বেশ কয়েক বছর ধরে একটা কথা শোনা গিয়েছিল যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। কিন্তু গত পাঁচ মাসের যুদ্ধ দেশটির শাসকদের বুঝিয়ে দিয়েছে, তাদের হাতে এরই মধ্যে একটি শক্তিশালী অস্ত্র আছে। সেটি হলো ভৌগোলিক অবস্থান।
ইরানের অবস্থান ও সামরিক শক্তির কারণে দেশটি হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সাধারণত এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। এই পথ বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারায় প্রতিপক্ষের ওপর ইরানের চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা অনেক বেড়েছে।
তবে ইরানের প্রতিপক্ষ দেশগুলো মনে করছে, খুব বেশিদিন তারা হরমুজকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, “হরমুজ বন্ধ করা এমন একটি তুরুপের তাস, যা একবারই ব্যবহার করা যায়।”
এ কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন তেল রপ্তানির বিকল্প পথ তৈরিতে জোর দিচ্ছে। ইরাক ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত টম ব্যারাকের মতে, দুই বছরের মধ্যেই হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অনেক কমে যাবে।
এই দাবি নিয়ে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে তিনটি বিষয় উঠে এসেছে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করে ইরান কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারবে, তা পণ্য ও দেশের ওপর নির্ভর করবে। দ্বিতীয়ত, সময়ের সঙ্গে হরমুজ থেকে ইরানের লাভ করার সুযোগ কমবে, তবে পুরোপুরি শেষ হবে না। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে এই পথ ব্যবহার করে ইরান কম অর্থ পেলেও, অঞ্চলজুড়ে তাদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব কমবে–এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং সেটি আরও বাড়তেও পারে।
হরমুজের ওপর নির্ভরতা কতটা কমানো সম্ভব?
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। এর একটি বড় অংশ অন্য পথেও পাঠানো সম্ভব।
সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন দেশটির পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল নিয়ে যায়। এই পাইপলাইন হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে না। যুদ্ধের আগে এটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হতো।
হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স
বর্তমানে পাইপলাইনটি পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে। এটি প্রতিদিন ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল রপ্তানি করা হচ্ছে। বাকি তেল উপকূলের শোধনাগারগুলোতে পাঠানো হচ্ছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাদের হাবশান-ফুজাইরাহ পাইপলাইনের সর্বোচ্চ সক্ষমতা ব্যবহার করছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হতো, এখন তা বেড়ে ১৮ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। এছাড়া আগে প্রায় অচল থাকা ইরাক-তুরস্কের একটি ছোট পাইপলাইন দিয়েও এখন প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছে।
এতে বিকল্প পথে তেল রপ্তানির পরও প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের ঘাটতি থেকে যাবে। এর সঙ্গে যদি যুদ্ধের কারণে নতুন যেসব পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা হয়েছে, সেগুলো যোগ করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে পারে।
এ বিষয়ে অভিজ্ঞ এক আইনজীবী দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে সরকারই বড় সিদ্ধান্ত নেয়। তাই নতুন পাইপলাইন নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণে তেমন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
এ বিষয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটি বর্তমান পাইপলাইনের পাশেই আরেকটি নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করতে চায়। এটি ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ চালু হলে প্রতিদিন আরও ১৮ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা যাবে।
ইরাকও আগামী এক বছরের মধ্যে তুরস্কমুখী পাইপলাইনের সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেল করতে চায়। এ ছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলের তেলক্ষেত্রকে জর্ডান, সিরিয়া ও তুরস্কের বিদ্যমান পাইপলাইনের সঙ্গে যুক্ত করতে নতুন একটি পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির বিশ্লেষক রাহুল চৌধুরী দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, প্রতিদিন ২৫ লাখ ব্যারেল সক্ষমতার এই প্রকল্পের জন্য ঠিকাদারি দেওয়া শুরু হয়েছে। চার বছরের মধ্যে এটি শেষ হতে পারে। সব মিলিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিদিন আরও প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে অন্য পথে রপ্তানি করা সম্ভব হতে পারে।
তবুও প্রতি দিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেলের জন্য কোনো বিকল্প পথ থাকবে না। এছাড়া এসব বিকল্প ব্যবস্থাও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নিরাপত্তা সমস্যা বা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধের কারণে ইরাকের প্রকল্পগুলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার অনেক পাইপলাইন প্রকল্প পরিকল্পনাতেই থেকে যায়, বাস্তবে আর নির্মাণ হয় না।
ইয়ানবু বন্দর থেকে এশিয়াগামী তেলবাহী জাহাজগুলো সাধারণত বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে যায়। সেখানে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার ঝুঁকি রয়েছে।
সৌদি আরবের তেল সুয়েজ খাল বা মিসরের সুমেদ পাইপলাইন দিয়েও পরিবহন করা সম্ভব। তবে সেই পথও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। ২৯ জুলাই সুয়েজের কাছে মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে একটি তেলবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ইরান যদি মনে করে যে কোনো নতুন অবকাঠামো হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারে–তাহলে তারা সেখানেও হামলা চালাতে পারে বলে মত বিশ্লেষকদের।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক কর্মকর্তা বারবারা লিফের মতে, যুদ্ধ যদি আলোচনার মাধ্যমে শেষ হয়, তাহলে ইরানের এমন হামলার সম্ভাবনা কম থাকবে। তবে হামলার আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হবে না। ফলে এসব প্রকল্পের বীমা ও অর্থায়নের খরচ বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
জ্বালানি পণ্য সরানো আরও কঠিন
অপরিশোধিত তেলের তুলনায় পরিশোধিত জ্বালানি–যেমন পেট্রোল, ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি ভিন্ন পথে পাঠানো আরও কঠিন। গত বছর উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল এসব জ্বালানি রপ্তানি করেছে। এগুলো পরিবহনের জন্য এখনো কোনো স্থলভিত্তিক পাইপলাইন নেই।
সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম করিডর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে নতুন একটি পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এর মাধ্যমে প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি পরিবহন করা যাবে। তবে প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। এটি চালু করতে ইয়ানবু বন্দরের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন মাত্র ১০টি জ্বালানিবাহী ট্রাক সিরিয়ায় পাঠাত ইরাক। এখন পাঠাচ্ছে প্রায় ১ হাজার ট্রাক। কিন্তু এভাবে জ্বালানি পরিবহন ধীরগতির এবং ব্যয়বহুল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শুধু এই ট্রাক চলাচল থেকেই সিরিয়া দেড় কোটি থেকে ২ কোটি ডলার ট্রানজিট আয় করেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে নতুন শোধনাগার নির্মাণ করাও সহজ নয়। এতে পাইপলাইনের চেয়েও বেশি সময় লাগে এবং খরচ হয় কয়েক শ কোটি ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দেবে এলএনজি রপ্তানিতে। কারণ উপসাগরীয় অঞ্চলে এলএনজির সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক কাতার, আর প্রায় সব এলএনজিই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। এ মুহূর্তে এলএনজি পরিবহনের জন্য কোনো নতুন পাইপলাইন নির্মাণ হচ্ছে না। এমনকি এ ধরনের প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও প্রকাশ করা হয়নি।
তাছাড়া আরব সাগরের উপকূলে কাতারের পুরো এলএনজি প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো নতুন করে তৈরি করাও বেশ কঠিন হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি তেল উত্তোলন যন্ত্র। ছবি: রয়টার্স
তা সত্ত্বেও বিশ্লেষকদের মতে, সময়ের সঙ্গে অনেক দেশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফেলতে পারবে। কয়েক বছর তেলের দাম বেশি থাকলে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য অঞ্চলগুলো থেকে প্রতিদিন আরও ২০ থেকে ৩০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে আসতে পারে।
চীনের শোধনাগারগুলোতেও এখনো অতিরিক্ত উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া এলএনজি উৎপাদনও ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ফলে এই দশকের শেষ নাগাদ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে ইরানের প্রভাব কমে যেতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের প্রভাব এত সহজে কমবে না। কারণ আগামী বেশ কয়েক বছর এসব দেশের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি রপ্তানি এখনো হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভর করবে। শুধু রপ্তানিই নয়, আমদানির ক্ষেত্রেও তারা এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল।
উপসাগরীয় আরব দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় শস্যের ৯৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। কিন্তু বড় আকারে শস্য খালাস করার মতো পর্যাপ্ত বন্দর শুধু সৌদি আরবেই রয়েছে। সেটিও পুরো অঞ্চলের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এ ছাড়া শস্য, লৌহ আকরিক বা বক্সাইট বিপুল পরিমাণে সড়কপথে পরিবহন করাও বাস্তবসম্মত নয়। কারণ একটি প্যানাম্যাক্স জাহাজে প্রায় ৬০ হাজার টন শস্য বহন করা যায়, যা পরিবহন করতে প্রায় ২ হাজার ট্রাকের প্রয়োজন হয়।
এর একটি সমাধান হতে পারে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আরও রেলপথ নির্মাণ। তবে সেগুলো তৈরি করতেও অনেক সময় ও অর্থ লাগবে।
অস্ট্রেলিয়ায় একই ধরনের মরুভূমি এলাকায় নির্মিত খনি-সংযুক্ত রেলপথের প্রতি কিলোমিটারে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার খরচ হয়েছে। সেই হিসাবে লোহিত সাগর থেকে কাতার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে অন্তত ২৫ বিলিয়ন ডলার লাগতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সাধারণত ৪ থেকে ৬ মাসের প্রয়োজন মেটানোর মতো শস্য মজুত থাকে। কিন্তু তাজা খাদ্য, ওষুধ ও গৃহস্থালি পণ্যের মতো কনটেইনারে আসা পণ্যের ক্ষেত্রে এমন কোনো বড় মজুত নেই।
অঞ্চলটির সবচেয়ে বড় কনটেইনার বন্দর জেবেল আলি, যার বার্ষিক ধারণক্ষমতা প্রায় ২ কোটি টিইইউ (২০ ফুট কনটেইনার)। কিন্তু এটি উপসাগরের ভেতরে অবস্থিত।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালির বাইরে সবচেয়ে বড় বন্দর হলো জেদ্দা। এর ধারণক্ষমতা ৭৫ লাখ টিইইউ। তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের বিশ্লেষক অ্যালেক্সিস এলেন্ডারের মতে, যুদ্ধ শুরুর আগেই বন্দরটি প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছিল।
দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ বলছে, ইরান আরও কিছুদিন হরমুজ প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। একই সঙ্গে এ থেকে অর্থও আয় করবে। উপসাগরীয় দেশগুলোর হরমুজের ওপর নির্ভরতা এক নয়। তাই জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে তারা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিতে পারে।
কাতার ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা সাময়িকভাবে কিছু ফি মেনে নিতে পারে। অন্য দেশগুলো তুলনামূলক কঠোর অবস্থানে ছিল।
তবে ইরানের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতও এখন কিছুটা নমনীয় হয়েছে। দেশটি আবার ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য শুরু করেছে এবং দুই দেশের কূটনীতিকদের মধ্যে আলোচনাও চলছে।
হরমুজ থেকে ইরান কত আয় করতে পারে?
ইরান যদি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তাহলে এ থেকে তারা কত আয় করতে পারবে?
এর জবাবে ইরানের একজন এমপি জুন মাসে দাবি করেন, প্রণালি দিয়ে যাওয়া প্রতিটি জাহাজ থেকে ইরান ১৫ থেকে ২০ লাখ ডলার আদায় করছে। যদি যুদ্ধের আগের তুলনায় ৭০ শতাংশ জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকে, তাহলে বছরে ৩৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই অঙ্কটি খুবই বড় এবং বাস্তবসম্মত নয়। কারণ যুদ্ধের সময় জোর করে নেওয়া এমন ফি দীর্ঘদিন টিকবে না। যুদ্ধ শেষ হয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে এত বেশি অর্থ আদায় করা কঠিন হবে। জুনে ইরানের পার্লামেন্টে দেওয়া একটি খসড়া আইনে বলা হয়েছে, পণ্যের পরিমাণ, মূল্য ও জাহাজের ধরন অনুযায়ী ফি নির্ধারণ করা হবে। তবে একটি শর্ত থাকবে—এই ফি যেন বিকল্প পথে পণ্য পরিবহনের খরচের চেয়ে বেশি না হয়। এছাড়া জাহাজের মালিক বা ভাড়াকারী কোন দেশের, তার ওপরও ফি ভিন্ন হতে পারে।
সার্বভৌম ঝুঁকি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান জিএসএসআইয়ের শাহিন ইরানিনেজাদ ইকোনমিস্টকে বলেন, আরেকটি প্রস্তাবে ইরানের জলসীমায় প্রতি টনে ৩ ইউরো এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রতি টনে ২ ইউরো ফি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তার হিসাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ইরানের বার্ষিক আয় হতে পারে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলার।
সময়ের সঙ্গে বিকল্প রপ্তানি পথ বাড়লে এই আয় আরও কমবে। তবে সব ধরনের জাহাজের ক্ষেত্রে সমানভাবে কমবে না।
অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের ওপর চাপ দ্রুত কমতে পারে। কিন্তু পরিশোধিত জ্বালানি, এলএনজি ও বাল্ক কার্গোবাহী জাহাজকে আরও কয়েক বছর বেশি ফি দিতে হতে পারে।
এই আয় দীর্ঘদিন থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে জাহাজ কোম্পানিগুলো ফি দিতে রাজি হবে কি না, তার ওপর।
শিপিংবিষয়ক সাময়িকী লয়েডস লিস্টের রিচার্ড মিডের মতে, যদি ফি নির্দিষ্ট থাকে, সহজে পরিশোধ করা যায় এবং যুদ্ধজনিত অতিরিক্ত বীমা খরচের চেয়ে কম হয়, তাহলে অনেক কোম্পানিই তা দিতে রাজি হবে। কিন্তু যদি অনেক জাহাজ ইরানকে অর্থ না দিয়েই নিরাপদে হরমুজ পার হতে শুরু করে, তাহলে এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে বলে মত দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফি আদায়ের এই ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে ইরানের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক দরকার। আবার জাহাজগুলোকে অর্থ দিতে বাধ্য করতে নিয়ম না মানা জাহাজে হামলার হুমকিও ধরে রাখতে হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে শান্তি বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মূল লক্ষ্য শুধু অর্থ আয় নয়। রিচার্ড মিড বলেন, ইরানের বড় উদ্দেশ্য হলো বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নিজের ভূমিকা ধরে রাখা এবং হরমুজ প্রণালির ‘প্রবেশদ্বারের রক্ষক’ হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করা। আরও দীর্ঘমেয়াদে তারা এমন একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইতে পারে, যেখানে ওমানের সঙ্গে যৌথ কাঠামো, সামুদ্রিক সেবা ব্যবস্থা বা জাহাজ চলাচলের অনুমতিপত্র (পারমিট) ব্যবস্থা চালু থাকবে।
সব মিলিয়ে, খুব সহজেই হরমুজ প্রণালিকে চাপের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারায় ইরানের প্রতিপক্ষ দেশগুলো বিস্মিত হয়েছে। আর বিশ্লেষকদের ধারণা, যুদ্ধ শেষ হলেও হরমুজের ওপর ইরানের এই প্রভাব দীর্ঘদিন বজায় থাকতে পারে।