তুরস্কে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী বিরোধী নেতা ওজগুর ওজেল। গত ২৪ জুলাই ঘোষিত দলের নাম রাখা হয়েছে নিউ পার্টি (ওয়াইপি)।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ইচ্ছা যেন বাস্তবে রূপ নিল। কারণ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট বেশ কয়েক বার বলেছেন, তিনি এবং তার ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একে) পার্টি আরও কার্যকর একটি বিরোধী দল পাওয়ার যোগ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ওজেল তুরস্কের রাজনৈতিক মানচিত্রই বদলে দিয়েছেন। রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) নেতৃত্ব থেকে সম্প্রতি অপসারিত হওয়ার পর তার সঙ্গে দলটির ১৩৫ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৯১ জনই ওয়াইপিতে যোগ দিয়েছেন। ফলে দলটি এখন পার্লামেন্টের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০০২ সালে বর্তমান ক্ষমতাসীন একেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সিএইচপি ছিল তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল।
জনমত জরিপ বলছে, সিএইচপির অধিকাংশ ভোটারও ওজেলের নতুন দলে চলে এসেছেন। কয়েকটি জরিপে ওয়াইপির জনসমর্থন ৩০ শতাংশেরও বেশি দেখানো হয়েছে, যা এরদোয়ানের একেপির চেয়েও এগিয়ে।দুই বছরেরও বেশি সময় সিএইচপির নেতৃত্ব দেওয়ার পর মে মাসের শেষ দিকে আদালতের এক আদেশে ওজেলকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আদালতের রায়ে বলা হয়, দলীয় কংগ্রেসে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেখানে অনিয়ম হয়েছিল। ফলে সাবেক চেয়ারম্যান কামাল কিলিচদারওগলুকে আবারো দলের নেতৃত্বে ফিরিয়ে আনা হয়। ওজেলের সমর্থকরা আদালতের এই রায় মানতে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ সিএইচপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান চালায়।
তুরস্কের বিরোধী নেতা ওজগুর ওজেল। ছবি: রয়টার্স
সমালোচকদের মতে, আদালতের এই রায়ের পেছনে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের প্রভাব ছিল। তাদের ধারণা, এরদোয়ান কিলিচদারওগলুকে এমন প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেন, যাকে সহজে মোকাবিলা করা যায়। কারণ, আগের মেয়াদে কিলিচদারওগলুর নেতৃত্বে সিএইচপি একের পর এক নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিল। ২০২৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তিনি এরদোয়ানের কাছে হেরে যান। কিন্তু মাত্র এক বছর পর, ওজেলের নেতৃত্বে সিএইচপি অর্ধ শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফল করে এবং স্থানীয় নির্বাচনে একেপিকে পেছনে ফেলে।
ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুরস্কের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল সিএইচপি এখন কার্যত অস্তিত্ব সংকটে। দল ভাঙনের পর জনমত জরিপে তাদের সমর্থন এক অঙ্কে নেমে এসেছে। ২৫ জুলাই পরিস্থিতি আরও বিব্রতকর হয়, যখন কিলিচদারওগলুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে উপস্থিত শত শত মানুষকে ভাড়া করা দর্শক হিসেবে শনাক্ত করেন এক সাংবাদিক। কাস্টিং এজেন্সির মাধ্যমে আনা এসব ব্যক্তিকে করতালি ও উল্লাস করার জন্য জনপ্রতি ৯৫০ লিরা (প্রায় ২০ ডলার) দেওয়া হয়েছিল।
ধারণা করা হচ্ছে, তুরস্কের সর্বোচ্চ আপিল আদালত যদি কিলিচদারওগলুর অবস্থান পুনর্বহাল বহাল রাখেন, তাহলে আরও অনেক সিএইচপি নেতা ও সংসদ সদস্য ওয়াইপিতে যোগ দিতে পারেন। তবে প্রশ্ন হলো, নতুন দলটি কি কেবল সিএইচপির আরেকটি সংস্করণ হয়ে থাকবে, নাকি এর চেয়ে বড় কিছু হয়ে উঠতে পারবে? ইতোমধ্যে দলটি সিএইচপির ধর্ম নিরপেক্ষ ও সামাজিক গণতান্ত্রিক ভোটভিত্তির বড় অংশ নিজেদের দখলে নিয়েছে। কিন্তু এরদোয়ানকে চ্যালেঞ্জ জানাতে হলে কেন্দ্র-ডানপন্থী, জাতীয়তাবাদী এবং কুর্দি ভোটারদের নিয়েও একটি বৃহত্তর জোট গড়ে তুলতে হবে। এখন পর্যন্ত তারা সে লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
২০০৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী এবং এরপর থেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এরদোয়ান। সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি একবার নিজের ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ বাড়িয়েছেন। আবারো ক্ষমতায় থাকার সুযোগ পেতে তিনি ২০২৮ সালে নির্ধারিত প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচন আগামী বছর এগিয়ে আনার জন্য পার্লামেন্টের কাছে প্রস্তাব রাখতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কাগজে-কলমে ওজেল এবং ওয়াইপি একেপিকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, একেপির সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিরোধী রাজনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান দমন-পীড়ন এবং এরদোয়ানের প্রভাবাধীন বিচারব্যবস্থা তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আদালত ধীরে ধীরে প্রেসিডেন্টের পথের বাধা সরিয়ে দিচ্ছে অথবা যদি আগামীতে ৭৩ বছরে পা দেওয়া এরদোয়ান নিজে আর নির্বাচন করতে না পারেন, তার মনোনীত উত্তরসূরির জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। ইস্তাম্বুলের জনপ্রিয় তৎকালীন মেয়র একরেম ইমামওগলুকে ২০২৫ সালের মার্চে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মাত্র কয়েক দিন আগেই সিএইচপির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হয়। জনমত জরিপে তাকে এরদোয়ানকে হারানোর সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছিল। দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এমন সব মামলা করা হয়েছে, যাতে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩০০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
ইস্তাম্বুলের সাবেক মেয়র একরেম ইমামওগলু। ছবি: রয়টার্স
গত কয়েক বছরে সিএইচপির অন্তত ২৬ জন মেয়র এবং শত শত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য বিকল্প প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এবং আঙ্কারার মেয়র মানসুর ইয়াভাশকেও একই ধরনের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। জুলাইয়ের শুরুতে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলন শেষ হওয়ার পর বিদেশি নেতারা দেশ ছাড়তেই ইয়াভাশের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান জোরদার করা হয়।
ধারণা করা হচ্ছে, ওয়াইপিও শিগগিরই নতুন দমন-পীড়নের লক্ষ্যবস্তু হবে। ইস্তাম্বুলের সাবানজি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বের্ক এসেনের ভাষায়, “এই মুহূর্তে বিরোধী দলের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নির্বাচনে জয়ী হওয়া নয়, বরং টিকে থাকা।”
তার মতে, ওজেল ও তার সমর্থকরা যদি আগামী ছয় মাস থেকে এক বছর টিকে থাকতে পারেন, তাহলে তারা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন। এরদোয়ান বিরোধী রাজনীতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে ছেঁটে ফেলেছেন। কিন্তু সেই বিরোধী শক্তিই হয়তো আবার আগের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসে তাকে বিস্মিত করতে পারে।