বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোনো দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ নিয়ে এত অনিশ্চয়তা থাকে না, যা দেখা যায় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) নিয়ে। গত দশ বছর ধরেই প্রায় নিয়মিতভাবেই প্রতিটি আসর শুরুর আগেই তৈরি হয় নানা সংকট। টুর্নামেন্ট শেষ পর্যন্ত হবে কিনা, তা নিয়ে এক মাস আগেও থেকে যায় ধোঁয়াশা। তবে এবার বিসিবি বেশ আগেই ঘটা করে জানিয়ে দিয়েছে, জোড়াতালি দিয়ে বিপিএল আর নয়। আসলেই কি সেটা সম্ভব?
বিপিএলের প্রথম আসরের থিম সং গেয়েছিলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী বাপ্পি লাহিড়ী। গানের নাম ছিল বিপিএল কাপ! এতগুলো বছর পরেও সেই গানই যেন হয়ে আছে বিপিএলের প্রতিচ্ছবি। ফ্র্যাঞ্চাইজি আছে তো দল নেই, দল আছে তো মালিক নেই, মালিক আছে তো টাকা নেই, আবার কখনো কখনো এর কোনোটাই নেই। এরপর বিপিএল যেন হতেই হবে। ক্রিকেটার থেকে শুরু করে বিসিবি পরিচালক, এমনকি বোর্ড সভাপতিও বিপিএল আয়োজন করতে চান যেভাবেই হোক না কেন।
আর এতে করে একসময় বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ থেকে বিপিএল এখন চলে গেছে সেরা দশেরও বাইরে। অপেশাদারিত্ব, মালিকানা জটিলতা, প্রতি আসরেই মালিকানা বদল বা নতুন দলের আবির্ভাব, খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নিয়ে নজিরবিহীন টালবাহানার কারণে বিপিএলের ভাবমূর্তি প্রায় তলানিতে।
আর তাই বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবাল দায়িত্ব নিয়েই বলেছেন, যেনতেনভাবে আর বিপিএল নয়। দরকার হলে এক বছর বিরতি নিয়ে এরপর গুছিয়ে তারা বিপিএল আয়োজন করবেন। তবে মাঠের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। বিসিবির অন্য অনেক ক্ষেত্রের মতো এখানেও সভাপতি বলছেন একটা, আর হচ্ছে ঠিক উল্টোটাই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিবির একজন পরিচালক চরচাকে বিপিএল নিয়ে জানিয়েছেন চমক জাগানিয়া খবরই। তিনি বলেন, “বিপিএল করবেন না, এটা বললেই তো হয় না। দ্বিপাক্ষিক সিরিজের চেয়েও এখানে দর্শকের আগ্রহ বেশি থাকে। যত বিতর্কই হোক, বিপিএল মানেই ক্রিকেটের একটা জোয়ার। আপনি দশটা অন্য টুর্নামেন্ট করলেও সেই ক্রেজ তো পাবেন না। আর ক্রিকেটারদের রুটি-রুজির ব্যাপারও আছে। বিপিএল যাতে হয়, সেই চেষ্টাটা তাই সব পক্ষই করবে।”
তার মানে দাঁড়াচ্ছে, ভেতরে ভেতরে বিপিএলের প্রস্তুতি ঠিকই চলছে। তিনটি ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে বিসিবি এরই মধ্যে যোগাযোগ করে আগামী বিপিএল তারা খেলবে কিনা, সেটা জানতে চেয়েছে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী ওয়ারিয়র্স, রংপুর রাইডার্সের অংশ নেওয়া প্রায় নিশ্চিত। অন্যদিকে বিদেশি লিগের ফ্র্যাঞ্চাইজি, বিশেষ করে আইপিএলের মালিকরা এক-দুইটা দল নেবেন, এই আশাও করছে বিসিবি।
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের এবারের বিপিএলে অংশগ্রহণ নিশ্চিত। ছবি: বিসিবি
ফারুক আহমেদ ও আমিনুল ইসলামের অধীনে হওয়া বিপিএলের শেষ দুই আসরেই লস হয়েছিল বিসিবির। এর মধ্যে গত আসরে চট্টগ্রাম ফ্র্যাঞ্চাইজির পুরো খরচ বোর্ডকে বহন করতে হয়েছিল। এবার যাতে এমন কিছু না হয়, সেটাই সবার আগে নিশ্চিত করতে চাচ্ছে বিসিবি। লাভ না হোক, লস যাতে না হয়, সেটাই মূল এজেন্ডা।
আর সেটার জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ফ্র্যাঞ্চাইজির স্বত্বাধিকারী, যারা পেশাদারত্ব বজায় রেখে অংশ নেবেন। সেই লক্ষ্যে এরই মধ্যে দেশের কয়েকটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বিসিবি। আর্থিক দিক থেকে শতভাগ সবুজ সংকেত মিললেই কেবল এবার দেওয়া হবে মালিকানা, যাতে পরে বিব্রতকর অবস্থায় না পড়তে হয়।
সবশেষ বাদ রইলেন ক্রিকেটাররা। বিপিএল নিয়ে ক্রিকেটারদের চিন্তা এতটাই যে, লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগ খেলতে শ্রীলঙ্কায় থাকা তাওহীদ হৃদয় সরাসরি বলে দিয়েছেন, তিনি চান বিপিএল যাতে হয়। জাতীয় দলের খেলোয়াড় বলে তার ক্ষতি না হলেও বিপিএল এবার বাদ গেলে অন্য ক্রিকেটারদের কী ক্ষতি হবে, সেটাই তিনি বলতে চেয়েছেন। বিসিবির কোর্টে বল ঠেলে দিলেও তাই তাওহীদের চাওয়া, বিপিএলটা যেন হয়।
জাতীয় দল বা ঘরোয়া ক্রিকেট খেলা প্রায় সবার সুরটাও একই। নাম না প্রকাশ করার শর্তে গত বছর রাজশাহীতে খেলা একজন ক্রিকেটার যেমন বলেছেন, “তামিম ভাই তো এক বছর আগেও বিপিএল খেলছেন। তিনি সবসময় ক্রিকেটারদের স্বার্থ দেখেন, আশা করি এবারও তাই করবেন। মাথাব্যথা হয়েছে বলে তো আপনি মাথা কেটে ফেলতে পারেন না। বিপিএল খেলেই অনেকের কয়েক মাসের সংসার চলে, এগুলো বুঝতে হবে। আমার বিশ্বাস, বিপিএল করবে এই বছর বিসিবি।”
তার মানে হলো, তামিম নামকাওয়াস্তে বিপিএল না করতে চাইলেও সব পক্ষই বিপিএলে এক বছরের বিরতি চান না। সেই চাওয়া এতটাই জোরদার যে, আরেকটি বিতর্কিত বিপিএলেও আপত্তি নেই তাদের। তাছাড়া তামিমের বোর্ড নিশ্চয় সেই বোর্ডও হতে চাইবে না, যারা প্রথম মেয়াদে বিপিএল আয়োজনে ব্যর্থ হয়েছে।
নিন্দুকদের আলোচনার খোরাক জোগাতে কি শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটের স্বার্থে বিপিএল বন্ধ থাকবে এবার? নাকি জোর করে হলেও খেলতে হবে বিপিএল কাপ? উত্তর যেটাই হোক, বিসিবিকে নিতে হবে কঠিন সিদ্ধান্ত।