়োগ পাবেন না।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের মতো পদ্ধতি ছাড়া চেয়ারম্যান বা কমিশনারকে অপসারণ করা যাবে না। তবে দেউলিয়া বা অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হওয়া, দায়িত্বের বাইরে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অন্য পদে যুক্ত হওয়া, ফৌজদারি বা নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়া, নাগরিকত্ব ত্যাগ করা বা নিয়োগের যোগ্যতা হারালে রাষ্ট্রপতি অপসারণ করতে পারবেন।
বাছাই কমিটিতে কারা
বাছাই কমিটির সভাপতি হবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। কমিটিতে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি ও বিরোধী দলের একজন করে সংসদ সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং নাগরিক প্রতিনিধি থাকার বিধান রয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কমিটি গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদন বা মনোনয়ন আহ্বান করতে পারবে। যাচাই-বাছাই শেষে চেয়ারম্যান ও প্রতিটি কমিশনার পদের বিপরীতে দুজন করে প্রার্থীর নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে।
অভিযোগ করা যাবে কীভাবে
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ লিখিত বা মৌখিকভাবে করা যাবে। কমিশন গণমাধ্যমসহ অন্য কোনো মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য পেলেও নিজ উদ্যোগে বিষয়টি নিতে পারবে।
সাধারণভাবে ঘটনার ছয় মাসের মধ্যে অভিযোগ করতে হবে। তবে ভুক্তভোগীর আইনগত বা শারীরিক অসামর্থ্য, ভয়ভীতি, বিশেষ পরিস্থিতি বা জনস্বার্থে যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকলে কমিশন এই সময়সীমা মওকুফ করতে পারবে।
অভিযোগ বা তথ্য পাওয়ার পর ১৫ দিনের মধ্যে কমিশন তা আমলে নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে পারবে। তদন্ত শেষ করতে হবে তিন মাসের মধ্যে। বিশেষ কারণে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিশনার আরও ৩০ দিন সময় বাড়াতে পারবেন।
তদন্তে বাড়ছে ক্ষমতা
তদন্তের সময় কমিশন বা তার নিয়োগ করা তদন্ত কর্মকর্তা দেওয়ানি আদালতের মতো কিছু ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবেন। সাক্ষীকে সমন করা, জিজ্ঞাসাবাদ, শপথে বক্তব্য নেওয়া, প্রয়োজনীয় দলিল তলব এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা যাবে।
কমিশন যেকোনো সময় যেকোনো স্থান পরিদর্শন করতে পারবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট স্থানের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
অভিযোগ প্রমাণ হলে
তদন্তে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে কমিশন বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আদালত বা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠাতে পারবে। দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভাগীয়, শৃঙ্খলামূলক বা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করতে পারবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কমিশনের সুপারিশ পাওয়ার দুই মাসের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করে কমিশনকে জানাতে হবে।
কমিশন ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করে তা দেওয়ার নির্দেশও দিতে পারবে। ক্ষতিপূরণের অর্থ দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি থেকে আদায়যোগ্য হবে।
অনাদায়ী থাকলে ম্যাজিস্ট্রেট বা কালেক্টরের মাধ্যমে আদায়ের ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।
তদন্ত চলাকালে সুরক্ষা
তদন্ত চলাকালে ভুক্তভোগী তাৎক্ষণিক সহায়তা বা সুরক্ষা না পেলে গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন বলে মনে হলে কমিশন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিশনার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তা বা সুরক্ষার নির্দেশ দিতে পারবেন। কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত চললেও প্রয়োজনীয় আইনানুগ অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ বা সুপারিশ করা যাবে। কমিশনের আদেশ অমান্য বা গাফিলতি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে আলাদা পদ্ধতি
সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, র্যাবসহ আইনে সংজ্ঞায়িত শৃঙ্খলা বাহিনী বা তাদের সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আলাদা পদ্ধতি রাখা হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ পেলে কমিশন নিজ উদ্যোগে বা আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে।
প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হলে কমিশন আর পদক্ষেপ নেবে না। সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করতে পারবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে কমিশনের সুপারিশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে নেওয়া ব্যবস্থা সম্পর্কে কমিশনকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। এই বিধান নিয়েই বিরোধী দলের প্রধান আপত্তি।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা অধ্যাদেশ বাতিলের সময় সরকার আরও শক্তিশালী আইন আনার কথা বলেছিল। কিন্তু নতুন মানবাধিকার কমিশন বিলে সাধারণ নাগরিক ও শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে ‘দ্বৈত প্রয়োগ’ রাখা হয়েছে।
তার বক্তব্য, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশন সরাসরি তদন্ত করতে পারবে। কিন্তু কোনো বাহিনী জড়িত থাকলে আগে সেই বাহিনীর কাছে জবাব চাইতে হবে।
প্রথমবার জবাব না দিলে কী হবে, তার স্পষ্ট নির্দেশনা নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এরপর ওয়াকআউটের সময় শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা এ আইনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করছি না এবং আমরা এখন ওয়াকআউট করছি। মাননীয় স্পিকার, সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।”
বিরোধী দল বেরিয়ে যাওয়ার পর আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার আগেই মানবাধিকার কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং সেই অনুযায়ী নতুন বিল আনা হয়েছে। বিল তৈরির আগে নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, ভুক্তভোগী, বিদেশি অংশীদার এবং কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, মানবাধিকার কমিশন কোনো ফৌজদারি তদন্ত সংস্থা নয়। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করাই বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার কমিশনের সাধারণ কাজ। নতুন আইনে কমিশনকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষমতা এবং সমন জারিসহ দেওয়ানি আদালতের কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রেও কমিশনের তদন্তের সুযোগ রাখা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বক্তব্য শোনার জন্য একটি প্রক্রিয়া রাখা হয়েছে।
বাহিনী ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিলে কমিশনের পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার থাকবে বলেও জানান আইনমন্ত্রী।
নির্যাতন প্রতিরোধে নতুন ইউনিট
নির্যাতন, নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ প্রতিরোধে জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইউনিট গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। চেয়ারম্যান এই ইউনিটের প্রধান থাকবেন। সঙ্গে থাকবেন একজন কমিশনার এবং কারাবন্দি বা স্বাধীনতাবঞ্চিত ব্যক্তিদের অধিকার ও কল্যাণ বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন মানবাধিকারকর্মী।
প্রয়োজনে আইন, ফরেনসিক মেডিসিন, মনোবিজ্ঞান, মানসিক স্বাস্থ্য, জেন্ডার বা আটক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা যাবে। কারাগার, হাজতখানা, থানা, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র, কিশোর সংশোধনাগার, অভিবাসী আটক কেন্দ্র, মানসিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানসহ যেখানে মানুষের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়, এসব স্থান নিয়মিত ও পূর্বঘোষণা ছাড়াই পরিদর্শন করতে পারবে ইউনিটটি।
জনবল নিয়োগ ও অর্থ
কমিশন প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করতে পারবে। তবে তা সরকার অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী করতে হবে। কমিশনের জন্য আলাদা মানবাধিকার কমিশন তহবিল গঠনের বিধান রয়েছে। সরকারি অনুদানের পাশাপাশি আইন অনুযায়ী বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির অনুদান এবং কমিশনের বিনিয়োগ থেকে আয় এই তহবিলে জমা হতে পারবে।
তবে স্বার্থের সংঘাত বা আইনের সঙ্গে অসংগতির আশঙ্কা থাকলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুদান নেওয়া যাবে না। সরকার প্রতি অর্থবছরে কমিশনের জন্য অর্থ বরাদ্দ করবে। অনুমোদিত খাতে সেই অর্থ ব্যয়ের জন্য কমিশনের সরকারের পূর্বানুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। তবে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের নিরীক্ষার ক্ষমতা বহাল থাকবে।
কার্যালয় ও প্রতিবেদন
কমিশনের প্রধান কার্যালয় থাকবে ঢাকায়। ঢাকার বাইরে বা অন্য কোনো স্থানে কার্যালয় স্থাপন করতে হলে সরকারের পূর্বানুমোদন লাগবে। প্রতি বছর ৩১ মার্চের মধ্যে আগের বছরের কার্যক্রমের প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে দিতে হবে কমিশনকে।
প্রতিবেদনে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নিলে তার কারণও উল্লেখ করতে হবে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সাত দিনের মধ্যে কমিশনের ওয়েবসাইটে তা প্রকাশ করতে হবে।
নতুন আইনের অধীনে বিদ্যমান জাতীয়িকার কমিশন বহাল থাকবে। ২০০৯ সালের আইনের অধীনে চলমান মামলা, কার্যক্রম ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও নতুন আইনের অধীনে বহাল রাখার বিধান রয়েছে।