৭৯ বছর ধরে বেলুচরা সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। এমনকি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে তারা অস্ত্র ধরেছিল, যেমন ধরেছিল বাঙালিরা। ১৯৫০ সালের মে মাসের শেষ দিকে আবদুল করিম খান কালওয়ান জেলার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান চালান। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এর প্রতিশোধ নেয়। এভাবে পাল্টাপাল্টি অভিযানের একপর্যায়ে সেনাবাহিনী বিদ্রোহী বেলুচদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা আবদুল করিমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এই বলে এক চুক্তিতে সই করেন যে তার পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। তারা পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে চুক্তি মেনে চলার শপথ নেন। কিন্তু কালাত যাওয়ার পথে করিম খান ও তার ১০২ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান সরকার সেই চুক্তি বরখেলাপ করে।
এ সম্পর্কে বিজেঞ্জো লিখেছেন,“কেএসএনপি নিষিদ্ধ ও দলের বেশিরভাগ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার করার পর কালাতকে পাকিস্তান দখল করে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে আমিও ছিলাম। আবদুল করিম খানের এই বিদ্রোহ দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো, বেলুচরা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি মেনে নেয়নি। দ্বিতীয়ত,পাকিস্তান সরকার চুক্তির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করল। করিম খান ও তার সহযোগীরা বেলুচ স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছেন।”
বেলুচদের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিণতি না পাওয়ার অন্যতম কারণ, তারা বিভিন্ন উপজাতি জনগোষ্ঠীতে বিভক্ত। একসঙ্গে সব উপজাতি জনগোষ্ঠী লড়াই-সংগ্রাম চালাতে পারেনি। কোনো না কোনো উপজাতি জনগোষ্ঠী পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আপস করেছে। সরকারও তাদের ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে বশে আনতে সচেষ্ট থেকেছে। আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করে বিজেঞ্জো লিখেছেন, “এতে যেসব উপাদান অনুপস্থিত ছিল, তা হলো উন্নত ও তীক্ষ্ণ জাতীয় মতৈক্য, স্বাধীনতার জন্য সর্বব্যাপী ও সুদৃঢ় প্রয়াস, সংগঠন, বস্তুগত শর্ত, নিবেদিতপ্রাণ নেতৃত্ব এবং সংগ্রামের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকা।”
সংগ্রামের কৌশল বদল
পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে কালাত স্টেট ন্যাশনাল পার্টির অধিকাংশ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হলে দলের নেতৃত্ব কৌশলগত কারণে মুসলিম লীগে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। বেলুচ নেতারা পঞ্চাশের দশকে প্রকাশ্যে মুসলিম লীগের ব্যানারে কাজ করলেও গোপনে বেলুচ রাজ্যগুলোর সমন্বয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র (বালুচ স্টেট ইউনিয়ন) গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছিলেন। তাদের স্বপ্ন ছিল কালাত, লাসবেলা, মাকরান, খারান নিয়ে এই ইউনিয়ন গঠিত হবে। বেলুচদের এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে কমিউনিস্টদের কাজের বেশ মিল আছে। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় বাম নেতারা আওয়ামী লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি কিংবা তাদের শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে কাজ করতেন। তারও আগে কেউ মুসলিম লীগ ও কেউ কংগ্রেসের ব্যানারেও কাজ করেছেন। পার্থক্য ছিল কমিউনিস্ট নেতারা চেয়েছিলেন সমাজ বিপ্লব, বেলুচ নেতারা চেয়েছিলেন স্বাধীনতা। দুটোই অধরা থেকে গেছে।
পাকিস্তানের প্রথম দশকের রাজনীতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মির গাউস বক্স বিজেঞ্জো লিখেছিলেন, “The adoption of the 'Objectives Resolution' by the Constituent Assembly in 1949, opening a window for religious and sectarian elements to interfere in the process of constitution-making and eventual emergence of religious intolerance and violence in national politics and governance.” তিনি আরও লিখেছেন, “১৯৫১ সালের তথাকথিত রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িয়ে পাকিস্তান সরকার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মী, প্রগতিশীল ছাত্র, লেখক, সাংবাদিক ও শ্রমিকনেতাদের গ্রেপ্তার ও বিচার করে। তারা বামপন্থী সব সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালায়।”
উল্লেখ্য, ১৯৪৯-৫০ সালে পাকিস্তানের দুই অংশেই মুসলিম লীগবিরোধী দলের রাজনীতির যাত্রা শুরু হয়। পূর্ব পাকিস্তানে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং পশ্চিম পাকিস্তানে নওয়াব মামদোতের নেতৃত্বে জিন্নাহ মুসলিম লিগ।
১৯৫৮ সালে সংঘটিত দ্বিতীয় বেলুচ বিদ্রোহের সঙ্গে পঞ্চাশের দশকের শুরুতে পূর্ববঙ্গের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের যোগসূত্র ছিল। বাঙালিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাঞ্জাবি শাসকেরা ভীত হয়ে সংখ্যা সাম্যের ভিত্তিতে দুটি ইউনিট গঠন করে, যার একটির নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান এবং অন্যটি পশ্চিম পাকিস্তান। এর আগে পূর্ব পাকিস্তান পূর্ববঙ্গ নামেই পরিচিত ছিল।
বেলুচরা এক ইউনিট গঠনের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। জেল থেকে বেরিয়ে আবদুল করিম খানও তাতে যোগ দেন। তারা ১৯৫৭ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার সঙ্গে দেখা করে কালাতকে এক ইউনিটের বাইরে রাখার পাশাপাশি উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানান। দুই পক্ষের মধ্যে এই মর্মে সমঝোতা হয় যে কেউ কারও বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করবে না
দুর্ভাগ্যজনক যে এই সমঝোতা বেশি দিন কার্যকর থাকেনি। কেননা, ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির আগেই সেনাবাহিনীর প্রধান আইয়ুব খান রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নিজের হাতে নেন, ইস্কান্দার মির্জা ছিলেন শিখণ্ডী মাত্র। ৬ অক্টোবর ১৯৫৮ আইয়ুব খান কালাতে সেনা অভিযান চালান। বালুচরাও রাজনৈতিক কৌশল পাল্টে কঠোর অবস্থান নেয়। উপজাতীয় সর্দারেরা অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন। করিম খান গড়ে তোলেন নিজস্ব সেনাবাহিনী। এই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী খান সাহেব ও তার অনুসারীদের গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের সঙ্গে গোপন ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনে সরকার। এ ঘটনা বেলুচদের মধ্যে ব্যাপক ও লাগাতার প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, সর্বত্র দেখা দেয় বিদ্রোহ। পাকিস্তান সেনাবাহিনী গেরিলা-অধ্যুষিত এলাকায় নির্বিচারে গোলাবর্ষণ করে।
খান সাহেবের অনুসারী জাশওয়ান সর্দারেরা নওসেবা ও ওয়াদে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করেন। জাশওয়ানে জেহার উপজাতীয়দের প্রধান নওরোজ খান মিরঘাট পাহাড়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা তাদের প্রতি অস্ত্রবিরতির আহ্বান জানান। তারা কোরআন হাতে নিয়ে এই প্রতিশ্রুতি দেন যে অস্ত্রবিরতি করলে নওরোজ খান ও তার সহযোগীদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে এবং সবাই সাধারণ ক্ষমার সুযোগ পাবেন। কিন্তু নওরোজ খান ও তার দুই ছেলে অস্ত্রসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গে সরকার জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়। এরপর ১৯৬০ সালের জুলাইতে নওরোজের দুই ছেলেকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ১৯৬২ সালে কোহলু জেলে খান সাহেব আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। এসবের মাধ্যমে আইয়ুব খান বেলুচদের এই বার্তাই দেন যে অনুগত না হলে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতেও তিনি দ্বিধা করবেন না। (চলবে)