‘চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা, যদি না পড়ো ধরা’—ছোটবেলায় প্রবাদটি শুনে মনে হতো, এটি বুঝি অলস ছাত্রদের সান্ত্বনার বাণী। বড় হয়ে বুঝলাম, এটি আসলে আমাদের সময়ের সবচেয়ে সফল অর্থনৈতিক তত্ত্ব। অর্থনীতির বইয়ে এর উল্লেখ নেই, কিন্তু বাস্তবের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এর প্রয়োগ বিস্ময়করভাবে সফল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে ৩২ টাকার বেশি আর স্বাভাবিক পথে ফেরার সম্ভাবনা নেই। সংখ্যাটি এত বড় যে সেটিকে কেবল হিসাবের খাতায় লিখলে তার ভয়াবহতা বোঝা যায় না।
এই বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান একটি বাক্যে বহু বছরের ভদ্রলোকি পর্দা সরিয়ে দিলেন। তার ভাষায়, ব্যাংকিং খাতের এক-তৃতীয়াংশ টাকা আসলে চুরি হয়ে গেছে। আমরা যাকে এতদিন খেলাপি ঋণ বলছিলাম, সেটি মূলত চুরি হওয়া অর্থ।
এই একটি বাক্য বহু বছরের অভিনয়ের মেকআপ ধুয়ে দিয়েছে। এতদিন আমরা ভাবতাম, টাকা ঋণ হিসেবে গেছে, পরে ফেরত আসেনি। এখন জানা গেল, বিষয়টি এত ভদ্র ছিল না। ঋণের নামে টাকা বেরিয়ে গিয়ে আর কখনো বাড়ি ফেরেনি। তাকে আর খেলাপি বললে চলে না। সে তো নিখোঁজও নয়। তাকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এতদিন আমরা কী করছিলাম? উত্তর সহজ। আমরা শব্দের চিকিৎসা করছিলাম। ‘চুরি’ শব্দটি খুবই অভদ্র। তাই তাকে স্যুট-টাই পরিয়ে বানিয়ে ফেললাম ‘খেলাপি ঋণ’। শুনতেও মার্জিত, বলতেও আরাম। যেমন হাসপাতালের ভুল চিকিৎসাকে বলা হয় জটিলতা, তেমনি কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎকে বলা হয় খেলাপি ঋণ। ভাষার এই অলৌকিক ক্ষমতা পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি না সন্দেহ।
এতদিন আমরা ভেবেছিলাম, ঋণ গেছে, ব্যবসা খারাপ হয়েছে, তাই ফেরত আসেনি। এখন বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি এত সরল ছিল না। ঋণের নামে টাকা দরজা দিয়ে বেরিয়েছে, তারপর নাগরিকত্ব বদলে ফেলেছে। কেউ দুবাইয়ে, কেউ লন্ডনে, কেউ সিঙ্গাপুরে নতুন ঠিকানা খুঁজে নিয়েছে। শুধু আমানতকারীর পাসবইয়ে আর ফিরে আসেনি।
আমাদের দেশে ভাষারও শ্রেণিবৈষম্য আছে। ‘চুরি’ শব্দটি গরিব মানুষের জন্য। বড় মানুষের জন্য আছে ‘খেলাপি ঋণ’, ‘আর্থিক অনিয়ম’, ‘পুনঃতফসিল’, ‘পুনর্গঠন’ কিংবা ‘ব্যবসায়িক ঝুঁকি’। অভিধানের এই সামাজিক সংস্করণ সত্যিই বিস্ময়কর।
জাতীয় সংসদে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা উপস্থাপন করেছেন। সেখানে এস আলম গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠান, বেক্সিমকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান, কেয়া কসমেটিকস, দেশবন্ধু সুগার মিলস, পাওয়ারপ্যাকের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম, কর্ণফুলী ফুডস, সিএলসি পাওয়ারসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। তালিকাটি পড়লে মনে হয়, ঋণখেলাপিও যেন এক ধরনের করপোরেট অভিজাত ক্লাব। সাধারণ মানুষের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। কয়েক হাজার টাকার কিস্তি বাকি পড়লে ব্যাংকের ফোন আসে। কয়েক হাজার কোটি টাকা আটকে থাকলে আসে বৈঠক।
আমাদের সমাজে চুরিরও মর্যাদাক্রম আছে। ক্ষুধার তাড়নায় কেউ বাজার থেকে একটি রুটি চুরি করলে সে চোর। বিদ্যুতের মিটার বাইপাস করলে সে অপরাধী। কিন্তু হাজার হাজার কোটি টাকা বছরের পর বছর ফেরত না দিলে তাকে ‘চোর’ বলা অশোভন। তিনি শিল্পোদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, অর্থনীতির চালিকাশক্তি কিংবা ব্যবসায়িক সংকটের শিকার। শব্দ বদলালেই চরিত্রও বদলে যায়, অন্তত আমাদের জনপরিসরে।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, টাকা যত বড়, ভাষা তত ভদ্র। এক লাখ টাকা নিলে চুরি। একশো কোটি নিলে অনিয়ম। এক হাজার কোটি নিলে পুনর্গঠন। আর কয়েক হাজার কোটি হলে বলা হয়, বিষয়টি তদন্তাধীন।’ এই বড় বড় ঋণখেলাপিরা অনেক সম্মানিত। তিনি শিল্পোদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, সম্মানিত ব্যবসায়ী, সমাজসেবক, কখনো কখনো আবার নীতিনির্ধারকদের পরম সুহৃদ। তার বিরুদ্ধে মামলা হলে সেটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ওপর আঘাত। আর সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হলে সেটি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।
চুরির সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে আমরা নানা আয়োজনও করেছি। তদন্ত কমিটি আছে, অনুসন্ধান কমিটি আছে, বিশেষ টাস্কফোর্স আছে, উচ্চপর্যায়ের সভা আছে। শুধু টাকারই দেখা নেই। মনে হয় টাকা এত লাজুক যে কমিটির নাম শুনলেই বিদেশে পালিয়ে যায়। কমিটি প্রতিবেদন দেয়, প্রতিবেদন আলমারিতে যায়, আলমারির ওপর ধুলো জমে, ধুলোর ওপর নতুন কমিটি বসে। এভাবেই প্রশাসনিক পরিবেশে পুনর্ব্যবহারযোগ্য নাটকের জন্ম হয়।
ব্যাংক আসলে কোনো জাদুর বাক্স নয়। সেখানে জমা থাকে একজন স্কুলশিক্ষকের সঞ্চয়, একজন প্রবাসীর ঘাম, একজন কৃষকের ফসলের দাম, একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষের পেনশন। সেই অর্থ যখন হারিয়ে যায়, তখন শুধু ব্যাংকের ব্যালান্সশিট দুর্বল হয় না; দুর্বল হয় রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা।
কিন্তু আস্থার কোনো বাজারদর নেই। তাই তার ক্ষতিও জিডিপিতে ধরা পড়ে না।
এই সমাজে নৈতিকতারও অদ্ভুত বাজারচলতি দাম আছে। স্কুলে শেখানো হয়, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা অন্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বোঝা যায়, আত্মসাৎ যদি যথেষ্ট বড় আকারে হয়, তবে সেটিকে ভিন্ন নামে ডাকা যায়। চাকরিজীবী একটি কিস্তি মিস করলে তাকে নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু হাজার কোটি টাকার খেলাপির ক্ষেত্রে বলা হয়, ‘সমস্যার টেকসই সমাধান খুঁজতে হবে।’
মনে হয়, অর্থনীতির নতুন সূত্র হওয়া উচিত—ঋণের অঙ্ক যত বড়, জবাবদিহি তত ছোট।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন বিভাগ খুলতে পারে—‘উন্নত চুরিবিদ্যা ও আত্মসাৎ ব্যবস্থাপনা’। প্রথম বর্ষে থাকবে ঋণ সংগ্রহের কৌশল। দ্বিতীয় বর্ষে পুনঃতফসিলের দর্শন। তৃতীয় বর্ষে কাগজপত্রের গোলকধাঁধা নির্মাণ। শেষ বর্ষে বিদেশে সম্পদ স্থানান্তরের ব্যবহারিক পরীক্ষা। যে ছাত্র সবচেয়ে বেশি অর্থ সরিয়ে সবচেয়ে কম প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারবে, সে স্বর্ণপদক পাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলমন্ত্র হবে, ‘ধরা পড়িলে ভয় করিও না।’
অবশ্য শুধু চোরদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। যে সমাজ সততাকে বোকামি আর অসততাকে বুদ্ধিমত্তা হিসেবে পুরস্কৃত করে, সেখানে অসাধু লোকের অভাব হবে কেন? বাজার তো চাহিদা অনুযায়ীই পণ্য তৈরি করে। সমাজও তাই।
সবচেয়ে ভয়ের বিষয়, বড় চুরি যখন স্বাভাবিক হয়ে যায়, তখন ছোট মানুষও নিজের বিবেকের সঙ্গে আপস করতে শেখে। সে ভাবে, যারা হাজার কোটি টাকা আটকে রেখে সম্মান নিয়ে ঘোরে, সেখানে আমি যদি বাসভাড়া ফাঁকি দিই, একটু ঘুষ নিই কিংবা কর না দিই, তাতে এমন কী ক্ষতি? একটি জাতির নৈতিক পতন এভাবেই শুরু হয়। আদালতে নয়, মানুষের বিবেকের ভেতরে।
তাই আজ প্রবাদটির শেষ লাইন বদলে গেছে।
‘চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা, যদি না পড়ো ধরা’—এটি এখন সেকেলে।
নতুন সংস্করণ হলো, ‘চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা, ধরা পড়লেও খুব বেশি অসুবিধা নেই।’
কারণ ধরা পড়া আর শাস্তি পাওয়া এক জিনিস নয়। ধরা পড়া সংবাদপত্রের শিরোনাম হতে পারে, সংসদের আলোচনার বিষয় হতে পারে, টেলিভিশনের টক শো হতে পারে। কিন্তু অর্থ ফেরত আসে না। মানুষের বিশ্বাসও ফেরে না।
শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। একটি দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক যদি মানুষের বিশ্বাস হয়, তবে সেই বিশ্বাসের এক-তৃতীয়াংশ হারিয়ে গেলে তার হিসাব কোন খাতায় লেখা হবে? তার জন্য কি কোনো পুনঃতফসিল আছে? কোনো বিশেষ প্রণোদনা আছে? কোনো পুনরুদ্ধার তহবিল আছে? সম্ভবত নেই।
কারণ টাকা হারালে সরকার নতুন টাকা ছাপতে পারে। ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ করতে পারে। আইন বদলাতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস ছাপানোর কোনো মুদ্রণযন্ত্র আজও আবিষ্কৃত হয়নি।
আর যে সমাজে বিশ্বাসের মূলধন ফুরিয়ে যায়, সেখানে চোরেরা শুধু ব্যাংকের টাকা নিয়ে যায় না; তারা ভবিষ্যতের ওপরও ঋণ তুলে রেখে যায়—যে ঋণ কোনো দিনই শোধ হয় না!
চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও গবেষক।